মৃত্যুর চার মাস পর শেষ বিদায় খামেনির, ৯ জুলাই শেষকৃত্যের নেপথ্যে কী কারণ?
Ayatollah Ali Khamenei: মৃত্যুর চার মাস পর কেন দাফন হচ্ছে আলি খামেনির? ইসলামে যেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দাফনের রীতি, সেখানে ১৩১ দিন পর ৯ জুলাই শেষকৃত্য কেন?
পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে এক যুগের অবসান ঘটিয়েছিলেন তিনি। প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেশকে পরিচালনা করা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্য অবশেষে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আগামী ৯ জুলাই তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু হয়ে তাঁর জন্মশহর উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদে শেষ হবে এই দীর্ঘ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। কেন ৯ জুলাই দিনটিকেই বেছে নেওয়া হলো?
৮৬ বছর বয়সি আলি খামেনি চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন। তেহরানে তাঁর বাসভবন ও কার্যালয় লক্ষ্য করে চালানো ওই বিমান হামলায় শুধু খামেনিই নন, তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্য এবং ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তারাও প্রাণ হারান। সেই ঘটনার পর থেকেই গোটা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে।
ইসলামি রীতিনীতি অনুযায়ী কোনো মুসলিমের মৃত্যুর পর যত দ্রুত সম্ভব দাফন সম্পন্ন করা উচিত। সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই প্রক্রিয়া শেষ করার কথা বলা হয়। কিন্তু খামেনির ক্ষেত্রে ঘটছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা। মৃত্যুর ১৩১ দিন পর তাঁর দাফন হতে চলেছে, যা অত্যন্ত বিরল। যদিও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বা বিশেষ পরিস্থিতিতে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটতে পারে।
প্রথমদিকে পরিকল্পনা ছিল, ২০২৬ সালের মার্চ মাসের ৪ থেকে ৬ তারিখের মধ্যে তেহরান ও মাশহাদে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু সেই সময় ইরান জুড়ে যুদ্ধাবস্থা এবং নিরাপত্তাজনিত জটিলতার কারণে অনুষ্ঠান স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছিল সরকার। এরপর দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করা হয়।
নতুন ঘোষণায় জানানো হয়েছে, ৪ জুলাই থেকে তেহরানে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। রাজধানীর ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় ৪ ও ৫ জুলাই সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মরদেহ রাখা হবে। এই সময় হাজার হাজার মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
৬ জুলাই তেহরানে একটি বড় শোকমিছিলের আয়োজন করা হবে। তারপর ৭ জুলাই মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে পবিত্র শহর কোমে। শিয়া মুসলিমদের কাছে কোম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র। সেখানে বিশেষ স্মরণসভা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Assassination of Ali Khamenei: জানা গিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে খামেনির নিরাপত্তা বলয়, যাতায়াতের ধরন এবং বৈঠকের সময়সূচি নিয়ে বেশ কিছু নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।
এরপর ৯ জুলাই মাশহাদে অনুষ্ঠিত হবে চূড়ান্ত দাফন। এই দিনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ শিয়া ইসলামের চতুর্থ ইমাম এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদের প্রপৌত্র ইমাম সাজ্জাদের শাহাদতবার্ষিকীর আগের দিনেই খামেনির দাফনের আয়োজন করা হয়েছে। ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের মতে, এই সময় নির্বাচন করার মধ্যে একটি প্রতীকী বার্তা রয়েছে, যা শিয়া ঐতিহ্য ও আত্মত্যাগের ইতিহাসের সঙ্গে খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে যুক্ত করে।
আলি খামেনির মৃত্যু ঘিরে আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। হামলায় তাঁর পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তাঁর কন্যা বশরা খামেনি, পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ-আদেল, জামাতা মেসবাহ বাঘেরি কানী এবং নাতনি জাহরা মোহাম্মদি গোলপায়েগানি। একই সঙ্গে ইরানের সামরিক কাঠামোর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বও প্রাণ হারান। ফলে হামলাটি শুধু একজন রাষ্ট্রনেতার মৃত্যু নয়, বরং ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে চালানো এক বড় আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।
হামলার সময় খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিও আহত হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্ত দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা ছিল, খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবার নাম বিবেচনায় রয়েছে।
তবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে খুব কমই দেখা গিয়েছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, হামলায় তিনি এতটাই গুরুতর আহত হয়েছিলেন যে কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারছেন না। আবার অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরানের ক্ষমতা বর্তমানে অনেকটাই ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
যদিও তেহরানের শাসকগোষ্ঠী এই সমস্ত দাবি বারবার অস্বীকার করেছে। সরকারের বক্তব্য, মোজতবা খামেনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং স্বাভাবিকভাবেই দেশের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন এখনও থামেনি।
খামেনির শেষকৃত্যের ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির খবর সামনে এসেছে। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর দুই দেশ একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির কাঠামো নিয়ে একমত হয়েছে বলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দাবি করেছেন।
শাহবাজ শরিফের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই একটি প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারে। এমনকি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
তবে ইরান কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি জানিয়েছেন, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনও ঠিক হয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, পরদিনই চুক্তি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তা হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির শেষকৃত্য এবং সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি—এই দুই ঘটনা একসঙ্গে ইরানের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। একদিকে দেশটি তার দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতাকে বিদায় জানাতে চলেছে, অন্যদিকে বহু রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে।
আলি খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে তিনি গত কয়েক দশক ধরে ইরানের রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং ধর্মীয় কাঠামোর কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন। ৯ জুলাই মাশহাদে তাঁর দাফনের মাধ্যমে সেই অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। একই সঙ্গে শুরু হবে ইরানের নতুন নেতৃত্ব এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার আরেকটি অধ্যায়।









