২০ হাজার ডিস্কে সিনেমার ইতিহাস আগলে রাখছে অনুরাগ কাশ্যপের মহাফেজখানা
Anurag Kashyap DVD collection: একসময় অনুরাগ বলতেন, ১০ হাজার ডিস্ক জমার পর তিনি আর গোনাগুনির মধ্যে যাননি। তবে সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে সিনেমার সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে গর্বের সঙ্গেই তিনি দাবি করেন, তাঁর কাছে থাকা সংগ্রহ যেকোনো বড় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা অ্যামাজ়নের চেয়েও সমৃদ্ধ ও বিশাল।
চারপাশে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের রমরমা আর অ্যালগরিদমের রাজত্ব। স্মার্টফোনের পর্দায় একটা ট্যাপেই ভেসে উঠছে হাজার হাজার কনটেন্ট। কিন্তু এই ডিজিটাল যুগেও অনুরাগ কাশ্যপ বিশ্বাস করেন সিনেমার আসল স্পর্শ লুকিয়ে থাকে ফিজিক্যাল কপির গায়ে হাত বুলিয়ে নেওয়ার অনুভূতির মধ্যে। আর তাঁর বেঙ্গালুরুর বাড়িটিও নিছক কোনো বিলাসবহুল বাসস্থান নয়, বিশ্বচলচ্চিত্র ও দুর্লভ সাহিত্যের এক অনন্য মহাফেজখানা।
২০০০ সালে বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘মিশন কাশ্মীর’ ছবির চিত্রনাট্যে যখন কাজ করছিলেন অনুরাগ, তখন কাজের পারিশ্রমিক বা সাইনিং অ্যামাউন্ট হিসেবে নগদ টাকা নেওয়ার সুযোগ ছিল তাঁর, কিন্তু তিনি তা না নিয়ে চাইলেন ২২ হাজার টাকা দামের একটি ডিভিডি প্লেয়ার। সেই সময় তাঁর হাতে পরিচালিকা দীপা মেহতা তুলে দিয়েছিলেন ছ’টি ক্লাসিক ছবির ডিভিডি, তার মধ্যে ছিল ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘মিন স্ট্রিটস’ আর ‘দ্য ওয়াইল্ড বাঞ্চ’-এর মতো মাস্টারপিস। ব্যস, সেই যে সূচনা হলো, তারপর আর থামাথামি নেই। মুম্বইয়ের বিখ্যাত ‘চ্যারিয়ট লাইব্রেরি’ যখন বন্ধ হওয়ার মুখে, অনুরাগ দেড় লাখ টাকা দিয়ে পুরো ‘ক্রাইটেরিয়ন বক্স সেট’ কিনে নিয়েছিলেন, যার দেনা তিনি মিটিয়েছিলেন টানা তিন মাসের কিস্তিতে। বিদেশে ছবির শুটিংয়ে গেলে পারিশ্রমিকের বড় অংশ খরচ করে ফেলতেন ওখানকার ডিভিডি স্টোরে। ভারতে এখন ফিজিক্যাল মিডিয়া প্রায় পাওয়াই যায় না, তাই পরিচালক বিক্রমাদিত্য মোটওয়ানের মতো কাছের বন্ধুদের বিদেশ সফরের আগে অনুরাগের ফরমাশ যেত লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে রেয়ার ব্লু-রে নিয়ে আসার।
একসময় অনুরাগ বলতেন, ১০ হাজার ডিস্ক জমার পর তিনি আর গোনাগুনির মধ্যে যাননি। তবে সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে সিনেমার সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে গর্বের সঙ্গেই তিনি দাবি করেন, তাঁর কাছে থাকা সংগ্রহ যেকোনো বড় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা অ্যামাজ়নের চেয়েও সমৃদ্ধ ও বিশাল।
মুম্বইয়ে তাঁর আগের বাড়িটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক ফিল্ম-স্কুল। ঘরভর্তি বই আর সিনেমা, সেখানেই ছিল নিজস্ব স্ক্রিনিং রুম—যেখানে পরবর্তীতে শুট হয়েছিল তাঁর ছবি ‘একে ভার্সেস একে’। তরুণ নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকারদের জন্য বাড়ির দরজা সবসময় খোলা থাকত বলে অনুরাগ নিজেই রসিকতা করে একে বলতেন ‘ক্লোজড ধর্মশালা’। ঘরের ভিতরে জায়গা না থাকায় দরজার বাইরে জুতোর তাক সাজিয়ে বলতেন ‘শু লাইব্রেরি’।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কর্ণাটকের এক কৃষক পরিবারের ছেলে আঙ্কে গৌড়া বহু বছর ধরে বিভিন্ন কাজ করার পাশাপাশি বই সংগ্রহ করে গিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি বিনামূল্যের লাইব্রেরির। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিয়েছে 'পুস্তক মানে' (Pustak Mane) নামক একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য লাইব্রেরিতে, যেখানে রয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ বই। সেখানে এখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, গবেষকদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।
অনুরাগ কাশ্যপের ডিভিডি কালেকশন
এখন অনুরাগ বেঙ্গালুরুর যে বাড়িতে থাকেন, তা অনেক বেশি শান্ত ও পরিপাটি। কিন্তু সিনেমার আবহ সেখানে এতটুকু কমেনি। হালকা ওক কাঠের ডাইনিং টেবিলের পিছনের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে চারটি লম্বা বুকশেলফ, যেখানে বই, মিডিয়া কালেকশন, বাঁধানো ফ্রেম আর সিরামিকের শোপিস সাজানো। বসার ঘরে সোয়েড লাউঞ্জ আর বেতের নকশাদার চেয়ারের ঠিক পাশেই রয়েছে গাঢ় কাঠের দীর্ঘ এক কনসোল টেবিল, যা ঠাসা বক্স সেট আর ব্লু-রে ডিস্কে। বড় কাচের প্যাটিও দরজার ওপারে বারান্দা থেকে দেখা যায় ঘন সবুজ ট্রপিক্যাল গাছপালা। তবে বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হলো মিডিয়া রুম ও লাইব্রেরি নুক। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত দেওয়াল জুড়ে গাঢ় কাঠের তাকে হাজার হাজার ডিস্ক এমনভাবে সাজানো যেন আস্ত এক আর্কাইভ। মেঝেতে বসার জন্য রাখা ফরেস্ট-গ্রিন চেজ লাউঞ্জ আর হলুদ ডে-বেড। কোন রাতে কোন মাস্টারপিস দেখবেন, তা প্রতিদিন কাজের ফাঁকেই আগে থেকে ঠিক করে রাখেন পরিচালক।
ডিজিটাল স্ট্রিমিং সার্ভিসের যুগে কেন কোটি টাকা খরচ করে ডিস্ক জমিয়ে রাখছেন? অনুরাগ খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন তাঁর আশঙ্কার কথা। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলি মূলত ব্যবসার কথা ভাবে। ফলে তাদের সার্ভার থেকে বহু ধ্রুপদী, সাইলেন্ট এরা ফিল্ম কিংবা আর্টহাউস সিনেমা রাতারাতি গায়েব হয়ে যায়। ইতিহাস ও শিল্পের এই দুর্লভ দলিলগুলিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখতেই তাঁর এই ফিজিক্যাল মিডিয়া সংরক্ষণ।
অনুরাগ কাশ্যপের ডিভিডি সম্ভার
এই মহাফেজখানার নিয়মও বেশ কড়া। নিজের সংগ্রহের ডিস্ক তিনি কাউকে ধার দেন না, কারণ হারানোর ভয় থাকে। আবার ভারতের আবহাওয়ায় আর্দ্রতার কারণে যাতে ফাঙ্গাস না পড়ে, সেজন্য প্রতি দুই বছর পর পর পরম যত্নে প্রতিটি ডিস্ক নিজে হাতে পরিষ্কার করেন। তিনি কেবল সেই সিনেমাই কেনেন যা তিনি উৎসবে দেখে মুগ্ধ হয়েছেন বা যা তাঁর মনে দাগ কেটেছে। অনুরাগের ভাষায়, এটি সেইসব নির্মাতাদের প্রতি তাঁর পক্ষ থেকে একধরনের ঋণ শোধ।
চলচ্চিত্রের যেকোনো ধারার সেরা কাজ মিলবে এই মহাফেজখানায়। নোয়ার সিনেমা থেকে শুরু করে জাপানি আন্ডারগ্রাউন্ড ক্রাইম—সবই সাজানো। তাঁর সংগ্রহের বড় অংশ জুড়ে আছেন স্যামুয়েল ফুলার, জঁ-পিয়ের মেলভিল এবং কিঞ্জি ফুকাসাকুর ‘ইয়াকুজা পেপার্স’ সিরিজ, যা পরবর্তীকালে বিশ্ব চলচ্চিত্রের একাধিক থ্রিলার ধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এ ছাড়া আকিরা কুরোসাওয়া ও তাঁর অন্যতম পছন্দের পরিচালক ফ্রিৎস লাং-এর সমস্ত রেয়ার এডিশন তাঁর সংগ্রহে রয়েছে। এমনকী টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গিয়ে তিনি ক্রাইটেরিয়ন ক্লোসেট থেকে নিজের ঝুলিতে তুলে নিয়েছিলেন মিশরীয় ক্লাসিক ‘কায়রো স্টেশন’ এবং জিলো পন্তেকোরভোর ঐতিহাসিক ছবি ‘দ্য ব্যাটল অব আলজিয়ার্স’—যে ছবি দেখে তিনি একসময় বানিয়েছিলেন তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’। পাশাপাশি ‘কাসাব্লাঙ্কা’, ‘সাউন্ড অব মিউজিক’ কিংবা ‘ফিডলার অন দ্য রুফ’-এর আধুনিক ৪কে আল্ট্রা-এইচডি সংস্করণও তাঁর তাকের শোভা বাড়াচ্ছে।
অনুরাগের এই মহাফেজখানা কেবল সেলুলয়েডে সীমাবদ্ধ নয়, বইয়ের জগতেও সমান বিস্তৃত। ছোটবেলায় মাত্র ১১ বছর বয়সে হিন্দিতে অনুবাদ করা দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ পড়ে তাঁর ভিতরে সাহিত্যের যে বীজ বোনা হয়েছিল, তা ছড়িয়ে আছে আলবেয়ার কামুর ‘দ্য আউটসাইডার’, ফ্রাঞ্জ কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’ ও ‘মেটামরফোসিস’-এর পাতায়। পড়ার টেবিলে রয়েছে মুন্সি প্রেমচাঁদের ‘মানসরোবর’ আর দেশি-বিদেশি ক্রাইম ও পাল্প ফিকশনের বিপুল সমাহার। একই সঙ্গে তিনি গ্রাফিক নভেলের একনিষ্ঠ পাঠক, যেখানে মারজান সাতরাপির ‘পার্সিপলিস’ তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। তরুণ চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতাদের জন্য তিনি সবসময় পড়তে পরামর্শ দেন ত্রুফো ও হিচককের কথোপকথনের ঐতিহাসিক বই ‘হিচকক/ত্রুফো’ কিংবা ক্যামেরন ক্রোর ‘কনভারসেশনস উইথ বিলি ওয়াইল্ডার’।
ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা প্রায়ই বলেন, আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষ নিজেদের ড্রয়িংরুম সাজায় ইনস্টাগ্রাম বা পিন্টারেস্টের ছবি দেখে। কিন্তু অনুরাগ কাশ্যপের বাড়িটি নিছক ফ্যাশনের তাগিদে সাজানো নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে ভালবাসায় একটু একটু করে গড়ে তোলা। এই মহাফেজখানার প্রতিটি ক্যাবিনেট, প্রতিটি কাঠের তাক আর প্রতিটা ডিস্কের ভিতর লুকিয়ে আছে এক সিনেমা-পাগল মানুষের আজীবনের সাধনা।









