বেছে বেছে বাদ যিশু থেকে টিপু সুলতান, কর্ণাটকের বিকৃত সিলেবাস চেনাচ্ছে বিজেপির 'জাত'

মাসদুয়েক আগে বিজেপি নেতাদের বারংবার দাবির জেরে পাঠ্যবই থেকে টিপু সুলতানকে গৌরবান্বিত করা অধ্যায় বাদ দেওয়ার ব্যাপারে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে সরকার।

tiasa gupta
৩ মিনিট
বেছে বেছে বাদ যিশু থেকে টিপু সুলতান, কর্ণাটকের বিকৃত সিলেবাস চেনাচ্ছে বিজেপির 'জাত'

বিতর্কের কেন্দ্রভূম বাসভরাজ বোমাইয়ের রাজ্য, অর্থাৎ কর্নাটক। হিজাব পরা নিয়ে কর্নাটকের বিতর্কের আঁচ পৌঁছে গেছিল অন্য রাজ্যেও। তার মধ্যে এবার সিলেবাস নিয়ে নতুন করে বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়েছে বিজেপি-শাসিত এই রাজ্যে। এর প্রতিবাদে যে সুধী সমাজ পথে নেমেছে, তাদের দাবি, এটা বিজেপির শিক্ষাকে গৈরিক করার চেষ্টা। সমাজকর্মী, আইনজীবীরা দল বেঁধে গত সোমবার বেঙ্গালুরুর সিভিল কোর্টের বাইরে প্রতিবাদ সংগঠিত করেন। তাঁরা আওয়াজ তোলেন, কারণ, কর্নাটকের সেকেন্ডারি স্কুল লিভিং সার্টিফিকেটের টেক্সট বুক পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কীসের ভিত্তিতে কেন এই সিলেবাসে পরিবর্তন, তার কোনও সদুত্তর নেই সরকারের কাছে। শিক্ষাকে গৈরিকীকরণ করার চেষ্টাকে দস্তুরমতো নিন্দা করেছেন বিদ্দ্বজ্জনরা। তাঁদের অভিযোগ, টেক্সট বুকের রিভিশন করার প্রক্রিয়া শুধু অগণতান্ত্রিকই নয়, ব্রাহ্মণত্ব কায়েম করার চেষ্টাও বটে। কর্নাটক সরকার প্রথমে স্কুলের টেক্সট বই রিভাইজ করে। পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয় টিপু সুলতানের গরিমা। পরে অবশ্য এই নিয়ে প্রতিবাদের আঁচ বুঝে ঢোক গিলতে হয় সরকারকে।

সিলেবাস বিতর্ক

সিলেবাস বিতর্ক প্রথম মাথাচাড়া দেয় আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার-এর বক্তৃতা দশম শ্রেণির রিভাইসড টেক্সড বুকে যোগ করার পর। নাগরিক সমাজ এর বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লেখে।

কর্নাটকের শিক্ষাদপ্তর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই থেকে মহীশূরের রাজা টিপু সুলতান, হজরত মহম্মদ, যিশু খ্রিস্ট-সংক্রান্ত একাধিক অধ্যায় বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মুঘল ও রাজপুতদের ইতিহাস ছাঁটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সিলেবাস থেকে। যা নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয় কর্নাটকে। জেডিএস-কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলি বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়। কংগ্রেস জানায়, ইতিহাস বদলে ফেলার অপচেষ্টা করছে বিজেপি। বিজেপি টিপু সুলতানকে 'লুঠেরা', 'সাম্প্রদায়িক নেতা' আখ্যা দিয়ে থাকে‌।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জ্ঞানবাপী আসলে ব্যর্থতা লুকনোর গোদি-মিডিয়া পালা

প্রশ্ন ওঠে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে। প্রেস কাউন্সিলের নির্দেশ মানলে মিডিয়ার উচিত ছিল, এই বিষয়টিকে সংবেদনশীল না করে তোলা, কারণ এর মধ্যে প্রত্যক্ষ সাম্প্রদায়িক ইন্ধন রয়েছে।

মাসদুয়েক আগে বিজেপি নেতাদের বারংবার দাবির জেরে পাঠ্যবই থেকে টিপু সুলতানকে গৌরবান্বিত করা অধ্যায় বাদ দেওয়ার ব্যাপারে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে সরকার। তবে কমিটি রিপোর্ট দেয়, অষ্টাদশ শতকের মহীশূরের রাজার অধ্যায় পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। কিন্তু টিপু সুলতানকে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার অপবাদ দিয়ে তাঁকে মহিমান্বিত করার বিপক্ষে বিজেপি। অন্যদিকে, প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি ডি শিবাকুমার জানিয়েছেন, ইতিহাস পালটে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি। সিলেবাস থেকে টিপু সুলতানের অধ্যায় বাদ দেওয়া ইস্যুতে তুমুল বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখল কর্নাটক সরকার। বিতর্কের জেরে আপাতত সিলেবাসে কাটছাঁট করছে না, জানিয়ে দিয়েছে কর্নাটকের শিক্ষাদপ্তর।

অহেতুক বিতর্ক?

এবারও ব্যতিক্রম নয়। হিজাবের মতো সিলেবাসের আঁচও পৌঁছে গেছে সারা দেশে। এই নিয়ে বিতর্কের আগুনে ফুটতে হচ্ছে সরকারকে। আগুন নেভাতে আসরে নামেন কর্নাটকের প্রাথমিক ও মধ্যশিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী বিসি নাগেশ। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এবং ছাত্রদের মধ্যে অযথা বিতর্ক ছড়ানো হচ্ছে। মিথ্যার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানো হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, পাঠ্যবইয়ে অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। সেগুলি পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। চেষ্টা চলছে, সঠিক ঘটনা সামনে নিয়ে আসার। স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবীরা এটা হজম করতে পারছেন না।

বোমাইয়ের মন্ত্রী যতই গলা ছাড়ুন, প্রশ্ন হল কেন বারবার কর্নাটককে বিতর্কে জড়াতে হচ্ছে? হিজাব বিতর্কের রেশ এখনও কাটেনি। সেই আগুন জ্বলছে ধিকিধিকি। তার মধ্যেই আবার বিতর্ক। খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়, বিজেপি-শাসিত কর্নাটকের হিজাব বিতর্ক ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছিল অন্য রাজ্যেও। তার স্বরূপ ক্রমশ জটিল হয়েছে। মুসলিম শিক্ষার্থীদের হিজাব পরে কলেজে আসতে নিষেধাজ্ঞা জারির পর কোনও কোনও কলেজে হিন্দু শিক্ষার্থীদের গেরুয়া ওড়না বা ‘স্কার্ফ’ পরে কলেজে আসতে দেখা যায়। ছাত্রদেরও গেরুয়া চাদর পরে কলেজে আসতে দেখা যায়। এই নিয়ে কোথাও কোথাও উত্তেজনাও দেখা দিয়েছিল। মুসলমান মেয়েরা আন্দোলনে নামেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা যায় হিন্দুদের দিক থেকেও। গেরুয়া চাদর গায়ে হিন্দু ছাত্রছাত্রীদের মিছিল করে কলেজে যেতে দেখা যায়। স্লোগান ওঠে ‘জয় শ্রীরাম’। কর্নাটকে হিজাব বিতর্কের সূচনা ঘটে যখন একটি কলেজে হিজাব পরা মুসলিম ছাত্রীদের ক্লাসে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২-এ কর্নাটক সরকার কলেজগুলিতে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে। হিজাবের জল গড়ায় আদালতে। এই প্রসঙ্গে বেশি চর্চা না করেও বলা যায় রাজ্যটা বিজেপি-শাসিত। তাই কি বারবার রাজ্যের রং গেরুয়া করার এত চেষ্টা!

সারা দেশে মন্দির-মসজিদ বিতর্ক। জ্ঞানবাপীর পর জামিয়া; ‘মন্দির ভেঙে হয়েছে মসজিদ’- পুজোর দাবিতে সোচ্চার বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। এবারও ঘটনাস্থল কর্নাটকের শ্রীরঙ্গপাটনা। এই এলাকার জামিয়া মসজিদটি হনুমান মন্দির ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছিল বলে দাবি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতাদের। ওই মসজিদে পুজো-পাঠ শুরুর দাবিতে সোচ্চার হয়েছে হিন্দুত্ববাদী এই সংগঠন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুমুল উত্তেজক পরিস্থিতি এলাকায়। এটা কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। রেহাই পাচ্ছে না কুতুব মিনার, তাজমহলও।

এটা অবশ্য নজর দেওয়ার বিষয় যে, ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে 'ধর্মনিরপেক্ষ’ রাষ্ট্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজেপি এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলি যে একে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার নেশায় মেতেছে, সেটা যে আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়, তা বলাই বাহুল্য। ভারতের রং গেরুয়া হতে পারে না, বরং রামধনুর মতো বৈচিত্রের রং লাগুক দেশের মানচিত্রে। যে শিক্ষা আগামীর জন্ম দেবে, তাদের পড়াশোনায় হিন্দুত্বের রং লাগতে পারে না, আর যাই হোক।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ইন্ডিয়া জোটের মিছিলে বাধা, সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হলো রিট

INDIA bloc's march towards supreme court: সোমবার কনট প্লেস থেকে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে ইন্ডিয়া ব্লকের ‘চলো দিল্লি’ মিছিল অনুষ্ঠিত হলো। রাহুল গান্ধীর দুই পাশে ছিলেন, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও নেহা বোরা। মিছিলে অংশ নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, ডি রাজা, সুপ্রিয়া সুলে। ভগবান দাস রোডে মিছিল পুলিশি বাধার সম্মুখীন হয়। শেষমেশ সুপ্রিম কোর্টে ‘রাহুল গান্ধী বনাম নির্বাচন কমিশন অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি রিট পিটিশন দাখিল হয়।

ব্যারিকেড ঘেরা দিল্লি, নজরদারির চোখে নাগরিক: নিরাপত্তা নাকি নিয়ন্ত্রণ?

Delhi Under Siege: জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লি কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছে। ৩৫ হাজার পুলিশ, কাঁটাতারের ব্যারিকেড, ড্রোন নজরদারি, ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ২৪ ঘণ্টার ইন্টারনেট শাটডাউন, ৭ হাজারের বেশি আটক। ওমর আব্দুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতির অভিযোগ তুলেছেন, দিল্লিতে 'কাশ্মীর মডেল'-এর প্রয়োগ চলছে।

প্রতিবাদের মানচিত্র থেকে মুছে গেল যন্তর মন্তর

Jantar Mantar protest site: আঠারো শতকে নির্মিত যন্তর মন্তর মূলত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার পাশের রাস্তা হয়ে ওঠে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রতিবাদীদের মিলনস্থল।

‘দুই নেহা’-র কাণ্ডে বিভ্রান্ত দিল্লি পুলিশ! AISA নেত্রী-কে আটকানো যাচ্ছে না কোনোভাবেই

AISA-র সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরাকে আটক করতে গিয়ে তাঁরই মতো দেখতে এক মেয়েকে আটক করল দিল্লি পুলিশ। অথচ সেই সময় আসল নেহা বোরা দিল্লির কনট প্লেসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যারিকেড পেরিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছিলেন।

রাহুল, নেহা, অভিজিৎ, ঐশী: কাউকেই দেবতা বানানো উচিত নয়

Gyanesh Kumar resignation: আজকে আমরা নেহাকে যে জায়গায় বসাচ্ছি, কাল সকালে যদি নেহার কোনো ত্রুটি হয় তাহলে কিন্তু আমরা এক মুহূর্তে তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দেব। তাহলে আমরাই বা আজকে নেহাকে এই জায়গায় বসাচ্ছি কেন?

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও দিল্লিতে সাংবাদিকদের আটক কেন?

সাংবাদিকদের আটকের ঘটনাটি সামনে এসেছে এমন এক দিনে, যখন সুপ্রিম কোর্টে দিল্লির বিক্ষোভ ঘিরে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং নাগরিকদের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ইন্ডিয়া ব্লকের সঙ্গে বৈঠকে নারাজ প্রধান বিচারপতি, কী কারণ দেখালেন তিনি?

CJI surya kant rejects INDIA bloc meeting: প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, মল্লিকার্জুন খাড়্গে ও রাহুল গান্ধীর বৈঠকের অনুরোধ কিছু 'কারণ দেখিয়ে' প্রত্যাখ্যান করলেন। তাঁর যুক্তি, বিষয়গুলি সাব জুডিস আর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর বৈঠক সাংবিধানিক ক্ষমতা বিভাজনের নীতি লঙ্ঘন করবে।

বিক্ষোভে বাধা, নেতাদের আটক! কোন পথে CJP-র আন্দোলন?

রাজধানীতে আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনার আবহে নিরাপত্তা বাহিনীর এই তৎপরতা নজর কেড়েছে। তবে রবিবারের পরবর্তী কর্মসূচি কোথায় এবং কীভাবে হবে, সে বিষয়ে সিজেপি-র ঘোষণার দিকে নজর রয়েছে।