তেলের দাম বাড়লে কেন পড়ে সেনসেক্স-নিফটি?

crude oil price: তেলের দাম বাড়লেই কেন পড়ে যায় সেনসেক্স-নিফটি? কিভাবে তেলের দাম বাড়লে ভারতীয় টাকার দাম কমে যায়, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে,কোন কোন শেয়ারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে?

inscript
৫ মিনিট
তেলের দাম বাড়লে কেন পড়ে সেনসেক্স-নিফটি?

অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা ভারতীয় শেয়ার বাজারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সেনসেক্স ও নিফটির মতো বেঞ্চমার্ক সূচকগুলো তেলের দাম পরিবর্তনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তেলের দাম ওঠানামা করলে সেনসেক্স ও নিফটির মতো বেঞ্চমার্ক সূচকগুলোও ওঠানামা করে।

ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় তেলের দাম বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে এবং সেই চাপ শেয়ার বাজারেও প্রতিফলিত হয়। তেলের দাম বাড়লে ভারতের আমদানি খরচ বেড়ে যায়। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি (Current Account Deficit) বৃদ্ধি পায় এবং ভারতীয় টাকার ওপর চাপ তৈরি হয়।

তেলের দাম বাড়লে ভারতকে বিদেশ থেকে তেল আনতে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। এতে দেশের টাকার ঘাটতি বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মান কমে যায়। রুপি দুর্বল হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের শেয়ার বিক্রি করে টাকা সরিয়ে নেয়। ফলে সেনসেক্স ও নিফটিতে বিক্রির চাপ বাড়ে এবং দাম কমতে থাকে। আরও একটা সমস্যা হলো তেলের দাম বাড়লে সব জিনিসের দামও বাড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়ায়। এর ফলে রিজার্ভ ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে দিতে পারে। সুদের হার বাড়লে কোম্পানিগুলোর খরচ বাড়ে এবং শেয়ারের দাম কমে যায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হরমুজে সংকট: কেন তেলের দাম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ভারত?

Hormuz Strait Crisis: ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর সরকার তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। তখন ভারতের তেল আমদানির নির্ভরতা ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। লক্ষ্য ছিল তা কমিয়ে দুই-তৃতীয়াংশে নামানো। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো।

তেলের দাম বাড়লে অটো, এভিয়েশন, পেইন্ট, টায়ার এবং এফএমসিজি এসব খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ জ্বালানির খরচ বেড়ে যায়। জ্বালানির খরচ বেড়ে গেলে মারুতি, হিরো মোটোকর্প, ইন্টারগ্লোব এভিয়েশনের মতো কোম্পানির মুনাফা কমে যায়। এশিয়ান পেইন্টস বা হিন্দুস্তান ইউনিলিভারের মতো কোম্পানিগুলোর কাঁচামালের খরচও বাড়ে। অন্যদিকে, তেল ও গ্যাস খাতের কোম্পানিগুলো—যেমন রিলায়েন্স, ওএনজিসি, বিপিসিএল—তেলের দাম বাড়লে লাভবান হতে পারে। তবে সেনসেক্স ও নিফটিতে এনার্জি খাতের ওজন সীমিত হওয়ায় সামগ্রিকভাবে বাজার নেতিবাচক প্রভাবই বেশি অনুভব করে।

আইটি কোম্পানিগুলো সরাসরি তেলের দামের ওপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু তেলের দাম বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ে। তখন মার্কিন ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো খরচ কমাতে শুরু করে। যার ফলে ইনফোসিস, টিসিএস, এইচসিএলের মতো কোম্পানির অর্ডার কমতে পারে। একই সঙ্গে, উচ্চ তেলের দাম বৈশ্বিক ঝুঁকি এড়ানোর মনোভাব তৈরি করে, যা এফআইআইদের ভারতীয় শেয়ার বিক্রি করতে উৎসাহিত করে।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, তেলের দাম যখন দ্রুত বেড়েছে, তখন সেনসেক্স ও নিফটিতে পতন হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ব্রেন্ট ক্রুড ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে ভারতীয় বাজার বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপে ছিল। সম্প্রতি ব্রেন্ট ক্রুড ১১৪-১১৫ ডলার এবং ডব্লিউটিআই প্রায় ১০১ ডলারের কাছাকাছি থাকায় বাজারে একই ধরনের সতর্কতা দেখা যাচ্ছে। তেলের উচ্চ মূল্য এবং মার্কিন ১০-বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ৪.৯৭ শতাংশের কাছাকাছি থাকা একসঙ্গে বাজারের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করে।

তবে সব প্রভাবই নেতিবাচক নয়। তেলের দাম স্থিতিশীল বা কমলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমে, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মান বাড়ে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে। এছাড়া দেশীয় তহবিল (ডিআইআই) এবং কোম্পানিগুলোর ভালো আয় বাজারকে সমর্থন দেয়। সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক ফলাফলে অনেক কোম্পানির মৌলিক অবস্থা ভালো থাকায় বাজার সম্পূর্ণ ধসে পড়ে না।

মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের নীতি সিদ্ধান্তও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফেড যদি সুদের হার বেশি রাখে বা কঠোর সংকেত দেয়, তাহলে ডলার শক্তিশালী হয় এবং ভারতসহ উদীয়মান দেশগুলো থেকে টাকা বেরিয়ে যায়। তেলের উচ্চ দামের সঙ্গে এই পরিস্থিতি যুক্ত হলে সেনসেক্স ও নিফটিতে চাপ আরও বাড়ে।

অপরিশোধিত তেলের দাম ভারতীয় শেয়ার বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাক্রো ইন্ডিকেটর। এর বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় ভারতীয় টাকার দাম কমে যাওয়া, খরচ বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির মাধ্যমে সেনসেক্স ও নিফটিকে নিম্নমুখী করে। তবে দেশীয় তহবিল প্রবাহ, কর্পোরেট আয়ের শক্তি এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি এই চাপকে কিছুটা কমাতে পারে। বিনিয়োগকারীদের তাই তেলের দাম, ভারতীয় টাকার মান এবং বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির দিকে ভালো করে নজর রাখতে হয়।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ইজরায়েলের গণতন্ত্রে ফিলিস্তিনের জায়গা কোথায়?

Ballot Box Apartheid in israel: ইজরায়েলের ২৬তম নেসেট নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট কিংবা এইজেনকটের ‘চেঞ্জ ব্লক’—কেউই ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। আরব দলগুলি ১৯ আসনে ‘কিংমেকার’, কিন্তু উভয় পক্ষই তাদের সঙ্গে জোট নাকচ করেছে। ইজরায়েলি নির্বাচনের ‘ব্যালট বক্সে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ’ই এখন মুখ্য।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

যুদ্ধের অস্ত্র পরিবহণে অস্বীকার, ২২ দেশের ১১৩ বন্দরে শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক ধর্মঘটে কোন বার্তা উঠে এল?

Dock Workers: বিশ্বের ২২টি দেশ ও ১১৩টি বন্দরে যুদ্ধ ও সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে শামিল হলেন শ্রমিকরা। গাজায় ইজরায়েলি আগ্রাসন থেকে ইউক্রেন সংঘাত, অস্ত্র পরিবহণ বন্ধের দাবিতে গড়ে উঠল আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি

পূর্ব মেদিনীপুরে খ্রিস্টান পরিবারের উপর হামলার অভিযোগ, ধর্মান্তরণের চাপ বজরং দলের বিরুদ্ধে

পার্বতীর অভিযোগ, সন্ধ্যায় যখন তাঁরা প্রার্থনা করতে বসেন, সেই সময় ৩০ জনেরও বেশি ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় জোর করে বাড়িতে ঢুকে তাঁদের মারধর করেন। তাঁর চুলের মুঠি ধরে মারধর করা হয়, স্বামীকে গালিগালাজ করা হয় এবং তাঁর ননদ অর্থাৎ মোহন সোরেনের মেয়ে রেণু সোরেনকেও আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ।

প্রাথমিকে ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি! পড়ুয়াদের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট?

West Bengal Primary Education: প্রাথমিক শিক্ষায় বড় পরিবর্তনের পথে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু হতে পারে ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি। পড়ুয়াদের অগ্রগতির ভিত্তিতে শিক্ষকদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টও কি নির্ধারিত হবে?

ইজরায়েলে সরকার গড়বে কে?

Israel election results: নির্বাচনে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নেতানিয়াহুর টিকে থাকা ও আইজেনকটের ক্ষমতায় আসা অনিশ্চিত; এমতাবস্থায় আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া শেষ পর্যন্ত কে সরকার গঠন করবে?

আইডিবিআই বিক্রির সিদ্ধান্তে ক্ষোভ, রাহুলের চিঠিতে জোর পেল ব্যাঙ্ক কর্মীদের আন্দোলন

IDBI Bank privatisation: কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদনে, আইডিবিআই ব্যাঙ্কের ৬০.৭২ শতাংশ মালিকানা কানাডার ফেয়ারফ্যাক্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে ₹৫২,৮৭৮ কোটি টাকায় বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাহুল গান্ধী ব্যাঙ্ক কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, লোকসানে থাকা ব্যাঙ্ক মুনাফায় ফেরার পর কেন বিক্রি করছে সরকার? ২ ও ৩ নভেম্বর দেশব্যাপী অনশনের ডাক ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের।