বাংলায় আবার শূন্য থেকে শুরু! শাহি পরিকল্পনায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বঙ্গ বিজেপির দাপুটে নেতারাই

এত চেষ্টা করেও বঙ্গ-বিজেপিকে কিছুতেই সাবালক করতে পারছে না কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এ-রাজ্যের নব্য এবং অনভিজ্ঞ নেতাদের নালিশ শুনে দিল্লি কিছু নেতাকে মাঠের বাইরে পাঠিয়েছে, দিলীপ ঘোষকে ভিনরাজ্যে বদলি করেছে, হয়তো পাইপলাইনে 'সংস্কারমূলক' আরও কিছু কার্যক্রম আছে, তবুও পশ্চিমবঙ্গের গেরুয়া-ব্রিগেডের গায়ে গত্তি লাগছে না।

 

ফলে ফের কোচ-দেরই মাঠে নামতে হচ্ছে। একুশের বিধানসভা ভোটের আগে গোটা দেশের প্রায় হাজারখানেক পদ্ম-নেতা পর্যায়ক্রমে পা রেখেছিলেন বাংলায়। সবার মুখেই ছিল অমিত শাহ-র বেঁধে দেওয়া গান, 'অব কি বার, ২০০ পার', অর্থাৎ এবারের ভোটে ২০০ আসন পার করবে বিজেপি। পাঞ্জাব, সিন্ধু, গুজরাত, মারাঠা, দ্রাবিড়, উৎকলের ভাষা 'বঙ্গ' বোঝেনি। ফলে চাকা থেমে যায় '৭৭-এ, যা এখন '৬৯-এ দাঁড়িয়েছে। ফলপ্রকাশের পর দিলীপ ঘোষরা ঠিক এই অভিযোগই তুলে বলেছিলেন, দলের পাঠানো হিন্দিভাষী বক্তা-নেতাদের বাংলার গ্রামে প্রচারে পাঠানো ব্যুমেরাং হয়েছে। গেরুয়া নেতারা ঠিক কী বলতে চাইলেন, বাংলার মা-বোনরা তা ধরতেই পারেননি। ফলে ভোট গিয়েছে জোড়া ফুলে।

 

ঠিক এমনই তো হয়েছিল দিল্লি বিধানসভার ২০২০ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে। দিল্লি জিততে বিজেপি যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল, তাতে কেমন একটা অসহায় ভাবই যেন ফুটে উঠছিল৷ দিল্লির মোট আসনসংখ্যা ৭০। বিধানসভা নির্বাচনে ৭০-এ-৭০ পেতে মরিয়া চেষ্টায় নামে বিজেপি শিবির। প্রচারের শেষ ২০ দিনে দিল্লির ৭০টি আসনে মোট ৫,০০০ ছোট জনসভা করার পরিকল্পনা নেয় ভারতীয় জনতা পার্টি। সেসময় বিজেপির তরফেই জানানো হয়, তাদের লক্ষ‍্য ২০ দিনে ৭০টি আসনের প্রতিটিতে এক-একদিনে ৪ থেকে ৫টি করে জনসভার আয়োজন করা। যাতে প্রতিদিন প্রায় ২৫০টি করে জনসভা হয়। এই জনসভাগুলোতে সর্বাধিক ২০০ জন মানুষের জমায়েত হওয়ার আশা প্রকাশ করেছিল বিজেপি। ওখানেই শেষ নয়। ওই ২০ দিনে দিল্লিজুড়ে বিজেপির তরফে প্রচার করেন প্রায় ২০০ জন নেতা-নেত্রী। যাদের মধ্যে ছিলেন ক্যাবিনেট-স্তরের মন্ত্রী থেকে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত। দিল্লির বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের ভাষাগত বিন্যাস করে, সেইসব রাজ্যের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী বা বিরোধী হেভিওয়েট নেতাদের দিয়ে সভা করানো হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, দিল্লির বাঙালি-অধ্যুষিত এলাকায় দলের প্রচারে কাজে লাগানো হয় বাংলার নেতা-সাংসদদের। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৮টি জনসভা করেছেন। অমিত শাহ-কে দেখা গিয়েছে এলাকায় এলাকায় ঘুরে নিজেই লিফলেট বিলি করছেন। মোটের ওপর দিল্লি ভোটের প্রচারে দেশজুড়েই 'ঝড়' তুলেছিল বিজেপি। হবে না-ই বা কেন! ২০১৪-তে মসনদে বসেছেন নরেন্দ্র মোদি। ক্ষমতাসীন হওয়ার হনিমুন পিরিয়ড-এর মধ্যেই ২০১৫-তে দিল্লির ভোট। বিজেপি নিশ্চিত ছিল জয় এবার হবেই। হয়নি, গো-হারা হারে মোদির দল‌। তাই ২০২০-তে সব কাজ ফেলে বিজেপি এবং গোটা কেন্দ্রীয় সরকার ঝাঁপ দেয় দিল্লিতে। ভিন রাজ্যের নেতা-কর্মীর ভিড় দেখে দিল্লির বাসিন্দা কার্যত ঘাবড়ে যান। ২০২০-তে দিল্লির মোট ৭০ আসনের মধ্যে ৮টিতে কষ্টার্জিত জয় পায় জাতীয় বিজেপি‌। 'বহিরাগত'-দের জমায়েত করানো বরদাস্ত করেননি দিল্লিবাসী।

 

আরও পড়ুন: হঠাৎ ঘুম ভাঙল চাণক্য মুকুলের, খেলায় ফিরবেন না কি তলিয়েই যাবেন

 

তবে এতে যে বিশেষ শিক্ষা হয়েছে দিল্লি বিজেপির, এমন নয়। ফের একই পথে হেঁটে কেন্দ্রীয় বিজেপি। একুশের বঙ্গ-নির্বাচনে দফায় দফায় বিমানবোঝাই ভিন রাজ্যের নেতা বাংলায় পাঠায় নানা বিচিত্র সব কাজের ভার দিয়ে। মোদি-শাহ কার্যত ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেছেন দিল্লি-বাংলা। দিল্লির পর বাংলাও বিজেপিকে বার্তা দিয়েছে, উপযুক্ত ভূমিপুত্র না থাকলে এত বড় বড় ভাবনাচিন্তা না করাই উচিত, আত্মসম্মান কিছুটা হলেও বজায় থাকে৷ কিন্তু তাতেও শিক্ষা হয়নি।

 

একুশের ভোটে বাংলায় পর্যুদস্ত হওয়ার পর প্রায় বছরখানেক একটা হ্যাং-ওভারে কাটায় দিল্লির গেরুয়া নেতারা‌। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন আসলে নরেন্দ্র মোদির অ্যাসিড-টেস্ট। বিরোধী শিবির বুদ্ধিসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে মোদিকে হয়তো গুজরাতেই ফিরতে হবে। তাই দিল্লির বিজেপি এখন থেকেই সিরিয়াস হয়ে নেমে পড়েছে। বাংলা থেকে ২০১৯-এ ১৮ আসন জেতে গেরুয়াবাহিনি, এখন দাঁড়িয়েছে ১৬-তে। শোনা যাচ্ছে, তলায় তলায় সিঁধ কাটা প্রায় শেষের মুখে। যখনতখন এই সংখ্যা ১১- ১২-তে নেমে আসতে পারে। তবে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা জানেন, বাংলা থেকে জিতে আসা একাধিক 'অ্যাক্সিডেন্টাল এম পি'-র অনেকেই ২০২৪-এ আর ফিরতে পারবেন না। অথচ বাংলার ৪২ আসনের মধ্যে ১০-১২টা না পেলে বিজেপির অঙ্ক কিছুতেই মিলবে না। ওদিকে ২০১৩ সালে বাংলায় পঞ্চায়েত নির্বাচন৷ এই ভোট এগিয়েও আসতে পারে। বিজেপি পঞ্চায়েত ভোটকে প্রস্তুতি ম্যাচ হিসেবে দেখতে চাইছে। তাই এখন থেকেই বাংলার পিচে প্র্যাকটিসে নেমে পড়তে চলেছে দিল্লি। তবে রাজনৈতিক মহলের অভিমত, মোদি-শাহ-র সেই পুরনো স্ট্র্যাটেজি লোকসভা ভোটের আগেই যদি ফের বাংলায় প্রয়োগ করা হয়, তাহলে বিজেপির কপালে ২০২৪-এ দুঃখই লেখা আছে।

 

বিরোধী শিবিরের হাতে সেই 'বহিরাগত' হাতিয়ার তুলে দিতেই ফের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নিয়ে বাংলায় ঝাঁপাতে চলেছে দিল্লির বিজেপি। অবশ্য এছাড়া কোনও উপায়ও নেই। বঙ্গ বিজেপি এখনও নড়বড়ে। বড় মাপের বা দীর্ঘমেয়াদি কোনও কর্মসূচি গ্রহণের সবলতা রাজ্যের অফিসিয়াল গোষ্ঠীর নেই। বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে আজ পর্যন্ত নেতা-নেত্রীদের সময় চলে গিয়েছে নিজেদের মধ্যে চুলোচুলি করতে। কে বড় নেতা, কে দিল্লির খুব কাছের, তা প্রমাণ করতেই ব্যস্ত থাকায়, বঙ্গ-বিজেপি আর সেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময় পায়নি। দিল্লি সবই লক্ষ করেছে। তাই রাজ্য নেতৃত্বের ভার অপেক্ষাকৃত নব্য এবং অনভিজ্ঞদের হাতে তুলে দিয়ে গোটা সংগঠনই 'টেক ওভার' করেছে দিল্লি। কারণ, লোকসভা ভোট এগিয়ে আসছে‌। মাথায় হাত দিল্লির নেতাদের। বাংলা নেতারা এখনও ঠিকভাবে ভরসাযোগ্য হয়ে উঠতেই পারেনি, তাই ওষুধও খুঁজতে হচ্ছে দিল্লিকেই।

 

গেরুয়া-সূত্রের খবর, পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনের আগেই রাজ্য দলকে সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে বিজেপি যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার অংশ হিসেবে পদ্ম-শিবির এবার বাংলাজুড়ে বুথ স্তরে ছোট ছোট সভা করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। বিজেপি সূত্রের মতে, দলীয় কর্মীদের মনোবল বাড়াতেই এই ধরনের বিকেন্দ্রীভূত 'মাইক্রো' সভার ছক সাজিয়েছেন শাহ নিজেই। ৬ মে রাজ্য সফরে এসে বঙ্গ বিজেপির নেতাদের এই নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন অমিত শাহ। কলকাতার দলীয় বৈঠকে শাহ না কি বলেছেন, অতীতে দেখা গিয়েছে, বাংলায় বড় মাপের সমাবেশ শক্তি প্রদর্শনের জন্য ভালো হলেও তা দলের সংগঠনের ওপর খুব কম প্রভাব ফেলেছিল। নিউটাউনের এক হোটেলে বাছাই করা রাজ্য নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে শাহ না কি জোর দিয়েছিলেন, "এই মুহূর্তে বাংলায় শূন্য থেকে শুরু করাই জরুরি।"

 

বাংলার জন্য তৈরি করা শাহি ছক বলছে, এই ধরনের সভায় সর্বাধিক হাজারখানেক মানুষ থাকবেন। আর এই হাজার লোকের সভায় ভাষণ দিতে আসবেন শাহ, নাড্ডা-সহ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। বছরজুড়েই এই কর্মসূচি চলবে। দফায় দফায় ফের রাজ্যে আসবেন বাংলা ভাষা না-জানা নেতারা। একুশের বিধানসভা ভোটের প্রচারে এসে যাঁরা দুর্বোধ্য ভাষায় ভোট চেয়েছিলেন, ফের তাঁরাই এসে বাংলার মানুষকে বোঝাবেন, কেন মোদিকেই ভোট দেওয়া উচিত। এদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছে একাধিক রাজ্য নেতা। তাঁদের বক্তব্য, দলের সেকেন্ড বা থার্ড-ইন-কমান্ডদের যদি বুথ স্তরের মিটিং করতে হয়, তাহলে রাজ্যজুড়ে ভুল বার্তা যাবে। বিরোধীরা প্রচার করবে, দলের এমন হাল যে, ৫০০-১০০০ লোকের সভা করতেও আসতে হচ্ছে শাহ-নাড্ডাকে। এই প্রচার মানুষকে প্রভাবিত করলে পঞ্চায়েত ভোটেই মুখ থুবড়ে পড়বে রাজ্য বিজেপি। দলের এই অংশের অভিমতে সারবত্তা থাকলেও, তা উড়িয়ে দিয়েছে দিল্লি‌। কেন্দ্রীয় স্তরে গ্রহণ করা কর্মসূচিই চূড়ান্ত বলে জানানো হয়েছে।

 

বিজেপি সূত্রের খবর, অমিত শাহ না কি রাজ্যনেতাদের কাছে স্বীকার করেছেন, বাংলা নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের দীর্ঘদিন উদাসীন থাকাটা দলের পক্ষে ঠিক হয়নি। কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের ধারাবাহিক অনুপস্থিতিও সমস্যা বাড়িয়েছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে শাহ বলে গিয়েছেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আসলে উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন এবং আরও কিছু বিষয়ে ব্যস্ত ছিল। তবে এখন থেকে দিল্লি ফের নজরে এনেছে বাংলার সংগঠনকে।

 

অমিত শাহ বা জেপি নাড্ডারা লোকসভা ভোটের মুখে ফের বাংলা নিয়ে ভাবনা শুরু করছেন বটে, তবে গেরুয়া শিবিরের রাজ্য নেতৃত্বের একাংশের সাফ কথা, এসব টোটকায় গোষ্ঠী-কোন্দলের ক্রনিক ব্যামো কিছুতেই নিরাময় হবে না। একুশের নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে রাজ্য নেতাদের আকচা-আকচি বাড়তে দিয়েছে কেন্দ্রীয় নেতারাই। দিল্লির এক-একজন শীর্ষ স্তরের নেতা এরাজ্যের এক-একজন নেতাকে মদত দিয়ে গিয়েছেন। সেই মদতে রাজ্য নেতারা নিজেদের মোদি-শাহ স্তরের নেতা ভাবতে শুরু করেন, অপর পক্ষকে ঢালাও অপমান করতে থাকেন। একঝাঁক আদি বিজেপি নেতা অপমানের ভয়ে ঘরে বসে গিয়েছেন। ওদিকে নিচুতলার নেতা-কর্মীরা এই ধরনের অভ্যন্তরীণ কলহ দেখতে দেখতে হতাশ হয়ে দলে দলে বিজেপি ছাড়তে থাকেন। দলের সাংসদ-বিধায়করাও দলত্যাগ করছেন। তবুও চৈতন্য হয়নি দিল্লির।


দলের অন্দরের ক্রমবর্ধমান ঝগড়া এমন স্তরে পৌঁছে গিয়েছে যে, জনকয়েক বড় নেতা স্রেফ হুমকি দিয়ে দলের কমিটি গঠন পর্যন্ত আটকে রেখেছেন। উত্তরবঙ্গে, দক্ষিণবঙ্গে একধিক এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে। ময়নাগুড়ি এবং নন্দীগ্রামের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা-কর্মী সদ্যগঠিত মণ্ডল কমিটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ইস্তফা পর্যন্ত দিয়েছেন। বিধানসভার বিরোধী দলনেতার গোষ্ঠীভুক্ত লোকজনও নন্দীগ্রামে দু'টি মন্ডল কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন। ময়নাগুড়ির কমিটিতে আদি-দের উপেক্ষা করা হয়েছে বলে প্রতিবাদ করে যাঁরা পদত্যাগ করেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সংগঠনের জেলা সম্পাদকও।

 

বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের এই অংশের বক্তব্য, ম্যাক্রো বা মাইক্রো বৈঠক করার যে পরিকল্পনা শীর্ষ নেতারা গ্রহণ করেছেন, আখেরে তাতে কোনও লাভই হবে না। এসব নেহাতই কসমেটিক-সার্জারি। আগে দিল্লি এরাজ্যের নেতাদের গোষ্ঠীকোন্দল থামাক, দলত্যাগ কেন হচ্ছে, তার কারণ খুঁজুক। না হলে ২০২৩ বা ২০২৪-এর নির্বাচনে শোচনীয় ফলের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে কেন্দ্রীয় নেতাদের।

More Articles

;