বাসের কন্ডাক্টর থেকে পদ্মশ্রী! ২০ লক্ষ বইয়ের লাইব্রেরি গড়ে ইতিহাস আঙ্কে গৌড়ার
কর্ণাটকের এক কৃষক পরিবারের ছেলে আঙ্কে গৌড়া বহু বছর ধরে বিভিন্ন কাজ করার পাশাপাশি বই সংগ্রহ করে গিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি বিনামূল্যের লাইব্রেরির। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিয়েছে 'পুস্তক মানে' (Pustak Mane) নামক একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য লাইব্রেরিতে, যেখানে রয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ বই। সেখানে এখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, গবেষকদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।
কর্ণাটকের এক কৃষক পরিবারের ছেলে আঙ্কে গৌড়া বহু বছর ধরে বিভিন্ন কাজ করার পাশাপাশি বই সংগ্রহ করে গিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি বিনামূল্যের লাইব্রেরির। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিয়েছে 'পুস্তক মানে' (Pustak Mane) নামক একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য লাইব্রেরিতে, যেখানে রয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ বই। সেখানে এখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, গবেষকদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।
বইয়ের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে— বই মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। কারও কাছে বই মানে নতুন এক জগতের খোঁজ, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কোনো এক মহান লক্ষ্য পূরণের অনুপ্রেরণা। কর্ণাটকের ৭৯ বছর বয়সি বৃদ্ধ আঙ্কে গৌড়ার গল্পটাও ঠিক তেমনই। বই তাঁর কাছে যেমন জ্ঞানের ভাণ্ডার হয়ে উঠেছিল, তেমনই এক প্রতিজ্ঞার নামও ছিল। পেশায় যিনি একসময় ছিলেন সাধারণ এক বাসের কন্ডাক্টর, আজ তিনি ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ বিজয়ী। স্রেফ নিজের জেদ আর বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি তৈরি করেছেন ২০ লক্ষ বইয়ের এক বিশাল লাইব্রেরি, যেখানে যে কেউ আসতে পারেন একদম বিনামূল্যে। ২০২৬ সালে তাঁর এই অসাধারণ উদ্যোগ ও নিষ্ঠার জন্য তাঁকে ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’-তে ভূষিত করা হয়েছে।
আঙ্কে গৌড়ার জন্ম কর্ণাটকের মাণ্ড্য জেলার এক সাধারণ কৃষক পরিবারে। তাঁর গ্রামে পড়াশোনার সুযোগ ছিল খুবই কম, আর বই পাওয়া ছিল সেখানে একপ্রকার বিলাসিতা। একটু ভালো বইয়ের খোঁজে ছোটবেলায় তাঁকে মাইলের পর মাইল পথ পেরিয়ে যেতে হতো মহীশূরে।
জ্ঞানের পিপাসা থাকলেও, সেই তৃষ্ণা নিবারণের উপায় ছিল না। পড়াশোনার সুযোগের অভাব কাকে বলে—তা নিজের জীবন দিয়ে টের পেয়েছিলেন আঙ্কে গৌড়া। আর তাই তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, স্রেফ টাকার অভাবে কোনো শিশুর পড়াশোনা যাতে আটকে না যায়, তা তিনি সুনিশ্চিত করবেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যাতে তাঁর মতো একই কষ্টের মুখোমুখি হতে না হয়, সেই তাগিদ থেকেই তিনি যেখানে যেভাবে পেরেছেন, বই জমাতে শুরু করেন।
'পুস্তক মানে'-তে আঙ্কে গৌড়া
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এখানকার রাস্তাগুলি ছিল গ্রিড প্যাটার্নের (চৌকো ছক কাটা) এবং প্রায় ১.৯২ মিটার চওড়া। পোড়া ইটের বাড়ি, জল পাসের জন্য চমৎকার নর্দমা ব্যবস্থা, কুয়ো এবং জল ধরে রাখার জন্য বড় জলাশয় পাওয়া গিয়েছে। ঠিক যেন আজকের কোনো আধুনিক পরিকল্পিত শহর!
আঙ্কে গৌড়ার এই স্বপ্ন রাতারাতি সত্যি হয়নি। সংসার চালাতে জীবনের একটা বড় সময় ধরে তিনি নানা রকমের কাজ করেছেন। কখনও বাসের কন্ডাক্টর, কখনও চিনিকলের কর্মী, কখনও দুধ বিক্রেতা, কখনও ইনস্যুরেন্স এজেন্ট—যখন যা পেয়েছেন, তা-ই করেছেন।
তাঁর আয় ছিল খুবই সামান্য। কিন্তু সেই অল্প উপার্জনের মধ্যেও তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত বই। সংসারের খরচ বাঁচিয়ে সুযোগ পেলেই তিনি একটা করে বই কিনে বাড়ি ফিরতেন। তারপর আরও একটা, আরও একটা...। এভাবেই দিনে দিনে জমতে থাকল বইয়ের পাহাড়। কয়েক দশক ধরে বই সংগ্রহের পর তা লাইব্রেরির আকার নেয়।
প্রথমে যেটা ছিল একটা ছোট ব্যক্তিগত সংগ্রহ, তা আস্তে আস্তে গোটা ঘর, আলমারি আর শেষমেশ পুরো বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। পরিবারের মানুষজন আজও হাসিমুখে মনে করেন, কীভাবে তাঁদের বাড়ির প্রতিটা কোণ জুড়ে শুধু বই আর বই থাকত। কিন্তু আঙ্কে গৌড়ার কাছে এই প্রতিটি বই ছিল এক একটি সুযোগ— এমন সুযোগ, যা হয়তো একটি গরিব শিশু পাচ্ছে না।
দীর্ঘ কয়েক দশকের পরিশ্রমে আজ গড়ে উঠেছে ‘পুস্তক মানে’ (Pustak Mane)—যার বাংলা অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘বইয়ের বাড়ি’। আজ এখানে স্থান পেয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ বই। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিরল সব পাণ্ডুলিপি, পত্রিকা, অভিধান আর বিভিন্ন ভাষার গবেষণার বই। তিনি যখন বইগুলি সংগ্রহ করছেন, জানতেন এই লাইব্রেরিটা নিজের জন্য বানাচ্ছেন না; কিন্তু তিনি তৈরি করছিলেন এমন একটা অমূল্য ভাণ্ডার, যা নিজের ছোটবেলায় থাকলে হয়তো তিনি খুব খুশি হতেন। আজ স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে কলেজের শিক্ষক, গবেষক কিংবা ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ছাত্রছাত্রী—সবার জন্যই এই লাইব্রেরির দরজা সবসময় খোলা।

গৌড়া পরিবারের কাছে এই লাইব্রেরিটা শুধু কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটাই তাঁদের ঘর। আঙ্কে গৌড়া, তাঁর স্ত্রী বিজয়লক্ষ্মী এবং ছেলে সাগর—আজও এই লাইব্রেরি চত্বরের ভিতরেই থাকেন। বইয়ের রাজ্যেই তাঁদের দিন কাটে। সবাই মিলে দিন-রাত এই বিশাল বইয়ের ভাণ্ডার আগলে রাখছেন, যাতে এখানে আসা প্রতিটি মানুষ সম্পূর্ণ নিখরচায় জ্ঞানের আলো পেতে পারেন।
আজ, যে ছেলেটি একসময় একটু পড়ার বইয়ের খোঁজে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিত, সে-ই এমন এক আশ্রয় তৈরি করেছে যেখানে পা রাখা মাত্রই যে কেউ অনায়াসে শিক্ষার আলো ছুঁয়ে দেখতে পারে।
আর সম্ভবত এটাই আঙ্কে গৌড়ার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য—এই ২০ লক্ষ বই সংগ্রহ করা নয়, বরং এই বইগুলোর হাত ধরে অন্য হাজারো মানুষের সামনে হাজারো নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া।
আঙ্কে গৌড়ার এই জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ বদলে দেওয়ার জন্য প্রচুর অর্থ, ক্ষমতা বা বিশাল কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও হয়তো এর শুরুটা হয় এমন একটা মানুষের হাত ধরে, যে নিজে একসময় অভাবের স্বাদ পেয়েছিল।
যে ছেলেটি একসময় একটু পড়ার বইয়ের খোঁজে মাইলের পর মাইল রাস্তা পাড়ি দিত, সে আজ এমন এক জায়গা তৈরি করেছে যেখানে পা রাখলেই যে কেউ শিক্ষার আলো ছুঁয়ে দেখতে পারে। আঙ্কে গৌড়ার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য বোধহয় ২০ লক্ষ বই সংগ্রহ করা নয়, বরং এই বইগুলির হাত ধরে হাজার হাজার মানুষের সামনে এক নতুন জীবনের দরজা খুলে দেওয়া।








