ব্রিকস সম্মেলনে নয়াদিল্লি আসছেন না তারেক, কেন আমন্ত্রণ নিয়ে ভিন্ন দাবি ঢাকার?
Tarique Rahman Skips BRICS Summit: ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে কেন ভারত যাচ্ছেন না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান? ঢাকা কেন দাবি করছে, তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, অন্য ভূমিকায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল?
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে আসছেন না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে তৈরি হয়েছে কূটনৈতিক বিতর্কও। কারণ, ভারতের তরফে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলেই খবর সামনে এসেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার এখন বলছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ঢাকার দাবি, তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল অন্য একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন বিমস্টেকের চেয়ারম্যান হিসেবে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামনে এসেছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান সমীকরণ। ঢাকার বক্তব্য, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর কোনো বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত নয়। বরং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে আলাদা দ্বিপাক্ষিক সফরেই তিনি ভারতে আসবেন।
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। বর্তমানে ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে ভারত। এই সম্মেলনে যোগ দিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-সহ একাধিক দেশের রাষ্ট্রনেতার ভারতে আসার কথা। সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও যোগ দিতে পারেন বলে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের তরফে সেই সম্ভাবনা কার্যত উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বিমস্টেকের চেয়ারম্যান হিসেবে।
বিমস্টেক বা বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকনমিক কো-অপারেশন হলো বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি আঞ্চলিক সংগঠন। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাতটি দেশ এই সংগঠনের সদস্য।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে হুমায়ুন কবির পাল্টা প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের সরকার থেকে কাউকে কি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে? বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে কি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে? তাঁর বক্তব্যে কার্যত এটাই বোঝানো হয় যে, বিমস্টেক চেয়ারম্যান হিসেবে কোনো আমন্ত্রণকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ বলে দেখা ঠিক হবে না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sheikh Hasina: শেখ হাসিনা সত্যিই চলতি বছরের শেষে বাংলাদেশে ফিরবেন? ফিরলে কি তাঁকে সরাসরি আদালতের মুখোমুখি হতে হবে, নাকি তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে?
ভারতের তরফে অবশ্য তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং পাশাপাশি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে ভারত সফরের জন্য আলাদা দ্বিপাক্ষিক আমন্ত্রণও দেওয়া হয়েছিল বলে খবর সামনে আসে। গত ফেব্রুয়ারি থেকেই সেই আমন্ত্রণের কথা সামনে এসেছিল।
বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের পরে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার সময়ও ভারত শুভেচ্ছা জানিয়েছিল। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। তাঁর মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছাবার্তাও পৌঁছেছিল তারেক রহমানের কাছে। ভারত সফরের জন্য তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তা হলে এখন ব্রিকস সম্মেলনে তাঁর না যাওয়ার কারণ কী?
বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সফর হিসেবেই দেখতে চাইছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম সফর কোনো বহুপাক্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে হওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন দ্বিপাক্ষিক সফর এবং আলোচনাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকলে তারেক রহমান ভারত সফর করবেন। কিন্তু সেই সফর নিয়ে তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গত কয়েক মাসে দুই দেশের সম্পর্ক নানা কারণেই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। একদিকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে সীমান্ত, নদীর জলবণ্টন, বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্যও সামনে এসেছে।
বিশেষ করে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার জল ভাগাভাগি নিয়ে যে চুক্তি হয়েছিল, তার ৩০ বছরের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sheikh Hasina’s India Connection: ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন? সেই কঠিন সময়ে ইন্দিরা গান্ধী কীভাবে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন? দিল্লি কীভাবে হয়ে উঠেছিল তাঁর নিরাপদ আশ্রয়?
বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি বিষয় ঢাকা গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও বাংলাদেশ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করতে চায়।
গঙ্গার জলবণ্টন প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুষ্ক মরসুমে দুই দেশের মধ্যে নদীর জল ভাগাভাগি নিয়ে এই চুক্তি হয়েছিল। এখন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন হবে।
বাণিজ্য নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। যদিও এই মুহূর্তে নতুন কোনো বড় সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
তবে এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, আমন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে এমন পার্থক্য কেন?
ভারতের তরফে বলা হয়েছে, বিমস্টেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের বক্তব্য, সেই আমন্ত্রণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ছিল না। তাই বাংলাদেশের সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর সেখানে যাওয়ার প্রশ্নও উঠছে না।
একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কোনো দেশের সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো আর কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের সরকার এখন সেই পার্থক্যটিকেই সামনে আনছে। ঢাকার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের মর্যাদা এবং তাঁর প্রথম ভারত সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যে ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে এগিয়েছিল, নতুন সরকারের সময়ে সেই সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর চেষ্টা চলছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ব্রিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে তারেক রহমানের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারত। এবারের সম্মেলনে বিশ্বের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা যোগ দিচ্ছেন। ভারত, চিন ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশের নেতাদের উপস্থিতিতে এই সম্মেলনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ আপাতত সেই মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর পরিবর্তে তারা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই আলোচনায় জলবণ্টন, বাণিজ্য, পারস্পরিক স্বার্থ এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের বক্তব্য পরিষ্কার, তারেক রহমান ভারত সফর করবেন, কিন্তু তা তখনই, যখন দুই দেশের মধ্যে সেই সফরের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সম্ভব হবে।
এখন দেখার, ব্রিকস সম্মেলনের পরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সেই দ্বিপাক্ষিক সফরের পথ কতটা দ্রুত তৈরি হয়। গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দুই দেশের আলোচনা কোন দিকে এগোয়, বাণিজ্য নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হয় এবং নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক কোন সমীকরণে দাঁড়ায়—সেই উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরের সময় এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব।








