ইরান সংকট: এক দশক পর ট্রাম্পের চিন সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
Trump Xi Jinping meeting: ইরান যুদ্ধ, তাইওয়ান, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বিশ্ব অর্থনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে বেজিংয়ে মুখোমুখি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং। এই বৈঠক কি ইরান সংকট কমাতে পারবে? নাকি যুক্তরাষ্ট্র-চিন সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করবে? বিশ্বের রাজনীতিতে কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে এই শীর্ষ বৈঠক?
বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন বেজিং। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে প্রবল আগ্রহ। এই বৈঠক হবে ১৪-১৫ মে। এমন এক সময়ে এই বৈঠক হচ্ছে, যখন পশ্চিম এশিয়ায় ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বেজিংয়ে ট্রাম্পের এই সফরকে অনেকেই তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফর বলে মনে করছেন। কারণ এই বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে রয়েছে একসঙ্গে বহু জটিল বিষয়—ইরান যুদ্ধ, মার্কিন-চিন বাণিজ্য সম্পর্ক, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিরল খনিজ এবং প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিন সফর ৩১ মার্চ-২ এপ্রিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সংঘাতের জেরে সেই সফর পিছিয়ে যায়। ট্রাম্প মনে করেছিলেন, দ্রুত সামরিক সাফল্য অর্জন করে শক্তিশালী অবস্থানে বেজিংয়ে পৌঁছবেন। বাস্তবে তা হয়নি। ব্যাপক হামলা ও কড়া হুঁশিয়ারির পরেও ইরান নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বরং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের উপর চাপ বাড়িয়েছে। ট্রাম্প এখন কূটনৈতিকভাবে চাপে। হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে ইরান জানিয়েছে, আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
বলে রাখা ভালো, চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই কখনও টানাপোড়েনের, কখনও সহযোগিতার। গত ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি ঘোষণা করে, যা নিয়ে চিন তীব্র আপত্তি জানায়। অন্যদিকে, ট্রাম্প নিজে তাইওয়ানকে রক্ষার বিষয়ে খুব জোরালো অবস্থান নেননি। বরং গত বছর তিনি তাইওয়ানের পণ্যের উপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। পাশাপাশি অভিযোগ করেন, তাইওয়ান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সুবিধা নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে, ওয়াশিংটন ও বেজিং উভয়েই বুঝছে, পরস্পরের সঙ্গে কথা বলা ছাড়া উপায় নেই।
এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ইরান সংকট নিয়ে চিনের সহযোগিতা চাওয়া। চিন ইরানের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক অংশীদার এবং তেহরানের উপর তার যথেষ্ট কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের আশা, বেজিং চাইলে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে চিন মধ্যস্থতা করাতে পারে।
তবে চিন ভালো করেই জানে, ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের বড় শক্তি। তাই বেজিং বিনা শর্তে ওয়াশিংটনের অনুরোধ মেনে নেবে, এমন সম্ভাবনা কম। সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির বেইজিং সফর দেখিয়েছে, তেহরানের উপর চিনের প্রভাব এখনও যথেষ্ট। মার্কন যুক্তরাষ্ট্রও বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে।বিশ্লেষকদের মতে, যদি চিন ইরান প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তবে তার বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাণিজ্য শুল্ক কমানো, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞায় শিথিলতা বা সেমিকন্ডাক্টর রফতানির উপর কিছু ছাড় চাইতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Strait of Hormuz crisis: পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের খবরে আমরা তেলের দাম দেখি, মিসাইলের সংখ্যা দেখি। কিন্তু সেই যুদ্ধে আটকে পড়া ২০ হাজার নাবিকের কথা কতটা জানি?
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সঙ্গে এই সফরে রয়েছেন একাধিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা। তাঁদের মধ্যে আছেন এলন মাস্ক এবং জেনসেন হুয়াং। এই উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন চিনের বাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলির প্রবেশাধিকারের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
চিনের পক্ষেও এই বৈঠকের গুরুত্ব কম নয়। চিনের অর্থনীতি এখনও ধীর গতিতে এগোচ্ছে। এই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা বেজিংয়ের স্বার্থে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানেন, যদি দু'দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়, তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে এবং অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আলোচনার টেবিলে বহু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। তাইওয়ান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মতভেদ বহুদিনের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে অস্ত্র ও নিরাপত্তা সহায়তা দিয়ে থাকে, আর চিন মনে করে তাইওয়ান তাদের দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইভাবে উন্নত চিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিরল খনিজ এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিয়েও দু'দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে।
ট্রাম্পের বলে থাকেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিনের সাহায্য 'অবশ্যক' নয়। তবে এখন তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, ইরান সংকট মোকাবিলায় বেজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এই ধরনের বক্তব্যকে অনেকেই কূটনৈতিক দরকষাকষির অংশ হিসেবে দেখছেন।
বেজিংয়ে সফর ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মার্কিন-চিন সম্পর্কের ওঠানামা চিনের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিশ্ব অর্থনীতির দিক থেকেও এই বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি। তাদের সম্পর্কের সামান্য পরিবর্তনও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তেলের দাম, শেয়ারবাজার, প্রযুক্তি খাত, উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল—সব ক্ষেত্রেই এই বৈঠকের ফলাফল প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো চুক্তি নাও হতে পারে। কিন্তু যদি দু'পক্ষ অন্তত যোগাযোগের পথও খোলা রাখে, তবেই তা বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইরান যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক দেশ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চিন যদি মধ্যস্থতায় ভূমিকা নেয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কিছু কৌশলগত ছাড় দেয়, তবে পরিস্থিতি শান্ত হলেও হতে পারে।
ট্রাম্প বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন যে তাঁর সঙ্গে শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো। বেজিং সফরের আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন,
“I have a very good relationship with President Xi.”
অতীতেও দুই নেতা ব্যক্তিগত কূটনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। যদিও শুধু ভালো ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। এই বৈঠক বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনাগুলির একটি। এই বৈঠকে হয়তো সব সমস্যার সমাধান হবে না, কিন্তু যদি ইরান সংকট প্রশমনে কিছু অগ্রগতি হয়, বাণিজ্য উত্তেজনা কিছুটা কমে এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ সুগম হয়, তবে সেটাই হবে বড় সাফল্য।







