উন্নয়নের মানচিত্রে নেই আদিবাসী?
Ken Betwa River Linking Project and International Day of the World's Indigenous Peoples: বুন্দেলখণ্ড বললে রাষ্ট্রের চোখে ভেসে ওঠে কেবল একটি ‘অনগ্রসর এবং খরাপ্রবণ এলাকা’। রাষ্ট্রের সোজা হিসাব—যেখানে জল নেই, সেখানে নদীজুড়ে প্রকাণ্ড সিমেন্টের বাঁধ দাও, বড় বড় খাল কাটো, আর নদী থেকে জল তুলে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দাও। এই আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর চিন্তাভাবনা বা ‘টেকনোক্র্যাটিক’ মডেল ধরে নেয় যে, স্থানীয় সাধারণ মানুষের এ বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই। এই বুন্দেলখণ্ডেই শত শত বছর আগে গোণ্ড এবং সহরিয়া আদিবাসী সম্প্রদায় প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জল ব্যবস্থাপনার এক অদ্ভুত সুন্দর মডেল তৈরি করেছিলেন।
প্রতি বছর অগাস্টের ৯ তারিখ এলে ওদের অধিকার, ওদের সংস্কৃতি এবং জল-জঙ্গল-জমির উপর ওদের স্বাধিকার নিয়ে অনেক কথা হয়। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিশ্বজুড়ে ওরাই ‘প্রকৃতির আসল রক্ষক’ বলে প্রশংসিত হয়। ওই একদিনই। আর মঞ্চের আলো নিভে গেলেই ওদের লড়াই জারিই থাকে নিজেদের ভিটেমাটির জন্য।
মধ্য ভারতের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে বাস্তবায়িত হতে চলা কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ প্রকল্পকে সরকার তুলে ধরছে এক ঐতিহাসিক উন্নয়ন হিসেবে। বলা হচ্ছে, এই প্রকল্প বুন্দেলখণ্ড এলাকার দীর্ঘদিনের তীব্র জলসংকট ও খরা চিরতরে মিটিয়ে দেবে। কিন্তু তার পরিবর্তে কেবল কয়েক হাজার মানুষকে তাঁদের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না, বরং মুছে ফেলা হচ্ছে হাজার বছর ধরে টিকে থাকা আদিবাসী সমাজ, তাঁদের জল-পরিবেশ সংক্রান্ত জ্ঞান এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাঁদের গভীর আত্মিক সম্পর্ককেও।
বুন্দেলখণ্ড বললে রাষ্ট্রের চোখে ভেসে ওঠে কেবল একটি ‘অনগ্রসর এবং খরাপ্রবণ এলাকা’। রাষ্ট্রের সোজা হিসাব—যেখানে জল নেই, সেখানে নদীজুড়ে প্রকাণ্ড সিমেন্টের বাঁধ দাও, বড় বড় খাল কাটো, আর নদী থেকে জল তুলে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দাও। এই আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর চিন্তাভাবনা বা ‘টেকনোক্র্যাটিক’ মডেল ধরে নেয় যে, স্থানীয় সাধারণ মানুষের এ বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই। ইঞ্জিনিয়ারদের বানানো নকশাই নাকি জলসংকট মেটানোর একমাত্র উপায়।
কিন্তু ইতিহাস তা বলে না। এই বুন্দেলখণ্ডেই শত শত বছর আগে গোণ্ড এবং সহরিয়া আদিবাসী সম্প্রদায় প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জল ব্যবস্থাপনার এক মডেল তৈরি করেছিলেন।
গোণ্ডদের জলপ্রযুক্তি ছিল সম্পূর্ণভাবে অঞ্চলটির ভূতাত্ত্বিক গঠন অর্থাৎ গ্রানাইট ও বেলেপাথরের বিন্যাস বোঝার উপর প্রতিষ্ঠিত। জবলপুর ও গারহা-মান্ডলা অঞ্চলে গোণ্ড রাজাদের আমলে তৈরি করা হয় ‘চেইন অফ ট্যাঙ্কস’। তারা নদীর মূল ধারায় বিশাল বাঁধ না দিয়ে, পাহাড়ি ঢাল থেকে নেমে আসা জলধারাকে কাজে লাগাত। সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত পাহাড়ি গ্রানাইট পাথরের উপর তৈরি হতো মূল সঞ্চয়ী পুকুর, যেমন মহারাজতাল। সেখান থেকে জল উপচে একে একে নিচে নেমে আসত কোলাতাল, দেওতাল, সুপাতাল হয়ে সমতলের গঙ্গাসাগর পর্যন্ত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ken-Betwa project: দেশের উন্নয়নের বলি হিসেবে বারবার প্রান্তিক এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলিকে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁরা বারেবারে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। কেন এমনটা ঘটে?
এই শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে জলাধারের আকার ও গভীরতা নির্ধারণ করা হতো মাটির জলধারন ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে। পলিমাটির এলাকায় তৈরি হতো জল আটকে রাখার সঞ্চয়ী ট্যাঙ্ক, আর শিলাযুক্ত বেলেপাথরের এলাকায় তৈরি হতো রিচার্জ ট্যাঙ্ক, যা সরাসরি মাটির ভিতরের জলস্তরকে পুষ্ট করত। কোনো চুন-সুরকি বা সিমেন্টের আধুনিক আবরণ ছাড়াই, কেবল প্রাকৃতিক খাঁজ ও পাথরের বাঁধাই দিয়ে এই ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে বর্ষার পলি এক জায়গায় জমে পুরো জলাধার অকেজো না হয়ে পড়ে। এক ট্যাঙ্কের অতিরিক্ত পলি ও জল পরবর্তী ট্যাঙ্কে পরিশ্রুত হয়ে পৌঁছত।
অন্যদিকে, বুন্দেলখণ্ডের ‘হ্যাভেলি বান্ধি’ ব্যবস্থাটি ছিল আদিবাসী কৃষি-জলবিদ্যার আরেক উদাহরণ। বুন্দেলখণ্ডের কালো মাটির জল ধরে রাখার ক্ষমতা অদ্ভুত। আদিবাসীরা মাটির এই চরিত্রকে কাজে লাগিয়ে ৩০০-৪০০ বছর আগে এই ব্যবস্থার প্রচলন করেন। বর্ষা আসার আগেই চাষের জমির চারপাশে তিন থেকে চার ফুট উঁচু মাটির শক্ত বাঁধ তৈরি করা হতো। বর্ষার জল সেই আবদ্ধ জমিতে মাসের পর মাস জমে থাকত।
এর মূল উদ্দেশ্য দুটি—প্রথমত, দীর্ঘ সময় জল জমে থাকার ফলে কালো মাটি নিজের প্রয়োজনীয় জল শুষে নেওয়ার পর ভূগর্ভস্থ জলের স্তরকে ২ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত উঁচুতে তুলে আনত। দ্বিতীয়ত, বর্ষার জলে ভেসে আসা পলি জমিতে থিতিয়ে পড়ে মাটির উর্বরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিত। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে রবি শস্য বপনের ঠিক আগে বাঁধের জল সাবধানে পাশের নিচু নালা বা পুকুরে ছেড়ে দেওয়া হতো। এরপর সেই ভিজে স্যাঁতসেঁতে মাটিতে কোনো কৃত্রিম সেচ বা বোরওয়েলের পাম্প ছাড়াই গম বা ছোলার অবিশ্বাস্য ফলন হতো। এমনকী খরার বছরেও, যে জমিতে হ্যাভেলি ব্যবস্থা সক্রিয় থাকত, সেখানকার মাটির আর্দ্রতা ফসলকে শুকিয়ে যেতে দিত না।
সহরিয়াদের মতো বন-নির্ভর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদানও কম নয়। শিবপুরী ও মোরেনা অঞ্চলের সহরিয়ারা বনাঞ্চলের সালে বা সালাই গাছের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ জলের গভীর সম্পর্ক বুঝতেন। তাঁরা জানতেন কোনো পাহাড়ি ঝরনার মুখে ছোট পাথরের বাঁধ বা চেকা বাঁধ দিলে কীভাবে বনভূমির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং প্রাকৃতিক স্প্রিংগুলি বছরের পর বছর বেঁচে থাকে।
এখন যখন হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে নদী বাঁধার বড় বড় প্রকল্প তৈরি হচ্ছে, তখন গোণ্ড বা সহরিয়াদের এই সুপ্রাচীন ও পরিবেশবান্ধব জ্ঞান হয়ে যাচ্ছে ‘অবৈজ্ঞানিক’ বা ‘অপ্রাসঙ্গিক’।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ken Betwa Link Project: সমাজকর্মী ও জননেতা অমিত ভটনাগরকে পুলিশ আটক করে। আন্দোলনকারী নেত্রী দিব্যা আহিরওয়ারের অভিযোগ, পুলিশের এই অতি-সক্রিয়তার কারণ অমিত ভটনাগর কেন-বেতোয়া প্রকল্পে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার একটি দুর্নীতি সর্বসমক্ষে নিয়ে আসছিলেন।
স্থানীয়দের প্রতিবাদ
কেন-বেতোয়া প্রকল্পের মূল চিন্তাটাই দাঁড়িয়ে আছে নদীকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে না দেখে, তাকে স্রেফ কতগুলি পাইপলাইনের জোড়াতালি হিসেবে দেখার উপর। সরকারি খাতায় ধরে নেওয়া হয়েছে ‘কেন’ নদীতে নাকি অতিরিক্ত জল আছে, আর ‘বেতোয়া’ নদীতে জলের অভাব। তাই কেন নদীর জল কেটে বেতোয়ায় নিয়ে যেতে হবে।
কিন্তু জলবায়ু বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি আস্ত নদীর বাস্তুতন্ত্রে এই ‘উদ্বৃত্ত’ বা অতিরিক্ত জল বলে কিছু হয় না। নদীর জল কেবল মানুষের খাওয়ার জন্য নয়; নদী তার সঙ্গে পলি বয়ে আনে, নদীর উপর নির্ভর করে চারপাশের জঙ্গল টিকে থাকে, নদীর জলে ভেসে বেড়ায় মাছ, আর দুই তীরের জীববৈচিত্র্য বাঁচে।
গোণ্ড এবং কোল আদিবাসীদের কাছে কেন নদী স্রেফ একটি জলের উৎস নয়, তাঁদের জীবন ও ঐতিহ্যের এক পবিত্র অংশ। নদী এবং তার সংলগ্ন পান্না জঙ্গল ছিল তাঁদের যৌথ সম্পদ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁরা বনের কাঠ, ফলমূল, ভেষজ উদ্ভিদ আর নদী থেকে নেওয়া পরিমিত জল দিয়ে নিজেদের জীবন চালিয়ে এসেছেন, আবার জঙ্গলকেও রক্ষা করেছেন।
আজ কেন-বেতোয়া প্রকল্পের দৌলতে পান্না ব্যাঘ্র প্রকল্পের কোর এলাকার হাজার হাজার হেক্টর ঘন জঙ্গল জলের তলায় তলিয়ে যেতে বসেছে। কেটে ফেলা হচ্ছে কোটি কোটি গাছ। নদীকে বাস্তুতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে যখনই তাকে স্রেফ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে জল নিয়ে যাওয়ার কৃত্রিম নালা বানিয়ে ফেলা হয়, তখন নদী তার প্রাণ হারায়। আর নদী প্রাণ হারালে ধ্বংস হয়ে যায় সেই নদীর উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা আদিবাসী সমাজও।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে ভারত নিজেদের পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে, বা ‘মিশন লাইফ’ (Lifestyle for Environment)-এর মতো বিশ্বজনীন উদ্যোগের মাধ্যমে আদিবাসীদের ‘প্রকৃতির বন্ধু’ বলে প্রশংসায় ভরিয়ে দেয়। কিন্তু কেন-বেতোয়া প্রকল্পের জন্য সমস্যায় পড়ছেন তাঁরাই। একদিকে বার্তা দেওয়া হচ্ছে বন রক্ষা করার এবং কার্বন নির্গমন কমানোর, আর অন্যদিকে পান্নার মতো একটি সমৃদ্ধ বনভূমি পুরোপুরি জলে ডুবে যেতে বসেছে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, আদিবাসী মানুষের সুরক্ষায় যে সব আইন রয়েছে, সেগুলির কী হলো? আন্তর্জাতিক স্তরে জাতিসংঘের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে—যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মতামত ও স্বাধীন সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক, যাকে বলা হয় 'ফ্রি, প্রায়োর অ্যান্ড ইনফর্মড কনসেন্ট' (FPIC)। ভারতেও ২০০৬ সালের ‘বন অধিকার আইন’ (FRA) অনুযায়ী, গ্রামসভাগুলির কাছে ক্ষমতা দেওয়া আছে তাঁদের বনাঞ্চলের উপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
তাহলে এক্ষেত্রে কী হলো? অভিযোগ উঠেছে, বুন্দেলখণ্ডের ধুলোউড়ো গ্রামগুলিতে কেন-বেতোয়া প্রকল্পের জন্য গ্রামসভাগুলির সম্মতি নেওয়ার যে ঘটনা, তা স্রেফ আইওয়াশ। অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসী মানুষের কাছে প্রকল্পটির প্রকৃত ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হয়নি। কোথাও আবার কোনো বৈঠক না করেই নথিপত্রে সই করিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বুন্দেলখণ্ডের জলসংকট কোনো বানানো গল্প নয়, সংকটটি অত্যন্ত বাস্তব। কিন্তু তার সমাধান কি স্রেফ নদীকে ধ্বংস করে, আদিবাসীদের উচ্ছেদ করেই সম্ভব?







