সিআইএ-র তথ্যেই কি চিহ্নিত হয়েছিল খামেনির অবস্থান?
Assassination of Ali Khamenei: জানা গিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে খামেনির নিরাপত্তা বলয়, যাতায়াতের ধরন এবং বৈঠকের সময়সূচি নিয়ে বেশ কিছু নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এমন এক মোড় নিয়েছে, যার অভিঘাত শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রেই যেন নতুন দাগ কেটে দিয়েছে ঘটনাটি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এক যৌথ সামরিক অভিযানে নিহত হয়েছেন, অভিযান যুক্ত ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করার পর থেকেই উত্তেজনা চরমে উঠেছে।
খামেনি প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন। ১৯৮৯ সালে তিনি সর্বোচ্চ নেতার পদে বসেন এবং তারপর থেকে দেশের সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সিদ্ধান্তের শেষ কথা তিনিই ছিলেন। প্রেসিডেন্ট বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু নীতিগত ধারাবাহিকতার কেন্দ্রে ছিলেন খামেনি। তাঁর মৃত্যু তাই কেবল একজন নেতার মৃত্যু নয়; এটি ইরানের রাষ্ট্রকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত।
ঘটনার পেছনে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার ইতিহাস রয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে টানাপোড়েন বহু বছরের। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিরোধ, ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। গত কয়েক মাসে সেই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Iran After Ayatollah Ali Khamenei: খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: ইরানের নতুন নেতৃত্ব কে হবে?
জানা গিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে খামেনির নিরাপত্তা বলয়, যাতায়াতের ধরন এবং বৈঠকের সময়সূচি নিয়ে বেশ কিছু নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী এমন একটি সময় বেছে নেয়, যখন শীর্ষ নেতৃত্ব একত্রে উপস্থিত থাকবে— ফলে আঘাত হবে সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে।
হামলার দিন ভোররাতে তেহরানের একটি উচ্চ-নিরাপত্তা কমপাউন্ডে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়। সেটি ছিল খামেনির কার্যালয়। বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে রাজধানী। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কমপাউন্ডের প্রধান ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। পরে নিশ্চিত করা হয়, সেখানেই উপস্থিত ছিলেন খামেনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শোকবার্তা প্রচার করে এবং ৪০ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে 'প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ' বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছিল এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এটিকে 'বিরল কৌশলগত সুযোগ' বলে আখ্যা দেন। তাঁর দাবি, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে এই হামলা ভবিষ্যতের বড় সংঘাত ঠেকাতে সাহায্য করবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
US Israel Iran war: ইজরায়েল বহুদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে উৎসাহ দিয়ে আসছিল। এবার সেই লক্ষ্য অনেকটাই পূরণ হয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সর্বসম্মত সমর্থন পায়নি। বহু দেশই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, একটি সার্বভৌম দেশের শীর্ষ নেতাকে সরাসরি লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক ডেকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা শুরু করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে এশিয়ার বহু দেশ সংযমের আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল তৎক্ষণাৎ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইজরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু স্থাপনায় হামলার চেষ্টা হয়। যদিও অধিকাংশ হামলাই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, তবু উত্তেজনা বেড়েছে বহুগুণ।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ কীভাবে বদলাবে? ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে সর্বোচ্চ নেতা হলেন চূড়ান্ত কর্তৃত্বের প্রতীক। তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরসূরি নির্বাচনের দায়িত্ব পড়বে ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’-এর উপর। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে Islamic Revolutionary Guard Corps বা আইআরজিসি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাহিনীর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। ফলে ইরানের নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব তেল সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। হামলার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। শিপিং রুট, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
এখন ইরানের অভ্যন্তরে শোক, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তা মিলেমিশে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করেছে। কেউ কেউ খামেনির কঠোর নীতির সমালোচক ছিলেন, আবার অনেকেই তাঁকে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রতীক মনে করতেন। তাঁর মৃত্যু নতুন করে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব উসকে দিতে পারে।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। এটি বহু বছরের অবিশ্বাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং কৌশলগত দ্বন্দ্বের পরিণতি। খামেনির মৃত্যু হয়তো ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন পথে নিয়ে যাবে, আবার হয়তো আরও কঠোর অবস্থান তৈরি করবে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেহরান, ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের দিকে। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতি।






