কাশ্মীর থেকে দিল্লি: পেলেট গান কেন বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে?
Pellet guns: দিল্লির ছাত্র আন্দোলনে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। কাশ্মীরে ব্যবহৃত বিতর্কিত এই অস্ত্র কেন বারবার আলোচনায় আসে? ‘প্রাণঘাতী নয়’ বলা হলেও কীভাবে এটি গুরুতর আঘাত, অন্ধত্ব এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে?
দিল্লিতে ছাত্র-যুবদের আন্দোলন ঘিরে পুলিশি ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও অন্যান্য কঠোর পদ্ধতি ব্যবহার করছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই অভিযানে ১০০ জনেরও বেশি ছাত্র আহত হয়েছেন। পাশাপাশি অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজনের উপর পেলেট গানও ব্যবহার করা হয়েছে।
এই অভিযোগ সামনে আসতেই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক মাধ্যমে এমন কিছু ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে কয়েকজন আহত ছাত্রের শরীরে ছোট ছোট ক্ষতের চিহ্ন দেখা যায়। অভিযোগকারীদের দাবি, এগুলি পেলেটের আঘাতের ফল। তবে এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিক্ষোভ দমনে পেলেট গান ব্যবহার করা হয়নি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্ট ও দাবি 'ভুয়ো' বলে দাবি করেছে তারা। পুলিশের বক্তব্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত ভিড় নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিই ব্যবহার করা হয়েছে এবং পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
দিল্লির বিক্ষোভে পেলেট গানের আঘাতে আহত শেখ ইরশাদ মনসুরি। ছবি: ফেসবুক
এই ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক আরও বেড়েছে কারণ ভারতে পেলেট গান বহুদিন ধরেই একটি বিতর্কিত অস্ত্র। বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরে এর ব্যবহার নিয়ে অতীতে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। সত্যিই কি পেলেট গানকে ‘নিরাপদ’ বলা যায়?
বিক্ষোভ বা জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশ বা নিরাপত্তাবাহিনী ঠিক কতটা বলপ্রয়োগ করতে পারে, তা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান থেকে শুরু করে রাবার বুলেট—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে ‘কম ক্ষতিকর’ বা ‘লেস-লেথাল’ অস্ত্র ব্যবহারের ধারণা। এই তালিকাতেই রয়েছে পেলেট গান। সরকারিভাবে একে ‘নন-লেথাল’ বা প্রাণঘাতী নয় বলে বর্ণনা করা হলেও, বাস্তবে এই অস্ত্রের ব্যবহার বহুবার গুরুতর আঘাত, অন্ধত্ব এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটিয়েছে।
পেলেট গান আসলে একটি বিশেষ ধরনের পাম্প-অ্যাকশন শটগান। সাধারণ গুলির মতো এটি বড় বুলেট ছোড়ে না। বরং একটি কার্টিজের ভিতরে থাকে শত শত ক্ষুদ্র লোহার প্যালেট। ট্রিগার টানার সঙ্গে সঙ্গে কার্টিজ ফেটে সেই ছোট ছোট প্যালেট চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই কারণেই এটি একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নয়, একটি বড় এলাকায় একসঙ্গে আঘাত করতে পারে। নিরাপত্তাবাহিনীর যুক্তি, বড় জনতাকে দ্রুত ছত্রভঙ্গ করার জন্য এই অস্ত্র কার্যকর।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
NEET Protest vs Shaheen Bagh and Farmers' Protest: শাহিনবাগে ছিল নাগরিকত্বের প্রশ্ন, কৃষক আন্দোলনে জীবিকার লড়াই। কিন্তু দিল্লির নিট-দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন কেন অন্যরকম? কীভাবে এই আন্দোলন ধর্ম বা জীবিকার গণ্ডি ছাড়িয়ে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহির প্রশ্নকে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে এনে ফেলল?
দিল্লির বিক্ষোভে পেলেট গানের আঘাতে আহত। ছবি: ফেসবুক
ভারতে পেলেট গানের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে জম্মু ও কাশ্মীরে। ২০১০ সালে পুলিশের গুলিতে বহু মানুষের মৃত্যুর পর কেন্দ্র সরকার প্রাণঘাতী গুলির পরিবর্তে পেলেট গান ব্যবহারের অনুমতি দেয়। উদ্দেশ্য ছিল, সরাসরি গুলি চালিয়ে মৃত্যু ঘটানোর বদলে এমন একটি অস্ত্র ব্যবহার করা, যাতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিন্তু প্রাণহানি কম হয়।
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা খুব দ্রুত সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কারণ, পেলেটগুলি ছড়িয়ে পড়ায় ঠিক কোথায় আঘাত করবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বিশেষ করে মুখ, চোখ, গলা বা বুকে লাগলে তার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কাশ্মীরে পেলেট গানের আঘাতে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। অনেকের শরীরের ভিতরে পেলেট থেকে গিয়েছে, যা অস্ত্রোপচার করেও সব সময় বের করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণায়ও দেখা গিয়েছে, এই ধরনের অস্ত্র গুরুতর আঘাত, অক্ষমতা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই কারণেই ‘নন-লেথাল’ শব্দটি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন বহু বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, যে অস্ত্র মানুষের চোখ নষ্ট করতে পারে বা মৃত্যু ঘটাতে পারে, তাকে সম্পূর্ণ অপ্রাণঘাতী বলা বিভ্রান্তিকর। বরং ‘লেস-লেথাল’ বা তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী বলা বেশি যথাযথ। কারণ এই অস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হত্যা নয়, কিন্তু ভুল পরিস্থিতিতে বা ভুলভাবে ব্যবহার হলে এর ফল ভয়াবহ হতে পারে।
পুলিশ বা আধাসামরিক বাহিনীর বক্তব্য অবশ্য আলাদা। তাদের দাবি, বিক্ষোভকারীরা যখন পাথর ছোড়ে, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করে বা নিরাপত্তাবাহিনীর উপর হামলা চালায়, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কিছু মাত্রায় বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয়। সেই তুলনায় পেলেট গান সরাসরি রাইফেলের গুলির চেয়ে কম প্রাণঘাতী। তাদের মতে, এটি শেষ বিকল্প নয়; সাধারণত প্রথমে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান বা সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেই পেলেট গান ব্যবহার করা হয়।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলির বক্তব্য, বাস্তবে এই নিয়ম সব সময় মানা হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই ভিড়ের দিকে সরাসরি পেলেট ছোড়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিশু, পথচারী বা যারা বিক্ষোভে সরাসরি অংশ নেননি, তাঁরাও আহত হয়েছেন। কারণ একবার কার্টিজ থেকে পেলেট বেরিয়ে গেলে সেগুলি অনিয়ন্ত্রিতভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে আঘাত করার সুযোগ থাকে না।
শরীরে একটি বা দুটি নয়, কখনও শতাধিক ক্ষুদ্র ধাতব কণা ঢুকে যেতে পারে। চোখে লাগলে রেটিনা ছিঁড়ে যাওয়া, কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা স্থায়ী অন্ধত্বের আশঙ্কা থাকে। শরীরের অন্য অংশেও সংক্রমণ, হাড় ভাঙা কিংবা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হতে পারে। অনেক সময় এত ছোট প্যালেট শরীরের গভীরে ঢুকে যায় যে অস্ত্রোপচার করে বের করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ভিড় নিয়ন্ত্রণে রাবার বুলেট, প্লাস্টিক বুলেট, বিন-ব্যাগ রাউন্ড বা স্পঞ্জ রাউন্ডের মতো বিভিন্ন কম প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিতর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শরীরের সংবেদনশীল অংশে আঘাত লাগলে এই অস্ত্রগুলিও গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। তাই অধিকাংশ আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় বলা হয়, এগুলি ব্যবহার করতে হলে কঠোর প্রশিক্ষণ, স্পষ্ট নিয়ম এবং সর্বোচ্চ সংযম প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলিও বারবার বলেছে, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ অবশ্যই পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। যেখানে আলোচনা, সতর্কবার্তা বা অন্য উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব, সেখানে এমন অস্ত্র ব্যবহার করা উচিত নয় যা শারীরিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
ভারতে পেলেট গান নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে কাশ্মীরের অভিজ্ঞতা। বহু আহত মানুষের ছবি, চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা শিশু বা তরুণদের গল্প আন্তর্জাতিক স্তরেও আলোড়ন তুলেছিল। ফলে কোনো অস্ত্রকে শুধু ‘নন-লেথাল’ বললেই তা নিরাপদ হয়ে যায় না।
পেলেট গানকে ঘিরে বিতর্কের মূল প্রশ্নটি আজও একই রয়ে গেছে। জননিরাপত্তা বজায় রাখতে রাষ্ট্রের হাতে কি এমন একটি অস্ত্র থাকা উচিত, যার উদ্দেশ্য প্রাণহানি কমানো হলেও বাস্তবে তা বহু মানুষের জীবন চিরতরে বদলে দিতে পারে? নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের এই ভারসাম্য নিয়েই আলোচনা এখনও শেষ হয়নি। বরং প্রতিটি নতুন বিক্ষোভের সঙ্গে সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ফিরে আসে।
তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোনো সরকারি বা স্বাধীন ফরেনসিক প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, যা নিশ্চিতভাবে দেখায় যে দিল্লির এই ছাত্র আন্দোলনে পেলেট গান ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন আন্দোলনকারীদের অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে পুলিশ তা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছে। বিষয়টি নিয়ে এখনও স্পষ্ট ও স্বাধীন তদন্তের অপেক্ষা রয়েছে।








