কেন পঞ্জাবে ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে আপের?
Major Setback for AAP in Punjab: ২০২২ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পঞ্জাবে ক্ষমতায় এসেছিল আম আদমি পার্টি। কিন্তু পাঁচ বছরের মধ্যেই দলের অন্দরে বিদ্রোহ, বিধায়কদের দলত্যাগ, মাদক সমস্যা, দুর্নীতি ও ঋণের বোঝা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ২০২৭-এর নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখা কি কঠিন হয়ে উঠছে আপের?
দিল্লিতে আপের একটি জনসভায় দলের সর্বভারতীয় নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল (বাঁ দিকে) এবং পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান (ডান দিকে)।
২০২৭ সালের পঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনের আগে বড় রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়ল রাজ্যের শাসকদল আম আদমি পার্টি (আপ)। ২ নভেম্বর, আপ ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিলেন দলের তিন নেতা তথা বিধায়ক কুনওয়ার বিজয় প্রতাপ সিং, চেতন সিং জৌরমাজরা এবং হরমিত সিং পাঠানমাজরা। দিল্লিতে বিজেপির সদর দফতরে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে তাঁদের হাতে দলীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়। নির্বাচনের আগে এই দলবদল পঞ্জাবের রাজনীতিতে নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে, যে রাজ্যে ২০২২ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল আপ, সেখানে দলের বিধায়কদের একাংশের প্রকাশ্য বিদ্রোহ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
বিজেপিতে যোগ দেওয়া তিন নেতার মধ্যে চেতন সিং জৌরমাজরা সমানা কেন্দ্রের এবং হরমিত সিং পাঠানমাজরা সানৌর কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন। অন্য দিকে, কুনওয়ার বিজয় প্রতাপ সিং অমৃতসর উত্তর কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন। দলবদলের আগে রবিবার আপের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন জৌরমাজরা ও পাঠানমাজরা। সোমবার বিধানসভার সদস্যপদ থেকেও ইস্তফা দেওয়ার কথা জানান কুনওয়ার বিজয় প্রতাপ সিং। তিনি ফেসবুক পোস্টে জানান, বিধানসভার স্পিকার কুলতার সিং সান্ধওয়ানের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। পরে তাঁর ইস্তফা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।
এই দলবদলের সময়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শনিবারই ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ৪০ জন প্রার্থীর প্রথম তালিকা প্রকাশ করেছিল আপ। সেই তালিকায় জৌরমাজরা ও পাঠানমাজরার নাম ছিল না। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, প্রার্থী তালিকায় তাঁদের বাদ পড়া দলত্যাগের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করে থাকতে পারে। যদিও তাঁদের দল ছাড়ার পেছনে শুধু প্রার্থী না হওয়াই কারণ, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। দুই নেতাই আপ সরকারের কাজকর্ম এবং পঞ্জাবের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন।
প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পঞ্জাবে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছিল আপ। ১১৭ আসনের বিধানসভায় ৯২টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে দলটি। কংগ্রেস, শিরোমণি অকালি দল এবং বিজেপিকে কার্যত পিছনে ফেলে দিয়েছিল অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল। মুখ্যমন্ত্রী হন ভগবন্ত মান। সেই বিপুল জয়ের পর প্রায় পাঁচ বছর কাটতে চলেছে। এবার ২০২৭ সালের নির্বাচনের আগে দলের অন্দরে অসন্তোষ এবং একের পর এক নেতার দলত্যাগ আপের সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিজেপিতে যোগদানের পর তিন নেতাই আপ সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে পঞ্জাবের মাদক সমস্যা, অপরাধ, তোলাবাজি, রাজ্যের ঋণের বোঝা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ। কুনওয়ার বিজয় প্রতাপ সিং আপের সঙ্গে নিজের পাঁচ বছরের রাজনৈতিক সম্পর্ককে ‘ইন্টার্নশিপ’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, আপে তাঁর পাঁচ বছরের ইন্টার্নশিপের অবসান হল। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব এবং বিজেপির নীতির মাধ্যমে পঞ্জাবে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলেও দাবি করেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Arvind Kejriwal verdict: স্বাভাবিকভাবেই দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে এই মামলার ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং আম আদমি পার্টি পর্যদুস্ত হয়। সেই সময় গোদি মিডিয়া সমান্তরালভাবে কেজরিওয়াল এবং মণীশের বিরুদ্ধে মিডিয়া ট্রায়াল চালাতে থাকে যাতে তাঁরা গণশত্রু হিসাবে জনতার দরবারে চিহ্নিত হতে পারেন।
বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর পঞ্জাবের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কুনওয়ার বিজয় প্রতাপ। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে মাদক, তোলাবাজি, গ্যাংস্টারদের দৌরাত্ম্য এবং দুর্নীতি গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছে। পঞ্জাবের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রয়োজন বলেও দাবি করেন তিনি। বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে শান্তি ও উন্নয়ন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন বলে জানান এই প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিক।
অন্য দিকে, চেতন সিং জৌরমাজরা আপ সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যের অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম নিয়ে অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, গত পাঁচ বছরে পঞ্জাবের পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। রাজ্যে খনি দুর্নীতি এবং সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, পঞ্জাবকে স্থিতিশীল করতে কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ, বিজেপির কথিত ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের পক্ষে সওয়াল করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, আপ নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকার গঠনের পর তার অনেকগুলিই পূরণ করতে পারেনি।
হরমিত সিং পাঠানমাজরাও আপ সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যের ঋণ এবং মাদক সমস্যাকে সামনে রেখে আক্রমণ করেন। তাঁর দাবি, পঞ্জাবের মানুষের সামনে আপ যে উন্নয়নের স্বপ্ন তুলে ধরেছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। রাজ্যের ঋণের পরিমাণ প্রায় আড়াই লক্ষ কোটি টাকা বলে দাবি করেন তিনি। পঞ্জাবকে ‘উড়তা পঞ্জাব’ হিসেবে পরিচিত হতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন এই নেতা। তাঁর মতে, রাজ্যকে এই পরিস্থিতি থেকে বের করে এনে ‘উঠতা পঞ্জাব’ হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তবে তিন নেতার দলবদলকে নিজেদের রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে বিজেপি। দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা পঞ্জাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা সতীশ পুনিয়া বলেন, এই তিন নেতার রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিজেপিকে শক্তিশালী করবে। তাঁর দাবি, পঞ্জাবে বিজেপির পক্ষে জনমত তৈরি হচ্ছে এবং শাসকদল আপের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে মাদক সমস্যা, দুর্নীতি এবং অপরাধকে সামনে রেখে আপ সরকারকে আক্রমণ করেন তিনি।
পুনিয়ার অভিযোগ, আপ ক্ষমতায় আসার আগে পঞ্জাব থেকে মাদক ব্যবসা নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সরকার সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি। তাঁর দাবি, ‘চিট্টা’ নামে পরিচিত ভেজাল হেরোইনের নেশা পঞ্জাবের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশ থেকে মাদক সমস্যা নির্মূল করার লক্ষ্যমাত্রার কথা বলেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বিজেপি ক্ষমতায় এলে পঞ্জাবের পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দেন।
অন্য দিকে, কুনওয়ার বিজয় প্রতাপ সিংয়ের আপের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির ইতিহাসও রয়েছে। তিনি পেশায় প্রাক্তন আইপিএস আধিকারিক। ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে আপের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তবে ২০২৫ সালের জুন মাসে দলবিরোধী কাজকর্মের অভিযোগে তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য সাসপেন্ড করা হয়। শিরোমণি অকালি দলের নেতা বিক্রম সিং মাজিথিয়ার বিরুদ্ধে পঞ্জাব ভিজিল্যান্স ব্যুরোর পদক্ষেপ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। পাশাপাশি, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেছিলেন।
হরমিত সিং পাঠানমাজরার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। গত বছর এক মহিলার অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়। ওই মহিলার অভিযোগ ছিল, নিজেকে বিবাহবিচ্ছিন্ন বলে পরিচয় দিয়ে পাঠানমাজরা তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন এবং ২০২১ সালে তাঁকে বিয়ে করেন। অথচ সেই সময় তিনি বিবাহিত ছিলেন। চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে পঞ্জাব পুলিশ। এর আগে তিনি পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পরে মে মাসে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট তাঁকে নিয়মিত জামিন দেয়। এই মামলার অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়াও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, আপের তরফেও বিজেপিকে পাল্টা আক্রমণ করা হয়েছে। পঞ্জাব আপের সভাপতি অমান অরোরা অভিযোগ করেছেন, বিজেপি নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে না পেরে আপ থেকে বহিষ্কৃত বা অসন্তুষ্ট নেতাদের দলে টানছে। তাঁর বক্তব্য, পঞ্জাবে বিজেপির নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তির অভাব রয়েছে বলেই অন্য দলের নেতাদের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তিন বিধায়কের দলবদলকে ঘিরে পঞ্জাবের রাজনীতিতে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে বিজেপি এই ঘটনাকে আপ সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরছে। অন্য দিকে, আপের দাবি, বিজেপি অন্য দলের অসন্তুষ্ট নেতাদের নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক জমি তৈরির চেষ্টা করছে। তবে এই দলবদল শুধু তিনজন বিধায়কের দল পরিবর্তনের ঘটনা নয়। ২০২২ সালে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা আপের পাঁচ বছরের শাসন নিয়ে প্রশ্ন ওঠার একটি রাজনৈতিক মুহূর্তও বটে। ২০২৭ সালের নির্বাচনে এই অসন্তোষ কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে পঞ্জাবের ভোটাররা সরকারের কাজকর্ম এবং বিরোধীদের বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন তার উপর।






