ঘাড়ধাক্কা খেয়ে ওপারে, বাংলাদেশে যেভাবে বেঁচে আছেন সাইদা ফকির
Saida Fakir Deportation: বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগের পর কী ভাবে দিন কাটছে সাইদা ফকিরের? বাংলাদেশের কোথায় আছেন? কারা আশ্রয় দিল তাঁকে?
ঢাকা: প্রায় ২০ বছর ধরে ভারতের মুম্বইয়ে সংসার। সেখানে স্বামী, দুই সন্তান, পরিচয়পত্র—সবই ছিল। অথচ এখন সাইদা ফকির নিজের দেশ থেকে বহু দূরে, বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার ভাদিয়ালি গ্রামের একটি সাধারণ পরিবারের আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর বয়স ৪৭ বছর। শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন, হাতে কোনো টাকা নেই, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় নেই। গত পাঁচ দিন ধরে তিনি স্থানীয় মানুষের সহানুভূতির উপর নির্ভর করেই বেঁচে আছেন। ৩০ জুলাই রাত সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশের স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের কলারোয়া উপজেলার ভাদিয়ালি গ্রামের আব্দুল মালেকের বাড়িতে অবস্থান করছেন। তাঁর একটাই আবেদন—সরকারি ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেন তাঁকে দ্রুত ভারতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তিনি তাঁর ২৩ ও ১৪ বছরের দুই সন্তানের কাছে ফিরে যেতে পারেন।
বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় সহায় হয়ে দাঁড়ান সাতক্ষীরার কলারোয়ার কয়েকজন সাধারণ মানুষ। আশ্রয়দাতা আরিফা বেগম জানান, তাঁর স্বামী আবুল বাশার চিকিৎসার কাজে ভারত থেকে ফেরার সময় বেনাপোল এলাকায় সাইদাকে দেখতে পান। তখন তাঁর গায়ে কাদা-মাটি লেগে ছিল। জামাকাপড় ছেঁড়া ছিল। হাত-পা ফুলে গিয়েছিল। তিনি রাস্তার ধারে বসে কাঁদছিলেন।
আরিফা বেগম বলেন, সাইদার অবস্থা দেখে যে কারও চোখে জল চলে আসবে। তিনি বারবার বলছিলেন,
চাচা, আমাকে আপনার বাসায় নিয়ে যান। আমার ছোট ছোট বাচ্চা ভারতে আছে। আমার কাছে কোনো টাকা নেই।
এই কারণেই তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসেন আবুল বাশার। গত পাঁচ দিন ধরে তাঁরা নিজেদের পরিবারের সদস্যের মতোই সাইদার দেখাশোনা করছেন। পরে স্থানীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁকে কলারোয়া উপজেলার ভাদিয়ালি গ্রামের আব্দুল মালেকের বাড়িতে রাখা হয়েছে। ৩০ জুলাই রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করছিলেন।
সাইদা ফকিরের অভিযোগ, তাঁকে কোনো আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারতের মুম্বই থেকে আটক করা হয়। এরপর ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখে বিমানে অসমে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার স্থায়ী বাসিন্দা এবং তাঁর কাছে ভারতীয় পরিচয়পত্রও ছিল। কিন্তু সেগুলি দেখার প্রয়োজনই মনে করেননি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সাইদা জানান, গত প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি পরিবারের সঙ্গে মুম্বইয়ে বসবাস করছিলেন। চলতি মাসের ১৮ অথবা ১৯ জুলাই রাতে স্থানীয় একটি বাজার থেকে সবজি ও রুটি কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময় নিজেদের ভারতীয় সিআইডি পরিচয় দেওয়া ৪ থেকে ৫ জন ব্যক্তি তাঁকে আটক করেন। তাঁর সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেওয়া হয়। তিনি বারবার নিজের ভারতীয় পরিচয়পত্র দেখানোর চেষ্টা করলেও কেউ তা দেখতে রাজি হননি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Saida Fakir Case: সাইদা ফকিরকে বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে নাগরিকত্ব যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবির ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি। কাউকে দেশছাড়া করার আগে যথাযথ তদন্ত ও সাংবিধানিক সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই বিতর্ক ফের উঠে এসেছে।
এরপর তাঁকে কোনো আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরিবারের সঙ্গেও কথা বলতে দেওয়া হয়নি। সরাসরি তাঁকে মুম্বইয়ের চেম্বুর ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চার দিন আটক রাখা হয় বলে তাঁর অভিযোগ। এই সময় তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য নথি নিয়ে সেখানে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু সেই নথিও গ্রহণ বা যাচাই করা হয়নি।
চার দিন পর তাঁকে বিমানে করে অসম সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আরও কয়েকজনের সঙ্গে ৫ থেকে ৬ জনের একটি দলে তাঁকে সীমান্ত পার করিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। সীমান্ত অতিক্রম করার পর দলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি সম্পূর্ণ অপরিচিত এলাকায় একা পড়ে যান। শারীরিকভাবে অসুস্থ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় কোনো রকমে তিনি বেনাপোল এলাকায় পৌঁছাতে সক্ষম হন।
সাইদা আরও জানান, ঘটনার প্রায় এক মাস আগে তাঁর শ্বশুরের মৃত্যু হয়। সেই খবর পেয়ে তাঁর স্বামী কর্মস্থল মুম্বই থেকে পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাটে চলে যান। ফলে ঘটনার সময় তিনি মুম্বইয়ে একাই ছিলেন। তাঁর দাবি, এই সুযোগেই তাঁকে আটক করা হয়।
নিজের পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেন, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার বেড়াচাঁপা থানার গোবিন্দপুর গ্রাম। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ আইনউদ্দিন গাজী। তিনি বারবার বলছেন, গুগলে সার্চ করলেও তাঁদের বাড়ির সন্ধান পাওয়া যাবে। তাঁর দুই সন্তান এখনও ভারতে রয়েছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
আমি ভারতের নাগরিক। আমাকে আমার সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে দিন।
আরিফা বেগম আরও জানান, ঢাকা থেকে আসা দুই সাংবাদিক তাঁদের বাড়িতে গিয়ে সাইদার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, সরকারি ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছে। সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইকবাল হোসেন বলেন, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমানে কোনো সদস্য না থাকায় তিনিই বিষয়টি খোঁজ নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ভারত থেকে এক নারী এসে ভাদিয়ালি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন—এ তথ্য সঠিক। তবে তিনি এই সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেননি। প্রাথমিকভাবে যা জানা যাচ্ছে, ভারতের অনেক দূরের কোনো সীমান্ত এলাকা দিয়ে তাঁকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়েছে।
সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাজমা বেগম বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তিনি বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন।
কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, সাংবাদিকদের কাছ থেকেই তিনি প্রথম বিষয়টি জানতে পেরেছেন। এরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পুরো বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাইদা ফকিরের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত সুইটি ও সোনালির ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেই দুই ক্ষেত্রেও পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁদের দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়েছিল। সাইদার অভিযোগও প্রায় একই ধরনের। তাঁর দাবি, তিনি ভারতীয় নাগরিক, তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় নথিও ছিল। পরিবারের সদস্যরাও সেই নথি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তবু সেগুলি যাচাই না করেই তাঁকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয় এবং পরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়।
যদি সাইদার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি শুধু একটি পুশব্যাকের ঘটনা নয়। এটি সীমান্তে নাগরিকত্ব যাচাই, প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা এবং মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নও নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। আপাতত সাতক্ষীরার একটি গ্রামের সাধারণ মানুষের সহায়তাতেই দিন কাটছে তাঁর। কিন্তু তাঁর সমস্ত আকুতি ঘুরেফিরে এক জায়গাতেই এসে থামে,
আমি শুধু আমার দুই সন্তানের কাছে, আমার নিজের দেশে ফিরে যেতে চাই।
কৃতজ্ঞতা: ঢাকাস্ট্রিমকে







