সিআইএ-র তথ্যেই কি চিহ্নিত হয়েছিল খামেনির অবস্থান?

Assassination of Ali Khamenei: জানা গিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে খামেনির নিরাপত্তা বলয়, যাতায়াতের ধরন এবং বৈঠকের সময়সূচি নিয়ে বেশ কিছু নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।

inscript
৬ মিনিট
সিআইএ-র তথ্যেই কি চিহ্নিত হয়েছিল খামেনির অবস্থান?

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এমন এক  মোড় নিয়েছে, যার অভিঘাত শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রেই যেন নতুন দাগ কেটে দিয়েছে ঘটনাটি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এক যৌথ সামরিক অভিযানে নিহত হয়েছেন, অভিযান যুক্ত ছিল  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করার পর থেকেই উত্তেজনা চরমে উঠেছে।

খামেনি প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন। ১৯৮৯ সালে তিনি সর্বোচ্চ নেতার পদে বসেন এবং তারপর থেকে দেশের সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সিদ্ধান্তের শেষ কথা তিনিই ছিলেন। প্রেসিডেন্ট বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু নীতিগত ধারাবাহিকতার কেন্দ্রে ছিলেন খামেনি। তাঁর মৃত্যু তাই কেবল একজন নেতার মৃত্যু নয়; এটি ইরানের রাষ্ট্রকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত।

ঘটনার পেছনে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার ইতিহাস রয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে টানাপোড়েন বহু বছরের। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিরোধ, ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। গত কয়েক মাসে সেই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
খামেনির মৃত্যু কি বদলে দেবে ইরানের ক্ষমতার সমীকরণ?

Iran After Ayatollah Ali Khamenei: খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: ইরানের নতুন নেতৃত্ব কে হবে?

জানা গিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে খামেনির নিরাপত্তা বলয়, যাতায়াতের ধরন এবং বৈঠকের সময়সূচি নিয়ে বেশ কিছু নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী এমন একটি সময় বেছে নেয়, যখন শীর্ষ নেতৃত্ব একত্রে উপস্থিত থাকবে— ফলে আঘাত হবে সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে।

হামলার দিন ভোররাতে তেহরানের একটি উচ্চ-নিরাপত্তা কমপাউন্ডে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়। সেটি ছিল খামেনির কার্যালয়। বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে রাজধানী। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কমপাউন্ডের প্রধান ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। পরে নিশ্চিত করা হয়, সেখানেই উপস্থিত ছিলেন খামেনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শোকবার্তা প্রচার করে এবং ৪০ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে 'প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ' বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছিল এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এটিকে 'বিরল কৌশলগত সুযোগ' বলে আখ্যা দেন। তাঁর দাবি, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে এই হামলা ভবিষ্যতের বড় সংঘাত ঠেকাতে সাহায্য করবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ট্রাম্প না নেতানিয়াহু! ইরানে হামলায় কার লাভ বেশি?

US Israel Iran war: ইজরায়েল বহুদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে উৎসাহ দিয়ে আসছিল। এবার সেই লক্ষ্য অনেকটাই পূরণ হয়েছে।

তবে এই ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সর্বসম্মত সমর্থন পায়নি। বহু দেশই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, একটি সার্বভৌম দেশের শীর্ষ নেতাকে সরাসরি লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক নিয়ম ভেঙে দিয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক ডেকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা শুরু করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে এশিয়ার বহু দেশ সংযমের আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল তৎক্ষণাৎ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইজরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু স্থাপনায় হামলার চেষ্টা হয়। যদিও অধিকাংশ হামলাই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, তবু উত্তেজনা বেড়েছে বহুগুণ।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ কীভাবে বদলাবে? ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে সর্বোচ্চ নেতা হলেন চূড়ান্ত কর্তৃত্বের প্রতীক। তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরসূরি নির্বাচনের দায়িত্ব পড়বে ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’-এর উপর। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে Islamic Revolutionary Guard Corps বা আইআরজিসি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাহিনীর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। ফলে ইরানের নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব তেল সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। হামলার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। শিপিং রুট, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

এখন ইরানের অভ্যন্তরে শোক, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তা মিলেমিশে এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করেছে। কেউ কেউ খামেনির কঠোর নীতির সমালোচক ছিলেন, আবার অনেকেই তাঁকে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রতীক মনে করতেন। তাঁর মৃত্যু নতুন করে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব উসকে দিতে পারে।

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।  এটি বহু বছরের অবিশ্বাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং কৌশলগত দ্বন্দ্বের পরিণতি। খামেনির মৃত্যু হয়তো ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন পথে নিয়ে যাবে, আবার হয়তো আরও কঠোর অবস্থান তৈরি করবে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেহরান, ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের দিকে। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতি।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।