চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যু প্রসঙ্গে কে কী বলছেন?
বুধবার রাত সওয়া দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে মধ্যমগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর ছায়াসঙ্গী এবং তাঁর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে এখন চরম উত্তেজনা। একদিকে পরিবারের কান্না ও দোষীদের শাস্তির দাবি, অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের কাদা ছোড়াছুড়ি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত তপ্ত। কিন্তু সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল তা জানতে ইনস্ক্রিপ্টের প্রতিনিধি পৌঁছে গিয়েছিল ঘটনাস্থলে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নক্কারজনক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে গিয়েছে। বুধবার রাত সওয়া দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে মধ্যমগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর ছায়াসঙ্গী এবং তাঁর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে এখন চরম উত্তেজনা। একদিকে পরিবারের কান্না ও দোষীদের শাস্তির দাবি, অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের কাদা ছোড়াছুড়ি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত তপ্ত। কিন্তু সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল তা জানতে ইনস্ক্রিপ্টের প্রতিনিধি পৌঁছে গিয়েছিল ঘটনাস্থলে।
সেই রাতে প্রত্যক্ষদর্শীরা যা দেখলেন
স্থানীয় বাসিন্দা সুশান্ত সরকার ইনস্ক্রিপ্টকে জানান, রাতে তিনি যখন কুকুরদের খাওয়াচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ বাজি ফাটার মতো বিকট শব্দ পান। প্রথমে ভেবেছিলেন বিজেপি জেতার আনন্দে হয়তো কোথাও পিকনিক বা উৎসব হচ্ছে। কিন্তু তখনই একজনের আর্তনাদ শোনেন— "দুজনকে গুলি করে দিয়ে চলে গেল!"
তিনি দৌড়ে গিয়ে দেখেন, একটি স্করপিও গাড়ির রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে একটি অল্টো গাড়ি। অল্টো গাড়িটি ছিল ফাঁকা। স্করপিও গাড়ির ভিতরে একজন ভয়ে কাচ না নামিয়ে কান্নাকাটি করছিলেন। সুশান্তবাবু নিজেকে পাড়ার ছেলে বলে পরিচয় দিয়ে অভয় দিলে তিনি কাচ নামান। দেখা যায়, পিছনের সিটে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন চন্দ্রনাথ রথ। তখনও তাঁর জ্ঞান ছিল। সুশান্তবাবুর পরামর্শে চালক দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তিনি থানায় খবর দিলে পুলিশ ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থল থেকে তিনটি গুলির খোল উদ্ধার হয়।
এলাকাবাসীদের দাবি, এই খুনটি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ছক কষে করা হয়েছে। জয়া রায় নামে এক বাসিন্দা জানান, ঘাতকরা অনেক দূর থেকে গাড়িটিকে অনুসরণ করে আসছিল। একটি গলির মুখে গাড়িটির পথ আটকানো হয় । এরপর বাইকে করে আসা তিন যুবক পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে পর পর ছয়টি গুলি চালায়।
অন্যতম বাসিন্দা নিতু শর্মা জানান, "আততায়ীরা মাতুর রোড চৌমাথা থেকে ধাওয়া করেছে ওঁকে। তারপর যেখানে সিসি ক্যামেরা নেই, সেখানে গুলি করেছে। তাদের সবার মুখে কালো স্কার্ফ আর মাথায় হেলমেট ছিল। " নিতু শর্মার দাবি, অনেকদিন ধরে চন্দ্রনাথকে নজরে রাখা হচ্ছিল, নতুবা ঘাতকরা তাঁর যাতায়াতের সময় ও সিসি ক্যামেরা বিহীন জায়গা সম্পর্কে এত নির্ভুল তথ্য পেত না।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। বাসিন্দাদের একাংশ সরাসরি স্থানীয় চেয়ারম্যান রথীন ঘোষের দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁদের মতে, শুভেন্দু অধিকারী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোতেই এই আক্রোশ। শুভেন্দুবাবুর রণকৌশলের পিছনে চন্দ্রনাথের বড় ভূমিকা ছিল, আর সেই আক্রোশ থেকেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
বিজেপি কর্মী সুশান্তবাবুর দাবি, রাজ্য নেতৃত্ব তাঁদের শান্ত থাকতে বলেছে বলে তাঁরা চুপ করে আছেন, কিন্তু তৃণমূল যদি এই 'জিহাদী' আচরণ বন্ধ না করে, তবে তাঁরাও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন না।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। সুরেখা মজুমদার ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন, "বাংলাকে একটা সঠিক সিস্টেমে চলতে হবে। এভাবে হিংসা চললে আমাদের রাজ্যের নাম খারাপ হচ্ছে। রাজনীতিতে জয়-পরাজয় থাকবেই, সেটা মেনে নিতে হবে। সিপিএম যখন হেরেছিল, তারা শান্তভাবে বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু এখন কেন লোকজনকে ভয় দেখানো হচ্ছে?"
বাসিন্দা স্বপ্না কবিরাজ সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন শাসকদলের দিকে। তিনি ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন, "এটা পুরোপুরি হিংসার ফল। তৃণমূল হার মানতে পারছে না বলেই এই খুনের রাজনীতি শুরু করেছে। শুভেন্দু অধিকারীর ডান হাতকে সরিয়ে দিয়ে ওরা আসলে ভয় দেখাতে চাইছে। এমনকী স্থানীয় চেয়ারম্যান রথীন ঘোষের ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।"
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে গুলি করে খুন করা হলো শুভেন্দু অধিকারীর সহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে। মধ্যমগ্রামের দোহারিয়াতে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে চার রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে দুষ্কৃতীরা।
এলাকার অন্য এক বাসিন্দা মৌ রায় মনে করেন, এই ঘটনা আসলে একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা। তিনি ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন, "শুভেন্দুবাবুর আপ্ত সহায়ককে দিয়ে ওরা শুরু করল। সবাইকে ভয় দেখাচ্ছে তবে আমরা আশাবাদী যে বিজেপি আসায় পরিস্থিতি পাল্টাবে। আমরা মেয়েরা যাতে রাতে শান্তিতে রাস্তায় চলতে পারি, সেই নিরাপত্তা চাই।"
শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ
চন্দ্রনাথের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত ও ক্ষুব্ধ শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা বা আকস্মিক ঘটনা নয়। তাঁর কথায়, "এটা একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।" তিনি অভিযোগ করেছেন যে, অন্তত দু-তিন দিন ধরে আততায়ীরা এলাকা রেইকি বা নজরদারি চালিয়েছিল। এরপর পরিকল্পনা করেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। শুভেন্দুবাবুর দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই এই খুনের মূল কারণ। তিনি বলেন, "চন্দ্রনাথকে হত্যার পিছনে একটাই কারণ—শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছেন। চন্দ্রনাথ আমার আপ্ত সহায়ক হওয়ার কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করা হয়েছে।" তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন এবং দোষীদের উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
চন্দ্রনাথের মায়ের আর্তনাদ
ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন চন্দ্রনাথের মা। তিনি বলেন, "আমি চাই দোষীরা কঠিন শাস্তি পাক।" মা হিসেবে তিনি কারও ফাঁসি চান না ঠিকই, কিন্তু আজীবন কারাদণ্ড বা যাবজ্জীবন শাস্তির দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি করার কারণেই তাঁর ছেলেকে টার্গেট করা হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাঁদের বক্তব্য ছিল, ৪ তারিখের পর দিল্লি আর কাউকে রক্ষা করতে পারবে না। চন্দ্রনাথের মায়ের কথায়, "আমার ছেলে যদি দুর্ঘটনায় মারা যেত, তবে এতটা কষ্ট হতো না। কিন্তু তাকে যেভাবে কষ্ট দিয়ে মারা হলো, তা ভাবা যায় না। এটা তৃণমূলের সাজানো ঘটনা।"
চন্দ্রনাথের প্রতিবেশী দেব কুমার জানা জানান, খুনের আগে পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। দুপুর ২টোর সময়ও তাঁরা চন্ডীপুরে একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া ও গল্প করেছেন। চন্দ্রনাথের মা খাবার পাঠিয়েছিলেন। সেখান থেকে খেয়েই তিনি কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। প্রতিবেশীদের দাবি, চন্দ্রনাথের সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতা ছিল না। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন এবং কোনোদিন কারও কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিলেন বলেও জানা নেই।
তদন্ত প্রসঙ্গে পুলিশ যা বলছে
রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি) সিদ্ধনাথ গুপ্তা জানিয়েছেন, পুলিশ তদন্ত করছে। একটি গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে যা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে তদন্তে এক অদ্ভুত তথ্য উঠে এসেছে। গাড়িটির নম্বর প্লেট নিয়ে কারচুপি করা হয়েছে। নম্বরটি শিলিগুড়ির এক গাড়ির হলেও আসলে সেটি আসল নম্বর নয়। পুলিশ প্রতিটি সূত্র খতিয়ে দেখছে। অন্যদিকে, সিআইডি বা তদন্তকারী দলও ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তারা এখনই সংবাদমাধ্যমের সামনে কোনো বিস্তারিত তথ্য দিতে নারাজ।
চন্দ্রনাথের ময়নাতদন্ত নিয়ে আইনজীবী সোমরাজ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন যে, কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, আততায়ীরা চন্দ্রনাথকে লক্ষ্য করে চালানো গুলির মোট ৫টি গুলি তাঁকে স্পর্শ করেছিল। এর মধ্যে ৪টি গুলি তাঁর শরীরে বিঁধেছে এবং একটি গুলি তাঁর আইফোনে লেগেছে। এই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করার ঘটনা প্রমাণ করে আততায়ীরা কতটা পেশাদার ছিল।
দিলীপ ঘোষের কড়া বার্তা
বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, বিজেপি হিংসার রাজনীতি করে না। তাঁর অভিযোগ, গত ১৫ বছর ধরে মানুষের উপর অত্যাচার চলছে।
তিনি বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে বলেছেন যে, পুলিশমন্ত্রী বর্তমানে নাটক করতে ব্যস্ত। দিলীপ ঘোষের হুশিয়ারি, "গুন্ডাদের নিয়ে এসে যে পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, তার ফল সবাইকে ভুগতে হবে। আমরা অসামাজিক লোকেদের জন্য দলের দরজা বন্ধ করে দিয়েছি এবং কোনো অসামাজিক কাজ বরদাস্ত করা হবে না।"
"এটা প্রতিহিংসার রাজনীতি": শমীক ভট্টাচার্য
বিজেপি মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য এই হত্যাকাণ্ডকে পুরোপুরি পরিকল্পিত এবং প্রতিহিংসামূলক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, চন্দ্রনাথ রথ একজন প্রাক্তন সেনাকর্মী এবং সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে কেন মারা হলো? তাঁর মতে, দীর্ঘ ১৫ বছরে রাজ্যে পুলিশ ও প্রশাসনের রাজনীতিকরণ হয়েছে এবং অপরাধীরা এখন বেপরোয়া।
তিনি আরও এক গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, "বারাসাত-মধ্যমগ্রাম সীমান্তে জাল আধার ও রেশন কার্ড তৈরির চক্র চলছে। অনেক অনুপ্রবেশকারীও এখান থেকেই জাল নথিপত্র সংগ্রহ করে। প্রধানমন্ত্রী আসার আগে এমন ঘটনা কি কোনো বিশেষ বার্তা দেওয়ার জন্য? আমরা তৃণমূলের ভাষায় কথা বলতে জানি, কিন্তু শৃঙ্খলা বজায় রাখছি।"
"সুপারি কিলারদের কাজ": মহম্মদ সেলিম
বাম নেতা মহম্মদ সেলিমও এই খুনের ঘটনায় স্তম্ভিত। তিনি একে একটি "ঘৃণ্য অপরাধ" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, যেভাবে খুনের ছক কষা হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে সুপারি কিলার বা পেশাদার খুনিরা এই কাজে যুক্ত। নির্বাচনের পর শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও গত দু'দিনে যেভাবে একের পর এক খুন হচ্ছে, তাতে প্রশাসনের ব্যর্থতা স্পষ্ট। তিনি এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা আসল কুশীলবদের খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন।
চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোক নয়, বরং এটি পশ্চিমবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনেক বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক রয়েই গিয়েছে। দোষীরা আদৌ ধরা পড়বে কি না, নাকি এই মৃত্যুও রাজনীতির দলাদলিতে হারিয়ে যাবে—এখন সেটাই দেখার।








