খাদ্য অপচয়ে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে

Food Waste in India: ভারত বছরে প্রায় ৭৮–৮০ মিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় করছে, যার আর্থিক মূল্য ১.৫৫ লক্ষ কোটি টাকা। চিনের পরেই খাদ্য অপচয়ে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে।

inscript
৫ মিনিট
খাদ্য অপচয়ে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে

গত এক দশক যাবত দেশের চাষিরা মাঠে দাঁড়িয়ে দেখছেন তাঁর মাথার ঘাম পায়ে ঝরিয়ে উৎপাদন করা ফসলের দাম নেই, ক্রেতা নেই, সংরক্ষণের উপায়ও নেই। আবার অন্যদিকে শহরের আলো ঝলমলে বিয়েবাড়িতে, পাঁচতারা হোটেলের বুফেতে, কিংবা মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে সেই খাবারই নির্দ্বিধায় ডাস্টবিনে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্য কি কেবল অর্থনীতির ব্যর্থতা?

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (United Nations Environment Programme)-এর ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট যে সংখ্যা সামনে এনেছে, তা নিছক পরিসংখ্যান নয়; তা এক নির্মম আয়না। ভারত বছরে প্রায় ৭৮–৮০ মিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় করছে, যার আর্থিক মূল্য ১.৫৫ লক্ষ কোটি টাকা। চিনের পরেই খাদ্য অপচয়ে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে। গৃহস্থালির স্তরেই প্রায় ৬৮.৭ থেকে ৭৮ মিলিয়ন টন খাবার অপচয় হয়, অর্থাৎ প্রতি ব্যক্তি গড়ে ৫৫ কেজি খাবার নষ্ট করছে।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাদ্যশস্য উৎপাদক দেশ। তবুও ২০ কোটিরও বেশি মানুষ প্রতিদিন ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করে। খাবারের অপচয় চলছে অবিরাম—ক্ষেত থেকে বাজার, বাজার থেকে রান্নাঘর, আর রান্নাঘর থেকে ডাস্টবিন পর্যন্ত। এই দ্বৈত বাস্তবতা কি কেবল নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করে স্থির হওয়া যায়? নাকি আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস ‘একটু বেশি রান্না করি’, ‘প্লেটে বেশি তুলে নিই’, ‘পুরনো হয়ে গেছে’ বলে ফেলে দিই— এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলিই বড় সংকট তৈরি করছে?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আম্বেদকরের আন্দোলনের একশো বছর পার, আজও জলের জাত নিয়ে ভাবছে ভারত?

প্রশ্নটি এখন আর কেবল ‘জল পান করতে পারব কি না’ তা নয়, বরং প্রশ্নটি হলো—কী ধরনের জল আমরা পাচ্ছি, কোথা থেকে পাচ্ছি, কত দূর থেকে আনতে হচ্ছে এবং কতখানি অবমাননা সহ্য করে তা জোগাড় করতে হচ্ছে।

ঠান্ডা সংরক্ষণাগারের অভাব, দুর্বল কোল্ড চেইন, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ সব মিলিয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে মোট খাদ্য উৎপাদনের ৩০-৪০ শতাংশই কোনো না কোনো পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলের ক্ষেত্রে প্রায় ১৫ শতাংশ, সবজিতে ১১-১২ শতাংশ, শস্যদানায় প্রায় ৬ শতাংশ নষ্ট হয় সংরক্ষণ, পরিবহন ও লজিস্টিকের অভাবে। ঠান্ডা চেম্বারের সংখ্যা অপ্রতুল, রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য তো আছেই। দুধ, মাছ-মাংসের ক্ষেত্রেও ক্ষতি কম নয়। শহরে গিয়ে অপচয়ের চেহারা আরও ভয়াবহ। সুপারমার্কেটে ‘পারফেক্ট’ দেখতে না পেলে ‘আগলি’ ফল-সবজি ফেলে দেওয়া হচ্ছে অবিরত। গৃহস্থালি ও খাদ্য পরিষেবা খাতে বিশ্বের মোট অপচয়ের ৬১ শতাংশই হয় ভারতে। বিয়েবাড়ি, পার্টি, উৎসবে তো কথাই নেই। বাঙালি বাড়িতে ‘অতিথি দেবো ভব’-এর নামে রান্না হয় দ্বিগুণ, খাওয়া হয় তার অর্ধেক। বাকিটা নষ্ট। এই অলিখিত নিয়ম কি আমাদের শিখিয়েছে খাবারের মর্যাদা তার প্রয়োজনের চেয়ে প্রদর্শনে বেশি?

ভারতের মতো দেশে, যেখানে জলসংকট, মাটির ক্ষয়, জলবায়ু পরিবর্তন ইতিমধ্যেই ভয়াবহ আকার নিয়েছে, এই অপচয় একটা ‘পরিবেশগত টাইম বোমা’। অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতি অপরিসীম। এই অপচয়ের অর্থনৈতিক ক্ষতি যেমন বিপুল, পরিবেশগত ক্ষতিও তেমনই গভীর। এক কেজি চাল উৎপাদনে যে জল লাগে, তা কয়েকজন মানুষের দিনের প্রয়োজন মেটাতে পারে। অথচ সেই চাল যখন ফেলে দেওয়া হয়, তখন তা মিথেন গ্যাস তৈরি করে পরিবেশকে আরও বিপন্ন করে। খাদ্য অপচয় বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৮–১০ শতাংশের জন্য দায়ী।

প্রশ্ন থেকে যায় সমাধান কোথায়? সরকার কি যথেষ্ট করছে? Food Safety and Standards Authority of India-এর ‘সেভ ফুড শেয়ার ফুড’ উদ্যোগ কিংবা ইন্ডিয়ান ফুড শেয়ারিং অ্যালায়েন্স যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু তা কি যথেষ্ট বিস্তৃত? কোল্ড স্টোরেজ বাড়ানো, লজিস্টিক উন্নত করা, প্রসেসিং ইউনিট গড়ে তোলা— এই পরিকাঠামোগত পরিবর্তন কি দ্রুত হচ্ছে?

আর সমাজ? আমরা কি প্রস্তুত নিজেদের অভ্যাস বদলাতে? রেস্তোরাঁয় অল্প পরিমাণে অর্ডার করা, বিয়েবাড়িতে সীমিত আয়োজন, বাড়িতে প্রয়োজনমাফিক রান্না করার মতো এই ছোট পদক্ষেপগুলি— আমরা কি সত্যিই নিতে পারি? নাকি ‘সম্মান’ আর ‘প্রতিপত্তি’র নামে অপচয়কে আমরা সগর্বে বৈধতা দিয়ে যাব?

বাংলার সংস্কৃতিতে অন্নকে দেবতার আসনে বসানো হয়, কৃষককে বলা হয় ‘অন্নদাতা’। কিন্তু সেই অন্ন যখন অনায়াসে ডাস্টবিনে যায়, তখন সেই সংস্কৃতি কি শুধুই শব্দের অলংকার হয়ে দাঁড়ায় না? শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সরল, কিন্তু অস্বস্তিকর— যে দেশে ক্ষুধা এখনও বাস্তব, সেখানে আমরা কি সত্যিই খাদ্যের মর্যাদা বুঝি, নাকি খাদ্যকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবেই দেখি?

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।