খাদ্য অপচয়ে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে
Food Waste in India: ভারত বছরে প্রায় ৭৮–৮০ মিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় করছে, যার আর্থিক মূল্য ১.৫৫ লক্ষ কোটি টাকা। চিনের পরেই খাদ্য অপচয়ে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে।
গত এক দশক যাবত দেশের চাষিরা মাঠে দাঁড়িয়ে দেখছেন তাঁর মাথার ঘাম পায়ে ঝরিয়ে উৎপাদন করা ফসলের দাম নেই, ক্রেতা নেই, সংরক্ষণের উপায়ও নেই। আবার অন্যদিকে শহরের আলো ঝলমলে বিয়েবাড়িতে, পাঁচতারা হোটেলের বুফেতে, কিংবা মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে সেই খাবারই নির্দ্বিধায় ডাস্টবিনে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্য কি কেবল অর্থনীতির ব্যর্থতা?
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (United Nations Environment Programme)-এর ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট যে সংখ্যা সামনে এনেছে, তা নিছক পরিসংখ্যান নয়; তা এক নির্মম আয়না। ভারত বছরে প্রায় ৭৮–৮০ মিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় করছে, যার আর্থিক মূল্য ১.৫৫ লক্ষ কোটি টাকা। চিনের পরেই খাদ্য অপচয়ে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে। গৃহস্থালির স্তরেই প্রায় ৬৮.৭ থেকে ৭৮ মিলিয়ন টন খাবার অপচয় হয়, অর্থাৎ প্রতি ব্যক্তি গড়ে ৫৫ কেজি খাবার নষ্ট করছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাদ্যশস্য উৎপাদক দেশ। তবুও ২০ কোটিরও বেশি মানুষ প্রতিদিন ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করে। খাবারের অপচয় চলছে অবিরাম—ক্ষেত থেকে বাজার, বাজার থেকে রান্নাঘর, আর রান্নাঘর থেকে ডাস্টবিন পর্যন্ত। এই দ্বৈত বাস্তবতা কি কেবল নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করে স্থির হওয়া যায়? নাকি আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস ‘একটু বেশি রান্না করি’, ‘প্লেটে বেশি তুলে নিই’, ‘পুরনো হয়ে গেছে’ বলে ফেলে দিই— এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলিই বড় সংকট তৈরি করছে?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রশ্নটি এখন আর কেবল ‘জল পান করতে পারব কি না’ তা নয়, বরং প্রশ্নটি হলো—কী ধরনের জল আমরা পাচ্ছি, কোথা থেকে পাচ্ছি, কত দূর থেকে আনতে হচ্ছে এবং কতখানি অবমাননা সহ্য করে তা জোগাড় করতে হচ্ছে।
ঠান্ডা সংরক্ষণাগারের অভাব, দুর্বল কোল্ড চেইন, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ সব মিলিয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে মোট খাদ্য উৎপাদনের ৩০-৪০ শতাংশই কোনো না কোনো পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলের ক্ষেত্রে প্রায় ১৫ শতাংশ, সবজিতে ১১-১২ শতাংশ, শস্যদানায় প্রায় ৬ শতাংশ নষ্ট হয় সংরক্ষণ, পরিবহন ও লজিস্টিকের অভাবে। ঠান্ডা চেম্বারের সংখ্যা অপ্রতুল, রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য তো আছেই। দুধ, মাছ-মাংসের ক্ষেত্রেও ক্ষতি কম নয়। শহরে গিয়ে অপচয়ের চেহারা আরও ভয়াবহ। সুপারমার্কেটে ‘পারফেক্ট’ দেখতে না পেলে ‘আগলি’ ফল-সবজি ফেলে দেওয়া হচ্ছে অবিরত। গৃহস্থালি ও খাদ্য পরিষেবা খাতে বিশ্বের মোট অপচয়ের ৬১ শতাংশই হয় ভারতে। বিয়েবাড়ি, পার্টি, উৎসবে তো কথাই নেই। বাঙালি বাড়িতে ‘অতিথি দেবো ভব’-এর নামে রান্না হয় দ্বিগুণ, খাওয়া হয় তার অর্ধেক। বাকিটা নষ্ট। এই অলিখিত নিয়ম কি আমাদের শিখিয়েছে খাবারের মর্যাদা তার প্রয়োজনের চেয়ে প্রদর্শনে বেশি?
ভারতের মতো দেশে, যেখানে জলসংকট, মাটির ক্ষয়, জলবায়ু পরিবর্তন ইতিমধ্যেই ভয়াবহ আকার নিয়েছে, এই অপচয় একটা ‘পরিবেশগত টাইম বোমা’। অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতি অপরিসীম। এই অপচয়ের অর্থনৈতিক ক্ষতি যেমন বিপুল, পরিবেশগত ক্ষতিও তেমনই গভীর। এক কেজি চাল উৎপাদনে যে জল লাগে, তা কয়েকজন মানুষের দিনের প্রয়োজন মেটাতে পারে। অথচ সেই চাল যখন ফেলে দেওয়া হয়, তখন তা মিথেন গ্যাস তৈরি করে পরিবেশকে আরও বিপন্ন করে। খাদ্য অপচয় বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৮–১০ শতাংশের জন্য দায়ী।
প্রশ্ন থেকে যায় সমাধান কোথায়? সরকার কি যথেষ্ট করছে? Food Safety and Standards Authority of India-এর ‘সেভ ফুড শেয়ার ফুড’ উদ্যোগ কিংবা ইন্ডিয়ান ফুড শেয়ারিং অ্যালায়েন্স যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু তা কি যথেষ্ট বিস্তৃত? কোল্ড স্টোরেজ বাড়ানো, লজিস্টিক উন্নত করা, প্রসেসিং ইউনিট গড়ে তোলা— এই পরিকাঠামোগত পরিবর্তন কি দ্রুত হচ্ছে?
আর সমাজ? আমরা কি প্রস্তুত নিজেদের অভ্যাস বদলাতে? রেস্তোরাঁয় অল্প পরিমাণে অর্ডার করা, বিয়েবাড়িতে সীমিত আয়োজন, বাড়িতে প্রয়োজনমাফিক রান্না করার মতো এই ছোট পদক্ষেপগুলি— আমরা কি সত্যিই নিতে পারি? নাকি ‘সম্মান’ আর ‘প্রতিপত্তি’র নামে অপচয়কে আমরা সগর্বে বৈধতা দিয়ে যাব?
বাংলার সংস্কৃতিতে অন্নকে দেবতার আসনে বসানো হয়, কৃষককে বলা হয় ‘অন্নদাতা’। কিন্তু সেই অন্ন যখন অনায়াসে ডাস্টবিনে যায়, তখন সেই সংস্কৃতি কি শুধুই শব্দের অলংকার হয়ে দাঁড়ায় না? শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সরল, কিন্তু অস্বস্তিকর— যে দেশে ক্ষুধা এখনও বাস্তব, সেখানে আমরা কি সত্যিই খাদ্যের মর্যাদা বুঝি, নাকি খাদ্যকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবেই দেখি?







