ওয়ার্ক ফ্রম হোমে বিরক্ত? এই বাস্তু টিপসগুলি আপনাকে করে তুলবে আবার চনমনে

বিশ্ব এখনও করোনার প্রকোপমুক্ত হয়নি। প্রায় দেড় বছর ধরে সারাবিশ্ব ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছে। প্রথম সম্পুর্ন লকডাউন, এবং তারপর আংশিক লকডাউন যেন মানুষের জীবনকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে বেঁধে ফেলেছে। তার মধ্যে অধিকাংশ মানুষ এখনো বাড়ি থেকে কাজ অর্থাৎ ওয়র্ক ফ্রম হোম করছেন। কিন্তু, বাড়ি থেকে কাজ করা খুব একটা সহজ বিষয় তো আর নয়। লাগাতার বাড়ি থেকে কাজ করতে গিয়ে প্রত্যেক মানুষ নানা সময়ে নানা ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। অফিসের নিজস্ব ডেস্কে বসে যাদের কাজ করার অভ্যাস, তাদের ক্ষেত্রে ওয়ার্ক ফ্রম হোম সবথেকে বেশি সমস্যাজনক হয়ে উঠেছে। 

কিন্তু এই নিউ নরমালের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সকলেই নিজের আলাদা আলাদা কাজ করার পদ্ধতি বের করে আনছেন। কেউ কেউ নিজের বেড রুমের পাশেই একটি ছোট্ট কোনায় নিজের ওয়ার্কস্পেস তৈরি করেছেন, তো কেউ আবার শিফট করে গিয়েছেন ডাইনিং রুমে। এমনকি অনেকে নিজের ঘরের গেস্ট রুম ব্যবহার করছেন বাড়ি থেকে কাজ করার জন্য। কিন্তু, একথাও মেনে নিতে হবে বাড়িতে বসে কাজ করা সব সময় সবার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও অনেকে বাড়িতে কাজ করতে স্বচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এমনকী কাজ করতে করতে অনেকে তিতিবিরক্ত হয়ে ওঠেন। যার ফলে কাজের ক্ষেত্রে তো ক্ষতি হয়ই, ব্যক্তিগত জীবনেও নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। 

কিন্তু, আপনার পার্সোনাল এবং প্রফেশনাল জীবনের এই সমস্ত সমস্যা সমাধান করতে এবং বাড়ি পরিবেশকে আবারো‌ও স্বাভাবিক করতে আপনি ব্যবহার করতে পারেন কিছু বাস্তু টিপস। বাস্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই পরামর্শগুলি যদি কেউ মেনে চলে, তাহলে তাঁর বাড়ির পরিবেশ আবার আগের মত হয়ে উঠবে, এবং তিনি নিজেও বেশ এনার্জেটিক ফিল করবেন। চলুন সেরকমই কিছু বাস্তু টিপস দেখে নেওয়া যাক, যা আপনার কর্মজীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনকে স্বাভাবিক, সজীব করে তুলবে।

ডেস্ক রাখবেন কোনদিকে?

আপনি যদি ব্যবসায়ী হন, কিংবা আপনি লেখালেখি, ব্যাংক, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, কিংবা অ্যাকাউন্টসের মতো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন তাহলে আপনি নিজের ডেস্কের অভিমুখ উত্তর দিকে করে রাখুন। অন্যদিকে যদি আপনার কাজ কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, শিক্ষা, কাস্টমার সার্ভিস, টেকনিক্যাল সার্ভিস, আইন অথবা মেডিকেল সার্ভিস এর দিকে থাকে তাহলে আপনি নিজের ডেস্কের অভিমুখ রাখুন পূর্বদিকে। এর ফলে আপনি ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন এবং আপনি বেশ পজিটিভ এনার্জি পাবেন নিজের কাজের জন্য। তবে কাজ করার জন্য কখনোই উত্তর-পশ্চিম দিকটি বেছে নেবেন না। বাস্তু মতে, উত্তর-পশ্চিম দিকে বসে কাজ করা সবথেকে খারাপ। কারণ এই দিক থেকে সবথেকে বেশি নেগেটিভ এনার্জি আসে, যা আপনার কাজের ইচ্ছা এবং এবং কাজের সাফল্য দুটোই কমিয়ে দেবে।

কাজের ঘরের জন্য ঠিক রং পছন্দ করেছেন তো?

যদি আপনি বাড়িতে বসে এনার্জি নিয়ে কাজ করতে চান তাহলে সঠিক ভাবে আপনার কাজের ঘরের দেয়ালের রং নির্ধারণ আপনাকে করতে হবে। বাস্তু মতে, যদি আপনি নিজের ঘরের রং ক্রিম, হালকা হলুদ, কচি কলাপাতা সবুজ, অথবা হালকা সোনালী রাখেন তাহলে আপনি সারাদিন এনার্জেটিক থাকবেন। কখনোই কালো এবং নীল এই দুটি রং নিজের কাজের ঘরের জন্য নির্ধারণ করবেন না। কালো রং নেগেটিভিটির স্বরূপ, এবং নীল রংটি ব্যবসায়ীদের জন্য খুব একটা ভালো নয়। নীল রং সাধারণত জলের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে, যা আপনার কাজের জায়গার স্থায়িত্ব কমিয়ে দেবে। সঙ্গে এই দু'টি রং ব্যবহার করলে আপনার শরীর স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো থাকবে না। 

বাড়িতে কাজের পরিবেশ ভালো রাখতে হলে আপনাকে অবশ্যই নিজের বাড়ির রং সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। যদি ক্রিম রঙের মতো কোনো একটি নিউট্রাল রং আপনি ব্যবহার করেন আপনার ঘরের দেওয়ালে, তাহলে আপনি নিজের কাজের প্রতি আরো বেশি সংবেদনশীল হবেন এবং আরো ভালোভাবে নিজের কাজ করতে পারবেন। হালকা হলুদ রং আপনার শরীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। কচি কলাপাতা সবুজ রংটি আপনার দেহ, মন এবং আত্মাকে সজীব রাখে। হালকা সোনালী রং কাজের সফলতাকে ত্বরান্বিত করে।

টেবিল চেয়ার কী ভাবে রাখবেন?

বাস্তু মতে, আপনি যে চেয়ারে বসে কাজ করেন, সেই চেয়ারের পিছনে যদি একটি দেওয়াল থাকে তাহলে আপনার কাজের জন্য অনেকটা লাভবান হয়ে থাকে। কিন্তু, যদি সেই চেয়ারের পিছনে কোন দরজা, কিংবা কোনো জানালা থাকে তাহলে বাস্তুমতে বিষয়টি অত্যন্ত খারাপ। চেয়ার টেবিলের ব্যবস্থাপনা আপনার কাজের উপরে বেশ কিছু প্রভাব ফেলে। বলা হয়, যদি কোন জানলার সামনে কিংবা কোন দরজার সামনে বসে যদি আপনি কাজ করেন অথবা আপনি নিজের বসার চেয়ারটি রাখেন তাহলে সেই নির্দিষ্ট কাজে আপনার আর্থিক ক্ষতি হতে পারে, অথবা আপনার কোম্পানির ক্ষতি হতে পারে। 

কাজের টেবিলের উপরে হাজারো রকমের ফাইল, কাগজপত্র কিংবা বাড়ির কোন জিনিস রাখবেন না। এর ফলে বাস্তু মতে, আপনার কাজের ক্ষতি হতে পারে এবং আপনার নিজের মনসংযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। যদি আপনার মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটে, অথবা আপনার কাজের ক্ষেত্রে নেগেটিভ এনার্জি কাজ করে তাহলে আপনার কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন হবে না। তাই আপনার কাজ করার টেবিল সব সময় পরিষ্কার রাখুন, খুব বেশি হলে কোন পেন স্ট্যান্ড, কোন পেপার প্যাড, পেপার ওয়েট, অথবা আপনার ইষ্টদেবতার কোনও ছবি রাখতে পারেন। তা অনেকাংশে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এছাড়াও, যদি আপনি নিজের কোম্পানিকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চান, তাহলে আপনি নিজের কাজের টেবিলের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটা গ্লোব রাখতে পারেন। এই গ্লোব আপনার ব্যবসাকে সারা বিশ্বে ছড়ানোর রাস্তা সহজ করবে।

ঘরের আলো ঠিকঠাক আছে তো?

যদি আপনি নিজের ঘরেই নিজের কাজের জায়গা তৈরী করতে চান তাহলে সঠিক ভাবে নিজের ঘরের আলোর ব্যবস্থা রাখুন। যদি আপনার ঘরে সঠিকভাবে আলো সেটআপ করা থাকে, তা আপনার কাজের ইচ্ছাশক্তিকে অনেকটা বাড়িয়ে দেবে। সঙ্গেই, তা আপনার সফলতাকেও ত্বরান্বিত করবে। আপনার মুড এর উপরে এবং আপনার কাজের উপরে নিজের কাজের ঘরের আলো নির্ধারণ করুন। যদি আপনার ঘরের আলো অত্যন্ত বেশি উজ্জ্বল হয়, অথবা ঔজ্জ্বল্য খুবই কম থাকে, তাহলে তা আপনার চোখের উপরে খারাপ প্রভাব ফেলবে। সঠিক আলো না হলে, আপনার ঘরের বাস্তু কাজ করবেনা, এবং আপনি সাফল্যের মুখ দেখতে পাবেন না। এর ফলে আপনার কাজ বাধাপ্রাপ্ত হবে, অগ্রগতি হবে না এবং সহকর্মীদের সঙ্গে আপনার বচসাও হতে পারে এই বাস্তু সমস্যার জন্য।

কিছু গাছও রাখতে পারেন  -

আপনি নিজের ঘরে কিছু গাছ রাখতে পারেন, যা আপনার কাজের জায়গাকে আরো সুন্দর এবং প্রাণবন্ত করে তুলবে। মানি প্ল্যান্ট, ছোট বাঁশ গাছ, সাদা লিলি ফুলের গাছ, ছোট রবার গাছ আপনি রাখতে পারেন। তবে এই গাছ আপনি অবশ্যই রাখুন উত্তর অথবা পূর্বদিকে। এই দুই দিকে যদি আপনি গাছে রাখেন তাহলে আপনার ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে এবং আপনার কর্মজীবনের জন্য বিষয়টি লাভবান হবে। তবে কখনোই শুকনো গাছ রাখবেন না। গাছে প্রতিদিন জল দেবেন এবং ভালোগাছ রাখার চেষ্টা করবেন যেগুলি বাড়ির মধ্যে বড় হতে পারে। বনসাই জাতীয় গাছ রাখবেন না, এগুলি আপনার কাজের ক্ষতি করতে পারে। সব সময় এমন গাছ রাখবেন যেগুলির পাতা হালকা সবুজ রঙের।

কাজের চাপ কমাতে রাখুন ফুল -

নিজের কাজের জায়গায় অবশ্যই কিছু ফুল রাখুন। ফুল আপনার প্রত্যেক দিনের কাজের টেনশন কমিয়ে দেবে। এছাড়া আপনার সারাদিনের কাজের পরে হওয়া ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করবে ফুল। বাস্তু মতে, ফুল মনকে শান্তি দেয় এবং সারাদিনের চাপ কমায়। তবে কখনোই শুকিয়ে যাওয়া ফুল রাখবেন না নিজের কাজের ঘরে। এমন ফুলও রাখবেন যেগুলো খুব একটা শুভ নয়। এই ধরনের ফুল রাখলে আপনার কাজের উল্টে ক্ষতি হতে পারে।

কিছু ভালো ছবি রাখুন -

আপনার কাজের ঘরের উত্তর দিকে সবুজ বনাঞ্চলের ছবি কিংবা কোন শস্যের ছবি রাখতে পারেন। এই দুই ধরনের ছবি রাখলে আপনার কাজ সমাদৃত হবে। এছাড়া যদি দক্ষিণ এবং পশ্চিম দিকে কোন পর্বতের ছবি কিংবা কোন বড় পাথুরে এলাকার ছবি রাখেন, তাহলে আপনার কাজের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করবে সেই ছবি। কিন্তু কখনোই পূর্বদিকে এই ধরনের ছবি রাখবেন না। 

পূর্বদিকে যদি আপনি ছবি রাখতে চান তাহলে ছোট কোন গাছের ছবি, ঘোড়ার ছবি, উড়ন্ত পাখির ছবি, স্বস্তিক চিহ্ন, উদীয়মান সূর্যের ছবি, এইসব রাখা যেতে পারে। সমুদ্র, নদী কিংবা রদের ছবি আপনি রাখতে পারেন উত্তর এবং পশ্চিম দিকে। কিন্তু ক্রন্দনরত শিশু, পুরনো কোনও বৃদ্ধ গাছ, ভাঙা মূর্তি, ডুবতে থাকা জাহাজ, এই সমস্ত ধরনের কোন ছবি নিজের কাজের জায়গায় রাখবেন না।

যদি করোনাভাইরাস আমাদের কিছু শিখিয়ে থাকে তাহলে সেটা হল একক ভাবে কাজ করতে পারা, স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া । যদি আপনার  বাড়িতেও এরকম একটি কাজের জায়গা থাকে এবং আপনি বাড়িতে বসে নিজের অফিসের কাজ করেন তাহলে উপরে লেখা বাস্তু টিপসগুলি মেনে চলতে পারেন, তাহলে আপনার কাজের ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা সুবিধেই হবে, বাস্তুবিদরা অন্তত এমনটাই মনে করেন। পাশাপাশি আপনি অত্যন্ত গুছিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে নিজের কাজ করতে পারবেন এবং আপনার কর্মান্তে চওড়া হাসি সুনিশ্চিত হবে।

More Articles

;