প্রশ্নফাঁস থেকে শিক্ষাঋণ, নিটের আগে কোটার মঞ্চে ছাত্রদের সংকট তুলে ধরলেন রাহুল
Rahul Gandhi: রাজস্থানের কোটা থেকে ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচির সূচনা করে রাহুল গান্ধী দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষার চাপ, প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব এবং ছাত্রদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কংগ্রেসের দাবি, এটি যুবসমাজের বাস্তব সমস্যার কথা শোনার উদ্যোগ, যদিও বিজেপি একে রাজনৈতিক প্রচার বলেই ব্যাখ্যা করছে।
কয়েক দশক ধরে দেশের অন্যতম কোচিং হাব হিসেবে পরিচিত রাজস্থানের কোটা শহর বুধবার (১৭ জুন) শিক্ষাব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী কোটায় আয়োজিত ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একইসঙ্গে তাঁর সফরকে ঘিরে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সংঘাতও সামনে আসে।
কর্মসূচির আগেই বিতর্ক শুরু হয়েছিল। কংগ্রেস অভিযোগ তোলে যে রাহুল গান্ধীর সভাকে কেন্দ্র করে লাগানো পোস্টার, ব্যানার এবং হোর্ডিং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। দলের নেতা সচিন পাইলট অভিযোগ করেন, স্থানীয় মানুষ এবং ছাত্রছাত্রীদের উপরও অনুষ্ঠানে না যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁর দাবি, যুবসমাজের মধ্যে এই কর্মসূচি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হওয়ায় প্রশাসনের একটি অংশ তা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে।
রাজস্থান কংগ্রেসের সভাপতি গোবিন্দ সিং দোতাসরাও একই অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্য, সভা ঘিরে মানুষের আগ্রহ দেখে বিজেপি অস্বস্তিতে পড়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট আরও একধাপ এগিয়ে অভিযোগ করেন, কোটা সাংসদ এবং লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কার্যালয়ের তরফেও বাধা তৈরির চেষ্টা হয়েছে। যদিও বিজেপি সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে জানায়, অনুমতি ছাড়া লাগানো প্রচারসামগ্রী প্রশাসনিক নিয়ম মেনেই সরানো হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগকে তারা রাজনৈতিক নাটক বলেই ব্যাখ্যা করে।
তবে এই রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝেও সভার মূল আলোচ্য ছিল দেশের ছাত্রসমাজ। সেই কারণেই কংগ্রেস তাদের নতুন ছাত্র-অভিযানের সূচনার জন্য কোটাকে বেছে নিয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় কোচিং হাব হিসেবে পরিচিত এই শহরে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী চিকিৎসা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে আসে। একইসঙ্গে মানসিক চাপ, প্রতিযোগিতার চাপ এবং ছাত্র আত্মহত্যার ঘটনাতেও বারবার শিরোনামে উঠে আসে কোটা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতের জেন জি আদতে একরৈখিক নয়। মেট্রো শহরের উচ্চ-মধ্যবিত্ত ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী এবং প্রত্যন্ত ছোট শহরের চাকরিপ্রার্থী যুবকের রাজনৈতিক চাহিদা ও লড়াই কখনও এক নয়।
এই প্রেক্ষাপটেই রাহুল গান্ধী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ভারতের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ছাত্রদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দেওয়ার বদলে তাদের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। তাঁর মতে, শিক্ষা এখন অনেকাংশেই কয়েকটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। ফলে একজন ছাত্রের সৃজনশীলতা, ব্যক্তিগত আগ্রহ কিংবা বিকল্প প্রতিভা গুরুত্ব হারাচ্ছে।
রাহুল বলেন, সমাজ, পরিবার এবং শিক্ষাব্যবস্থা মিলেই এমন একটি ধারণা তৈরি করেছে যেখানে সফল হতে গেলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার অথবা আমলা হওয়াই যেন একমাত্র পথ। এই মানসিকতা লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীকে এক ধরনের নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে আটকে দিচ্ছে। অথচ প্রত্যেক মানুষের প্রতিভা এক নয়, স্বপ্নও এক নয়।
তিনি আরও দাবি করেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি ‘রিজেকশন সিস্টেম’-এ পরিণত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীকে একই প্রতিযোগিতায় নামানো হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খুব অল্প কয়েকজন সুযোগ পায়। বাকিরা নিজেদের ব্যর্থ মনে করতে শুরু করে। এই পরিস্থিতি তরুণদের মধ্যে হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ বাড়িয়ে তুলছে বলে তাঁর মত।
শুধু মানসিক স্বাস্থ্য নয়, শিক্ষার সঙ্গে জড়িত আর্থিক চাপের বিষয়টিও তুলে ধরেন রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বহু পরিবার নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে খরচ করতে বাধ্য হচ্ছে। কোচিং ফি, আবাসন, বইপত্র এবং অন্যান্য খরচের বোঝা অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এত খরচের পরেও চাকরি বা পেশাগত সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই আন্দোলন তথাকথিত রাজনৈতিক শুদ্ধতার ধার ধারে না। তারা সরাসরি সিস্টেমকে আক্রমণ করে, ব্যঙ্গ করে এবং প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলে। জেন-জি’র কাছে এটাই এই সময়ের 'অথেনটিক' রাজনীতি। বহু বছর ধরে একই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আর চেনা ভাষণ শুনে তারা ক্লান্ত। তারা এমন কাউকে চাইছে, যে অন্তত তাদের ক্ষোভের ভাষায় কথা বলতে পারে।
সমাবেশে তিনি নিট, জেইই, ইউপিএসসি, এসএসসি এবং রেলওয়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রসঙ্গও তোলেন। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। কংগ্রেসের দাবি, এর ফলে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। রাহুল বলেন, পরীক্ষা সংক্রান্ত ব্যর্থতার দায় ছাত্রদের উপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং সরকার এবং প্রশাসনের জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
রাহুল আরও বলেন, কোনো ছাত্র বা ছাত্রী যেন এমন পরিস্থিতিতে না পৌঁছয় যেখানে তাকে নিজের জীবন শেষ করার কথা ভাবতে হয়। একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব তরুণদের জন্য নিরাপদ, সহায়ক এবং মানবিক পরিবেশ তৈরি করা।
ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি একটি বিকল্প ভাবনার কথাও বলেন। তাঁর মতে, সাফল্যের অর্থ শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট পেশায় পৌঁছনো নয়। একজন তরুণ যদি শিল্পী, উদ্যোক্তা, গবেষক, লেখক বা অন্য কোনো পেশায় নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে চান, তবে সেই স্বপ্নও সমান মর্যাদা পাওয়া উচিত।
সমাবেশে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বেও অংশ নেন রাহুল গান্ধী। বেকারত্ব, শিক্ষার খরচ, পরীক্ষা পদ্ধতি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে তাঁদের মতামত শোনেন তিনি। কংগ্রেসের দাবি, এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই যুবসমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সমস্যাগুলি সরাসরি জানা।
কোটা থেকেই কংগ্রেস তাদের বৃহত্তর ছাত্র-সংযোগ কর্মসূচির সূচনা করেছে। আগামী দিনে দেশের আরও বিভিন্ন শহরে এই ধরনের ছাত্র-সমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। দলটির আশা, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশ্নফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম এবং বেকারত্বের মতো বিষয়গুলি নিয়ে যুবসমাজকে সংগঠিত করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, ছাত্রদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার নামে কংগ্রেস রাজনৈতিক প্রচার চালাচ্ছে। তাদের দাবি, বিরোধীরা ইচ্ছাকৃতভাবে হতাশার পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। ফলে কোটার এই সমাবেশকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাতও আরও তীব্র হয়েছে।
তবু সব রাজনৈতিক তর্কের বাইরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা, কোচিং সংস্কৃতি, কর্মসংস্থান এবং ছাত্রদের মানসিক স্বাস্থ্য এখন জাতীয় আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোটা থেকে রাহুল গান্ধীর বার্তা সেই বিতর্ককেই আরও জোরালো করেছে। এই বিতর্কের রাজনৈতিক ফলাফল ভবিষ্যৎ বলবে, কিন্তু দেশের কোটি কোটি ছাত্রছাত্রীর উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা যে এখন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে
, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।








