দুর্গাপুজো ২০২৬: কতটা বদলে গেল বাঙালির শারদোৎসব?

Durga Puja 2026: দুর্গাপুজোর প্রতিমা, খাদ্যাভ্যাস, বইয়ের স্টল, কার্নিভাল ও বিসর্জন ঘিরে ২০২৬ সালে একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দুর্গাপুজোর ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সামাজিক অংশগ্রহণের পরিসর কতটা বদলাচ্ছে?

inscript
৭ মিনিট
দুর্গাপুজো ২০২৬: কতটা বদলে গেল বাঙালির শারদোৎসব?

দুর্গাপুজো বাংলার মানুষের কাছে শিল্প, সাহিত্য, খাবার, গান এবং সামাজিক মিলনমেলার উপলক্ষ। পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখা, নানা ধরনের শিল্পকর্ম উপভোগ করা, বইয়ের স্টলে দাঁড়িয়ে বই কেনা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া মিলিয়ে দুর্গাপুজো বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় এই পরিচয়ের পাশাপাশি সামনে এসেছে একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক। রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুজোর আয়োজন, প্রতিমার ধরন, খাবারের অভ্যাস, বইয়ের স্টল এবং বিসর্জনের মতো বিষয়কে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন উঠেছে।

এ বছরের বিতর্কগুলির মধ্যে রয়েছে রেড রোডে দুর্গাপুজোর কার্নিভাল বাতিল, পুজোর সময় মদ বিক্রি ও ডিজে বাজানোর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ, থিমের প্রতিমা তৈরির চাহিদা কমে যাওয়া এবং বামপন্থী সংগঠনগুলির বইয়ের স্টল ঘিরে সংঘাত। এর পাশাপাশি দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে ধর্মীয় প্রচারক বাগেশ্বর বাবার মন্তব্য এবং বিসর্জনের সময় কারা প্রতিমা স্পর্শ করতে পারবেন, তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। উত্তর কলকাতার চোরবাগানে পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনাও উৎসবের আয়োজন ও প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

এই ঘটনাগুলিকে একসঙ্গে দেখলে প্রশ্ন ওঠে, দুর্গাপুজোর ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সামাজিক অংশগ্রহণের পরিসর কতটা বদলাচ্ছে?

প্রতিমার ধরন নিয়ে বিতর্ক

কলকাতার দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ থিমের মণ্ডপ ও প্রতিমা। বহু বছর ধরে বিভিন্ন পুজো কমিটি সমসাময়িক সামাজিক সমস্যা, ইতিহাস, সাহিত্য এবং শিল্পের নানা ধারাকে মণ্ডপসজ্জায় তুলে ধরেছে। সেই কারণে দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মণ্ডপ হয়ে উঠেছে শিল্পীদের সৃজনশীলতা প্রকাশের জায়গাও।

২০২৬ সালে প্রতিমার ধরন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী পুজো উদ্যোক্তাদের এমন থিম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন, যা মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে বা সনাতন ঐতিহ্যকে খাটো করে দেখায়। তবে সরকার থিমের পুজো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেনি।

কলকাতার কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের একাংশের দাবি, এ বছর থিমের প্রতিমার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালে যেখানে প্রায় ১৫০টি থিমের প্রতিমা তৈরি হয়েছিল, এ বছর সেই সংখ্যা অনেকটাই কমেছে। শিল্পী ও পুজো উদ্যোক্তাদের একাংশের বক্তব্য, তাঁদের প্রচলিত ধরনের প্রতিমার দিকে ফিরে যেতে চাপ দেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতি শিল্পীদের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে সরকারের তরফে থিমের প্রতিমা নিষিদ্ধ করার কোনো সর্বাত্মক নির্দেশ ছিল না। ফলে চাহিদা কমে যাওয়াকে সরাসরি সরকারি নিষেধাজ্ঞার ফল বলে দাবি করার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার আশঙ্কা শিল্পীদের নতুন ধরনের কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না।

পুজোমণ্ডপেও জাতীয়তাবাদ

এ বছরের কয়েকটি বড় পুজোর থিমেও রাজনৈতিক আবহের ছাপ দেখা গিয়েছে। কলকাতার সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে এ বার ‘বন্দে মাতরম’কে কেন্দ্র করে মণ্ডপ তৈরি করা হয়। গানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পর্ককে তুলে ধরাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। এই পুজোর সঙ্গে বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষের যোগ রয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান

Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।

তবে পুজোমণ্ডপে জাতীয়তাবাদী বিষয় তুলে ধরলেই তাকে রাজনৈতিক চাপের ফল বলা যায় না। হিন্দু পুরাণ, ধর্মীয় কাহিনি এবং দেশের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চার অংশ। একইভাবে ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা তৈরি করাও শিল্পের স্বাধীনতার বিরোধী নয়।

বিতর্কের মূল জায়গাটি অন্যত্র। ধর্মীয় পরিচয় ও জাতীয়তাবাদের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে যখন রাজনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন তার বাইরে থাকা শিল্পী ও সাংস্কৃতিক প্রকাশের জায়গা কতটা অক্ষুণ্ণ থাকে, সেই প্রশ্ন ওঠে।

দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে বিতর্ক

দুর্গাপুজোর আগে বাংলার খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত করেন ধর্মীয় প্রচারক ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী, যিনি বাগেশ্বর বাবা নামে পরিচিত। ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর হাওড়ার লিলুয়ায় একটি হনুমন্ত কথা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন তিনি। ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই সময় তিনি শাস্ত্রীকে পশ্চিমবঙ্গে বাগেশ্বর ধামের একটি কেন্দ্র গড়ে তোলার আমন্ত্রণও জানান।

৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠানের শেষ দিনে শাস্ত্রী বাঙালি হিন্দুদের দুর্গাপুজোর সময় মাছ-মাংস না খাওয়ার আবেদন জানান। দুর্গাপ্রতিমার আশপাশে আমিষ খাবার বিক্রি না করার কথাও বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে এই আবেদন না মানা ব্যক্তিদের ‘পাখণ্ডী’ বা ভণ্ড বলে উল্লেখ করা হয়।

এই মন্তব্য ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বাংলার বহু মানুষের কাছে মাছ-মাংস সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। দুর্গাপুজোর সময়ও বহু পরিবারে আমিষ খাবার খাওয়ার রীতি রয়েছে। ফলে ধর্মীয় আচরণের একটি নির্দিষ্ট ধরনকে সবার জন্য প্রযোজ্য করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

৭ সেপ্টেম্বর বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, কেউ মানুষের খাবার বা পোশাক নির্ধারণ করে দিতে পারেন না। শাস্ত্রী নিজের মতামত জানিয়েছেন, কিন্তু সেই মত মেনে চলতে বাঙালিরা বাধ্য নন বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।

অন্যদিকে, ১০ সেপ্টেম্বর শুভেন্দু অধিকারী শাস্ত্রীর নিজের ধর্মীয় মত প্রকাশের অধিকারকে সমর্থন করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মানুষ সেই মত গ্রহণ করবেন কি না, তা তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। একই দিনে মুখ্যমন্ত্রী কালীঘাটের কালীমন্দিরে গিয়ে ভোগ হিসেবে দেওয়া মাছ ও পোলাও খান। ঘটনাটি রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বাগেশ্বর বাবা মাছ-মাংস না খাওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন, কিন্তু দুর্গাপুজোর সময় গোটা রাজ্যে আমিষ খাবার খাওয়ার উপর সরকার কোনো সাধারণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। তবু এই বিতর্ক দেখিয়েছে, ধর্মীয় ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা নিয়ে বাংলার সমাজ ও রাজনীতির মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে।

বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ঘিরে সংঘাত

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শারদোৎসবের উৎস কি শুধু ধর্মে, নাকি কৃষি ও সমাজের ইতিহাসেও?

Durga Puja history: শারদোৎসব ও দুর্গাপুজোর ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিসভ্যতা, মাতৃকা উপাসনা, তন্ত্র, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির আত্তীকরণ এবং মহিষাসুরের বিকল্প আখ্যান।

দুর্গাপুজোর সময় বিভিন্ন মণ্ডপের আশপাশে বইয়ের স্টল বসানো বাংলার দীর্ঘদিনের পরিচিত ছবি। সিপিআই(এম) এবং অন্যান্য বামপন্থী সংগঠন বহু বছর ধরে এই স্টলগুলিতে রাজনৈতিক বই, মতাদর্শের আলোচনা এবং অন্যান্য প্রকাশনা বিক্রি করে। উৎসবের ভিড়ের মধ্যেও এই স্টলগুলি রাজনৈতিক মত প্রকাশের একটি পরিসর তৈরি করে।

কিন্তু এ বছর বইয়ের স্টল ঘিরে বিতর্ক দেখা দেয়। শুভেন্দু অধিকারী পুজো কমিটিগুলিকে এমন বামপন্থী বইয়ের স্টল না বসতে দেওয়ার পরামর্শ দেন, যেখানে ‘দুর্গাপুজো’র পরিবর্তে ‘শারদোৎসব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘শারদোৎসব’ শব্দটি উৎসবের ধর্মীয় গুরুত্বকে কমিয়ে দেয়।

এর পর বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থী সংগঠনগুলি বইয়ের স্টলে হামলা, ভাঙচুর এবং স্টল সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ তোলে। যাদবপুরে সিপিআই(এম)-এর একটি স্টল সরাতে যন্ত্র নিয়ে একদল লোক হাজির হলে উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিশ ও পুরসভার আধিকারিকরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বামপন্থী সমর্থকেরা স্টল সরানোর চেষ্টার বিরোধিতা করেন।

তবে এই ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে অভিযোগ, প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ব্যক্তিদের পরিচয় এবং স্টল বসানোর অনুমতি ছিল কি না—এই বিষয়গুলিকে আলাদা করে দেখা জরুরি। ২১ অক্টোবর কলকাতা হাই কোর্ট যাদবপুর কফি হাউসের বাইরে সিপিআই(এম)-এর অস্থায়ী বইয়ের স্টল ভেঙে দেওয়ার আশঙ্কা নিয়ে দায়ের করা একটি আবেদন খারিজ করে। আদালত জানায়, কলকাতা পুরসভায় টাকা জমা দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি।

এই রায় নির্দিষ্ট স্টলটির অনুমতি সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। রাজ্যের অন্যত্র বইয়ের স্টলে ভাঙচুরের অভিযোগের সত্যতা বা দায় কার, তা এই রায় থেকে নির্ধারণ করা যায় না।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই হামলাগুলির সঙ্গে দলকে যুক্ত করার বিরোধিতা করেন। দলের নেতা স্বপন দাশগুপ্তও ভাঙচুরের নিন্দা করেন। সব মিলিয়ে বিতর্কটি শুধু ‘দুর্গাপুজো’ না ‘শারদোৎসব’—এই শব্দের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। উৎসবের সময় জনপরিসরে রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বাতিল কার্নিভাল, বদলেছে সরকারি আয়োজন

রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর দুর্গাপুজোর সরকারি আয়োজনেও পরিবর্তন এসেছে। রেড রোডে আয়োজিত বার্ষিক দুর্গাপুজো কার্নিভাল এ বছর বাতিল করা হয়। আগের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে চালু হওয়া এই অনুষ্ঠান পুজোর পর বিভিন্ন বড় পুজো কমিটির প্রতিমা প্রদর্শন ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার অন্যতম মঞ্চ হয়ে উঠেছিল।

তার বদলে এ বছর ইডেন গার্ডেন্সে মহালয়ার দিন বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সরকার। সেখানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি ড্রোন প্রদর্শনী ও আতশবাজির ব্যবস্থা ছিল। মহাষ্টমীতে মদ বিক্রি এবং পুজো ও বিসর্জনের শোভাযাত্রায় ডিজে বাজানোর ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ ঘোষণা করা হয়। মহালয়ার আগে মণ্ডপ উদ্বোধন না করার জন্যও উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেওয়া হয়। সরকারের বক্তব্য, এই পদক্ষেপগুলির লক্ষ্য ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা এবং জননিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া।

এ বছর শ্রীভূমি, সুরুচি সংঘ এবং হাতিবাগান সর্বজনীন-সহ কয়েকটি পরিচিত পুজো কমিটির সঙ্গে যুক্ত নেতৃত্বেও পরিবর্তনের খবর সামনে এসেছে। আগে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রভাব ছিল, এমন কয়েকটি পুজোয় এ বার বিজেপি নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা গিয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের একাংশের বক্তব্য, পুজোকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব থেকে সরিয়ে স্থানীয় মানুষের হাতে ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁদের উদ্দেশ্য।

চোরবাগানের দুর্ঘটনা

১৭ অক্টোবর উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু এবং ২৫ জনের আহত হওয়ার ঘটনা এ বছরের পুজোর সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্তে উঠে এসেছে কয়েকটি সম্ভাব্য বিষয়। সরু রাস্তা, একটি মাত্র বেরোনোর পথ, প্রবল বৃষ্টি, ভিড় নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার মতো ঘোষণা—এই বিষয়গুলি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে।

ঘটনায় পুজো কমিটির সম্পাদক ও সহ-সভাপতি-সহ সাতজনকে গ্রেফতার করে পুলিশি হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। তবে গ্রেফতার হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই দায় নির্ধারিত হওয়া উচিত।

২১ অক্টোবর রাজ্য সরকার অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করে। তিন মাসের মধ্যে তদন্তের ফল ও সুপারিশ জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। দুর্ঘটনার আগে কী ঘটেছিল, ভিড় কীভাবে এগোচ্ছিল, প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা কেমন ছিল, আবহাওয়ার প্রভাব কতটা ছিল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে সিট।

পুজো কমিটির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সেই পরিচয় থেকে দুর্ঘটনার কারণ বা দায় নির্ধারণ করা যায় না। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তা স্থির করতে হবে। এই ঘটনা মনে করিয়ে দিয়েছে, উৎসবের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আয়োজক ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

প্রতিমা বিসর্জনেও বিতর্ক

দুর্গাপুজো ঘিরে ধর্মীয় পরিচয়ের বিতর্ক বিসর্জনের ক্ষেত্রেও পৌঁছেছে। ২১ অক্টোবর শুভেন্দু অধিকারী জানান, হুগলি নদীতে বিসর্জনের সময় শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই দুর্গাপ্রতিমা স্পর্শ করতে পারবেন। তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

বিসর্জন ধর্মীয় আচার হলেও তার সঙ্গে যুক্ত থাকে বহু মানুষ। প্রতিমা বহন, বিসর্জনের আয়োজন, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন বিভিন্ন ধর্ম ও সামাজিক পরিচয়ের মানুষ। তাই ধর্মীয় রীতির প্রশ্নের পাশাপাশি একটি সর্বজনীন উৎসবে অংশগ্রহণের সীমা কোথায় টানা হবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

প্রশ্ন হলো, বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসবের চরিত্র কে নির্ধারণ করবে? ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা করা জরুরি, কিন্তু সেই ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা কি একটি নির্দিষ্ট মতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? শিল্পী কি নতুন ভাবনায় প্রতিমা তৈরি করতে পারবেন? পুজোর সময় বাঙালির পরিচিত খাদ্যাভ্যাস কি ধর্মীয় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠবে? উৎসবের মণ্ডপের পাশে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের বই বিক্রির অধিকার কতটা থাকবে? বিসর্জনের মতো আচারেও কে অংশ নিতে পারবেন আর কে পারবেন না, তা কে ঠিক করবে?

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

শারদোৎসবের উৎস কি শুধু ধর্মে, নাকি কৃষি ও সমাজের ইতিহাসেও?

Durga Puja history: শারদোৎসব ও দুর্গাপুজোর ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিসভ্যতা, মাতৃকা উপাসনা, তন্ত্র, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির আত্তীকরণ এবং মহিষাসুরের বিকল্প আখ্যান।

বিসর্জনের রাতে শহর নিজের উল্টো ছবি দেখে

Durga Puja Visarjan: ক্যাওড়ামো মানে ক্ষমতার ভাষাকে অপমান করা। ক্যাওড়ামো মানে প্রভুর ভাষায়, প্রভুর বিরুদ্ধে কথা বলা। ক্যাওড়ামো মানে এমন এক শব্দসমাহার, যা অভিধানে ঢোকে না, কিন্তু অলিতে গলিতে বেঁচে থাকে আজীবন।

বিসর্জন একটি বাঙ্ময় নীরব আলো

Durga Puja Visarjan: বিসর্জনের মধ্যে ফেরার ফুরিয়ে আসা লেগে থাকে। কার ফেরা ফুরিয়ে এল? শুধুই কি এক বাঙালি মেয়ের নিজের বাড়ির কাছে ফেরা ফুরিয়ে আসে? শুধুই কি এক বাঙালি মায়ের নিজের বাচ্চাকাচ্চা সমেত বাপের বাড়িতে ফেরার দিন ফুরিয়ে আসা লেগে থাকে তার মধ্যে? নাকি আরও গভীর অনেক কিছুর, কিংবা খুব সাধারণ সমস্ত কিছুর ফেরা ফুরিয়ে আসে বিসর্জনের সঙ্গে?

মণ্ডপ থেকে থিম পুজো: যেভাবে বদলে গেল কলকাতার প্যান্ডেল শিল্প

Durga Puja pandal history: তপতী গুহ ঠাকুরতার প্রবন্ধ 'Abodes of the Goddess'-এর অংশ বিশেষ অনূদিত হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এই প্রবন্ধটি প্রাথমিকভাবে ইয়েল স্কুল অব আর্কিটেকচারের জার্নাল 'পারস্পেক্টা' (Perspecta)-য় প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি দেখতে পারেন: তপতী গুহঠাকুরতা, "অ্যাবোডস অব দ্য গডেস" (Abodes of the Goddess), পারস্পেক্টা ৫২, অক্টোবর ২০১৯: ১৯৫–২০৭।

কারও ফেরা হলো না মায়ের কোলে, কারও চোখের সামনেই চলে গেলেন মা, সপ্তমীর ভিড় কেড়ে নিল চেনা মুখগুলো

Kolkata Durga Puja stampede: যে শিশুটি বাবার হাত ধরে মণ্ডপ দেখতে চেয়েছিল, কিংবা যে তরুণ উৎসবের দিনেও শুধু মায়ের হাসিমুখ দেখতে ভিড়ে সামিল হয়েছিল—মুহূর্তের হুড়োহুড়িতে তাদের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল।

ভূমিকম্পে নদী শুকোল, গ্রাম ছাড়লেন কারিগররা: আজরাখপুর যেভাবে বাঁচিয়ে রাখল ৪০০ বছরের শিল্পকে

Ajrakh block printing: ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকেই শুকিয়ে যেতে থাকে সরন নদী। নিয়মিত বহমান জল ছাড়া কাপড়ে স্বাভাবিক রং ফোটানো কঠিন হয়ে পড়ায় গ্রামবাসীরা কূপ খনন করেছিল। নলকূপের জলে অতিরিক্ত মাত্রায় লোহা থাকার কারণে কাপড়ে রঙের কাঙ্ক্ষিত উজ্জ্বলতা আনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে ফিকে হতে থাকে প্রাকৃতিক ও ভেষজ রঙের এই ঐতিহ্যবাহী আজরাখ শিল্প। জীবিকার সন্ধানে এক সময় গ্রামের বহু মানুষ ভিন্ন পেশা বেছে নিয়ে দেশের নানা প্রান্তে পাড়ি দিতে বাধ্য হন।

শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণব ধারার মেলবন্ধন: খড়দহে নিত্যানন্দের কাত্যায়নী পুজো

Khardaha Nityananda Prabhu Durga Puja: নিত্যানন্দের পূজিতা দেবী কাত্যায়নী দশভুজা। ঘোড়ামুখো সিংহ তাঁর বাহন। ত্রিশূল হাতে অসুরকে তিনি হত্যা করছেন। তাঁর ডানে জয়া ও বামে বিজয়া। জয়ার নিচে গণেশ আর বিজয়ার নিচে কার্তিকের অবস্থান।