পশ্চিমবঙ্গ দিবস নিয়ে কেন এত বিতর্ক?
West Bengal Day: পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে ২০ জুন পালন নিয়ে বিতর্ক কেন? ১৯৪৭ সালের এই দিনেই বাংলাভাগের পক্ষে ভোট দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। কারও মতে এটি পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন, আবার কারও মতে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু জীবনের বেদনাময় স্মৃতির দিন। ইতিহাস ও রাজনীতি কী বলছে?
রাজ্য সরকারের নির্দেশে ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে সরকারি দফতর, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতর্কসভা, কুইজ, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, আলোচনা ও বক্তৃতার আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, ভারতের প্রায় সব রাজ্যেরই একটি প্রতিষ্ঠা দিবস বা রাজ্য দিবস রয়েছে। বিহার, ওড়িশা, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কেরল, রাজস্থান কিংবা ছত্তিশগড়—সব রাজ্যই নিজেদের জন্মদিন পালন করে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও সেই ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ২০ জুন কি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন? নাকি এটি বাংলাভাগের স্মৃতিবাহী এক বেদনাদায়ক দিন, যাকে উদযাপনের দিন হিসেবে গ্রহণ করা নিয়ে আপত্তির যথেষ্ট কারণ রয়েছে?
ফিরে যেতে হবে ১৯৪৭ সালের উত্তাল সময়ে। ২০ জুন ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় আইনসভার একটি ঐতিহাসিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। তখন ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘনিয়ে এসেছে। একইসঙ্গে সামনে এসেছে দেশভাগের প্রশ্ন। বাংলার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে আইনসভায় পৃথকভাবে ভোটাভুটি হয়। পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিনিধিরা বাংলাকে ভাগ করে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত একটি পৃথক প্রদেশ গঠনের পক্ষে ভোট দেন। ৫৮ জন সদস্য এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন, বিপক্ষে ভোট পড়ে ২১টি।
এই ভোটের ফলেই কার্যত পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পথ প্রশস্ত হয়। সেই কারণেই বিজেপি ও তাদের সমর্থকদের একটি বড় অংশ মনে করে, ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তাদের মতে, এই দিনটিকে উপেক্ষা করা মানে পশ্চিমবঙ্গের জন্মলগ্নকে অস্বীকার করা। তবে এই ব্যাখ্যার বিপরীতে রয়েছে অন্য দৃষ্টিভঙ্গিও।
সমালোচকদের বক্তব্য, ২০ জুন আসলে বাংলাভাগের দিন। একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলার ভাঙনের প্রক্রিয়া এই দিনেই চূড়ান্ত রূপ পায়। ফলে এই দিনটি বহু মানুষের কাছে আনন্দের নয়, বরং যন্ত্রণার স্মৃতি বহন করে। দেশভাগের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছিলেন, পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, সম্পদ ও পরিচয় হারিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। সেই প্রেক্ষাপটে ২০ জুনকে উৎসবের দিন হিসেবে দেখার মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি কাজ করতে পারে বলেও অভিযোগ ওঠে।
এই বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামও। বর্তমান সরকার পশ্চিমবঙ্গ গঠনের অন্যতম রূপকার হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির ইতিহাস কি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির কৃতিত্বে ব্যাখ্যা করা যায়? ইতিহাস বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়।
চল্লিশের দশকে বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছিল। দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং মুসলিম লীগের উত্থান বাংলার বহু হিন্দুর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছিল। এই পরিস্থিতিতে বাংলার একটি হিন্দু-অধ্যুষিত অংশকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত রাখার দাবি জোরালো হতে থাকে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই দাবির অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, সমগ্র বাংলা যদি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতি ও সমাজ অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। তাই পশ্চিমবঙ্গ গঠন প্রয়োজন। তবে এই আন্দোলনের নেতৃত্বে শুধু হিন্দু মহাসভা ছিল না। বাংলার কংগ্রেসও এই দাবির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Bengal Divided-এ দেখিয়েছেন, সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়ার পর বাংলার কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার অবস্থানের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ স্পষ্ট পার্থক্য খুঁজে পেতেন না। বিশেষত বাংলাভাগের প্রশ্নে দুই সংগঠনই অনেক সময় একই অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল।
১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনের ফলও সেই ইঙ্গিত দেয়। সাধারণ ও হিন্দু সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে বাংলার কংগ্রেস বিপুল সাফল্য অর্জন করে। অন্যদিকে হিন্দু মহাসভা খুব সীমিত সমর্থন পায়। এমনকি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিজেও বিশ্ববিদ্যালয় আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বাংলাভাগের সমর্থনে তখন শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সমাজের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিও এগিয়ে এসেছিলেন। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার, ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার, ভাষাবিদ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, মতুয়া নেতা প্রমথরঞ্জন ঠাকুর—অনেকেই পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে মত প্রকাশ করেছিলেন।
১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল জনসভা। সেখানে বাংলাভাগের দাবিতে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি বক্তব্য রাখেন। বঙ্গীয় কংগ্রেসের নেতারাও এই দাবিকে সমর্থন করেন। একই সময়ে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ জনমত সমীক্ষা চালিয়ে দাবি করে, বিপুল সংখ্যক হিন্দু পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে মত দিয়েছেন।
পরবর্তী কয়েক মাসে বাংলার বিভিন্ন জেলায় একের পর এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, ভারত সেবাশ্রম সংঘ এবং আরও বহু সামাজিক সংগঠন এই প্রচারে অংশ নেয়। জমিদার সমিতি, আইনজীবী সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্লাব ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও এই দাবিকে সমর্থন জানায়। এই প্রেক্ষাপটে ২০ জুনের ভোটাভুটি হয়েছিল। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই উঠে আসে।
২০ জুন কি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন?
ওই দিন পশ্চিমবঙ্গ গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা তখনও নির্ধারিত হয়নি। কোন কোন জেলা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নিয়ে তখনও অনিশ্চয়তা ছিল। র্যাডক্লিফ কমিশনের সীমান্ত-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয় ১৭ অগাস্ট ১৯৪৭ সালে। স্বাধীনতার ঘোষণারও দু’দিন পরে। সেই ঘোষণার পরেই স্পষ্ট হয় পশ্চিমবঙ্গের চূড়ান্ত সীমানা।
এমনকি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের ভূখণ্ডও তখন সম্পূর্ণ গঠিত হয়নি। পরে কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠনের ফলে পুরুলিয়াও পশ্চিমবঙ্গের অংশ হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে, আজকের পশ্চিমবঙ্গের জন্মকে কি শুধুমাত্র ২০ জুন ১৯৪৭-এর সঙ্গে যুক্ত করা যায়?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার একসময় পয়লা বৈশাখকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি ছিল, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সামনে আনা। অন্যদিকে বর্তমান সরকার ২০ জুনকে বেছে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক জন্মলগ্নকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে আসল বিতর্কটি কেবল একটি তারিখকে ঘিরে নয়। বিতর্কটি পশ্চিমবঙ্গের আত্মপরিচয়কে ঘিরে।
এক পক্ষের কাছে ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্ব রক্ষার দিন। অন্য পক্ষের কাছে এটি বাংলার বিভাজনের দিন। এক পক্ষ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রূপকার হিসেবে তুলে ধরে। অন্য পক্ষ মনে করিয়ে দেয়, এই প্রক্রিয়ায় কংগ্রেস, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষের ভূমিকাও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসের ঘটনাগুলি প্রায়শই একাধিক ব্যাখ্যার জন্ম দেয়। পশ্চিমবঙ্গ দিবসকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কও তার ব্যতিক্রম নয়। ২০ জুনকে কেউ দেখছেন আত্মরক্ষার ইতিহাস হিসেবে, কেউ দেখছেন বিচ্ছেদের ইতিহাস হিসেবে। তাই পশ্চিমবঙ্গ দিবসের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটি তারিখের প্রশ্ন নয়, বরং ইতিহাসকে কীভাবে স্মরণ করা হবে, সেই প্রশ্ন।







