আজও কামানের তোপে শুরু হয় মল্লবাড়ির দুর্গাপুজো

টেরাকোটা শিল্পের জায়গার পুজো বাংলার বিশেষ গর্ব।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
আজও কামানের তোপে শুরু হয় মল্লবাড়ির দুর্গাপুজো

এসে গেল বছরের সেই সময়, যে সময়টার জন্য বাঙালি সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে বসে থাকে। বাঙালির চোখ তখন খোঁজে মাঠের ধারের কাশফুল, বাঙালির চোখ তখন খোঁজে নীল আকাশে পেঁজা মেঘ, আর একটা অদ্ভুত গন্ধ, যার বর্ণনা করা খুবই কঠিন। মা আসছেন। আসছে শারদ উৎসব। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব, যা জিতে নিয়েছে ইউনেসকো-র স্বীকৃতিও। এই বছর পুজোয় শোনা যাচ্ছে ইউনেসকো-র প্রতিনিধিরা আসবেন, দেখবেন এই বিরাট যজ্ঞ। কিন্তু তাঁদের বিষ্ণুপুর নিয়ে যাওয়া হবে কি? তাঁরা কি দর্শন করবেন হাজার বছর পুরনো মৃন্ময়ী মায়ের মূর্তি? তাঁরা কি চাক্ষুষ করার সুযোগ পাবেন পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে একমাত্র কামান দাগার দৃশ্য? উত্তর জানা নেই। দেখে নেওয়া যাক, অনেকের অজানা এই ঐতিহ্যশালী পুজো নিয়ে কিছু কথা।

সাল ৯৯৪, বা ৪০১ বঙ্গাব্দ বা ৩০০ মল্লাব্দ। রাজা জগৎমল্ল তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানীকে জয়পুরের প্রদ্যুম্ননগর থেকে স্থানান্তরিত করে নিয়ে এলেন বিষ্ণুপুরে। সেই সময়ে তাঁদের সাম্রাজ্যের সূর্য মধ্যগগনে। এতটাই তাঁদের প্রতিপত্তি যে, তাঁরা নিজেদের রাজবংশের নাম অনুসারে তৈরি করেন বর্ষপঞ্জি। সেই বর্ষপঞ্জি অনুসারে ৩০৩ মল্লাব্দ অর্থাৎ ৯৯৭ সালে তাঁরা নিজেদের রাজবাড়িতে শুরু করেন দুর্গাপুজো। সেই সময়ে গঙ্গা থেকে মাটি তুলে এনে মায়ের প্রতিমা নির্মাণ করা হয়। তবে অন্যান্য জায়গার প্রতিমার থেকে এখানকার প্রতিমার সামান্য তফাৎ রয়েছে। এখানে দেবী প্রতিমার চালচিত্র অনেকটাই আলাদা। কার্তিক এবং গনেশ প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন ওপরের দিকে এবং নিচে রয়েছেন লক্ষ্মী এবং সরস্বতী। দেবীর পিছনে ভূতপ্রেত, নন্দী-ভৃঙ্গী-সহ শিবের অবস্থান লক্ষনীয়। একেবারে সামনে অবস্থান করছেন দেবী মৃন্ময়ী।

পঞ্চমীর তেরো দিন আগে থেকেই, অর্থাৎ জিতাষ্টমী থেকে এখানে পুজো শুরু হয়। কামানের তোপধ্বনির মাধ্যমে বিষ্ণুপুর জানতে পারে যে, রাজবাড়িতে এবার পুজো শুরু হবে। শুরু হবে বড়ঠাকরুণের পুজো। রাজবাড়ির উল্টোদিকে গোপালসায়রে নবপত্রিকার স্নানপর্ব শেষ হতেই গর্জে ওঠে তিনটি কামান। তারপর প্রথা অনুযায়ী মৃন্ময়ী মন্দিরে পটদুর্গা ঢোকার পরেই আরও তিনটি। সবশেষে দুপুরে ভোগপর্ব শেষ হতে আরও তিনটি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কখনও আটটি হাত, কখনও কৃষ্ণবর্ণ! যে নয়টি রূপে দেবী দুর্গার আরাধনা হয়

Durga Puja: শুক্লপক্ষের প্রথমা থেকে নবমী পর্যন্ত ন'টি রাত্রি দুর্গার ন'টি শক্তির পূজা করা হয়ে থাকে।

মাটির প্রতিমা থাকলেও এখানে পটপুজোই প্রধান। তিনটি ভিন্ন পট আসে, যেগুলি বড়ঠাকরুণ, মেজঠাকরুণ এবং ছোটঠাকরুণ নামে পূজিত হন। বিষ্ণুপুরের ফৌজদার পরিবারের শিল্পীরা এই তিনটি আলাদা পট আঁকেন। মূল দেবী প্রতিমার পাশে আলাদা তিনটি স্থানে রেখে এই পটগুলিকে পুজো করা হয়।

এই তোপধ্বনি কিন্তু শুধুমাত্র রাজার প্রতাপ প্রদর্শন বা সবাইকে পুজো শুরুর বার্তা দেওয়ার জন্য শুরু হয়নি।

শোনা যায়, হাজার বছর আগে রাজা জগৎমল্ল একদিন ঘন জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করেন শিকারের খোঁজে। তাঁর সঙ্গী ছিল তাঁরই পোষ্য এক বাজপাখি। সেখানেই তিনি দেবী মৃন্ময়ীর থেকে স্বপ্নাদেশ পান মন্দির প্রতিষ্ঠা করার। রাজা জগৎমল্ল সেখানেই নিজের রাজধানী স্থানান্তরিত করলেন এবং মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন। অন্যান্য সমস্ত পুজো কালিকাপুরাণ মেনে হলেও মৃন্ময়ী মায়ের পুজো হয় বলিনারায়ণী প্রথা মেনে। মল্লরাজারা প্রত্যেকেই হাম্বির বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার কারণে এই পুজোয় পশুবলি হয় না। এখানে শব্দই ব্রহ্ম। সেই কারণেই এখানে পুজো শুরুই হোক বা সন্ধিপুজো, সবই পালন হয় তোপধ্বনির মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, সমগ্র বাঁকুড়া জেলার সন্ধিপুজোর সূচনা হয় এই তোপধ্বনির আওয়াজ শোনার পর। মন্দিরের কাছের সেই ছোট্ট টিলা, মুর্চ্ছা পাহাড়ই পশ্চিমবঙ্গর সেই একমাত্র স্থান, যেখানে সন্ধিপুজোর আগে কামান দাগা হয়, যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজার হাজার দর্শনার্থী। সন্ধিপুজোতে পশুর পরিবর্তে বলি হয় মাসকলাই।

তবে রাজার আমলে যে প্রকাণ্ড আকারের কামান দাগা হতো, তা আর নেই। কামান এখন অনেকটাই ছোট। তবে তা শুধু কালের নিয়মে নয়। বেশ কিছু বছর আগে কামান দাগার সময়ে কামান ফেটে দুর্ঘটনা ঘটে। তাছাড়াও, সম্প্রতি একটি মামলা হয় এই প্রথার বিরুদ্ধে। সেই সব মিলিয়েই আজ আর রাজকীয় কামান নয়, তার ক্ষুদ্র সংস্করণ দিয়ে কাজ চালানো হয়।

মহানবমীতে পূজিত হন খচ্চরবাহিনী। সেই পুজোয় পুরোহিত এবং রাজপরিবারের সদস্য ব্যতীত কারও প্রবেশাধিকার থাকে না। কথিত আছে, দেবী মহামারী থেকে বিষ্ণুপুরবাসীদের রক্ষা করেন। আজও পুজো চলাকালীন পুরোহিত দেবীর দর্শন করেন না, পিছন ফিরে পুজো করেন। অষ্টধাতুনির্মিত বিশালাক্ষী দেবীর পুজোও শুরু হয় অষ্টমীর দিন থেকে।

টেরাকোটা শিল্পের স্থানে এমন পুজো বাংলার বিশেষ গর্ব। রাজা নেই, তাঁর সাম্রাজ্য নেই, কিন্তু থেকে গিয়েছে ঐতিহ্য। এই পুজোয় চাক্ষুষ করে আসুন হাজার বছর পুরনো এই পুজোকে।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।