প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান
Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।
দুর্গাপুজো মানেই আলোর রোশনাই, ঢাকের বাদ্যি, নতুন জামার গন্ধ আর মানুষের সাগরে ভেসে যাওয়ার উন্মাদনা। বাঙালির সেই মহোৎসবে উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপ চত্বর সপ্তমীর সন্ধ্যায় হঠাৎই এক ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না, আর তার উপর হঠাৎ নামা প্রবল বৃষ্টি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মুহূর্তে আনন্দ বদলে যায় কান্না, আতঙ্ক আর স্বজন হারানোর হাহাকারে। উৎসবের এই মহা আয়োজনে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।
কোন্নগরের এক অসহায় বাবা ও দাদু
কলকাতার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চত্বরে তখন কান্নার রোল। ঠিক তার বাইরে দাঁড়িয়ে এক বাবা ও দাদু দিশাহারা। তিনি কোন্নগরের বাসিন্দা, সপ্তমীর আনন্দ উপভোগ করতে মেয়ে ও সাত বছরের নাতনিকে নিয়ে এসেছিলেন উত্তর কলকাতার চোরবাগান মণ্ডপে। কিন্তু সেই আনন্দ যে এমন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।
পিটিআই-কে (PTI) দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, “আমরা ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টা লাইন দিয়ে ভিতরে ঢুকেছিলাম। ঢোকার জায়গাটা খুব সরু ছিল। বাইরে বেরোনোর সময় হঠাৎ বৃষ্টি নামায় লোকজন আর বেরোতে চাইছিল না। বেরোনোর রাস্তাটাও অত্যন্ত সরু ছিল এবং পুরো জায়গাটা ছিল অন্ধকার—এক ফোঁটাও আলো ছিল না।”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Durga Puja stampede: যে শিশুটি বাবার হাত ধরে মণ্ডপ দেখতে চেয়েছিল, কিংবা যে তরুণ উৎসবের দিনেও শুধু মায়ের হাসিমুখ দেখতে ভিড়ে সামিল হয়েছিল—মুহূর্তের হুড়োহুড়িতে তাদের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে কীভাবে বিপর্যয় নেমে এল, তা বর্ণনা করেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমার সাত বছরের নাতনি ছিল, আমার মেয়ে ছিল। ভিড়ের চাপে আমিও পড়ে গিয়েছিলাম, আর ওরাও পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ওদের উপর আরও অনেকে এসে পড়েন। আমি কোনোমতে নিজেকে সামলে উঠে নাতনিকে খুঁজতে শুরু করি, কারণ ও তো সাত বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে! কিন্তু তখন না দেখতে পাচ্ছিলাম মেয়েকে, না আমার নাতনিকে। আধ ঘণ্টা ধরে সেখানে কোনো পুলিশ বা কোনো রকম মাইক ঘোষণা কিচ্ছু ছিল না। পরে শুনলাম ওদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে, তাই এখানে ছুটে এসেছি। এখানকার স্থানীয় লোকজনই ওদের হাসপাতালে এনেছে, কোন গাড়িতে বা কীভাবে এনেছে আমি কিচ্ছু জানি না।”
ঠাকুর দেখতে গিয়ে সোনু পাল চোখের সামনে হারিয়ে ফেললেন মাকে
সোনু পাল সপ্তমীর সন্ধ্যায় মায়ের হাত ধরে আনন্দ করে পুজো দেখতে বেরিয়েছিলেন। চোরবাগানেও যান প্রতিমাদর্শনে।
উত্তর কলকাতায় তখন হঠাৎই নামে প্রবল বৃষ্টি। সেই অঝোর বৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচাতে অসংখ্য দর্শনার্থী হুড়মুড়িয়ে আশ্রয় নেন মণ্ডপের ভিতরে। মুহূর্তের মধ্যে প্রবেশপথে মানুষের পাহাড়প্রমাণ চাপ তৈরি হয়। পিটিআই-কে (PTI) দেওয়া সাক্ষাৎকারে সোনু জানিয়েছেন, তিনি চোখের সামনে ভিড়ের চাপে তাঁর মায়ের মৃত্যু হতে দেখেছেন। তিনি জানান, বৃষ্টির কারণে মণ্ডপের ভিতরের লোকজন বাইরে যেতে চাইছিলেন না, অন্যদিকে বাইরে অপেক্ষারত মানুষেরাও ভিতরে ঢোকার জন্য ধাক্কাধাক্কি করছিলেন। এই চাপ ধীরে ধীরে অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং মানুষ একে অপরের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে শুরু করে। সোনু নিজেও ভিড়ের চাপে ছিটকে পড়ে যান মাটিতে। কোনোমতে নিজেকে বাঁচিয়ে যখন তিনি উঠে দাঁড়ান এবং মায়ের খোঁজ করেন, ততক্ষণে সব শেষ। চোখের সামনেই পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছেন তাঁর মা। সোনুর কথায়, সেদিন ওই ভিড়ের চোটে তিনিও হয়তো বেঁচে ফিরতে পারতেন না—এই গভীর আতঙ্ক তিনি কখনও ভুলতে পারবেন না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে গিয়ে ভিড় সামলানোর অব্যবস্থা দেখে আগেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণার মনে। হাওড়ার বেলুড়ের বাসিন্দা, ৩০ বছর বয়সি সম্পূর্ণার কথায়, চোরবাগানে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।
প্রত্যক্ষদর্শী বিনয় কুমারের বয়ান
এএনআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রত্যক্ষদর্শী বিনয় কুমার জানান, পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।
বিনয়ের বয়ান অনুযায়ী, উত্তর কলকাতার বৃষ্টিই বিপর্যয় ডেকে আনে। প্রচুর মানুষ তখন পুজো মণ্ডপ চত্বরে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু বৃষ্টির কারণে কেউ বাইরে ফাঁকা জায়গায় বের হতে চাইছিলেন না। সবাই মণ্ডপ বা ছাদের নিচে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করায় সেখানে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। পুলিশ প্রশাসন এবং উদ্যোক্তারা যে একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তা নয়—তারা সাধ্যমতো কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে তৈরি হওয়া সেই বাঁধভাঙা জনস্রোরের ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Chorbagan Durga Puja incident: এই ঘটনার পর থেকেই পুজো কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং এর পিছনের পট পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই চোরবাগান পুজো কমিটির রদবদল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা উত্তমের চোখে উদ্ধারকাজ ও অসহায় মানুষের আর্তনাদ
বিপদ ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই যাঁরা ত্রাতা হয়ে ছুটে এসেছিলেন, তাঁদেরই একজন স্থানীয় বাসিন্দা উত্তম। তিনি এএনআইকে দুর্ঘটনার ঠিক পরের মুহূর্তের সেই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন।
উত্তমের কথায়, "আমরা স্থানীয় বাসিন্দা। ঘটনাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা এখানে চলে আসি। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখানে সবরকম ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল এবং তাঁরা সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। স্থানীয় সিভিল ভলান্টিয়ারেরাও উপস্থিত ছিলেন। আমাদের স্থানীয় বিধায়কও এখানে আছেন এবং সমস্ত ব্যবস্থা করা ও হাসপাতালে তাঁদের চিকিৎসার বিষয়টি নিশ্চিত করার কাজে পুরোপুরি যুক্ত রয়েছেন। বৃষ্টি থেকে নিজেদের ও বাচ্চাদের বাঁচানোর জন্য লোকজন ভিতরে থাকতে চাওয়ায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।" কিন্তু এতকিছুর পরেও তাঁর আক্ষেপ, বৃষ্টি থেকে নিজেদের ও শিশুসন্তানদের বাঁচানোর তাগিদেই মানুষগুলি মণ্ডপের ভিতর আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, আর সেই বৃষ্টি থেকে বাঁচার আকূতিই শেষ পর্যন্ত প্রাণে কেড়ে নিল অনেকের।
পর্যাপ্ত পুলিশের অভাব লক্ষ্য করেছিলেন এলাকাবাসী সংঘমিত্রা ভৌমিক
চোরবাগান এলাকারই বাসিন্দা সংঘমিত্রা ভৌমিক সরাসরি আঙুল তুলেছেন অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে। তাঁর সোজা কথা, "এ বছর আমি পর্যাপ্ত পুলিশি উপস্থিতি দেখিনি। আর এর ফলেই এই অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে।" স্থানীয় বাসিন্দারা এও অভিযোগ করেছেন যে, আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের তরফ থেকে তেমন কোনো সাহায্য পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, প্রবেশ, প্রস্থান এবং ভিড় সরানোর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা ছিল না, যার ফলে দর্শনার্থীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আজ বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসবের নিরাপত্তা নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে। সোনুর মা, কিংবা প্রিয়া, প্রাঞ্জল, তানিয়া বা শ্রীপর্ণার মতো অন্তত ১৯টি প্রাণ তরতাজা প্রাণ, যাঁরা স্রেফ উৎসবের আনন্দ উপভোগ করছিলেন, তাঁরা আর ফিরে আসবেন না। উৎসব মানে লাখো মানুষের ঢল, কিন্তু সেই ঢল সামলানোর জন্য আমাদের পরিকাঠামো কতটা প্রস্তুত? প্রবেশ ও প্রস্থানের প্রশস্ত পথ, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বেরোনোর বিকল্প ব্যবস্থা, সঠিক মাইক প্রচার, পর্যাপ্ত পুলিশি পাহারা এবং অ্যাম্বুল্যান্স চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাস্তা—এই মৌলিক বিষয়গুলি আজও কতটা অবহেলিত, চোরবাগানের ঘটনা তারই এক প্রমাণ।






