১০ মিনিটের প্রতিশ্রুতি বাতিল: গিগ কর্মীদের সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট?
Gig worker: ডেলিভারি কর্মীদের সঙ্গে কথা বললে এবং তাদের আন্দোলনের ধরন পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, অ্যাপগুলো কর্মীদের উপর যে চরম মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে, তা কেবল একটি নিয়ম বদলে দূর হওয়ার নয়।
অনলাইন ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো সম্প্রতি তাদের বহুচর্চিত '১০ মিনিটের ডেলিভারি'র প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু 'গিগ ইকোনমি' বা অ্যাপ-ভিত্তিক অর্থনীতির গভীরে যে সমস্যাগুলোর শিকড় বাসা বেঁধে আছে, তার সমাধান কি এতেই সম্ভব?
ডেলিভারি কর্মীদের সঙ্গে কথা বললে এবং তাদের আন্দোলনের ধরন পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, অ্যাপগুলো কর্মীদের উপর যে চরম মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে, তা কেবল একটি নিয়ম বদলে দূর হওয়ার নয়।
ডেলিভারি অ্যাপগুলো তাদের কর্মীদের কাছে সবচেয়ে বড় যে স্বপ্নটি বিক্রি করে, তা হলো 'কাজের স্বাধীনতা' বা ফ্লেক্সিবিলিটি। বলা হয়, আপনি যখন খুশি লগ-ইন করবেন, যখন খুশি কাজ করবেন, যখন খুশি কাজ থেকে ছুটি নেবেন। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে এই স্বাধীনতা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। একজন কর্মীর আয় তার পছন্দের উপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে অ্যাপের অ্যালগরিদম, টার্গেট এবং ইনসেনটিভের উপর। পিক-আওয়ারে (যখন অর্ডারের চাপ বেশি) লগ-ইন না করলে বা একটি অর্ডার মিস করলে তাদের সারা দিনের উপার্জনের অঙ্ক ওলটপালট হয়ে যায়। ফলে তারা বাধ্য হন অ্যাপের বেঁধে দেওয়া সময়েই কাজ করতে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Social Security to Gig Workers: এমন বিল সম্ভবত বিশ্বে প্রথম। এর আগে পৃথিবীর কোনও দেশ, কোনও রাজ্য এমন বিল আনতে পেরেছে বলে মনে হয় না। এই বিল আনার পথে এগোনোর আগে বেশ কয়েকটি সমীক্ষা চালিয়েছে রাজস্থান সরকার।
ডেলিভারি পার্টনারদের মতে, 'ইনসেনটিভ' কোনো উপরি পাওনা বা বোনাস নয়। মূল বেতন বা বেসিক পে এতটাই কম যে, সংসার চালাতে গেলে ইনসেনটিভের লক্ষ্য পূরণ করা ছাড়া উপায় থাকে না। এই ইনসেনটিভ পাওয়ার জন্য, তাদের দিনে ১০-১১ ঘণ্টা একটানা কাজ করতে হয়। অ্যাপগুলো এমনভাবে সিস্টেম তৈরি করেছে যে, ভোরবেলা বা গভীর রাতে ইনসেনটিভ বেশি, আর দুপুরে কম। যদি কোনো কারণে ট্রাফিক জ্যাম, ভুল লোকেশন বা গ্রাহকের ফোন না ধরার কারণে একটি অর্ডারে দেরি হয়, তবে সারা দিনের হিসেব নিমেষেই বদলে যায়। অর্থাৎ, ইনসেনটিভের পদ্ধতিটি এমনভাবে তৈরি, যেখানে ভুলের কোনো জায়গা নেই।
অ্যাপ কোম্পানিগুলো কাজকে একটি 'ভিডিও গেম'-এর মতো সাজিয়েছে। এখানে কর্মীদের 'নিঞ্জা' বা 'সুপারহিরো'র তকমা দেওয়া হয়। কিন্তু পর্দার আড়ালে চলে রেটিং, পয়েন্ট এবং র্যাঙ্কিংয়ের খেলা। অ্যাপগুলো চিৎকার করে বকা দেয় না, কিন্তু সব মনে রাখে। দেরি হলে বা ভুল হলে অ্যালগরিদম চুপিসারে তাদের রেটিং কমিয়ে দেয়, ভবিষ্যতে কাজ কমিয়ে দেয় বা অর্ডার অ্যাসাইন করা বন্ধ করে দেয়।
১০ মিনিটের ডেলিভারি বন্ধ হলেও, 'মাল্টি-অর্ডার' (এক ট্রিপে একাধিক অর্ডার) ডেলিভারির চাপ কমেনি। এবং সেই ডেলিভারিগুলিতে যে পরিমাণে মানসিক চাপ বহন করতে হয়, সেই মানে পারিশ্রমিক জোটে না। কোম্পানিগুলো প্রায়ই দাবি করে যে তারা 'অপ্টিমাইজেশন' বা প্রযুক্তির উন্নয়ন করছে। কিন্তু বাস্তবে তারা খরচ চাপাচ্ছে কর্মীদের ঘাড়ে। রেস্তোরাঁয় খাবারের জন্য অপেক্ষা করা, অর্ডার প্যাক হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা, বা ডেলিভারি শেষে খালি হাতে হাবে ফিরে আসা—এই সময়গুলোর জন্য কর্মীরা কোনো টাকা পান না। বাইকের তেল খরচ, মেরামতি, এবং ফোনের ইন্টারনেট বিল—সবই কর্মীকে বহন করতে হয়। ডেলিভারির সময় হওয়া দুর্ঘটনা বা অসুস্থতাকেও কোম্পানির দায় হিসেবে দেখে না বরং কর্মীর ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gig workers during Kolkata Durgapujo: কোম্পানি বলেছে, কম কথায় সারতে, বচসায় না জড়াতে। রিপোর্ট করলে কাজ যাবে। তাই পঞ্চমীর সন্ধ্যায় চুপ করে নেমে আসেন ডেলিভারি কর্মীটি।
কোম্পানিগুলো প্রায়ই বলে, গিগ ওয়ার্ক হলো 'পকেট মানি' বা সাময়িক আয়ের উৎস। কিন্তু সমীক্ষায় দেখা গেছে, অধিকাংশ কর্মীর কাছে এটিই আয়ের প্রধান উৎস। তারা এর উপর ভিত্তি করেই সংসার চালান, ভাড়া দেন এবং ঋণ শোধ করেন। অথচ 'পার্টনার' তকমা দিয়ে তাদের শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তাদের কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF) নেই, চিকিৎসার সঠিক বিমা নেই, এমনকি কোনো কারণ ছাড়াই যখন-তখন আইডি ব্লক করে দেওয়া হয়। তাদের অভিযোগ জানানোর কোনো স্বচ্ছ জায়গাও নেই।
এছাড়া ১০ মিনিটে ডেলিভারির চাপ তো ছিলই আগে। সময়ের মধ্যে ডেলিভারি দিতে না পারলে, ডেলিভারি বয় সমস্যায় পড়বে। যেকোনো অবস্থাতেই তাদের সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে হবে। গিগ ওয়ার্কারদের ১০ মিনিটের ডেলিভারির চাপে পথ দুর্ঘটনা ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অ্যাপ যাতে সকলের চোখে পড়ে এবং পণ্য বিক্রির হয় বেশি তাই বিভিন্ন ব্র্যান্ড এই বাণিজ্যিক এক কৌশল অবলম্বন করে।
আমরা কলকাতায় বিভিন্ন উদাহরণ পেয়েছি পথ দুর্ঘটনায় ডেলিভারি বয়ের মৃত্যুর। সময়ে পৌঁছনোর চাপে, অসাবধানে নিয়ন্ত্রনহীন গাড়ি চালানোর কারণে এইসব দুর্ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। বেঙ্গালুরু ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুসারে ট্রাফিক লঙ্ঘনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডেলিভারি কর্মীদের বিরুদ্ধে আইন ভাঙার মামলা ২০২৩ সালে ৩০,৯৬৮ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ৫২,১৫৩-এ পৌঁছেছে, অর্থাৎ ৬৮% বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসেই এই সংখ্যা ৬৩,৭১৮-এ পৌঁছেছে, যা গত বছরের তুলনায় আরও বেশি। এই আইন ভাঙার মধ্যে রয়েছে সিগন্যাল অমান্য করা, ফুটপাতে চগাড়ি চালানো, অতিরিক্ত গতি ইত্যাদি। গত তিন বছরে বেঙ্গালুরুতে ডেলিভারি কর্মীদের কমপক্ষে ২৭টি দুর্ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যার বেশিরভাগই দ্রুত ডেলিভারির চাপের কারণে ঘটেছে। হায়দরাবাদে ২০২৬-এর জানুয়ারিতে এক জেপটো ডেলিভারি বয়ের মৃত্যু এই সমস্যার আরেক উদাহরণ। গিগ কর্মীরা রাতের বেলা ডেলিভারি করতে গিয়ে চুরি, হামলারও সম্মুখীন হয়েছেন।
২০২৬-এ কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ১০ মিনিটের প্রতিশ্রুতি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্মীরা ধর্মঘট করে সময়সীমা শিথিল করার দাবি তুলেছেন। কর্ণাটকের গিগ ওয়ার্কার্স অ্যাক্ট ২০২৫ নিরাপত্তা প্রোটোকল চালু করেছে, কিন্তু বাস্তবায়ন অসম্পূর্ণ। ১০ মিনিটের ডেলিভারি বন্ধ হওয়া কেবল প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু যতদিন না গিগ কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট আইন, স্বচ্ছ বেতন কাঠামো, এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততদিন এই 'আধুনিক দাসত্ব' চলতেই থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর যেমন নিয়মকানুন প্রয়োজন, তেমনি লেবার প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্যও কঠোর নিয়ন্ত্রণ দরকার। ডেলিভারি কর্মীরা দয়া বা চ্যারিটি চান না; তারা চান তাদের শ্রমের মর্যাদা। তারা চান, অ্যাপের অ্যালগরিদম যেন তাদের মানুষ হিসেবে দেখে, কেবল একটি 'ডেটা পয়েন্ট' বা রোবট হিসেবে নয়। গতি বা সুবিধার নামে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা বিসর্জন দেওয়া কখনোই উন্নয়নের লক্ষণ হতে পারে না।






