আরাবল্লীকে বাঁচাতে পারবে শীর্ষ আদালত?
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ শনিবারের শুনানিতে খনি মালিক এবং লবিস্টদের সমস্ত যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে।
ভারতের প্রাকৃতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন সাক্ষী আরাবল্লী পর্বতমালা আজ তার অস্তিত্বের চরম সংকটে পড়েছে। একদিকে রাজস্থানের থর মরুভূমির আগ্রাসী বিস্তারকে আটকে রাখা সবুজ প্রাচীর, অন্যদিকে দিল্লি এবং তার আশেপাশের জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের (NCR) ফুসফুস আরাবল্লী আজ খনি মাফিয়া এবং ব্যবসায়ীদের লোভের শিকার। কোটি কোটি মানুষের মাটির তলার জলের প্রধান উৎস এবং বহু বন্যপ্রাণের নিরাপদ আশ্রয়স্থল আরাবল্লী পর্বতমালা আজ পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। সুপ্রিম কোর্ট বারবার এই ধ্বংসলীলা রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ জারি করার পরেও বাস্তব পরিস্থিতি ঠিক কতটা বদলাবে, তা নিয়ে একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন থেকে যায়। প্রশ্ন থেকে যায়, দেশের শীর্ষ আদালত কি পারবে আরাবল্লীকে বাঁচাতে?
আরাবল্লী কিন্তু স্রেফ একখণ্ড পাথুরে জমি নয়। গুজরাতের চম্পানের থেকে শুরু করে রাজস্থান ও হরিয়ানার বুক চিরে দিল্লির রাইসিনা হিলস পর্যন্ত প্রায় ৬৭০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই পর্বতমালা বিস্তৃত। এর মোট অববাহিকা ও আশেপাশের অঞ্চলের আয়তন প্রায় ১.৪৪ থেকে ১.৪৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। কোটি কোটি বছর ধরে এই পর্বতমালা উত্তর ভারতের জলবায়ু ও পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখছে।
পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের পরিবেশের জন্য আরাবল্লীর প্রধান চারটি অবদান রয়েছে:
মরুভূমির বিস্তার রোধ: রাজস্থানের থর মরুভূমি যাতে পূর্ব দিকে আরও ছড়িয়ে পড়তে না পারে, তার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এই পর্বতশ্রেণি। এটি না থাকলে সিন্ধু ও গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের উর্বরা জমি বা চাষবাস সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেত।
মাটির তলার জল ধরে রাখা: আরাবল্লীর পাথরের ফাটলগুলি বর্ষার জলকে মাটির গভীরে পাঠিয়ে দেয়। এর ফলে মাটির তলার জলস্তর ঠিক থাকে। দিল্লি, গুরুগ্রাম, ফরিদাবাদ ও রাজস্থানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের পানীয় জলের আসল লাইফলাইন হলো এটি।
প্রাকৃতিক ফিল্টার: দিল্লি-NCR অঞ্চলের মারাত্মক বায়ুদূষণ, ধোঁয়া এবং ধূলিকণাকে নিজেদের বনাঞ্চলের মাধ্যমে শুষে নেয় এই পাহাড়।
বন্যপ্রাণের বাসস্থান: চিতাবাঘ, ডোরাকাটা হাইনা, নীলগাই, শিয়াল এবং অসংখ্য প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আদি বাসস্থান হলো এই বনাঞ্চল।
কিন্তু গত চার দশকে এই সুরক্ষাকবচকে নির্মমভাবে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (FSI) এবং বিভিন্ন পরিবেশগত সংস্থার স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ চিত্রে দেখা গিয়েছে, গত দুই-তিন দশকে বিশেষ করে রাজস্থান এবং হরিয়ানা অঞ্চলে আরাবল্লীর ২৫ শতাংশের বেশি পাহাড় হারিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ যেখানে আগে পাহাড় ছিল, সেখানে আজ তৈরি হয়েছে গভীর খাদ অথবা বহুতল আবাসন ও রিসর্ট।
কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেখলে এই ধ্বংসের ভয়াবহতা খুব সহজে বোঝা যায়:
অবৈধ খনন: একটি সরকারি রিপোর্ট ও আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, গত সাত বছরে কেবল রাজস্থানেই ৭১,০০০-এর বেশি অবৈধ খনন বা বেআইনি পাথর কাটার ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সিংহভাগই ঘটেছে আলওয়ার, ভরতপুর, ঝুনঝুনু এবং জয়পুরের মতো আরাবল্লী লাগোয়া জেলাগুলিতে।
জলস্তর নামা: পাহাড় ও গাছপালা কেটে ফেলার কারণে বৃষ্টির জল আর মাটির নিচে যেতে পারছে না। ফলস্বরূপ, হরিয়ানা ও রাজস্থানের আরাবল্লী সংলগ্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর প্রতি বছর কয়েক ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক অঞ্চলকে ইতিমধ্যে 'ডার্ক জোন' বা তীব্র জলসংকটপ্রবণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে হয়েছে।
দীর্ঘকাল ধরে আরাবল্লীর নির্দিষ্ট কোনো আইনি বা প্রশাসনিক সংজ্ঞা ছিল না। আর এর সুযোগ নিয়েছিল খনি মাফিয়ারা। কোন অংশটিকে আসল ‘আরাবল্লী পাহাড়’ বলে ধরা হবে, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০২৫ সালের শুরুতে একটি সংজ্ঞা ঠিক করে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক (MoEFCC)।
কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত সেই সংজ্ঞায় বলা হয়েছিল—সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা মেপে নয়, বরং আশেপাশের সমতল এলাকার চেয়ে ১০০ মিটার বা তার বেশি উঁচু যে ভূখণ্ড, তাকেই কেবলমাত্র ‘আরাবল্লী পাহাড়’ বলে গণ্য করা হবে। আর ৫০০ মিটারের মধ্যে এই ধরনের দুই বা তার বেশি পাহাড় থাকলে তাকে ‘আরাবল্লী রেঞ্জ’ বলা হবে।
পরিবেশবিদ এবং বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা এই সংজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা করে আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁদের প্রধান অভিযোগগুলি ছিল:
৯০ শতাংশ পাহাড়ের সুরক্ষা হারানোর ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৃত্রিম এবং সংকীর্ণ সংজ্ঞাটি যদি চূড়ান্তভাবে মেনে নেওয়া হতো, তবে এত দিন ধরে যে ভূখণ্ড আরাবল্লী পাহাড়শ্রেণি বলে পরিচিত ছিল, তার ৯০ শতাংশই পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বাইরে চলে যেত। অর্থাৎ সেগুলির আর কোনো আইনি সুরক্ষা থাকত না। আরাবল্লীর একটি বড় অংশ জুড়েই রয়েছে ছোট ছোট টিলা, ক্ষয়প্রাপ্ত পাহাড় এবং মৃদু ঢালু জমি, যেগুলির উচ্চতা সমতল থেকে ১০০ মিটারের কম। কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য রাখতে এবং বন্যপ্রাণীদের চলাচলের জন্য সেগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।
রাজস্থানে বিস্তৃত প্রায় ১২,০০০-এর বেশি পাহাড় ও টিলার মধ্যে মাত্র হাজারখানেক পাহাড় কেন্দ্রের ওই ১০০ মিটারের শর্ত পূরণ করতে পারত। এর সহজ অর্থ হলো, বাকি ১১,০০০-এর বেশি পাহাড় আইনি সুরক্ষার বাইরে চলে যেত। গুজরাত ও হরিয়ানার ক্ষেত্রে প্রায় ৮২ শতাংশ এবং দিল্লির ক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণ আরাবল্লী অঞ্চলই গ্রিন জোনের কড়া বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত হয়ে যেত।
সুরক্ষা হারালে ওই বিস্তীর্ণ এলাকায় কোনো বাধা ছাড়াই নতুন নতুন খনি তৈরি করে পাথর ও খনিজ তোলার আইনি রাস্তা খুলে যেত। পাশাপাশি বড় বড় রিয়েল এস্টেট কোম্পানির জন্য রিসর্ট, হোটেল, পর্যটন কেন্দ্র এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক কারণে ঢালাও আবাসন ও নির্মাণকাজ করার পথ সহজ হতো। এর ফলে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক গাছপালার প্রায় ৩০ থেকে ৪২ শতাংশ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যেত এবং ঘাসজমি ও বালিয়াড়ি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
সংক্ষেপে এই মামলার সাম্প্রতিক পুরো ঘটনাক্রম:
২০২৫ সালের গোড়ার দিকে: কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক আরাবল্লী পাহাড়ের একটি নতুন সংজ্ঞা প্রস্তাব করে, যেখানে বলা হয় সমতল এলাকা থেকে কোনো ভূখণ্ডের উচ্চতা অন্তত ১০০ মিটার হতে হবে।
২০ নভেম্বর ২০২৫: সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বিআর গবইয়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কেন্দ্রের প্রস্তাবিত এই বিতর্কিত সংজ্ঞার উপর সিলমোহর দেয়।
ডিসেম্বর ২০২৫: এই রায়ের ফলে আরাবল্লীর প্রায় ৯০ শতাংশ পাহাড় আইনি সুরক্ষা হারাবে দেখে পরিবেশবিদরা তীব্র আপত্তি জানান এবং রাজস্থান ও হরিয়ানার বিস্তীর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষ গণবিক্ষোভ শুরু করেন।
২৭ থেকে ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫: পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেয় এবং এক অন্তর্বর্তী নির্দেশে পূর্ববর্তী বেঞ্চের রায়কে সম্পূর্ণ স্থগিত করে দেয়।
মার্চ ২০২৬: আরাবল্লীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার জন্য একটি সঠিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নির্ধারণের লক্ষ্যে কাঞ্চন দেবীর নেতৃত্বে ১০-সদস্যের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়।
১৬ মে ২০২৬: মামলার সাম্প্রতিক শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দেয়, এই বিশেষজ্ঞ কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত আরাবল্লীর এক ইঞ্চি জমিতেও কোনো রকম খননকাজ চালানো যাবে না।
শনিবারের শুনানি
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ শনিবারের শুনানিতে খনি মালিক এবং লবিস্টদের সমস্ত যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে। মামলার শুনানির সময় যখন খনি লিজ হোল্ডারদের পক্ষ থেকে ব্যবসা বন্ধ হওয়া এবং আর্থিক ক্ষতির কথা বলে কিছুটা ছাড় চাওয়া হয়, তখন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়ে বলে:
আদালত-নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল আরাবল্লী পাহাড়শ্রেণির একটি নতুন সংজ্ঞা জমা না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে কোনো খননের অনুমতি দেওয়া হবে না।
পাঁচ মাস আগে আদালতের নির্দেশে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি আরাবল্লীর নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের কাজ করছে জানিয়ে প্রধান বিচারপতি শনিবারের শুনানিপর্বে আবার বলেন:
আদালত আরাবল্লীর নতুন সংজ্ঞা সম্পর্কে সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এক ইঞ্চি জমিতেও খনন চলবে না।
শুনানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছিল খনি লবির প্রভাব নিয়ে আদালতের সোজাসুজি এবং নজিরবিহীন আক্রমণ। কর্পোরেট ও রাজনৈতিক আঁতাতের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন:
সমস্ত সমস্যার সূত্রপাত হয়েছে শক্তিশালী খনি লবির কারণে। আমাদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। আরাবল্লীর পরিবেশকে রক্ষা করা।
রাজ্য সরকারগুলির কাছ থেকে খনি সংক্রান্ত যে সমস্ত উদ্বেগজনক বা বিরক্তিকর তথ্য আসছে, তাতে আদালত যে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, তাও বেঞ্চের কথাবার্তায় পরিষ্কার বোঝা গিয়েছে।
হাই-পাওয়ার্ড এক্সপার্ট কমিটি (HPEC): সদস্য ও তাঁদের ভূমিকা
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত এই ১০-সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটিই এখন আরাবল্লীর ভাগ্য নির্ধারণ করবে। কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক দ্বারা অনুমোদিত এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন একজন দক্ষ মহিলা বন আধিকারিক। এই কমিটির চেয়ারপার্সন কাঞ্চন দেবী এবং সদস্যরা হলেন- সুভাষ আশুতোষ, রাজেন্দ্র কুমার শর্মা, তেজল কানিতকর, তেজবীর সিং রানা, সি. এন. পান্ডে , ধর্মেন্দ্র প্রকাশ, জয়া প্রকাশ যাদব প্রমুখ। কমিটির গঠন এবং সদস্যদের কাজের ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, আদালত এখানে শুধু সরকারি আমলাদের সিদ্ধান্তের চেয়ে প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চেয়েছে।
আমন্ত্রিত ও প্রস্তাবিত বিশেষজ্ঞ
কমিটিতে আঞ্চলিক গাছপালা ও পরিবেশের ভারসাম্য বুঝতে রাজস্থানের বিখ্যাত পরিবেশ-লেখক আর. এন. মিশ্র (যাঁর ‘Trees of Rajasthan’ বইটি খুব বিখ্যাত) এবং পরিচিত পরিবেশকর্মী ও বন পুনরুদ্ধার বিশেষজ্ঞ বিজয় ধাসমানার নামও প্রস্তাব করা হয়েছে।
কমিটির মূল কাজের পরিধি
১. কেন্দ্রের তৈরি বিতর্কিত ‘১০০ মিটার’ উচ্চতার সংজ্ঞাকে পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন করে খতিয়ে দেখা।
২. পাহাড়ের ঢাল, মাটির তলার জলের উৎস, বন্যপ্রাণের রাস্তা এবং মাটির চরিত্র বিশ্লেষণ করে আরাবল্লীর একটি সহজ ও পরিবেশ-বান্ধব আইনি সংজ্ঞা তৈরি করা।
৩. স্যাটেলাইট এবং জিআইএস (GIS) প্রযুক্তির সাহায্যে পুরো পর্বতশ্রেণীর নিখুঁত ডিজিটাল ম্যাপ বা মানচিত্র তৈরি করা।
৪. সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করা, যার উপর ভিত্তি করে আদালত পরবর্তী রায় দেবে।
সমালোচনা ও সংশয়
সুপ্রিম কোর্টের শনিবারের কড়া নির্দেশকে দেশজুড়ে পরিবেশপ্রেমী সংগঠন ও সাধারণ মানুষ খুশি হয়ে স্বাগত জানালেও, বিশেষজ্ঞ মহলে এখনও কিছু সংশয় ও সমালোচনা রয়ে গিয়েছে। ‘আশোক ট্রাস্ট ফর রিসার্চ ইন ইকোলজি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ (ATREE)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় পরিবেশ গবেষণা সংস্থার বিজ্ঞানীদের মতে, এই নতুন কমিটিতেও কিছু খামতি রয়ে গিয়েছে:
বিশেষজ্ঞতার অভাব: পরিবেশবিদদের একাংশের অভিযোগ, এই ১০ সদস্যের কমিটিতে হাইড্রো-জিওলজিস্ট (মাটির তলার জল বিশেষজ্ঞ) এবং বড় মাপের ওয়াইল্ডলাইফ ইকোলজিস্ট (বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ) খুব কম আছেন। আরাবল্লীর মূল গুরুত্ব যেখানে জল ধরে রাখা ও চিতাবাঘের মতো বন্যপ্রাণের সুরক্ষা, সেখানে বন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের এত বেশি সংখ্যায় কেন রাখা হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
রাজ্যগুলির রাজনৈতিক সদিচ্ছা: আদালত নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবে রূপায়ণ করার দায়িত্ব কিন্তু রাজ্য প্রশাসনের। রাজস্থান ও হরিয়ানা সরকারের আয়ের একটি বড় অংশ আসে খনি লিজ এবং জমি কেনাবেচার ট্যাক্স থেকে। পর্দার আড়ালে খনি মাফিয়াদের রাজনৈতিক মদত পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আদালত কতক্ষণ পাহারা দিয়ে এই চোর-পুলিশ খেলা বন্ধ রাখবে, তা নিয়ে মানুষের মনে সংশয় রয়েছে।
এই আইনি লড়াইয়ে সুপ্রিম কোর্ট পরিবেশ আইনের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনি দর্শন বা নীতিকে হাতিয়ার করেছে:
১. প্রিকশনারি প্রিন্সিপল বা সতর্কতামূলক নীতি
এই নীতি অনুযায়ী, যদি কোনো বাণিজ্যিক বা শিল্পমূলক কাজের ফলে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের শতভাগ নিশ্চয়তা না থাকলেও সেই কাজ আগে বন্ধ রাখতে হবে। আদালত স্পষ্ট বলেছে, সংজ্ঞা ঠিক করার আগেই যদি খনি চালাতে দেওয়া হয়, তবে পরে সংজ্ঞা তৈরি হলেও হারিয়ে যাওয়া পাহাড় আর কোনোদিন ফিরিয়ে আনা যাবে না।
২. পাবলিক ট্রাস্ট ডকট্রিন বা জনকল্যাণমূলক নীতি
এই নীতি বলে, প্রকৃতির দেওয়া সম্পদ যেমন—বাতাস, জল, পাহাড় ও বনভূমি হলো সাধারণ মানুষের সম্পত্তি। রাষ্ট্র বা সরকার এর মালিক নয়, বরং রক্ষক বা ‘ট্রাস্টি’ মাত্র। বাণিজ্যিক স্বার্থে রাষ্ট্র এই সম্পদকে কোনো কোম্পানির হাতে পুরোপুরি তুলে দিতে পারে না। সুপ্রিম কোর্ট শনিবারের মন্তব্যে এই রক্ষক হিসেবেই নিজের অনমনীয় অবস্থান পরিষ্কার করেছে।
সমাধান কোন পথে?
সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান রায়ের ফলে সাময়িকভাবে আরাবল্লীর উপর খনি মাফিয়াদের হাতুড়ির ঘা বন্ধ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই পর্বতমালাকে বাঁচাতে গেলে শুধু খনন বন্ধ রাখাই যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পর কয়েকটি পদক্ষেপগুলি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যেমন-
আরাবল্লী গ্রিন ওয়াল প্রজেক্ট: আফ্রিকা মহাদেশের ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’-এর আদলে গুজরাত থেকে দিল্লি পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার চওড়া এবং ১,৪০০ কিলোমিটার লম্বা একটি বিশাল সবুজ বলয় বা বাফার জোন তৈরি করতে হবে। এর ফলে থর মরুভূমির পূর্বমুখী বিস্তার সম্পূর্ণ বন্ধ হবে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য আবার নতুন করে বেঁচে উঠবে।
কঠোর ইকো-সেন্সি জোন (ESZ) ঘোষণা: বিশেষজ্ঞ কমিটির দেওয়া নতুন সংজ্ঞার উপর ভিত্তি করে সমগ্র আরাবল্লী অঞ্চলকে ‘ইকো-সেন্সি জোন’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। সেখানে সব ধরনের ভারী নির্মাণ ও খননকাজ স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। এর ফলে আইনি ফাঁকফোকর গলে কর্পোরেট রিসর্ট বা বড় আবাসন তৈরি করা পুরোপুরি বন্ধ হবে।
কমিউনিটি ফরেস্ট্রি ও বিকল্প কর্মসংস্থান: খনি অঞ্চলের উপর যেসব স্থানীয় খনি শ্রমিক ও আদিবাসী জীবিকার জন্য নির্ভরশীল, তাঁদের ইকো-ট্যুরিজম, ভেষজ বা ঔষধি গাছের চাষ এবং বন সুরক্ষার কাজে যুক্ত করতে হবে। তাঁদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করলে খনি মাফিয়াদের প্রতি স্থানীয় মানুষের জনসমর্থন কমবে এবং অবৈধ খনন রোধ করা অনেক সহজ হবে।
ড্রোন নজরদারি: রাজস্থান ও হরিয়ানা বর্ডার এবং প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় ২৪ ঘণ্টা ড্রোন এবং স্যাটেলাইট অ্যালার্ট সিস্টেম চালু করতে হবে। এর ফলে স্থানীয় স্তরে প্রশাসনিক অবহেলা বা দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না এবং তাৎক্ষণিকভাবে অবৈধ খননকারী ও তাঁদের গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হবে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর শনিবারের কড়া অবস্থান প্রমাণ করে, দেশের বিচারবিভাগ এই পরিবেশগত বিপর্যয় রুখতে তার সবটুকু শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত। খনি লবির কোটি কোটি টাকার খেলা আর রাজনৈতিক প্রভাবের মুখে দাঁড়িয়ে আদালতের মন্তব্য—“আমাদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। আরাবল্লীর পরিবেশকে রক্ষা করা”—পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদের মনে নতুন করে আশার আলো জুগিয়েছে।
তবে ইতিহাস সাক্ষী, ভারতের মাটিতে ভালো আইন বা আদালতের কড়া রায়ের অভাব কোনোদিন ছিল না, অভাব ছিল তা মাটিতে বোনার বা বাস্তবায়ন করার সৎ সরকারি ইচ্ছার। কাঞ্চন দেবীর নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি যদি সত্যিই কোনো বড় কোম্পানি বা রাজনৈতিক চাপে না পড়ে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক এবং পরিবেশ-বান্ধব সংজ্ঞা জমা দিতে পারে, এবং সুপ্রিম কোর্ট যদি সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজস্থান, হরিয়ানা ও গুজরাত সরকারকে কড়া হাতে তা মেনে চলতে বাধ্য করে—তবেই বাঁচবে আরাবল্লী। আর আরাবল্লী বাঁচলে তবেই বাঁচবে উত্তর ভারতের কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ, সুরক্ষিত থাকবে আগামী প্রজন্মের নিশ্বাস নেওয়ার বাতাস আর তৃষ্ণা মেটানোর জল। সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্টের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা দেশ। এখন দেখার, আরাবল্লীকে শীর্ষ আদালত বাঁচাতে পারে কি না।






