ড্রাগন কি শুধুই কল্পনা? বিজ্ঞানীদের যে দাবি ভেঙে দিচ্ছে সমস্ত ধ্যানধারণা...

Myths of Dragon: যে সময় এই পৌরাণিক কাহিনি বা মিথ তৈরি হচ্ছে সেই সময়ে কিন্তু সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগও ছিল না তেমন!

inscript
৩ মিনিট
ড্রাগন কি শুধুই কল্পনা? বিজ্ঞানীদের যে দাবি ভেঙে দিচ্ছে সমস্ত ধ্যানধারণা...

বিশ্বের যে কোনও প্রান্তেই এমন কিছু গল্পকথা শোনা যায় যা শিকড়ে খানিক একই। গল্পের চরিত্র পালটায়, ভূগোল পালটায়, কিন্তু কোথাও ঠিক একটা সুতো যেন লেগে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার পৌরাণিক, লোককাহিনিতে তাই দেখা যায়, অদ্ভুতভাবে মিল রয়েছে ড্রাগন নামের এক প্রাণীর। ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকা মহাদেশের প্রাচীন কিংবদন্তিগুলিতে লম্বা লেজ এবং হিংস্র চেহারার খানিক কুমির আকৃতির এক প্রাণীর চিত্র দেখা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সভ্যতায় এভাবে 'ড্রাগন' চরিত্রটিকে কল্পনা করেছে মানুষ? বাস্তবে তো কখনই ছিল না এই প্রাণীটি! নাকি ছিল?

প্রথমত, সমস্ত ড্রাগন যে একই রকম, এমনটা অনুমান করা খুবই ভুল। মধ্যযুগের ইউরোপের ড্রাগনগুলি ছিল দৃঢ় দেহ, বাদুড়ের মতো ডানা এবং শিংওয়ালা, নিঃশ্বাস দিয়ে আগুন বেরনো টিকটিকি জাতীয় প্রাণী। তাদের সাধারণত অশুভ প্রাণী হিসাবেই দেখা হতো। লোককাহিনি অনুযায়ী, প্রায়ই একজন সাহসী নায়ক ড্রাগনকে হত্যা করে তার সম্পদের ভাণ্ডার ছিনিয়ে নেয় বা আতঙ্কিত শহরবাসীকে শান্তি দেয়, মুক্তি দেয়- এমনটাই দেখা যায়। এমনকী ইউরোপিয় ড্রাগনগুলির ছবির মধ্যেও এদের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পিরানহা নয়, বিশ্বের প্রাচীনতম হ্রদে সত্যিই বাস 'মানুষখেকো' মাছের?

Lake Baikal Cannibal Fish: মাছের স্বচ্ছ দেহ, আঁশ নেই একটিও, লম্বায় প্রায় ২১ সেন্টিমিটার বা ৮.৩ ইঞ্চির কাছাকাছি।

পূর্ব এশিয়ার সংস্কৃতিতে, ড্রাগনের ভূমিকা অবশ্য সামান্য ভিন্ন। এই ড্রাগনগুলি আরও রহস্যময়। এখানকার ড্রাগনগুলি শক্তি, ক্ষমতা এবং সৌভাগ্যের প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। চিনের সংস্কৃতির একটি সুপরিচিত ড্রাগন হলো তিয়ানলং বা মহাকাশীয় ড্রাগন যা মেঘের মধ্যে ভেসে যায় এবং স্বর্গকে রক্ষা করে।

মেসোআমেরিকান সংস্কৃতির একটি দেবতা রয়েছে যার নাম Quetzalcóatl, যার অর্থ 'পালকওয়ালা সাপ'। এই ড্রাগন-সদৃশ দেবতার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে মেসোআমেরিকানদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে। স্থানীয় বিশ্বাসে মানবজাতির সৃষ্টিতে এই ড্রাগনের ভূমিকা রয়েছে।

পার্থক্য রয়েছে ঠিকই, কিন্তু একটি বিষয় এড়িয়ে গেলে চলবে না। পৌরাণিক এই ড্রাগনদের মধ্যের সাদৃশ্যগুলি কিন্তু যথেষ্ট লক্ষণীয়। মনে রাখতে হবে, এই সংস্কৃতিগুলি সবই কিন্তু ভৌগলিকভাবে পৃথক, পৃথক জায়গার। যে সময় এই পৌরাণিক কাহিনি বা মিথ তৈরি হচ্ছে সেই সময়ে কিন্তু সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগও ছিল না তেমন! তাহলে বিশ্বজুড়ে নানা সংস্কৃতিতে 'ড্রাগন' বিষয়টি এল কেমন করে?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেওয়ালে, দরজায় সর্বত্র আঁকা পুরুষাঙ্গ! ভুটানের এই রহস্যময় রীতির আসল কারণ কী?

Bhutan Phallus Painting: ভুটানে গৃহপ্রবেশের সময়, পুরুষাঙ্গের চিহ্নগুলি ছাদের চারটি কোণে এবং একটি বাড়ির ভিতরে স্থাপন করা হয়।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ধ্রুপদী লোককাহিনিবিদ এবং প্রাচীন বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ অ্যাড্রিয়েন মেয়রের যুক্তি অনুযায়ী, প্রাচীন মানুষ বিলুপ্ত প্রাণীদের জীবাশ্মের ভুল ব্যাখ্যা করার পরেই এই জাতীয় পৌরাণিক প্রাণীদের জন্ম। বিশেষ করে, সেই সময় গ্রিফিনদের কল্পনা করা হয়। গ্রিফিন হচ্ছে এমন একটা প্রাণী যার মাথা আর ডানা ঈগলের মতো, দেহটা সিংহের মতো কিন্তু পা গুলো আবার ঈগলের মতো। টিরানোসরাস রেক্সের প্রাগৈতিহাসিক অবশেষ বা জীবাশ্ম আবিষ্কার হয়। তখন অত বড় প্রাণীটা যে আসলে কেমন দেখতে, কীভাবে এমন প্রাণী হওয়া সম্ভব এত বিশদে জানার অবকাশই বা কই! তাই সেই জীবাশ্মকে ভয়ঙ্কর ড্রাগন-সদৃশ জন্তু হিসেবে কল্পনা করে নেওয়া কিন্তু কঠিন নয়।

আরেকটি তত্ত্ব বলছে, ড্রাগন আসলে মানুষের মনের গভীরে থাকা একটি আর্কিটাইপ। অ্যান ইনস্টিনক্ট ফর ড্রাগনস বইতে সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ ডঃ ডেভিড ই জোনস যুক্তি দেন যে, ড্রাগন সম্পর্কে পৌরাণিক কাহিনিগুলি এত সাধারণ কারণ আমরা বিপজ্জনক শিকারি সম্পর্কে আমাদের মনে একটি ছবি কল্পনা করেছি, যে কল্পনা শতাব্দী ধরে বিবর্তিত হয়েছে।

জোনসের মতে, আমাদের প্রাথমিক পূর্বপুরুষরা বন্য প্রাণীদের সহজাতভাবে ভয় পেতে শিখেছে এমন অনেক মোটিফ রয়েছে। এই আদিম প্রবৃত্তির ফলে আমাদের কল্পনা একটি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রাণী তৈরি করে নিয়েছে আমাদের অবচেতনে যা কুমির, সাপ, শিকারি পাখি এবং বাঘ বা সিংহের সমস্ত হিংস্র বৈশিষ্ট্যগুলিকে একত্রিত করে তৈরি।

তবে পৌরাণিক এই চরিত্রের নেপথ্যের কারণ যাই হোক না কেন, ড্রাগন স্পষ্টতই বিবিধ সভ্যতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তারা হাজার হাজার বছর ধরে সংস্কৃতির শিকড়ে ড্রাগনদের গল্প এখনও সতেজ। অনেকের কাছেই এখনও মুগ্ধতার বিষয় ড্রাগন, কল্পকাহিনির সবচেয়ে জনপ্রিয় এক অংশ, তা সে হবিট এবং হ্যারি পটার সিরিজ হোক বা গেম অফ থ্রোনস, এমনকী পোকেমন।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।