হাসিনার অতীতের ভারতবাস, কীভাবে আশ্রয়ের হাত বাড়িয়েছিল ভারত?
Sheikh Hasina’s India Connection: ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন? সেই কঠিন সময়ে ইন্দিরা গান্ধী কীভাবে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন? দিল্লি কীভাবে হয়ে উঠেছিল তাঁর নিরাপদ আশ্রয়?
একই পরিবারের দুই প্রজন্মের জীবনে যেন ফিরে এসেছে একই ছবি। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। সেই সময় তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন দেশের বাইরে। আর পাঁচ দশক পর, বাংলাদেশে সরকারবিরোধী আন্দোলনের চাপে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছাড়তে হয় শেখ হাসিনাকে। সঙ্গী হন সেই বোন শেখ রেহানাই। একবার পরিবারকে হারিয়ে দেশছাড়া হতে হয়েছিল দুই বোনকে, আর পরেরবার তাঁদের একজনকে দেশ ও ক্ষমতা—দুটিই ছাড়তে হলো।
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনা। শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ধানমন্ডির বাড়িতে সপরিবারে হত্যা করা হয় তাঁকে। তাঁর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসা, তিন ছেলে এবং দুই পুত্রবধূও সেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ও দেশের কয়েকজন মন্ত্রী-সহ মোট ৩৬ জনকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা হত্যা করেছিলেন। এক মুহূর্তে বাবা-মা, ভাই এবং পরিবারের বহু সদস্যকে হারিয়ে ফেলেন দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।
কিন্তু সেই ভয়াবহ ঘটনার সময় বাংলাদেশে ছিলেন না তাঁরা। তার কিছুদিন আগে স্বামী পদার্থবিদ এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে জার্মানিতে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। রেহানাও ছিলেন তাঁর সঙ্গে। জার্মানিতে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে তাঁদের বিদায় জানাতে এসেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। তখন কেউই জানতেন না, সেটিই হয়তো বাবা-মা ও ভাইদের সঙ্গে দুই বোনের শেষ দেখা। বিমানবন্দর থেকে যে বিদায় নিয়েছিলেন তাঁরা, তার পর আর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের সঙ্গে কোনো দিন দেখা হয়নি।
পরে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, ভারতই প্রথম দিকের দেশগুলির মধ্যে অন্যতম, যারা তাঁদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি স্মরণ করেছিলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার বক্তব্য অনুযায়ী, যুগোস্লাভিয়ার নেতা মার্শাল টিটো এবং ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকেও তাঁরা সাহায্য পেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা দিল্লিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের মনে হয়েছিল, দিল্লি থেকে হয়তো পরে বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারবেন। একই সঙ্গে পরিবারের কতজন সদস্য তখনও বেঁচে আছেন, সেটাও তাঁরা জানতে চেয়েছিলেন।
শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেসার পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় শেখ হাসিনা। তাঁর পরেই শেখ রেহানা। ছোটবেলা থেকেই দুই বোনের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। রাজনৈতিক জীবনেও সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। শেখ হাসিনার বহু সরকারি সফরে তাঁর সঙ্গে থেকেছেন রেহানা। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Aynaghar Bangladesh: ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০৫ জন গুম হয়েছেন বাংলাদেশে।
২০০৭-০৮ সালে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার সময় শেখ হাসিনাকে কারাবন্দি করা হয়েছিল। সেই সময় দিদির হয়ে দলীয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন রেহানা। অর্থাৎ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়গুলিতে বারবার তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। সময় বদলেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু দুই বোনের এই সম্পর্ক বদলায়নি।
১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের পর দুই বোনের জীবনও বদলে যায়। পরিবারের নিরাপত্তা হারিয়ে তাঁরা আশ্রয় নেন ভারতে। তখন শেখ হাসিনা তাঁর স্বামী, সন্তান এবং বোন রেহানাকে নিয়ে ভারতে ছিলেন। দেশ থেকে দূরে বসেই তাঁরা কাটিয়েছেন এক কঠিন সময়। মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁদের সামনে ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। একদিকে পরিবারের শোক, অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনীতির অনিশ্চয়তা—তাঁদের জীবন একেবারে অন্য পথে চলে যায়।
রেহানার ব্যক্তিগত জীবনও সেই সময়ের পর নতুন দিকে মোড় নেয়। ১৯৭৫ সালে মুজিবুর রহমানকে হত্যার সময় তাঁর বিয়ে হয়নি। কয়েক বছর পরে বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ শফিক আহমেদ সিদ্দিকীকে বিয়ে করেন তিনি। লন্ডনে তাঁদের বিয়ে হয়। সেই বিয়েতে অর্থাভাবে যোগ দিতে পারেননি শেখ হাসিনা। পরে রেহানা তিন সন্তানের মা হন।
পরে শেখ হাসিনা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই দিনের কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, তাঁর স্বামী বিদেশে থাকায় তিনি পরিবারের সঙ্গেই থাকতেন। তিনি বলেন,
ইন্দিরা গান্ধী সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি আমাদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিতে চান। আমরা বিশেষ করে যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো এবং শ্রীমতী গান্ধীর কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছিলাম। আমরা দিল্লিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমাদের মনে হয়েছিল, দিল্লিতে গেলে সেখান থেকে হয়তো আবার নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারব। পাশাপাশি, পরিবারের কতজন সদস্য তখনও বেঁচে আছেন, সেটাও আমরা জানতে পারব।
তাঁর সন্তানদের মধ্যেও রাজনীতির সঙ্গে যোগ তৈরি হয়। ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক স্ট্র্যাটেজি কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রিসার্চ শাখার ট্রাস্টি হিসেবেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটেনের লেবার পার্টির রাজনীতিবিদ। কেয়ার স্টারমারের সরকারের সময় তিনি ট্রেজারি এবং সিটি মিনিস্টারের অর্থনৈতিক সচিবের দায়িত্বেও ছিলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Taslima Nasreen on Sheikh Hasina: তসলিমার বিখ্যাত বই 'লজ্জা' নিয়ে মৌলবাদী সংগঠনগুলি তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। সেই প্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল তসলিমাকে।
এরপর আসে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট, ইতিহাস যেন অন্যভাবে ফিরে আসে। বাংলাদেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ। ক্রমশ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা রাজপথে, আর সরকারের সামনে বাড়তে থাকে চাপ।
দুপুরে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়। দেশ ছাড়ার আগে সেনাবাহিনীর তরফে তাঁকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল বলে খবর। প্রায় ৪৫ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হাসিনা জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সুযোগও তাঁকে দেওয়া হয়নি।
শেষ পর্যন্ত বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে গণভবন ছাড়েন হাসিনা। কপ্টারে করে তাঁরা বাংলাদেশ ছাড়েন। যে সময়ে দুই বোন গণভবন থেকে বেরিয়ে আসছেন, তখন বাইরে বিক্ষোভকারীদের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। দেশের পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে হাসিনার নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
শেখ হাসিনা প্রথমে দেশ ছাড়তে রাজি ছিলেন না বলেই জানা যায়। তাঁর উপদেষ্টারা তাঁকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু নিজের দেশ ছেড়ে যেতে চাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত রেহানাও দিদিকে বোঝান। তাতেও সিদ্ধান্ত বদল হয়নি। পরে ছেলে সজীব ওয়াজেদের ফোন পাওয়ার পর দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন হাসিনা।
কপ্টারে ওঠার সময় বাংলাদেশে অন্য এক দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। বিক্ষোভকারীরা শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তি ভেঙে ফেলছিলেন। একদিকে বাবার তৈরি করা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ভেঙে পড়ছে, অন্যদিকে সেই উত্তরাধিকারের অন্যতম উত্তরসূরি দেশ ছাড়ছেন। ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস যেন চোখের সামনে তৈরি হচ্ছিল।
কপ্টারটি এসে নামে গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানবন্দরে। সেখান থেকে হাসিনার লন্ডন যাওয়ার কথা ছিল। তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ সেখানে থাকেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ব্রিটেন তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বন্ধু হাসিনাকে ফেরায়নি ভারত। ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানান, শেখ হাসিনা ভারতেই রয়েছেন। তাঁর মানসিক অবস্থাও ভালো নয়। ফলে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে তিনি নেই। তাঁকে সময় দেওয়ার পক্ষেই রয়েছে ভারত সরকার।
এই ঘটনাই আবার মনে করিয়ে দেয় প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের সেই দিনগুলির কথা। ১৯৭৫ সালে মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিল। তখনও হাসিনা ও রেহানা দেশের বাইরে ছিলেন। সেই সময় তাঁরা বেঁচে গিয়েছিলেন কাকতালীয় ভাবে। পরিবারের বাকি সদস্যদের মতো তাঁদের পরিণতি হয়নি।
আর পাঁচ দশক পরে, দুই বোনের সামনে আবারও বাংলাদেশ ছাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। পার্থক্য শুধু একটাই—এবার পরিবারের সবাইকে হারাতে হয়নি। শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে দেশ ছাড়তে পেরেছেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছোট বোন রেহানা, যিনি জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলিতেও দিদির হাত ছাড়েননি।
একবার বাবা-মা-ভাইকে হারিয়ে দুই বোনকে দেশছাড়া হতে হয়েছিল। পাঁচ দশক পর আবারও তাঁদের একজনকে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়। একবার তাঁদের কাছ থেকে পরিবার কেড়ে নিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক হিংসা, এবার সেই রাজনৈতিক অস্থিরতাই কেড়ে নিল শেখ হাসিনার ক্ষমতা ও দেশ।
১৯৭৫ সালের সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর ভারত হয়ে ওঠে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার আশ্রয়ের জায়গা। আর প্রায় পাঁচ দশক পর, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আবারও দুই বোনকে ভারতে এসে আশ্রয় নিতে হয়। এবারের পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা। বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি দেশের সরকারপ্রধান ছিলেন। আর তাঁর বিরুদ্ধে এখন বাংলাদেশের মাটিতে একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপ রয়েছে। বাংলাদেশের মাটিতে দুই বোন আবার কখনও ফিরতে পারবেন কি না, তার উত্তর এখনই কারও জানা নেই।









