প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী
Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।
আমরা সবাই এক, আমাদের পরিচয়— আমরা মানুষ। বদলের বাংলায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের উপর একের পর এক হামলা ও হেনস্থার অভিযোগের আবহে ইনস্ক্রিপ্টের ক্যামেরায় ধরা পড়ল সম্প্রীতির ছবি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী থানার অন্তর্গত নারায়ণতলায় নবনির্মিত একটি গির্জার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায় ৩১ অক্টোবর। এক দল দুষ্কৃতী গির্জায় ঢুকে উপস্থিত উপাসক ও যাজকদের উপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ। আক্রান্ত হন মহিলারাও। তাঁদের শাঁখা ভেঙে, সিঁদুর মুছে গির্জা থেকে বের করে দেওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে এই ঘটনার মধ্যেই সামনে এসেছে অন্য এক ছবি। গির্জার পাশের বাড়ির হিন্দু প্রতিবেশীর স্পষ্ট বক্তব্য, ধর্ম আলাদা হলেও পাশাপাশি বসবাসে কোনো বিভেদ নেই।
“আমরা বলছি ভগবান, ওরা বলছে যিশু, আরেকজন বলছে আল্লাহ। সবই তো এক।”
গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।
প্রত্যক্ষদর্শী সাবিত্রী মন্ডল ও প্রতিমা নস্করের অনুমান দুষ্কৃতীদের ওই দলে প্রায় ৫০-৬০ জন ছিলেন। তাঁরা ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে দিতে গির্জায় ঢুকেই বলেন, হিন্দুরা বের হয়ে যান। গির্জার ভিতর সবাই খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ আছেন বলায় দুষ্কৃতীরা মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলেন, তাহলে আপনারা শাঁখা-সিঁদুর কেন পরে আছেন! আপনরা তো সনাতনী কেন এসব করছেন? উপাসক, অতিথি এবং যাজকদের মারধর করা হয় বলে দাবি প্রতিমা নস্কর ও সাবিত্রী মণ্ডলের। মহিলাদের শাঁখা ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে গির্জা থেকে বের করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার ছবি বা ভিডিও তুলতে গেলে একজনের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে জানান প্রতিমা নস্কর।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গির্জায় ঢুকেই হামলাকারীরা উপাসক ও অতিথিদের মারধর শুরু করে। বাদ যাননি মহিলারাও। তাঁদের শাঁখা খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গির্জা থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। বিশপের সঙ্গে উপস্থিত যাজকদেরও শারীরিকভাবে হেনস্থা ও মারধর করা হয় বলে দাবি।
শুধু মারধর নয়, ওই জায়গায় আর কোনো গান, প্রার্থনা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল, বলে অভিযোগ। প্রদীপ মণ্ডলের দাবি, পুলিশকে খবর দেওয়ার প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। ওই দিন সন্ধ্যায় বাসন্তী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয় এবং পুলিশ এফআইআর গ্রহণ করে বলে জানান তিনি। তবে, এখনও পর্যন্ত গ্রেফতারের কোনো খবর নেই।
তবে বাসন্তীর এই ঘটনার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রতিবেশীদের অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলছে। গির্জাটি প্রতিমা নস্করের দেওয়া জমিতে তৈরি হয়েছে, তাঁর বাড়ির সামনেই। তাঁদের প্রতিবেশী হিন্দু ধর্মের। গির্জার সামনেই মাত্র দশ পা এগোলেই সেই হিন্দু বাড়ির পারিবারিক মন্দির। গির্জার সামনে পুজোর ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়, ইনস্ক্রিপ্ট ৩ নভেম্বর ঘটনাস্থলে গিয়ে সেই বাড়ির কর্তা মন্দিরে পুজো করছেন। তাঁর কাছে ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি হামলার নিন্দা করেন। স্পষ্ট জানান, এভাবে কারও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া উচিত নয়। তাঁর কথায়,
“আমরা বলছি ভগবান, ওরা বলছে যিশু, আরেকজন বলছে আল্লাহ। সবই তো এক। আমার খুব খারাপ লেগেছে এই ঘটনায়।”
অর্থাৎ, যাঁদের ধর্মীয় পরিচয় আলাদা, তাঁদের সঙ্গে প্রতিবেশী হিসেবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই বিভাজন কোনো প্রভাব ফেলেনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bandle Tour : কলকাতা থেকে দিনের দিন গিয়ে দিব্যি সন্ধের মধ্যে বাড়ি ফিরে আসা যায় এই জায়গা থেকে
গির্জার দুই আক্রান্ত মহিলা প্রতিমা নস্কর ও সাবিত্রী মণ্ডলের বক্তব্যেও উঠে এসেছে একই অভিজ্ঞতা। তাঁদের দাবি, এই এলাকায় হিন্দু ও খ্রিস্টান পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই পাশাপাশি বসবাস করছে। স্থানীয় হিন্দু প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাঁদের কখনও কোনো সমস্যা হয়নি। সাবিত্রী মণ্ডলের কথায়, বংশপরম্পরায় তাঁরা খ্রিস্টান। এতদিন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। এই প্রথম এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, হামলাকারীরা স্থানীয় প্রতিবেশী নন, বাইরে থেকে এসেছিলেন।
এই জায়গাতেই বাসন্তীর ঘটনাটি অন্য কিছু এলাকার অভিযোগের থেকে আলাদা মাত্রা পাচ্ছে। যেখানে কোথাও কোথাও খ্রিস্টান পরিবারগুলির বিরুদ্ধে সামাজিক বয়কট, হেনস্থা কিংবা ধর্ম পরিবর্তনের চাপ তৈরির অভিযোগ উঠেছে, সেখানে নারায়ণতলার বাসিন্দাদের বক্তব্য, স্থানীয় হিন্দু প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাঁদের সহাবস্থানে কোনো সমস্যা ছিল না। বরং গির্জার পাশের হিন্দু পরিবারের কর্তার প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের বার্তা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাইরে থেকে আসা কোনো গোষ্ঠীর অভিযোগ বা হুমকি কি দীর্ঘদিনের স্থানীয় সম্প্রীতির পরিবেশকে নষ্ট করতে চাইছে?
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কতগুলি ঘটনা?
বিজেপি মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর হামলা ও হেনস্থার অভিযোগের পরিসংখ্যান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার কাছে জমা পড়া রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ছয় মাসে রাজ্যে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে হিংসার ৪৮টি ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে মাত্র ১৬টি এফআইআর করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার প্রতিষ্ঠাতা রাজ্য সম্পাদক হেরোদ মল্লিক।
অন্যদিকে, ইন্ডিয়া হেট ল্যাব নামে একটি পর্যবেক্ষক সংস্থার রিপোর্টে ১৩ মে থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজ্যের ১৩টি জেলায় খ্রিস্টানদের নিশানা করে কমপক্ষে ৬০টি ঘটনার কথা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি ছিল গির্জা, বাড়ি, প্রার্থনাসভা বা অন্যান্য ধর্মীয় জমায়েতে হানা এবং আটটি ছিল শারীরিক হামলা, দলবদ্ধ আক্রমণ বা সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনা।
তবে, নারায়ণতলার ঘটনা শুধু একটি গির্জায় হামলার অভিযোগ নয়, স্থানীয় স্তরে দীর্ঘদিনের সহাবস্থান ও সম্প্রীতির পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। গির্জার পাশের হিন্দু প্রতিবেশীর বক্তব্য সেই আবহেই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মবিশ্বাস আলাদা হতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী হিসেবে সম্পর্কের জায়গায় বিভেদ থাকা উচিত নয়। এখন দেখার, এই ঘটনায় পুলিশের তদন্তে কী উঠে আসে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করা হয়।






