স্কুল বন্ধ, রাস্তায় বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ: ফ্রান্সে ছাত্র আন্দোলনের নেপথ্যে কী?
France Student Protests 2026: কেন উত্তাল ফ্রান্স? হাজার হাজার পড়ুয়া কেন স্কুল ছেড়ে রাজপথে? পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কেন বাড়ছে উত্তেজনা?
ফ্রান্সে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ৬ অক্টোবর তা কার্যত জাতীয় বিক্ষোভের চেহারা নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্কুল বন্ধ, রাস্তা অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছাত্র আন্দোলনগুলির একটির সাক্ষী হচ্ছে ফ্রান্স। এই আন্দোলনের মূল অভিযোগ, দেশের সরকারি স্কুলগুলিতে শিক্ষক নেই, শ্রেণিকক্ষ উপচে পড়ছে পড়ুয়ায়, বহু স্কুলের পরিকাঠামো ভেঙে পড়ছে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি বিনিয়োগ কমছে।
৬ অক্টোবরের বিক্ষোভে শুধু পড়ুয়ারাই নয়, শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরাও পথে নামেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ২ লক্ষ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শুধু প্যারিসেই সংখ্যাটা প্রায় ৫৬ হাজার। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আরও বেশি। মার্সেই, স্ট্রাসবুর্গ-সহ একাধিক শহরেও বড় জমায়েত হয়। কয়েকশো স্কুলে তালা ঝোলানো হয় বা স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করে দেন পড়ুয়ারা।
এই আন্দোলনের শুরু অবশ্য এত বড় আকারে হয়নি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের উত্তরের দরিদ্র শহরতলির একটি স্কুলে শিক্ষক ধর্মঘটকে সমর্থন জানিয়ে পড়ুয়াদের বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে একে একে আরও স্কুলের পড়ুয়ারা সেই আন্দোলনে যোগ দেন। মূলত প্যারিসের তুলনামূলক দরিদ্র শহরতলির স্কুলগুলি থেকেই আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। সেখানকার পড়ুয়াদের অভিযোগ ছিল, ধনী এলাকার স্কুলগুলির তুলনায় তাঁদের স্কুলে পরিকাঠামো ও শিক্ষকের অভাব অনেক বেশি।
একজন ১৭ বছরের পড়ুয়া সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁদের স্কুলে এমনও হয়েছে যে ফরাসি ভাষার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হয়েছে পর্যাপ্ত শিক্ষক ছাড়াই। অন্য পড়ুয়ারা জানিয়েছেন, কোনো কোনো শ্রেণিতে ৪০ জন পর্যন্ত পড়ুয়া রয়েছে। কোথাও ছাদ থেকে জল পড়ছে, কোথাও দেওয়াল ও ভবনের অবস্থা খারাপ, আবার কোথাও শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না।
শুধু শিক্ষক বা স্কুলের পরিকাঠামোর সমস্যা নয়, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের তালিকা আরও দীর্ঘ। অত্যধিক দীর্ঘ স্কুলের সময়, গরমে শ্রেণিকক্ষে বসার সমস্যা, কর্মীদের ঘাটতি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জটিল ব্যবস্থা এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের পড়ুয়াদের জন্য আর্থিক সহায়তা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। মে ও জুন মাসের তীব্র গরমের সময় বহু স্কুলে শ্রেণিকক্ষের তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে পড়াশোনা ও পরীক্ষা দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ঘাটতির বিষয়টিও নতুন নয়। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলিতে প্রায় ১০ শতাংশ শিক্ষকতার সময় কার্যত পড়ানো হয়নি বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে। এর একটি বড় কারণ ছিল অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় বিকল্প শিক্ষক না পাওয়া। একই সময়ে ২০০৮ সালের তুলনায় মাধ্যমিক স্কুলগুলিতে শিক্ষক কমেছে, অথচ পড়ুয়ার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় আড়াই লক্ষ। সরকারি স্কুলের প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রেণিকক্ষে ৩০ জনের বেশি পড়ুয়া রয়েছে বলে সিএনএন-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
France NGO: প্রতি বছর ফ্রান্সে প্রায় ৭০ হাজারটি নতুন সংগঠন তৈরি হয়, যেখানে বন্ধ হয় প্রায় ৩৫ হাজার সংগঠন। প্রতি দশজন কর্মীর মধ্যে একজন ফ্রান্সে এমন অলাভজনক সংস্থায় কাজ করেন।
পড়ুয়াদের বক্তব্য, স্কুলে গিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশে পড়াশোনা করার অধিকারটুকুই তাঁরা চাইছেন। আন্দোলনকারীদের অনেকেই বলছেন, সরকার তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ তৈরির জন্য যে স্কুল ব্যবস্থার প্রয়োজন, সেটিই আজ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে। বেশ কিছু জায়গায় আগুন লাগানো, ব্যারিকেড তৈরি এবং পুলিশের দিকে আতশবাজি ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে। সরকার এই ঘটনাগুলিকে ‘শহুরে হিংসা’ বলে সমালোচনা করেছে। কিন্তু পড়ুয়া এবং তাদের সমর্থকদের অভিযোগ, পুলিশ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শক্তি প্রয়োগ করছে।
এই সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। ৬ অক্টোবর ফরাসি কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাবে, আন্দোলন শুরুর পর থেকে ৯৩০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৭১৫ জন পুলিশকর্মী এবং ২০০-র বেশি কিশোর-কিশোরী রয়েছেন। একজন পড়ুয়া বিক্ষোভের সময় একটি ভিড় নিয়ন্ত্রণের গ্রেনেড হাতে তুলে নেওয়ার পর হাত হারিয়েছেন। আর এক পড়ুয়া চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে।
পুলিশের হাতে আটক পড়ুয়ার সংখ্যাও বাড়ছে। কয়েক সপ্তাহে ৫ হাজারের বেশি মানুষকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে সিএনএন জানিয়েছে। তাঁদের বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং তাঁদের আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না।
সরকার বলছে, ছাত্রদের অনেক দাবি যুক্তিসঙ্গত হলেও স্কুলে আগুন লাগানো বা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু আন্দোলনের হিংসাত্মক ঘটনাগুলির নিন্দা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, পড়ুয়াদের অভিযোগ শোনার জন্য স্কুলগুলিতে অভ্যন্তরীণ আলোচনার ব্যবস্থা করা হবে। সরকার শিক্ষক ঘাটতি, স্কুলের পরিকাঠামো এবং স্কুলের সময়সূচি নিয়েও পদক্ষেপের কথা বলেছে।
ফ্রান্সের অর্থনীতিও এই মুহূর্তে বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। দেশের সরকারি ঋণ ৪ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়ে গিয়েছে এবং তা দেশের মোট অর্থনীতির আকারকে ছাড়িয়েছে। ঋণের সুদ মেটানোর খরচও বাড়ছে। একই সময়ে বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে পেনশনের খরচ বাড়ছে, আবার প্রতিরক্ষা খাতেও সরকারকে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষা খাতে বিপুল নতুন অর্থ বরাদ্দ করা সরকারের পক্ষে সহজ নয়।
এই অর্থনৈতিক সংকটই ছাত্র আন্দোলনকে আরও বড় রাজনৈতিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। কারণ আগামী বছর ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ থাকা মধ্যপন্থী দলগুলির প্রতি তরুণদের আস্থা কমছে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ডানপন্থী ও বামপন্থী শক্তিগুলি এই আন্দোলনকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
ফ্রান্সের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলন নতুন কিছু নয়। ১৯৬৮ সালের ছাত্র আন্দোলন পরবর্তীতে দেশের বৃহত্তম ধর্মঘটগুলির একটিতে পরিণত হয়েছিল। সেই আন্দোলনের প্রভাব ফরাসি রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ছিল। ২০২৬-এর আন্দোলনের সঙ্গে সেই সময়ের সরাসরি তুলনা করা হয়তো এখনই সম্ভব নয়। কিন্তু একটি জায়গায় দুই সময়ের মধ্যে মিল রয়েছে—তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
আজকের ফরাসি পড়ুয়ারা বলছেন, তাঁরা অসম্ভব কিছু চাইছেন না। তাঁদের দাবি, স্কুলে যেন শিক্ষক থাকেন, শ্রেণিকক্ষ যেন নিরাপদ হয়, প্রচণ্ড গরমে যেন পড়ুয়াদের পরীক্ষা দিতে না হয় এবং আর্থিক অবস্থার কারণে যেন কারও
শিক্ষার সুযোগ কমে না যায়।






