জ্ঞানবাপী: শোনাই হলো না মুসলিম পক্ষের আবেদন, পুজোর অনুমতি নিয়ে দ্রুত শুনানি
Gyanvapi Mosque Dispute: হাইকোর্ট বারাণসীর একটি আদালতকে নির্দেশ দিয়েছে, যাতে আগামী ৬ মাসের মধ্যে হিন্দু পক্ষের আবেদন খতিয়ে দেখে ৬ মাসের মধ্যে বিষয়টির শুনানি শেষ করা হয়।

মসজিদ ভেঙে মন্দির, মসজিদের ভিতর মন্দির। নতুন ভারতের রক্ত গরম করা ইস্যু এখন এগুলোই। অন্তত বছর কয়েক ধরে তেমনটাই নজরে আসছে। উত্তরপ্রদেশের জ্ঞানবাপী মসজিদ নাকি আদতে কাশি বিশ্বনাথ মন্দির। এ নিয়ে সেই ২০২১ সাল থেকে টানাপড়েন, আইন আদালত চলছে। হিন্দুপক্ষের দাবি মেনে নানাবিধ পরীক্ষা, সমীক্ষা অনেককিছুই হয়েছে জ্ঞানবাপী মসজিদে। তবে এবার ইলাহাবাদ হাইকোর্টে সটান খারিজ করে দিল মসজিদ পক্ষের আর্জি। হিন্দুপক্ষের দাবির বিরোধিতা করে যে পিটিশন তারা জমা করেছিল, তা মঙ্গলবার খারিজ করে দিয়েছে উচ্চ আদালতে। বরং পুজোর অধিকার নিয়ে দ্রুত শুনানির পক্ষেই সওয়াল আদালতের।
হাইকোর্ট বারাণসীর একটি আদালতকে নির্দেশ দিয়েছে, যাতে আগামী ৬ মাসের মধ্যে হিন্দু পক্ষের আবেদন খতিয়ে দেখে ৬ মাসের মধ্যে বিষয়টির শুনানি শেষ করা হয়। ইলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বিতীয় রায় এটি, যা শোনার পর কার্যত খুশির ঢল নেমেছে হিন্দু পক্ষে। তাঁদের দাবির পক্ষেই এদিন ঝুঁকেছে উচ্চ আদালতের রায়। হিন্দু পক্ষের আইনজীবী হরি শঙ্কর জৈন জানান, আদালতের রায় একেবারে সঠিক। এই মামলায় 'প্লেস অব ওয়ারশিপ' আইনটি খাটে না বলেই দাবি তাঁর। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে একমাত্র প্রামাণ্য বিষয় এটাই যে জায়গাটি আদৌ ধর্মীয় স্থানের কাঠামো কিনা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রশ্ন ওঠে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে। প্রেস কাউন্সিলের নির্দেশ মানলে মিডিয়ার উচিত ছিল, এই বিষয়টিকে সংবেদনশীল না করে তোলা, কারণ এর মধ্যে প্রত্যক্ষ সাম্প্রদায়িক ইন্ধন রয়েছে।
প্রায় বছর দুয়েক ধরে এই জ্ঞানবাপী মামলায় নানাবিধ টানাপড়েন চলেছে। তবে এই ইস্যুটি কিন্তু আজকের নয়। জ্ঞানবাপী মসজিদটি আসলে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের একটি অংশ বলে দাবি করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল একটি পক্ষ। এরপর সেই মামলা গড়ায় ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের সমীক্ষা পর্যন্ত। সেইসব পরীক্ষানিরিক্ষায় মসজিদের ভিতর থেকে শিবলিঙ্গ পাওয়া গিয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। পরে জানা যায় মসজিদের ওজুখানার একটি কাঠামো সেটি। এসব নিয়ে লাগাতার টানাপড়েন চলেছে দীর্ঘদিন। আপাতত এই রামমন্দির হাওয়ায় ফের উস্কে উঠল সেই জ্ঞানবাপী মন্দির।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাসদুয়েক আগে বিজেপি নেতাদের বারংবার দাবির জেরে পাঠ্যবই থেকে টিপু সুলতানকে গৌরবান্বিত করা অধ্যায় বাদ দেওয়ার ব্যাপারে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে সরকার।
দেশকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে দীর্ঘদিন। আর সেই হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার পথে সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ যে অ-হিন্দু স্থাপত্য, ধর্মস্থানের ভিতর থেকে হিন্দু বীজ খুঁজে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা। দেশের একের পর এক জায়গার নাম বদলে গিয়েছে মোদিজমানায়। ইলাহাবাদ হয়েছে প্রয়াগরাজ, আলিগর হচ্ছে হরিগর। এই তালিকা দীর্ঘ। সম্প্রতি অসমের বিজেপি সরকার রাজ্যের সমস্ত মাদ্রাসাগুলোর নাম পাল্টে ফেলার কথা ঘোষণা করেছে। ইতিমধ্যেই তাজমহলে হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। একের পর এক মসজিদের ভিতর খোঁজা হয়েছে হিন্দু দেবদেবীর অস্তিত্ব। নষ্ট করা চেষ্টা করা হচ্ছে একের পর এক ইসলাম স্থাপত্য।
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদের সামনে যে তাণ্ডব দেখিয়েছিল একদল হিন্দুত্ববাদী, তার ফসল যে আজকের অযোধ্যা রামমন্দির, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিছুদিনের মধ্যে মহাধূমধাম করে উদ্বোধন করা হবে নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নের এই মন্দিরের। অযোধ্যা রামমন্দির হাওয়ার মাঝখানে মসজিদপক্ষের আবেদন যে আদালতে খারিজ হয়ে যাবে, তা-ও বোধহয় খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। আঞ্জুমান ইন্তেজেমিয়া মসজিদ কমিটি (AIMC) এবং উত্তর প্রদেশ সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড ২০২১ সালেপর ৮ এপ্রিল বারাণসী কোর্টে আবেদন জানিয়েছিল। সেই মামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল আদালত। ফের আদালতে একই রকম ধাক্কা খেল মসজিদ-পক্ষ।
তবে এই অসম যুদ্ধে আইনের দাঁড়িপাল্লাটি যে সবসময়েই একটি দিকে ঝুঁকে, তা এতদিনে বুঝতে অসুবিধা হয় না। এই মামলা-মোকদ্দমার ইতিহাসটি বিস্তর লম্বা। সেই ১৯৯১ সাল থেকে জ্ঞানবাপী মন্দির নিয়ে আইন আদালত মামলা মোকদ্দমা চলছে। শুধু সময় বিশেষে, বিশেষত আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালেই যখন লোকসভা ভোট, তেমন সময় বুঝে খুঁচিয়ে তোলা হয় জ্ঞানবাপী মসজিদের মতো মামলাগুলিকে। আসলে এই সব মামলা-মোকদ্দমার নেপথ্যে যে অন্য অঙ্ক জড়িয়ে ছিল, আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে, তা বুঝতে বোধহয় বিশেষ অসুবিধা হয় না। সমঝদারদের জন্য যে এসব ছোটখাটো ইশারাই কাফি।







