আম্বেদকরের আন্দোলনের একশো বছর পার, আজও জলের জাত নিয়ে ভাবছে ভারত?

প্রশ্নটি এখন আর কেবল ‘জল পান করতে পারব কি না’ তা নয়, বরং প্রশ্নটি হলো—কী ধরনের জল আমরা পাচ্ছি, কোথা থেকে পাচ্ছি, কত দূর থেকে আনতে হচ্ছে এবং কতখানি অবমাননা সহ্য করে তা জোগাড় করতে হচ্ছে।

inscript
৬ মিনিট
আম্বেদকরের আন্দোলনের একশো বছর পার, আজও জলের জাত নিয়ে ভাবছে ভারত?

২০২৭ সালের ২০ মার্চ ভারতীয় ইতিহাসের এক স্মরণীয় দিন—মহাড সত্যাগ্রহের শতবর্ষ। এই বিশেষ মাইলফলককে সামনে রেখে ২০২৬ সালের আম্বেদকর জয়ন্তীকে আমাদের কেবল উৎসব হিসেবে নয়, বরং এক গভীর জাতীয় আত্মসমালোচনার সময় হিসেবে দেখা উচিত।

১৯২৭ সালের মার্চ মাসে বাবাসাহেব আম্বেদকর হাজার হাজার মানুষকে সাথে নিয়ে মহাডের চাভদার জলাশয় থেকে জল পান করেছিলেন। এটি ছিল এক বৈপ্লবিক বিদ্রোহ। যে জল তথাকথিত ‘অস্পৃশ্যদের’ জন্য নিষিদ্ধ ছিল, সেই জল পান করে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপাদানের উপর কোনো নির্দিষ্ট জাতের একচেটিয়া অধিকার থাকতে পারে না। জলের কোনো জাত থাকে না। এটি কোনো দয়া ভিক্ষা ছিল না, এটি ছিল মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদার দাবি।

মহাড সত্যাগ্রহ লড়াই করেছিল ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ স্তরীভূত অসমতার বিরুদ্ধে। বিদেশি শাসনের থেকে মুক্তি পাওয়া যতটা কঠিন, নিজের সমাজের মানুষের হাত থেকে মানবিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া তার চেয়েও বেশি কঠিন। কারণ এটি সমাজকে নিজের অন্তরের নিষ্ঠুরতা স্বীকার করতে বাধ্য করে। আম্বেদকরের শৈশবের বিদ্যালয়ের সেই তিক্ত স্মৃতি—‘নো পিয়ন, নো ওয়াটার’ (পিয়ন না থাকলে জল নেই)—জাতপাতের সেই নৃশংস রূপকেই ফুটিয়ে তোলে, যেখানে মানুষের তৃষ্ণাও নিয়ন্ত্রিত হতো অন্যের অনুগ্রহে।

এক শতাব্দী পর মহাড সত্যাগ্রহ আজও শেষ হয়ে যায়নি; এটি কেবল রূপ বদলেছে। প্রশ্নটি এখন আর কেবল ‘জল পান করতে পারব কি না’ তা নয়, বরং প্রশ্নটি হলো—কী ধরনের জল আমরা পাচ্ছি, কোথা থেকে পাচ্ছি, কত দূর থেকে আনতে হচ্ছে এবং কতখানি অবমাননা সহ্য করে তা জোগাড় করতে হচ্ছে। এই কারণেই মহাড সত্যাগ্রহকে কেবল ইতিহাস হিসেবে দেখলে চলবে না, একে ‘পরিবেশগত ন্যায়বিচারের’ দর্পণে দেখতে হবে। জল কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি একটি মৌলিক জনস্বার্থ রক্ষা করার উপাদান, যা সুস্বাস্থ্য, শ্রম, শিক্ষা এবং সর্বোপরি জীবনের অপরিহার্য শর্ত। নিরাপদ জল থেকে কাউকে বঞ্চিত করা বা জল বণ্টনে বৈষম্য করার অর্থ হলো তার বেঁচে থাকার সুযোগকেই সংকুচিত করে দেওয়া। রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল ৬’ (SDG 6) এই বিষয়ে স্পষ্ট: লক্ষ্য কেবল জলের নাগাল পাওয়া নয়, বরং সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী পানীয় জল এবং স্যানিটেশনের সমান অধিকার নিশ্চিত করা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
"দলিত এখন একটা ফ্যাশন"! আম্বেদকরের আর প্রয়োজন কোথায়?

B R Ambedkar and Dalits: পাড়ার দোকানে ডিম কিনতে গেলে পাড়ার ছেলে ছোকরাদের জটলা থেকে ভেসে আসে, “এসব মণ্ডল ফণ্ডল ডি এম দিয়ে কি কোনও কাজের কাজ হয়?”

ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ‘জল জীবন মিশন’ প্রকল্পের শুরুতে গ্রামীণ এলাকায় ট্যাপের জলের সংযোগ ছিল মাত্র ১৬.৭ শতাংশ পরিবারের কাছে, যা ২০২৬ সালের ৩ মার্চের মধ্যে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১.৭১ শতাংশে। প্রায় ১৫.৮২ কোটি গ্রামীণ পরিবার আজ এই পরিষেবার আওতায়। এই অগ্রগতি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু, কেবল একটি সংযোগ পাওয়া আর সাম্য প্রতিষ্ঠা হওয়া এক কথা নয়। ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ দলিত স্টাডিজ’-এর বিনোদ কুমার মিশ্রের ২০২৩ সালের একটি গবেষণা (NSSO ৭৬তম রাউন্ডের তথ্যের ভিত্তিতে) বলে, উচ্চবর্ণের তুলনায় তফশিলি জাতিভুক্ত পরিবারগুলির নিজেদের বাড়িতে নিজস্ব জলের উৎস থাকার সম্ভাবনা আজও অনেক কম। এই পার্থক্যের অর্ধেকেরও বেশি কারণ হলো জাতিভিত্তিক বৈষম্য। অর্থাৎ, এই সমস্যা কেবল দারিদ্র্যের নয়, বরং এটি পরিকাঠামোর ভিতরে লুকিয়ে থাকা বঞ্চনার গল্প। মহাড সত্যাগ্রহ আজও শেষ হয়ে যায়নি; এটি চাভদার জলাশয় থেকে সরে এসে এখন ঘরের কল, স্ট্যান্ডপোস্ট, পাইপলাইনের মধ্যে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জল সরবরাহ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অনিয়মিত, দুষ্প্রাপ্য এবং দূষিত। এই বৈষম্যমূলক গ্রাম বা মফস্বলগুলোতে অভাবের মার সবার উপর সমানভাবে পড়ে না। ক্ষমতাশালীরা স্টোরেজ, ফিল্টার, ব্যক্তিগত ট্যাঙ্কার বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের জলের ব্যবস্থা করে নেয়। আর প্রান্তিক মানুষদের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়, কিংবা শেষ পর্যন্ত নোংরা জল খেয়েই দিন কাটাতে হয়।

জলের অধিকারের সঙ্গে স্যানিটেশন বা বর্জ্য নিষ্কাশনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। যে সমাজ দলিতদের একসময় পরিষ্কার জল নিতে বাধা দিত, সেই সমাজই আজও তাদের ম্যানহোল বা সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের মতো বিপজ্জনক কাজে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২৬ সালের সরকারি তথ্য বলছে, ‘নমস্তে’ (NAMASTE) প্রকল্পের অধীনে গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ৮৯,১১৪ জন সুয়ারেজ এবং সেপটিক ট্যাঙ্ক কর্মীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্য একটি দাপ্তরিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০১৩ এবং ২০১৮ সালের সমীক্ষায় ৫৮,০৯৮ জন ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জার বা হাতে বর্জ্য পরিষ্কার করা কর্মীকে শনাক্ত করা হয়েছিল। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে অন্তত ৪৭১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

ঠিক এই কারণেই ২০২৬ সালের আম্বেদকর জয়ন্তীকে সচেতনভাবে 'মহাড সত্যাগ্রহ' শতবর্ষ উদযাপনের সূচনা হিসেবে দেখা উচিত, যার মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে জল এবং জাতপাত। বাবাসাহেব আম্বেদকর মহাড কেবল জল পান করতে যাননি, তিনি ঘোষণা করেছিলেন—গণতন্ত্রের যাত্রা সেখানেই শুরু হয়, যেখানে অপমানের শেষ হয়।

একশ বছর পর ভারতকে আজ নিজের কাছেই প্রশ্ন করতে হবে, জল কি সত্যিই সবার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অধিকারে পরিণত হতে পেরেছে? নাকি আজও জাতপাতই ঠিক করে দেয়—কে নিরাপদ জল পান করবে, কারা বর্জ্য পরিষ্কার করবে আর কারা অকালে প্রাণ হারাবে?

যতক্ষণ না ভারতের প্রতিটি মানুষ জাতপাতের বাধা ছাড়াই নিরাপদ জল পাচ্ছে, ততক্ষণ মহাড সত্যাগ্রহ কেবল ইতিহাস নয়, বরং আমাদের সমাজের জন্য এক জ্বলন্ত সতর্কবার্তা।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।