বিয়ের মণ্ডপে বর হাজির ল্যাপটপ হাতেই, চলছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম ওয়েডিং’

Work form home : ‘ওয়ার্ক ফর্ম হোম’, সুবিধা বেশ কিছু আছে ঠিকই, তবে এছাড়া অসুবিধাও রয়েছে ঢের

Kankana Mukherjee
৪ মিনিট
বিয়ের মণ্ডপে বর হাজির ল্যাপটপ হাতেই, চলছে  ‘ওয়ার্ক ফ্রম ওয়েডিং’

করোনা আবহে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন ট্রেন্ড, 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম।’ অর্থাৎ এখন জ্বর বা শরীর খারাপ হলেও অফিস থেকে নিস্তার নেই। বাড়িই বদলে হয়েছে দপ্তর। জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে অবসর। ব্যক্তিগত পরিবেশেও সেঁধিয়ে গিয়েছে অফিস। এমনকী বিয়ের আসরেও রেহাই মেলেনি অফিস থেকে। সম্প্রতি ভাইরাল একটি ভিডিওতে রয়েছে সেই নজিরই। বিয়ের পিঁড়িতে বসেও বরের কোলে ল্যাপটপ, মন্ত্রের পাশাপাশিই পুরোদমে চলছে ‘ওয়ার্ক ফর্ম ছাদনাতলা’।

২০২০ সাল, সবেমাত্র থাবা বসিয়েছে করোনা, নিমেষে থমকে গিয়েছিল ব্যস্ত জীবন। তবে ভয় একটু কাটিয়ে উঠতেই শুরু হয়ে যায় ‘নিউ নর্মাল’। নামেই নর্মাল, তবে আদ্যোপান্ত নতুন একটা পদ্ধতি। যার জেরে একটা চিরাচরিত অভ্যাস বদলে গেল নিমেষে। বদলে গেল রোজকার জীবনের হালচাল। আর সেই রেশ চলছে এখনও। অফিসে যাওয়ার জন্য বাসের পিছনে ছোটা নেই, নেই ট্রেন লেট থাকার ফিরিস্তিও। এমনকী ঠিক সময়ে অফিসে ঢুকতে না পারলে ‘লেট ফাইন’ করার হিসেবও এখন অস্তাচলে। এখন কেবল বাড়ি থেকেই ‘লগ ইন’ করার তাড়া। কিন্তু এই যে আস্ত একটা নতুন নিয়মে অচিরেই বাঁধা পড়ে গেলাম আমরা, কী তার পরিণতি? ওয়ার্ক ফর্ম হোম শাপে বর নাকি, গলার ফাঁস? ভাবাচ্ছে এসব প্রশ্ন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এক মাসে ৩২ লক্ষ বিয়ে! বাঙালির বিয়ে যেভাবে হয়ে উঠল 'ইভেন্ট'

Marriage Ceremony : বিবাহ নাকি জোরদার কোনো ইভেন্ট, প্রশ্ন উঠছে হাল আমলের বাঙালি বিয়ের রীতিকে ঘিরে

মুঠোফোনে আচ্ছন্ন একটা গোটা প্রজন্ম। কলম ধরার বয়স থেকেই ফোন ধরছে শিশুরা। সবকিছুই এখন ওই চারকোণা যন্ত্রে আটকা পড়ে গেছে। বয়স আরেকটু বাড়লেই এ অভ্যাসে যোগ হচ্ছে ট্যাব, ল্যাপটপ সহ নানা কিছুই। যার জের এখন স্কুল কলেজ ছড়িয়ে অফিসে গিয়ে ঠেকেছে। সর্বক্ষণ হোয়াটসঅ্যাপ অথবা মেসেঞ্জারের টুং শব্দে সতর্ক আমরা। আর এই সতর্কতাই পিছু ধাওয়া করতে করতে এক্কেবারে হাজির হয়েছে ছাদনাতলায়। কী আর করা! বরও তাই একসঙ্গেই সামলাচ্ছেন দুই দায়িত্ব। সব্যসাচীর মতো। পুরোহিত মন্ত্র বলে যাচ্ছেন নিজের মতো, কানে শুনেই বিয়ের দায়টুকু সারছেন বর। কিন্তু হাত চলছে ল্যাপটপে। আসল ঘটনা অবশ্য জানে না কেউই। তবে ছবি দেখে নিজেদের জীবনের সঙ্গে তুলনা টানাকেই দস্তুর ভাবছেন নেটিজনেরা। আর কপাল চাপড়ে দেখে নিচ্ছেন, ভাবছেন তাদের জীবনেও এমন দশাই আসন্ন বুঝি!

ধরা যাক, বিয়ের দিন সবেমাত্র মন্ত্রপাঠ শুরু হয়েছে মণ্ডপে। পুরোহিত বুঝি হাতে তুলে দিয়েছেন ফুল অথবা কুশি। এইবারই বলতে হবে সেই চিরাচরিত মন্ত্র ‘যদিদং হৃদয়ং তব’, ব্যাস এমন সময় হঠাৎ নোটিফিকেশনের শব্দ। আর ওমনি সব ফেলে পাশে রাখা ল্যাপটপটা কোলে তুলে টাইপ করতে লাগলো বর। ভাবুন তো এবার, ‘হৃদয়ং’-এর হৃদয় খানা আসলে কোথায় বাধা পড়লো তাহলে!

‘ওয়ার্ক ফর্ম হোম’, সুবিধা বেশ কিছু আছে ঠিকই। এই যেমন বাড়িতে থাকার সময়সীমা বেড়েছে। একটু ফিকির খুঁজে দুয়েকটা নিমন্ত্রণ খেয়ে নেওয়াও যাচ্ছে বেশ কিছু সময়। তবে অসুবিধাও রয়েছে ঢের। এখন আর কোনো কিছুরই নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। খাওয়া, ঘুম সবই চলছে অফিসের বয়ানে।

এর একটা বড় দিক হল, কর্পোরেটের প্রেসারে আমাদের শরীর দিন দিন এমন একটা যন্ত্রে পরিণত হয়েছে যে কাজ ছাড়া থাকতে নেই, এমনটাই বিশ্বাস করেছে সে। তাই কাজের তথাকথিত সময়সীমার বাইরেও নজর রাখছে গ্রুপে। ছুটির দিনেও এর অন্যথা নেই। তার ওপর বাড়িতে থেকেই কাজ বলে হিসেবের ছুটিও গেছে কমে। তাই অহেতুক ছুটি নষ্ট করেনা কেউই। যাতে বছর শেষে কটাদিন বাইরে ঘুরতে যেতে পারে। ফলে অবসরকে নিয়ত গ্রাস করছে এই প্রক্রিয়া। আর সবশেষে যেটা না বললেই নয়, তা হল টার্গেটের চাপ। বছরের শেষে হিসেবে খামতি হলে আর ব্যক্তিগত জীবনে কীই বা এল, কীই বা গেল! কর্পোরেট জীবনের একটা নেশা আছে। বুঁদ হয়ে থাকি আমরা। একটা অকৃত্রিম উপরে ওঠার হাতছানি সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখে আমাদের। এর বুঝি সত্যিই কোনও শেষ নেই। আরও খানিক নিজেকে প্রমাণ করা, প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে আরও খানিকটা ছুটে নেওয়া, এটাই জীবন হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। তাই সম্প্রতি নেটমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিয়ের সকালের ছবিটি, যেখানে ল্যাপটপ হাতে বরের বেশে বসে রয়েছেন একজন, তা সাময়িকভাবে হাস্যকর মনে হলেও, এর আড়ালের ছবিটা মোটেই মজার নয়।

কোভিড মহামারির পর অনেকেই বাড়িতে বসে কাজ করেন কিন্তু বিয়ের মণ্ডপে বরের এই হাল দেখে তাজ্জব সকলেই। সম্প্রতি ছবিটি ইন্সটাগ্রাম থেকে শেয়ার হওয়া মাত্রই ঝড় তুলেছে নেট মাধ্যমে। যদিও বাঙালি বিয়ের এ ঘটনাই প্রথম নয়, এর আগেও কিছু ক্ষেত্রে সামনে এসেছে এরকম ঘটনা। কিছুদিন আগেই মহারাষ্ট্রের এক বিয়েবাড়িতে দেখা গিয়েছে এক চিত্র। বিয়ের আসরে বর, বউ দু’জনেই রয়েছেন, রয়েছেন পুরোহিতও। কিন্তু বরের কোলে রয়েছে সেই ল্যাপটপ। যেন বিয়ের ছুটি কাটছাঁট করে, কাজের ফাঁকে ফাঁকেই সেরে নিচ্ছেন আচার। আর এইসব ঘটনাই ভাইরাল হচ্ছে নিমেষের মধ্যে। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এ আর নতুন কি!

চিকিৎসকরাও রীতিমত চিন্তিত এই নিয়ে। এই কাজের চাপ তো কেবল কয়েকটা প্রশ্নেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। এর সঙ্গে এসে জড়ো হয়েছে নানারকম শারীরিক সমস্যাও। এক জায়গায় বসে ১০ ঘণ্টা থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ, এ ডেকে আনছে স্পন্ডেলাইটিস, বাত, মাইগ্রেন, ওবেসিটি এবং চোখের সমস্যার মতো হাজারটা রোগকে। ছুটি বাঁচানো নাকি কাজের চাপে যন্ত্রসম হয়ে যাওয়া, হাজার প্রশ্নের ভিড়ে জর্জরিত বর্তমান প্রজন্ম। তবে লাখ টাকার প্রশ্ন তো একটাই। পেশাগত জীবন কি এভাবেই গিলে খাবে ব্যক্তিগত পরিসরকে? নাকি বদল আসবে? উত্তর দেবে ভবিষ্যতই।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অথর ইজ ডেড, যে লেখে সে আমি নয় এআই?

Caine Prize winning story AI allegations: ১১ অক্টোবর লেখক ও সাংবাদিক ভোহিনি ভারা ‘দ্য আটলান্টিক’-এ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন—যার শিরোনাম ছিল “Yet Another Literary Prizewinner Seems to Be AI”। সেখানে তিনি জানান, ‘পাংগ্রাম’ নামের একটি এআই-ডিটেকশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে গল্পটি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এটি প্রায় পুরোটাই কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত।

জমিদারগিন্নির অপমানের জবাব দিতেই শুরু পাঞ্জা বাড়ির দুর্গাপুজো

Panja family Durga Puja: এক বর্ষামুখর দুর্গাষ্টমীর দিনে জমিদারবাড়ির মহিলারা, জমিদারগিন্নির সঙ্গে, বাড় সিউড়ির দুর্গাপ্রতিমা দর্শনে যান। ফেরার পথে কর্দমাক্ত রাস্তা পেরোনোর সময় দামি শাড়ি কাদা থেকে বাঁচাতে তাঁরা শাড়ির পাড় কিছুটা তুলে হাঁটছিলেন। কথিত আছে, তা দেখে পাড়ার কয়েকজন কটূক্তি করে বলেন— “পাঞ্জা বাড়ির বউ কাপড় উঠিয়ে চলছে!”

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।