গৃহবন্দি, চিকিৎসাও পাচ্ছেন না! সু চি-র দিন যে ভাবে কাটছে
Aung San Suu Kyi, Myanmar: প্রচণ্ড দাঁতে ব্যথা নিয়ে শয্যাশায়ী তিনি। মাড়ি ফুলেছে, যার জেরে ভালো করে খেতে পাচ্ছেন না। তার সঙ্গে বমি ভাব, মাথাও ঘুরছে। সব মিলিয়ে প্রচণ্ড রকম শারীরিক অসুবিধার মধ্যে রয়েছে সু চি।

এককালে তিনি ছিলেন মায়ানমারের সর্বময় নেত্রী। শান্তির জন্য পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারও। আবার তার রাজত্বেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর ভয়ঙ্করতম অত্যাচারের নজির দেখেছে বিশ্ব। এমনই এক অদ্ভুত বৈপিরিত্যের নাম অং সান সু চি। ইতিহাস জানে উত্থানের ওপিঠে পতন অনিবার্য। ঠিক সেভাবেই একদিন খসে পড়ে সু চি-র সাম্রাজ্য। ২০২১ সালে মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর আপাতত গৃহবন্দি সু চি। এককালের দাপুটে নেত্রী, যার এক কথায় দিন থেকে রাত হত মায়ানমারে, সেই সু চি শারীরিক ভাবে অসুস্থ। দাঁতে ব্যথায় কাতর। প্রয়োজন জরুরি চিকিৎসার। অথচ জুন্টা সরকার নাকি ৭৮ বছরের নেত্রীর জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকুও করছে না। বরং বাধার পাথার দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে তাঁর চিকিৎসার পথে। এমনই অভিযোগ করেছেন সু চি-র ছেলে কিম অ্যারিস।
মায়ানমারে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের উপর দিনের পর দিন নিগ্রহ হয়েছে রাজ্যে। চলছে গণহত্যা। একটা সময় অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করেন রোহিঙ্গা মুসলমানরা। প্রতিবেশী দেশগুলির সীমান্তে বাড়তে থাকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভিড়। শুরু হয় ঠেলাঠেলি। উচ্ছিষ্টের মতো এ পাত থেকে ও পাতে চালান হতে থাকে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা। অথচ বিশ্ব আদালতে রোহিঙ্গা সমস্যার দায় কাঁধ থেকে ঝেরে ফেলেন মায়ানমারের সর্বময় নেত্রী। অবশেষে দেশে সেনা অভ্যুত্থান হয় মায়ানমারে। ধ্বসে পড়ে সু চি-র সাম্রাজ্য। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই গৃহবন্দি তিনি। তাঁর ঘাড়ে রয়েছে অনেকগুলি মামলার খাঁড়া। যার মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন ভঙ্গ ও হিংসায় উস্কানি দেওয়ার মতো অভিযোগ। মোটামুটি সেই সব মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে কম করে হলেও একশো বছরের কারাবাস বাঁধা সু চির।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Fire at Rohingya Camp Bangladesh : কীভাবে তাঁরা বাঁচবেন, কীভাবে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজবেন, সেটা নিয়েই চিন্তায় রোহিঙ্গারা।
তবে দূরের কথা দূরে। আপাতত জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত সু চি। প্রচণ্ড দাঁতে ব্যথা নিয়ে শয্যাশায়ী তিনি। মাড়ি ফুলেছে, যার জেরে ভালো করে খেতে পাচ্ছেন না সু চি। তার সঙ্গে বমি ভাব, মাথাও ঘুরছে। সব মিলিয়ে প্রচণ্ড রকম শারীরিক অসুবিধার মধ্যে রয়েছে সু চি। আর সেই অসুস্থতাকে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না সে দেশে ক্ষমতায় থাকা জুন্টা সরকার। তাঁর চিকিৎসার জন্য কোনও ব্যবস্থাই করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ তুলেছে সু চির পরিবার।
যদিও জুন্টা সরকারের তরফে এক সামরিক প্রতিনিধি দাবি করেছেন, সু চি-র পরিবারের সমস্ত দাবিই মিথ্যা। ইতিমধ্যেই সু চি-কে দেখেছেন সামরিক ডাক্তার। তার বাইরেও এক চিকিৎসককে দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়েছে প্রাক্তন নেত্রীকে। তিনি ভালো আছেন, সুস্থ আছেন বলেই দাবি করেছেন ওই প্রতিনিধি। নিয়মিত চিকিৎসা চলছে তাঁর। যদিও সু চির পরিবারের দাবি, দু'দিন আগেই বাইরের চিকিৎসককে দিয়ে শারীরিক পরীক্ষার দাবিকে নাকচ করে দিয়েছিল জুন্টা সরকার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Rohingya Refugee issue Bangladesh Myanmar : নেই আনন্দ উদযাপনের সুযোগ। ‘আনন্দ’ – এই শব্দটাই হারিয়ে গিয়েছে রোহিঙ্গাদের জীবন থেকে।

২০২১ সালে দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের পরের দিনই গ্রেফতার করা হয় অং সান সু চি-কে। মায়ানমারের রাজধানী নেপিডো থেকে স্থানান্তরিত করা হয় সু চি-কে। তিনি গৃহবন্দি, তবে কোথায় আছেন, তা সেনা ব্যতিত কেউ জানে না। সু চি-র ছেলে, বছর ছেচল্লিশের অ্যারিস আপাতত ব্রিটেনে রয়েছেন। সেখান থেকেই বারবার মায়ের মুক্তির দাবি তুলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, একজন বন্দির শারীরিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়ার দায়িত্ব সরকারেরই। নিজের কর্তব্য পালন করছে না জুন্টা সরকার।
এর আগেও বারবার আদালতে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সু চি। তাঁর ছেলে অ্যারিসও দাবি করেছেন, অন্যায় ভাবে তাঁর মাকে বন্দি বানিয়েছে জুন্টা সরকার। সেনাবাহিনী রাজনীতির খেলা খেলছে তাঁর মা-কে নিয়ে। অবহেলা করছে তাঁর চিকিৎসা নিয়েও। এখনও সু চি-র স্বাস্থ্য নিয়ে পদক্ষেপ না-করলে অবস্থার অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অ্যারিস।
নোবেলজয়ী সু চি যদি ইঁট হন, তাহলে পাথর জুন্টা সরকার। মায়ানমারে গণ অভ্যুত্থান ঘটল বটে, তবে অন্ধকার কাটল না পুরোপুরি। সু চি-র বহু সিদ্ধান্তই স্বৈরাচারী ছিল, রোহিঙ্গাদের প্রতি তাঁর আমলে যে নির্যাতন, অত্যাচার হয়েছে, তা সমগ্র বিশ্বের কাছে লজ্জার। জুন্টা সরকার যেন তারই উল্টোপিঠ। সম্প্রতি জুন্টা সরকারের বিরোধিতা করে একটি জনসভা ও অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল কাচিন প্রদেশে। সেখানে আকাশপথে হামলা চালায় জুন্টা সেনা। সেই হামলায় আদিবাসী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর লোক তো মারা গিয়েইছে। তার সঙ্গে মারা গিয়েছে শিল্পী, শ্রোতা-দর্শকও। ঘটনায় শিশু ও মহিলা-সহ মোট ৮০ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। যেভাবে বিদ্রোহ দমন করতে আকাশ থেকে মুহুর্মুহু বোমা ফেলা হয়েছে অনুষ্ঠানস্থলে, তা নজিরবিহীন বলেই মনে করেছে মানবাধিকার দলগুলি। ফলে এই সরকার যে সু চি-র চিকিৎসায় কতটা গুরুত্ব দেবে তা নিয়ে সন্দিহান শুধু তাঁর পরিবার নয়, দেশের মানুষও। সু চি-কে সরিয়েও মায়ানমার সুরক্ষিত হাতে নেই, তা এই কদিনেই বেশ ঠাওর করতে পারছে মায়ানমারবাসী।






