‘কী করছে পুলিশ?’ আরজি করে ভাঙচুর নিয়ে হাইকোর্টের প্রবল ভর্ৎসনার মুখে রাজ্য
Kolkata Doctor's Rape and Murder: এদিন পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, ‘‘পুলিশ নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না। জনতাকে ঠেকাতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলা কী ভাবে রক্ষা করবে?’’

ঠিক এক সপ্তাহ আগেই আরজি কর হাসপাতালের বক্ষবিভাগের সেমিনার রুম থেকে উদ্ধার হয়েছিল এক মহিলা চিকিৎসকের ক্ষতবিক্ষত দেহ। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মেলে ধর্ষণের চিহ্ন। সেই ঘটনায় গোটা রাজ্য তো বটেই, দেশ জুড়ে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। এরই মধ্যে বুধবার রাতে মেয়েদের রাত দখলের কর্মসূচী চলাকালীন আরজি কর হাসপাতাল চত্বরে ঢুকে হামলা করে বেশ কয়েকজন দুষ্কৃতি। ভাঙচুর করা হয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, আছড়ে ভাঙা হয় ওষুধপত্র, নষ্ট করা হয় ফ্রিজ। পুলিশের গাড়িতেও ভাঙচুর চালায় দুষ্কৃতীরা। যে ভাবে মেয়েদের প্রতিবাদ মিছিলের সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলতা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে, সেই ঘটনায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বিভিন্ন মহল।
আরজি কর কাণ্ডের পরেই একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টে। বুধবার রাতে হাসপাতালে দুষ্কৃতী হামলার পরে নতুন করে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এমনকী জরুরি ভিত্তিক শুনানির আর্জিও জানানো হয় আদালতের কাছে। আর শুক্রবার সেই আবেদন মঞ্জুরও করেছে কলকাতা হাইকোর্ট। শুধু তাই নয়, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম এবং বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের বেঞ্চে আরজি করে হামলার ঘটনা নিয়ে নতুন মামলা করা হয়েছে।
এ দিন রাজ্যকে আদালতের তরফে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, ‘এ সব কী হচ্ছে?’ জবাবে রাজ্যের আইনজীবী জানান, আন্দোলন চলাকালীন আচমকা প্রায় সাত হাজার মানুষ হাসপাতালে ঢুকে পড়েন। তাঁদের মধ্যে কয়েক হাজার মানুষ ভাঙচুর চালান। পুলিশও সেই হামলায় আক্রান্ত হয়েছে। তার পরেই রাজ্যের তরফে আইনজীবী আদালতকে জানান, মূল ঘটনাস্থলে কিছু হয়নি। সেখানে পৌঁছতে পারেননি হামলাকারীরা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
R G Kar Hospital Incident: সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ যেখানে সংগ্রহ করা হয়, সেই ঘরেও ভাঙচুর চালানো হয়। পরিকল্পিতভাবে ভাঙা হয় সিসিটিভির হার্ডডিক্স যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য পুলিশের ঘরে থাকা প্রত্যেকটি মোবাইল ফোনও।
একই সঙ্গে আরজি করের ঘটনায় পুলিশের গোয়েন্দাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলল আদালত। রাজ্যের উদ্দেশে এদিন প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন ছুড়ে দেন ‘‘সাধারণত ১০০ জনের জমায়েত হলেই গোয়েন্দারা নজর রাখেন। সাত হাজার মানুষের জমায়েতে তাঁরা কী করছিলেন? এত লোকের জমায়েত হল আর পুলিশের গোয়েন্দারা কিছু জানলেন না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন।’’ একই সঙ্গেএই পরিস্থিতিতে ১৪৪ ধারা জারির প্রয়োজন ছিল কি না এ নিয়েও প্রশ্ন করেছে আদালত। আদালতের জিজ্ঞাসা, এত বড় ঘটনা। চিকিৎসকরা ধর্না দিচ্ছেন। বিক্ষোভ, প্রতিবাদ হচ্ছে। রাজ্য কী করেছে? ওই ঘটনার পরে সতর্কতা হিসাবে কী করেছে পুলিশ? এর পর প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, ‘‘এটা রাজ্য প্রশাসনের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। পুলিশ নিজেদের কর্মীদের রক্ষা করতেই পারেনি।’’
মঙ্গলবার শুনানির দিনই আরজি কর কাণ্ডে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। তার পরেই প্রকাশ্যে আসে আরজি কর কলেজের বক্ষ বিভাগের একটি অংশে সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। আর সেই জায়গাটি সেমিনার হলের একেবারে কাছে। শৌচাগার তৈরির জন্য ভাঙা হচ্ছে একটি ঘর। যেখানে এত বড় ঘটনা, সেই জায়গায় কেন ঘর ভাঙা শুরু হল? মামলাকারীদের পক্ষের আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আদালতে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মামলাকারীদের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘আরজি করে হামলার পর পুলিশ কমিশনার বলেছেন, সারা শহর জুড়ে প্রতিবাদ হচ্ছে। আমরা কী করতে পারি? অর্থাৎ, পুলিশের তরফে কোনও সমর্থন নেই! কমিশনারের বক্তব্যের ভিডিয়ো রেকর্ড রয়েছে। এ সব কী হচ্ছে? সরকারি হাসপাতালে ভাঙচুর করা হচ্ছে!’’

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
RG Kar Kolkata Police: সেদিনের ভাংচুরের ঘটনার ৫০টিরও বেশি ছবি প্রকাশ করে কলকাতা পুলিশ।
তার উত্তরে হাইকোর্টের বিচারপতি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘‘আপনারা বলছেন, ৭০-৮০ জন হাসপাতালে ভাঙচুর করেছে। রাজ্য আবার সাত হাজার লোকের জমায়েতের কথা বলছে। ৭০-৮০ জন যদি এটা করে থাকে, তা হলে তাঁদের উদ্দেশ্য কী?" আরজি কর কাণ্ডে জনস্বার্থমামলাকারীদের মধ্যে রয়েছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এ দিন তাঁর আইনজীবী আরজি কর হাসপাতাল চত্বরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের আবেদন জানিয়েছেন আদালতের কাছে।
এই ঘটনার পর সোমবারই অরজি কর কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে ইস্তফা দেন সন্দীপ ঘোষ। সেদিন বিকেলেই তাঁকে অন্য হাসপাতালে নিযুক্ত করা হয়। মঙ্গলবার কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে লম্বা ছুটিতে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। তাঁর প্রতি রাজ্য সরকারের সহানুভূতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল আদালত। শুক্রবার শুনানিতে কার্যত সেই অধ্যক্ষের আইনজীবীকে সাফ হুঁশিয়ারি দিল হাইকোর্ট। আরজি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের আইনজীবী আদালতে নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘‘আমার মক্কেলকে নিরাপত্তা দেওয়া হোক। সিবিআইয়ের সঙ্গে আমরা সহযোগিতা করেছি। রাজ্য বা কেন্দ্রীয় বাহিনী, যে কোনও সংস্থাকে নিরাপত্তা দিতে নির্দেশ দিক আদালত।’’ এর পর আইনজীবীর উদ্দেশে বিচারপতির মন্তব্য, ‘‘ ‘‘সবটাই আমাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি তো প্রভাবশালী ব্যক্তি। আপনার সঙ্গে রাজ্য রয়েছে। কেন আবার নিরাপত্তা চাই? আপনি আমাদের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করছেন। বাড়িতেই থাকুন। শান্তিতে থাকুন। না হলে বলুন, কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে দিচ্ছি।’’
যদিও এদিন রাজ্যের তরফে আদালতের তরফে দাবি করা হয়েছে, আরজি করের বক্ষ বিভাগের সেমিনার রুম, যেখান থেকে ওই চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হয়েছিল, সেই স্থান সুরক্ষিত রয়েছে পুরোপুরি। সেখান পর্যন্ত হামলাকারীরা পৌঁছতে পারেনি। রাজ্যের তরফে আইনজীবী এদিন আদালতকে জানান, চিকিৎসকদের দাবি মেনেই ওই অংশে আর একটি বিশ্রামের ঘর তৈরি করা হচ্ছে। সেই কাজ শুরু হয়েছিল। তবে তাতে সন্তুষ্ট হয়নি আদালত। বরং কেন সেমিনার হলের কাছের ঘরটি এখনই ভাঙতে হল? এত তাড়াহুড়ো কিসের? হলফনামা দিয়ে রাজ্যের কাছে জানতে চেয়েছে আদালত। এমনকী ঘটনাস্থল যে নিরাপদ রয়েছে, তা-ও হলফনামা আকারে রাজ্যকে জানাতে হবে। এ প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, ‘‘এত তাড়াহুড়ো কেন? সব হাসপাতালেই পর্যাপ্ত বিশ্রাম-ঘর রয়েছে। শিলিগুড়ি হাসপাতালে যান। এত বড় একটা ঘটনা ঘটেছে, এই পরিস্থিতিতে আপনারা সেখানে গোলমাল (ডিসটার্ব) করছেন! ঘটনাস্থল নিরাপদ রয়েছে এই মর্মে হলফনামা দিন।’’
এদিন পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। রাজ্যের আইনজীবীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, ‘‘পুলিশ নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না। জনতাকে ঠেকাতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলা কী ভাবে রক্ষা করবে?’’ ভবিষ্যতে এমন ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ করবে পুলিশ? এদিন সে ব্যাপারেও জানতে চেয়েছে আদালত। আগের শুনানির দিনই সিবিআইয়ের হাতে তদন্তভার তুলে দিয়েছিল আদালত। এদিন আরও একবার সিবিআইকে তদন্তের প্রয়োজনে সব রকম স্বাধীনতা দেওয়ার কথা জানিয়েছে হাইকোর্ট। প্রয়োজনে হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবে সিবিআই। হামলার ফলে হাসপাতালের কোন অংশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখবে কেন্দ্রীয় সংস্থা। রাজ্য এ নিয়ে হলফনামা জমা দেবে। একই সঙ্গে কতদিনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এ বিষয়েও রাজ্যের কাছে জানতে চেয়েছে আদালত।
শুক্রবার এর পাশাপাশি নিহত চিকিৎসকের নাম ও ছবি যাতে কোনও ভাবে প্রকাশ না করা হয়, তার জন্য অনুমতি চেয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি এদিন জানান ‘‘আমরা অনুরোধ করছি মৃতাকে যাঁরা চেনেন তাঁরা তাঁর নাম এবং ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবেন না। সংবাদমাধ্যমও কোথাও তা প্রকাশিত করতে পারবে না। এটা করা যাবে না, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট আইন রয়েছে।’’এই মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী বুধবার বলে জানিয়েছে হাইকোর্ট। সেই দিনই সিবিআই তদন্তের অগ্রগতির রিপোর্ট জমা দেবে আদালতে, তেমনটাই জানিয়েছে হাইকোর্ট।





