রাহুর গ্রাস থেকে মুক্তি পেল টলিউড?
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নির্বাচনে অরূপ বিশাসের পরাজয়ের পর প্রশ্ন উঠছে— এবার কি অবশেষে 'বিশ্বাসী' তন্ত্র থেকে মুক্তি পেতে চলেছে টলিউড?
পশ্চিমবঙ্গের বিনোদন জগৎ এবং ক্রীড়াঙ্গন গত এক দশকে এমন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, যাকে হয়তো এক ‘অন্ধকার যুগ’ বলা যায়। স্টুডিও পাড়ার অলিগলি থেকে শুরু করে মেকআপ রুম পর্যন্ত—সর্বত্রই রাজত্ব চলত দুই ভাইয়ের। অরূপ বিশ্বাস ও স্বরূপ বিশ্বাস। একজনের প্রশাসনিক ক্ষমতা আর অন্যজনের ‘ফেডারেশন’ শাসন। এই দুই শক্তির জাঁতাকলে পড়ে টলিউড শুধু তার সৃজনশীলতাই হারায়নি, বরং এক ভয়ংকর ‘সিন্ডিকেট’ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে টলিপাড়ায় 'দাদাগিরি'র পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ বহুদিন থেকেই উঠে এসেছে। ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ থেকে শুরু করে ‘সিন্ডিকেট রাজ’, টলিউড যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল তাঁদের ইশারায়।
কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নির্বাচনে অরূপ বিশাসের পরাজয়ের পর প্রশ্ন উঠছে— এবার কি অবশেষে 'বিশ্বাসী' তন্ত্র থেকে মুক্তি পেতে চলেছে টলিউড?
১. ক্ষমতার অপব্যবহার
অরূপ ও স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, তাঁরা নিজেদের পদকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
মেসি-কাণ্ড ও অরূপ বিশ্বাসের দাপট: ২০১১ সালে লিওনেল মেসি যখন কলকাতায় পা রাখেন, তখন যুবভারতীতে যা ঘটেছিল তা ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে এক দুঃস্বপ্ন। অভিযোগ ওঠে, দর্শকদের মেসিকে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার চেয়ে তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস নিজে মেসির খুব কাছে থাকা এবং ছবি তোলায় বেশি ব্যস্ত ছিলেন। বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর ও অব্যবস্থাপনায় যখন সাধারণ দর্শকরা রক্তাক্ত হচ্ছিলেন, তখন মন্ত্রী মশাই ব্যস্ত ছিলেন ভিআইপি প্রটোকল সামলাতে।
স্বরূপ বিশ্বাসের ‘কার্ড’ রাজনীতি: স্বরূপ বিশ্বাস সিনেমার কোনো পেশাদার কর্মী না হয়েও একটি ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর’ কার্ড বাগিয়ে নেন এবং সেই ক্ষমতাবলে ফেডারেশনের (FCTWE) সভাপতি পদ দখল করেন। তাঁর এই পদাধিকার ব্যবহার করে তিনি পুরো স্টুডিও পাড়াকে নিজের করতলে নিয়ে আসেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Tollygunge Threat Culture: অন্যায্য ভাবে গিল্ডের কার্ড দখল, তোলাবাজি, সিন্ডিকেটে নাম জড়ানো, কীভাবে টালিগঞ্জের কেউকেটা হলেন স্বরূপ বিশ্বাস?
২. অনির্বাণ ভট্টাচার্য ও অন্যদের উপর ‘অলিখিত নিষেধাজ্ঞা’
অনির্বাণের বিরুদ্ধে ‘অলিখিত নিষেধাজ্ঞা’: ফেডারেশনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামার পর থেকেই অনির্বাণকে অঘোষিত বা ঘোষিত ‘ব্যান’ করে স্বরূপ বিশ্বাসের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশন। তাঁর মিউজিক ভিডিওর শুটিং বন্ধ করে দেওয়া হয়, টেকনিশিয়ানদের তাঁর সঙ্গে কাজ করতে নিষেধ করা হয়। এমনকী তাঁর মতো বড় তারকাকে ‘অঘোষিত বয়কট’ করে কাজ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা চলে মাসের পর মাস।
রাহুল মুখোপাধ্যায়ের ৩ মাসের ব্যান: পরিচালক রাহুল মুখোপাধ্যায়ের উপর তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়ে ফেডারেশন প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে, তাদের অনুমতি ছাড়া টলিউডে একটি পাতাও নড়বে না। এই ঘটনার প্রতিবাদে রাজ চক্রবর্তী, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকরা একজোট হয়ে ‘Cease Work’ বা কর্মবিরতির ডাক দিয়েছিলেন।
সুদেষ্ণা রায় ও বিদুলা ভট্টাচার্যের লড়াই: দেড় বছরের বেশি সময় কাজ না পাওয়া সুদেষ্ণা রায় বা আদালতের দরজায় কড়া নাড়া বিদুলা ভট্টাচার্য—সবাই এই ‘বিশ্বাসী’ তন্ত্রের শিকার। স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই কাজ কেড়ে নেওয়া হবে—এই ভয় টলিউডকে এক জেলখানায় পরিণত করেছিল।
৩. টলিউডের উপর ‘সিন্ডিকেট রাজ’
ফেডারেশনের সুবিধা নিয়ে স্বরূপ বিশ্বাস টলিউডকে অদ্ভুতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল
প্রোডাকশনের প্রয়োজন না থাকলেও জোর করে ফেডারেশন অনুমোদিত বাড়তি টেকনিশিয়ান নিয়োগ করতে বাধ্য করা হতো প্রযোজকদের। এতে অহেতুক খরচ বাড়ত এবং সিনেমার বাজেট ভেঙে পড়ত। ছবি কেউ ৩ পয়সা রোজগারের জন্য বানালে, তাকে ২ পয়সা খরচ করতে হতো এইসব কিছুর জন্য।
ফেডারেশনের অনুমতি ছাড়া কোনো স্বাধীন পরিচালক যদি কম বাজেটে কাজ করতে চাইতেন, তাকে ‘গুপি শুটিং’ তকমা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হতো। এমনকী ওই কাজে যুক্ত টেকনিশিয়ানদের ৩ মাস সাসপেন্ড করার হুমকি দেওয়া হতো।
স্বরূপ বিশ্বাসের প্রতি অনুগত না থাকলে স্টুডিও পাড়ায় টিকে থাকা ছিল খুব কঠিন। এই ‘পেশিশক্তি’র রাজনীতি টলিউডের শিল্প সুষমাকে গ্রাস করেছিল।
২০২৬ সালের নির্বাচনে অরূপ বিশ্বাসের পরাজয় এবং রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের হওয়া এই ভ্রাতৃদ্বয়ের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছে। নির্বাচনে হারের পর এখন আর অরূপ বিশ্বাসের সেই প্রশাসনিক ছাতা স্বরূপ বিশ্বাসের মাথায় নেই। দেব যখন প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে ‘ক্যান্সেল কালচার’ বা নিষিদ্ধ করার রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং অনির্বাণকে নিজের ছবিতে কাজ করার ঘোষণা করেন, তখনই বোঝা যায় যে স্বরূপ বিশ্বাসের একাধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে।
অরূপ-স্বরূপ বিশ্বাসের মতো ব্যক্তিত্বরা ক্ষমতার দাপটে শিল্পকে কুক্ষিগত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আজ ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে। তাহলে কি এবার 'রাহুর গ্রাস' থেকে কি মুক্তি পাবে টলিউড? অনির্বাণ ভট্টাচার্য বা রাহুল মুখোপাধ্যায়দের যে লড়াই, তা কি তাহলে এবার সফল হতে চলেছে?








