তেলের দাম বাড়লে কেন পড়ে সেনসেক্স-নিফটি?
crude oil price: তেলের দাম বাড়লেই কেন পড়ে যায় সেনসেক্স-নিফটি? কিভাবে তেলের দাম বাড়লে ভারতীয় টাকার দাম কমে যায়, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে,কোন কোন শেয়ারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে?
অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা ভারতীয় শেয়ার বাজারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সেনসেক্স ও নিফটির মতো বেঞ্চমার্ক সূচকগুলো তেলের দাম পরিবর্তনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তেলের দাম ওঠানামা করলে সেনসেক্স ও নিফটির মতো বেঞ্চমার্ক সূচকগুলোও ওঠানামা করে।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় তেলের দাম বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে এবং সেই চাপ শেয়ার বাজারেও প্রতিফলিত হয়। তেলের দাম বাড়লে ভারতের আমদানি খরচ বেড়ে যায়। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি (Current Account Deficit) বৃদ্ধি পায় এবং ভারতীয় টাকার ওপর চাপ তৈরি হয়।
তেলের দাম বাড়লে ভারতকে বিদেশ থেকে তেল আনতে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। এতে দেশের টাকার ঘাটতি বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মান কমে যায়। রুপি দুর্বল হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের শেয়ার বিক্রি করে টাকা সরিয়ে নেয়। ফলে সেনসেক্স ও নিফটিতে বিক্রির চাপ বাড়ে এবং দাম কমতে থাকে। আরও একটা সমস্যা হলো তেলের দাম বাড়লে সব জিনিসের দামও বাড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়ায়। এর ফলে রিজার্ভ ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে দিতে পারে। সুদের হার বাড়লে কোম্পানিগুলোর খরচ বাড়ে এবং শেয়ারের দাম কমে যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Hormuz Strait Crisis: ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর সরকার তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। তখন ভারতের তেল আমদানির নির্ভরতা ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। লক্ষ্য ছিল তা কমিয়ে দুই-তৃতীয়াংশে নামানো। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো।
তেলের দাম বাড়লে অটো, এভিয়েশন, পেইন্ট, টায়ার এবং এফএমসিজি এসব খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ জ্বালানির খরচ বেড়ে যায়। জ্বালানির খরচ বেড়ে গেলে মারুতি, হিরো মোটোকর্প, ইন্টারগ্লোব এভিয়েশনের মতো কোম্পানির মুনাফা কমে যায়। এশিয়ান পেইন্টস বা হিন্দুস্তান ইউনিলিভারের মতো কোম্পানিগুলোর কাঁচামালের খরচও বাড়ে। অন্যদিকে, তেল ও গ্যাস খাতের কোম্পানিগুলো—যেমন রিলায়েন্স, ওএনজিসি, বিপিসিএল—তেলের দাম বাড়লে লাভবান হতে পারে। তবে সেনসেক্স ও নিফটিতে এনার্জি খাতের ওজন সীমিত হওয়ায় সামগ্রিকভাবে বাজার নেতিবাচক প্রভাবই বেশি অনুভব করে।
আইটি কোম্পানিগুলো সরাসরি তেলের দামের ওপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু তেলের দাম বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ে। তখন মার্কিন ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো খরচ কমাতে শুরু করে। যার ফলে ইনফোসিস, টিসিএস, এইচসিএলের মতো কোম্পানির অর্ডার কমতে পারে। একই সঙ্গে, উচ্চ তেলের দাম বৈশ্বিক ঝুঁকি এড়ানোর মনোভাব তৈরি করে, যা এফআইআইদের ভারতীয় শেয়ার বিক্রি করতে উৎসাহিত করে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, তেলের দাম যখন দ্রুত বেড়েছে, তখন সেনসেক্স ও নিফটিতে পতন হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ব্রেন্ট ক্রুড ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে ভারতীয় বাজার বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপে ছিল। সম্প্রতি ব্রেন্ট ক্রুড ১১৪-১১৫ ডলার এবং ডব্লিউটিআই প্রায় ১০১ ডলারের কাছাকাছি থাকায় বাজারে একই ধরনের সতর্কতা দেখা যাচ্ছে। তেলের উচ্চ মূল্য এবং মার্কিন ১০-বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ৪.৯৭ শতাংশের কাছাকাছি থাকা একসঙ্গে বাজারের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করে।
তবে সব প্রভাবই নেতিবাচক নয়। তেলের দাম স্থিতিশীল বা কমলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমে, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মান বাড়ে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে। এছাড়া দেশীয় তহবিল (ডিআইআই) এবং কোম্পানিগুলোর ভালো আয় বাজারকে সমর্থন দেয়। সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক ফলাফলে অনেক কোম্পানির মৌলিক অবস্থা ভালো থাকায় বাজার সম্পূর্ণ ধসে পড়ে না।
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের নীতি সিদ্ধান্তও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফেড যদি সুদের হার বেশি রাখে বা কঠোর সংকেত দেয়, তাহলে ডলার শক্তিশালী হয় এবং ভারতসহ উদীয়মান দেশগুলো থেকে টাকা বেরিয়ে যায়। তেলের উচ্চ দামের সঙ্গে এই পরিস্থিতি যুক্ত হলে সেনসেক্স ও নিফটিতে চাপ আরও বাড়ে।
অপরিশোধিত তেলের দাম ভারতীয় শেয়ার বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাক্রো ইন্ডিকেটর। এর বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় ভারতীয় টাকার দাম কমে যাওয়া, খরচ বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির মাধ্যমে সেনসেক্স ও নিফটিকে নিম্নমুখী করে। তবে দেশীয় তহবিল প্রবাহ, কর্পোরেট আয়ের শক্তি এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি এই চাপকে কিছুটা কমাতে পারে। বিনিয়োগকারীদের তাই তেলের দাম, ভারতীয় টাকার মান এবং বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির দিকে ভালো করে নজর রাখতে হয়।







