জেন জি আন্দোলনের ঢেউ কোথায় কতটা আছড়ে পড়ল?
Cockroach Janata Party Protest: দিল্লির জন্তর মন্তর থেকে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র তরুণদের আন্দোলনে দেশ এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার পেল। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম এবং বেকারত্বের প্রতিবাদে রাস্তায় নামে ভারতের জেন জি (Gen Z)। তাদের আন্দোলন কেবল ভারতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর কম্পন পৌঁছে গিয়েছিল গোটা বিশ্বে।
হাম দেখেঙ্গে...লাজিম হ্যায় কে হাম ভি দেখেঙ্গে!
"Hum dekhenge... Lazim hai ke hum bhi dekhenge!"
প্রখ্যাত কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের এই কালজয়ী পংক্তিটি আরও একবার সত্যি প্রমাণ করল দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্ম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-যুবদের তীব্র প্রতিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দেশের কাঁটাতারে আটকে থাকে না—তা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল।
দিল্লির জন্তর মন্তর থেকে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র তরুণদের আন্দোলনে দেশ এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার পেল। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম এবং বেকারত্বের প্রতিবাদে রাস্তায় নামে ভারতের জেন জি (Gen Z)। তাদের আন্দোলন কেবল ভারতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর কম্পন পৌঁছে গিয়েছিল গোটা বিশ্বে।
আজ সেই লড়াই সাফল্যের মুখ দেখেছে। ছাত্রদের মূল দাবি মেনে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইতিম্যধ্যেই পদত্যাগ করেছেন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও শিক্ষার অধিকার সংক্রান্ত আন্দোলনকারীদের বাকি সমস্ত দাবিও সরকার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে এই আন্দোলন কিন্তু ভারতের মধ্যেই আটকে থাকেনি। এর আঁচ পড়ে বিশ্বজুড়ে।
দক্ষিণ এশিয়ার চোখে ভারতীয় জেন জি
শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক ‘অরাগালয়া’ আন্দোলন কিংবা নেপাল ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র অভ্যুত্থানের পর অনেকে মনে করেছিলেন, হয়তো ভারতের তরুণ সমাজ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই শান্ত। কিন্তু সেই ভুল ধারণা ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। প্রধান বিচারপতির একটি উক্তিকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল মাধ্যমে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ যখন রাস্তায় নামল, তখন স্তম্ভিত হয়ে যায় গোটা দক্ষিণ এশিয়া।
সবচেয়ে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া এসেছে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান থেকে। সেখানকার ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক ব্যবহারকারীরা এই আন্দোলন দেখে কেবল মুগ্ধ হননি, বরং নিজেদের ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। এক পাকিস্তানি তরুণী রিল বানিয়ে বলেই ফেললেন,
“কহিন পেয়ার না হো জায়ে... ইন্ডিয়ার জেন জি-র কাছে একটা অনুরোধ, আর না! তোমরা এত ভালো কাজ করলে আমরা তো আর ঘৃণা করতে পারব না!”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Cockroach movement spread: কীভাবে একটি আদালতের অপমান, এক তরুণ জনসংযোগবিদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং দুই সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের মৈত্রী ভারতের সবচেয়ে আলোচিত ব্যাঙ্গাত্মক আন্দোলনের জন্ম দিল?
কারও মতে—
“তোমাদের দেশের আন্দোলনকারীদের পুলিশ মারে, আর আমাদের আন্দোলনকারীদের গুম করে দেওয়া হয়।”
সীমান্তের ওপার থেকে আসা এই বার্তা প্রমাণ করেছে, শাসক যাই বলুক না কেন, দুই দেশের তরুণদের সাধারণ যন্ত্রণা একই।
অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কার অরাগালয়া আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীরা ভারতীয় ছাত্রদের সমর্থনে খোলা চিঠি লিখেছেন। নেপাল থেকেও এসেছে সংহতি এবং আন্দোলনের পরবর্তী পথচলার প্রয়োজনীয় পরামর্শ। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মূল ধারার গণমাধ্যমে প্রতিদিন স্থান পেয়েছে দিল্লির জন্তর মন্তরের খবর।
ইউরোপ জুড়ে প্রবাসীদের রাজপথে নামা
ভারতের রাজপথে যখন ছাত্ররা জল কামান ও লাঠিচার্জের মুখোমুখি হচ্ছিল, তখন ইউরোপে বসবাসকারী ভারতীয় প্রবাসী ও ছাত্ররা ঘরে বসে থাকেনি।
সবচেয়ে বড় আন্দোলন দেখা গিয়েছে লন্ডনে। 'স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া - ইউকে' (SFI-UK)-র ডাকে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ার ও ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে হাজার হাজার প্রবাসী ভারতীয় শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছিলেন। তাঁরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্লোগান তোলেন—“Main Bhi Cockroach”। শুধু লন্ডন নয়, ম্যানচেস্টার, এডিনবরা ও গ্লাসগোতেও এই সংহতি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
India Gen Z Protest Memes: মিম, রিল, পপ কালচার আর ভাইরাল হাস্যরস কীভাবে ভারতের Gen Z-র প্রতিবাদের নতুন ভাষা হয়ে উঠল? জন্তর মন্তরের আন্দোলনে কেন স্লোগানের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডই হয়ে উঠল রাজনৈতিক বার্তার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার?
বার্লিনের ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের সামনে ও ভারতীয় দূতাবাসের কাছে ভারতীয় প্রবাসীরা একত্রিত হন। তারা ৩ ইডিয়টস চলচ্চিত্রের বিখ্যাত গান—“সাড়ি উমর হাম মর মর কে জি লিয়ে” গেয়ে প্রতিবাদ জানান এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তোলেন।
কোলোন ক্যাথেড্রালের সামনেও প্রবাসীরা একত্রিত হন। তারা বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড নিয়ে আসেন। তারাও যে ভারতের যুব সমাজের পাশে আছেন, সেই বার্তাই দেন।
জার্মানিতে প্রবাসী বাঙালি স্নেহা পান ও বোধিসত্ব রায়
ডাবলিনে ভারতীয় দূতাবাসের সামনে এবং নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ও দ্য হেগ-এ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) কাছাকাছি প্রবাসীরা জড়ো হয়ে ভারতের প্রতিবাদী ছাত্রদের পক্ষে বার্তা দেন।
ইউরোপের পাশাপাশি আটলান্টিকের ওপারেও ছড়িয়ে পড়েছিল আন্দোলনের আগুন।
নিউ ইয়র্কের ইউনিয়ন স্কোয়ারে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির পাদদেশে শত শত প্রবাসী ভারতীয় ও 'হিন্দুজ ফর হিউম্যান রাইটস' (HfHR)-এর সদস্যরা সংহতি সমাবেশ করেন। সান জোসে ও লস অ্যাঞ্জেলেসেও ভারতীয়দের এই দাবি তুলতে দেখা যায়।
টরন্টোর বিখ্যাত ইটন সেন্টার এবং ভ্যাঙ্কুভারে প্রবাসীরা জড়ো হন। ভ্যাঙ্কুভার থেকে আসা বার্তা ছিল স্পষ্ট—“আমরা দূর থেকে তোমাদের দেখছি। তোমরা দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার যে লড়াই করছ, তাতে তোমরা একা নও।”
সিডনির টাউন হল ও প্যারামাটা স্কোয়ার, মেলবোর্নের ফেডারেশন স্কোয়ার এবং ব্রিসবেনে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ সমাবেশ করে। এমনকী, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এক তরুণ তো আন্দোলনের বার্তা সরাসরি পৌঁছে দিতে নিজের ১ লাখ টাকা খরচ করে দিল্লির জন্তর মন্তরে এসে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন!
যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ার একটি সাধারণ ক্ষোভ থেকে, তা যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারতের শাসনব্যবস্থাকে এভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে, তা হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেননি।
বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা এই গণদাবি এবং দেশের অভ্যন্তরে ছাত্র-যুবদের অনমনীয় মনোভাবের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় প্রশাসন। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি পূরণ করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। একই সঙ্গে, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং অন্যান্য শর্তাবলীও সরকার মেনে নিয়েছে।
‘রং দে বাসন্তী’ ছবির সেই বিখ্যাত সংলাপটি যেন আজ আবার সত্যি হয়ে উঠল—
"কোই ভি দেশ পারফেক্ট নেহি হোতা, উসে পারফেক্ট বানানা পড়তা হ্যায়..."






