ইয়ুবি লাকপি: যেখানে বল নয়, গোল হয় ডাব দিয়ে! গোলকিপার নেই, গোলপোস্টে বসেন রাজা!

Yubi Lakpi Manipur: ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য মণিপুরে গেলে ঠিক এমন এক রোমাঞ্চকর খেলার দেখা মিলবে। স্থানীয় মানুষ একে ভালোবেসে ডাকেন 'ইয়ুবি লাকপি'। মেইতেই ভাষায় ‘ইয়ুবি’ মানে নারকেল, আর ‘লাকপি’ শব্দের অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া। ফুটবল বা রাগবির আন্তর্জাতিক গ্ল্যামার হয়তো এর নেই, কিন্তু এর প্রতিটা মিনিটে যে আদিম উত্তেজনা লুকিয়ে আছে, তা যেকোনো আধুনিক খেলাকে টেক্কা দিতে পারে।

Deepsubhra Mahato
৩ মিনিট
ইয়ুবি লাকপি: যেখানে বল নয়, গোল হয় ডাব দিয়ে! গোলকিপার নেই, গোলপোস্টে বসেন রাজা!

ফুটবল বিশ্বকাপের মেগা ফাইনাল তো আমরা সবাই দেখলাম। শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠ জুড়ে সেই চেনা আনন্দ, গ্যালারির গর্জন আর ট্রফি হাতে বিশ্বজয়ের উল্লাস! কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপের এই তুমুল উন্মাদনার রেশ কাটতে না কাটতেই যদি আপনাকে এমন এক ফুটবল ম্যাচের গল্প শোনানো হয়, যেখানে পায়ের কোনো কাজই নেই? যেখানে গোল করার জন্য কোনো চামড়ার বল নয়, দরকার পড়ে আস্ত একটা তেল-চ্যাবচ্যাবে ডাবের! আর গোলপোস্টের নিচে কোনো গোলকিপার থাকে না, সেখানে সিংহাসনে বসে থাকেন স্বয়ং একজন 'রাজা'!

ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য মণিপুরে গেলে ঠিক এমন এক রোমাঞ্চকর খেলার দেখা মিলবে। স্থানীয় মানুষ একে ভালবেসে ডাকেন 'ইয়ুবি লাকপি'। মেইতেই ভাষায় ‘ইয়ুবি’ মানে নারকেল, আর ‘লাকপি’ শব্দের অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া। ফুটবল বা রাগবির আন্তর্জাতিক গ্ল্যামার হয়তো এর নেই, কিন্তু এর প্রতিটা মিনিটে যে আদিম উত্তেজনা লুকিয়ে আছে, তা যেকোনো আধুনিক খেলাকে টেক্কা দিতে পারে।

সমুদ্র মন্থনের অমৃত যখন মাঠের ডাব

আজ থেকে বহু শতাব্দী আগে, প্রায় পঞ্চম শতকে এই খেলার শুরু। মণিপুরের লোকবিশ্বাস বলে, পুরাণের সেই বিখ্যাত ‘সমুদ্র মন্থন’-এর গল্প থেকেই এই খেলার জন্ম। দেবতা আর অসুরদের মধ্যে অমৃতের কলসি নিয়ে যে তুমুল কাড়াকাড়ি হয়েছিল, ইয়ুবি লাকপি আসলে তারই এক জীবন্ত রূপ।

শুরুর দিকে অবশ্য ডাব ছিল না, খেলা হতো বাঁশের শিকড় দিয়ে তৈরি এক শক্ত গোল বস্তু দিয়ে। উনবিংশ শতাব্দীতে মণিপুরের রাজা চন্দ্রকীর্তির আমলে যখন রাজ্যে ডাবের ফলন বাড়ল, তখন বাঁশের জায়গা নিল ডাব। সেই যুগে মণিপুরের রাজারা তাঁদের সৈন্যদের শক্তি, সাহস আর যুদ্ধক্ষেত্রের চপলতা পরীক্ষা করার জন্য এই খেলার আয়োজন করতেন। রাজপ্রাসাদের সামনে খোলা মাঠে চলত বীরদের সেই শক্তির লড়াই।

ফুটবল বনাম ইয়ুবি লাকপি: মিল কোথায়, অমিলই বা কী?

বিশ্বকাপের মাঠে আমরা দেখি নিখুঁত পাসিং, বাতাসে ভাসানো ক্রস আর ড্রিবলিংয়ের জাদু। ঐতিহাসিকভাবে ইয়ুবি লাকপি-কে অনেকে ‘ঐতিহ্যবাহী ফুটবল’ বা ‘দেশি রাগবি’ বলে ডাকলেও, এর গল্পটা একটু অন্যরকম।

ফুটবলের মতোই এই খেলাতেও মাঠের এক প্রান্তে একটি নির্দিষ্ট ‘গোল লাইন’ থাকে। সেই দেওয়াল পার হওয়াই খেলোয়াড়দের একমাত্র লক্ষ্য। ফুটবলে যেমন ১১ জন খেলে, এখানে দল ছোট—সাধারণত ৭ জন করে মাঠে নামেন। ফুটবলে পা ছাড়া বল ছোঁয়া পাপ, আর ইয়ুবি লাকপিতে পায়ে ডাব ছোঁয়া নিষেধ! এখানে ডাব বগলে চেপে ধরে দৌড়াতে হয়। ফুটবলের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে পাসিংয়ের মধ্যে। কিন্তু এই খেলায় কোনো পাসিংয়ের নিয়ম নেই। ডাব একবার হাতে এলে আপনি একা, পুরো প্রতিপক্ষ দল আপনার সামনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়াবে।

তাই ফুটবলপ্রেমীরা এই খেলা দেখলে ফুটবলের চেয়ে রাগবি বা কুস্তির ছোঁয়া বেশি পাবেন।

তেল-চপচপে শরীর আর পিচ্ছল ডাবের যুদ্ধ

এবার আসা যাক খেলার সবচেয়ে মজাদার ও রোমাঞ্চকর অংশে। খেলা শুরুর ঠিক আগে একটা আস্ত ডাবকে খাঁটি সরষের তেলে ভালো করে চুবিয়ে রাখা হয়, যাতে সেটা চরম পিচ্ছল হয়ে যায়। এখানেই শেষ নয়! যারা খেলতে নামেন, তারা নিজেদের খালি শরীরে (গলা থেকে পা পর্যন্ত) দেদার তেল আর জল মেখে নেন। গায়ে কোনো জার্সি বা শার্ট থাকে না, খেলোয়াড়রা শুধু একটা ল্যাঙ্গট বা হাফপ্যান্ট পরে খালি পায়ে মাঠে নামেন।

কাদার মাঠ, তার উপর একদল তেল মাখা পালোয়ান আর তাদের হাতে একটা তেল-চিটচিটে পিচ্ছল ডাব! ঠিক এরকমই দৃশ্য।

মাঠের মাঝখানে রেফারি যেই ডাবটি ছুঁড়ে দেন, অমনি শুরু হয়ে যায় আসল যুদ্ধ। যে খেলোয়াড় ডাবটি লুফে নিতে পারেন, তিনি সেটা বগলে চেপে ধরে জান লড়িয়ে দৌড় লাগান গোল লাইনের দিকে। আর বাকি খেলোয়াড়রা বাঘের মতো তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। শরীর তেল চিটচিটে হওয়ায় কাউকে ধরে রাখা বা ট্যাকল করা প্রায় অসম্ভব। পিছলে পিছলে হাত ফস্কে যায়। তবে নিয়ম বড় কড়া—যার কাছে ডাব থাকবে, কেবল তাকেই কুস্তির মতো চেপে ধরা বা আটকানো যাবে, অন্য কাউকে ছোঁয়াও যাবে না। আর লাথি, ঘুষি বা নখ দিয়ে আঁচড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

যেখানে ট্রফি নয়, জয়ী খেলোয়াড় নিজেই ভগবান!

আধুনিক ফুটবলে দল জিতলে সবাই সমান ট্রফি পান, কিন্তু ইয়ুবি লাকপি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত বীরত্বের খেলা। যে খেলোয়াড় সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে, প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে ডাবটি নিয়ে গোল লাইনের ওপারে বসে থাকা প্রধান অতিথি বা ‘রাজা’-র হাতে তুলে দিতে পারবেন, তিনিই হন সেই ম্যাচের একমাত্র মহাসম্পদ, আসল বিজয়ী।

মণিপুরের বসন্ত উৎসব ‘ইয়োশাং’ (যা আমাদের এখানে দোলযাত্রা) এবং ‘সাংগাই উৎসব’-এর সময় এই খেলা দেখতে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। কখনো কখনো প্রতীকীভাবে ‘দেবতা’ ও ‘অসুর’ নামে দুটি দল তৈরি করা হয়। লোকবিশ্বাস বলে, ‘দেবতা’ দল জিতলে নাকি সেই বছর রাজ্যে ভালো ফসল হবে আর শান্তি বজায় থাকবে। খেলা শেষে বিজয়ী খেলোয়াড়কে কাঁধে তুলে পুরো গ্রাম ঘোরানো হয়, নিয়ে যাওয়া হয় মন্দিরে। সেখানে পবিত্র জলে স্নান করিয়ে তাকে বীরের সম্মান দেওয়া হয়।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ঝলমলে আলো আর কোটি টাকার আইপিএল-এর ভিড়ে আমাদের দেশের এমন অনেক মাটির গন্ধ মাখা খেলা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। ইয়ুবি লাকপি-ও এখন আর আগের মতো রোজ খেলা হয় না। তবে মণিপুরের কিছু স্থানীয় ক্লাব এবং যুব সংগঠন প্রতি বছর নতুন বছরের শুরুতে এই খেলার আয়োজন করে একে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।

কর্নওয়ালিস স্ট্রিট থেকে বিধান সরণি, ধর্মতলা থেকে লেনিন সরণি: যেভাবে ক্ষমতাসীনরা বদলেছে কলকাতার রাস্তার নাম

Renaming politics of kolkata's street: লটারি কমিটির কর্নওয়ালিস স্ট্রিট নির্মাণ থেকে বামফ্রন্টের লেনিন সরণি, হো চি মিন সরণি—কলকাতার রাস্তার নামকরণ প্রথম থেকেই রাজনৈতিক ছিল। ২০২৬ সালে, বিজেপি সরকারের উৎসাহে দশ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে লেনিন, কার্ল মার্কস ও হো চি মিন সরণির নাম বদলের সুপারিশ করতে। কিন্তু নাম বদলালেই কি মানুষের স্মৃতি বদলায়?

মাছে-ভাতে বাঙালি, দুর্গাপুজোর ভোগেও আমিষের চল, কী বলছে শোভাবাজার রাজবাড়ির ২৭০ বছরের ইতিহাস?

Durga Puja non vegetarian food: পুজোর দিনগুলিতে সকালে রাজবাড়ির সদস্যরা উপোস করে অঞ্জলি দেন এবং পুজোর কাজে অংশ নেন। দিনের সেই সময়ে তাঁরা নিরামিষ খাবারই গ্রহণ করেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর আমিষ খাবার খাওয়ার রীতি রয়েছে। অর্থাৎ পুজোর প্রত্যেক দিনই পরিবারের সদস্যরা মাছ-মাংস খান।

বাংলা কবিতায় যুক্তি ও আবেগের সেতু গড়েছিলেন বিনয় মজুমদার

Binoy Majumdar: বিনয় মজুমদারের কাব্যভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল প্রচলিত ‘কবিত্ব’-এর থেকে সচেতন দূরত্ব। তিনি এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা অনেক সময় কবিতার পরিবর্তে কোনো বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, ব্যক্তিগত নোট, গাণিতিক অনুমান অথবা যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের মতো মনে হয়।