রাহুর গ্রাস থেকে মুক্তি পেল টলিউড?

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নির্বাচনে অরূপ বিশাসের পরাজয়ের পর প্রশ্ন উঠছে— এবার কি অবশেষে 'বিশ্বাসী' তন্ত্র থেকে মুক্তি পেতে চলেছে টলিউড?

inscript
৩ মিনিট
রাহুর গ্রাস থেকে মুক্তি পেল টলিউড?

পশ্চিমবঙ্গের বিনোদন জগৎ এবং ক্রীড়াঙ্গন গত এক দশকে এমন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, যাকে হয়তো এক ‘অন্ধকার যুগ’ বলা যায়। স্টুডিও পাড়ার অলিগলি থেকে শুরু করে মেকআপ রুম পর্যন্ত—সর্বত্রই রাজত্ব চলত দুই ভাইয়ের। অরূপ বিশ্বাস ও স্বরূপ বিশ্বাস। একজনের প্রশাসনিক ক্ষমতা আর অন্যজনের ‘ফেডারেশন’ শাসন। এই দুই শক্তির জাঁতাকলে পড়ে টলিউড শুধু তার সৃজনশীলতাই হারায়নি, বরং এক ভয়ংকর ‘সিন্ডিকেট’ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে টলিপাড়ায় 'দাদাগিরি'র পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ বহুদিন থেকেই উঠে এসেছে। ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ থেকে শুরু করে ‘সিন্ডিকেট রাজ’, টলিউড যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল তাঁদের ইশারায়।

কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নির্বাচনে অরূপ বিশাসের পরাজয়ের পর প্রশ্ন উঠছে— এবার কি অবশেষে 'বিশ্বাসী' তন্ত্র থেকে মুক্তি পেতে চলেছে টলিউড?

১. ক্ষমতার অপব্যবহার

অরূপ ও স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, তাঁরা নিজেদের পদকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

  • মেসি-কাণ্ড ও অরূপ বিশ্বাসের দাপট: ২০১১ সালে লিওনেল মেসি যখন কলকাতায় পা রাখেন, তখন যুবভারতীতে যা ঘটেছিল তা ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে এক দুঃস্বপ্ন। অভিযোগ ওঠে, দর্শকদের মেসিকে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার চেয়ে তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস নিজে মেসির খুব কাছে থাকা এবং ছবি তোলায় বেশি ব্যস্ত ছিলেন। বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর ও অব্যবস্থাপনায় যখন সাধারণ দর্শকরা রক্তাক্ত হচ্ছিলেন, তখন মন্ত্রী মশাই ব্যস্ত ছিলেন ভিআইপি প্রটোকল সামলাতে।

  • স্বরূপ বিশ্বাসের ‘কার্ড’ রাজনীতি: স্বরূপ বিশ্বাস সিনেমার কোনো পেশাদার কর্মী না হয়েও একটি ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর’ কার্ড বাগিয়ে নেন এবং সেই ক্ষমতাবলে ফেডারেশনের (FCTWE) সভাপতি পদ দখল করেন। তাঁর এই পদাধিকার ব্যবহার করে তিনি পুরো স্টুডিও পাড়াকে নিজের করতলে নিয়ে আসেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
টলি কেলেঙ্কারি: স্বরূপ বিশ্বাসের উত্থান কখন, কীভাবে, কতটা?

Tollygunge Threat Culture: অন্যায্য ভাবে গিল্ডের কার্ড দখল, তোলাবাজি, সিন্ডিকেটে নাম জড়ানো, কীভাবে টালিগঞ্জের কেউকেটা হলেন স্বরূপ বিশ্বাস?

২. অনির্বাণ ভট্টাচার্য ও অন্যদের উপর ‘অলিখিত নিষেধাজ্ঞা’

  • অনির্বাণের বিরুদ্ধে ‘অলিখিত নিষেধাজ্ঞা’: ফেডারেশনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামার পর থেকেই অনির্বাণকে অঘোষিত বা ঘোষিত ‘ব্যান’ করে স্বরূপ বিশ্বাসের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশন। তাঁর মিউজিক ভিডিওর শুটিং বন্ধ করে দেওয়া হয়, টেকনিশিয়ানদের তাঁর সঙ্গে কাজ করতে নিষেধ করা হয়। এমনকী তাঁর মতো বড় তারকাকে ‘অঘোষিত বয়কট’ করে কাজ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা চলে মাসের পর মাস।

  • রাহুল মুখোপাধ্যায়ের ৩ মাসের ব্যান: পরিচালক রাহুল মুখোপাধ্যায়ের উপর তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়ে ফেডারেশন প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে, তাদের অনুমতি ছাড়া টলিউডে একটি পাতাও নড়বে না। এই ঘটনার প্রতিবাদে রাজ চক্রবর্তী, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকরা একজোট হয়ে ‘Cease Work’ বা কর্মবিরতির ডাক দিয়েছিলেন।

  • সুদেষ্ণা রায় ও বিদুলা ভট্টাচার্যের লড়াই: দেড় বছরের বেশি সময় কাজ না পাওয়া সুদেষ্ণা রায় বা আদালতের দরজায় কড়া নাড়া বিদুলা ভট্টাচার্য—সবাই এই ‘বিশ্বাসী’ তন্ত্রের শিকার। স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই কাজ কেড়ে নেওয়া হবে—এই ভয় টলিউডকে এক জেলখানায় পরিণত করেছিল।

৩. টলিউডের উপর ‘সিন্ডিকেট রাজ’

ফেডারেশনের সুবিধা নিয়ে স্বরূপ বিশ্বাস টলিউডকে অদ্ভুতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল

প্রোডাকশনের প্রয়োজন না থাকলেও জোর করে ফেডারেশন অনুমোদিত বাড়তি টেকনিশিয়ান নিয়োগ করতে বাধ্য করা হতো প্রযোজকদের। এতে অহেতুক খরচ বাড়ত এবং সিনেমার বাজেট ভেঙে পড়ত। ছবি কেউ ৩ পয়সা রোজগারের জন্য বানালে, তাকে ২ পয়সা খরচ করতে হতো এইসব কিছুর জন্য।

ফেডারেশনের অনুমতি ছাড়া কোনো স্বাধীন পরিচালক যদি কম বাজেটে কাজ করতে চাইতেন, তাকে ‘গুপি শুটিং’ তকমা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হতো। এমনকী ওই কাজে যুক্ত টেকনিশিয়ানদের ৩ মাস সাসপেন্ড করার হুমকি দেওয়া হতো।

স্বরূপ বিশ্বাসের প্রতি অনুগত না থাকলে স্টুডিও পাড়ায় টিকে থাকা ছিল খুব কঠিন। এই ‘পেশিশক্তি’র রাজনীতি টলিউডের শিল্প সুষমাকে গ্রাস করেছিল।

২০২৬ সালের নির্বাচনে অরূপ বিশ্বাসের পরাজয় এবং রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের হওয়া এই ভ্রাতৃদ্বয়ের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছে। নির্বাচনে হারের পর এখন আর অরূপ বিশ্বাসের সেই প্রশাসনিক ছাতা স্বরূপ বিশ্বাসের মাথায় নেই। দেব যখন প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে ‘ক্যান্সেল কালচার’ বা নিষিদ্ধ করার রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং অনির্বাণকে নিজের ছবিতে কাজ করার ঘোষণা করেন, তখনই বোঝা যায় যে স্বরূপ বিশ্বাসের একাধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে।

অরূপ-স্বরূপ বিশ্বাসের মতো ব্যক্তিত্বরা ক্ষমতার দাপটে শিল্পকে কুক্ষিগত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আজ ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে। তাহলে কি এবার 'রাহুর গ্রাস' থেকে কি মুক্তি পাবে টলিউড? অনির্বাণ ভট্টাচার্য বা রাহুল মুখোপাধ্যায়দের যে লড়াই, তা কি তাহলে এবার সফল হতে চলেছে?

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

টাকার বিনিময়ে বিজেপি-র প্রচার করেছেন সায়ক! আর আইনি জালে জড়ালেন অলিপাবের নিরীহ কর্মী

Sayak Chakraborty Olypub controversy: নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পাঁচটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনে বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরের মোট খরচ ছিল ৫২৯.৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই খরচ হয়েছে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা। সেই প্রচারের একটি অংশ ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্ট।

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।