লেনদেন ফ্রি! কী ভাবে রোজগার করে ফোনপে, পেটিএম?
UPI business model: আমরা সাধারণ গ্রাহকরা যখন একে অপরকে টাকা পাঠাই, সেখানে কোম্পানিগুলোর আয় নামমাত্র। কিন্তু আসল খেলা শুরু হয় যখন আপনি কোনো দোকানদার বা মার্চেন্টকে পেমেন্ট করেন।
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে পকেটে নগদ টাকা থাকুক বা না থাকুক, স্মার্টফোনে একটি ইউপিআই অ্যাপ থাকলেই কেল্লাফতে। পাড়ার চায়ের দোকান থেকে বড় শপিং মল— সর্বত্রই কিউআর (QR) কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করা এখন জলভাত। ভারত সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫৭% লেনদেন এখন ইউপিআই-এর মাধ্যমে হয়। কিন্তু আমরা যখন পেমেন্ট করি, তখন আমাদের যা বিল হয়, সেই পরিমাণ টাকাই পেমেন্ট করি, অ্যাকাউন্ট থেকে বেশি টাকা তো কাটে না। তাহলে এই কোম্পানিগুলোর ঘর চলে কীভাবে? বার্নস্টেইন (Bernstein) রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে এক চমকপ্রদ ব্যবসার মডেল।
১. মার্চেন্ট পেমেন্ট (আয়ের ৭৫%): আমরা সাধারণ গ্রাহকরা যখন একে অপরকে টাকা পাঠাই, সেখানে কোম্পানিগুলোর আয় নামমাত্র। কিন্তু আসল খেলা শুরু হয় যখন আপনি কোনো দোকানদার বা মার্চেন্টকে পেমেন্ট করেন। বার্নস্টেইন রিপোর্ট বলছে, পেমেন্ট অ্যাপগুলোর নিট রেভিনিউ বা আয়ের ৭৫% আসে মার্চেন্ট সাইড থেকে। যদিও সাধারণ ইউপিআই-তে জিরো MDR (Merchant Discount Rate), কিন্তু মার্চেন্টদের বিভিন্ন ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস দিয়ে এই টাকা উসুল করা হয়।
২. সাউন্ডবক্স এবং POS ডিভাইসের ভাড়া (Subscription Model): রাস্তায় বেরোলেই দোকানে শোনা যায়— "পেটিএম পর বিশ রুপয়ে প্রাপ্ত হুয়ে"। এই যে সাউন্ডবক্স বা কার্ড সোয়াইপ করার POS মেশিন, এগুলো দোকানদারদের নিতে হলে গাঁটের টাকা খরচ করতে হয়। এই ডিভাইসগুলোর জন্য মার্চেন্টদের থেকে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট রেন্টাল বা ভাড়া নেওয়া হয়। ২০২৫ অর্থবর্ষে শুধুমাত্র এই ডিভাইসের ভাড়া থেকেই প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা আয় হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এটি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি 'সাবস্ক্রিপশন' মডেলের মতো কাজ করে।
৩. বিল পেমেন্ট ও রিচার্জ থেকে কমিশন: ফোনপে বা পেটিএম অ্যাপ ব্যবহার করে যখন আপনি ইলেকট্রিক বিল, জলের বিল, ডিটিএইচ (DTH) রিচার্জ বা মোবাইল রিচার্জ করেন, তখন প্রতিটি ট্রানজ্যাকশনের জন্য কোম্পানিগুলো একটি নির্দিষ্ট কমিশন পায়। ভারত বিল পেমেন্ট সিস্টেম (BBPS)-এর মাধ্যমে হওয়া এই লেনদেনে প্রতি ১০,০০০ টাকায় প্রায় ৮-১০ টাকা পর্যন্ত আয় হয় এই প্ল্যাটফর্মগুলোর। ২০২৫-এ এই সেক্টরে ১০ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বর্তমানে এআই যুদ্ধক্ষেত্রে এমনভাবে সংহত হয়েছে যে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (LLM) এখন রণকৌশল নির্ধারণের প্রধান হাতিয়ার।
৪. ক্রেডিট কার্ড ও রুপে (RuPay) কার্ডের মেলবন্ধন
সাধারণ সেভিংস অ্যাকাউন্ট থেকে ইউপিআই করলে চার্জ না থাকলেও, ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে গল্পটা আলাদা। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে পেমেন্ট করলে মার্চেন্টদের থেকে একটি ফি নেওয়া হয়। বর্তমানে রুপে ক্রেডিট কার্ডকে ইউপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত করার ফলে পেমেন্ট অ্যাপগুলোর প্রফিট মার্জিন দ্রুত বাড়ছে। কারণ ক্রেডিট কার্ডের ট্রানজ্যাকশন ভ্যালু সাধারণত বেশি হয় এবং এখানে কমিশন রেটও বেশি।
৫. আর্থিক পণ্যের ডিস্ট্রিবিউশন (Cross-selling):
পেমেন্ট অ্যাপগুলো এখন শুধু টাকা পাঠানোর মাধ্যম নয়, এগুলো এখন এক একটি 'ফাইন্যান্সিয়াল সুপারমার্কেট'।
বাইক, গাড়ি বা স্বাস্থ্য বিমা বিক্রি করে মোটা অঙ্কের কমিশন পায় এই অ্যাপগুলো। ডিজিটাল গোল্ড বা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সুবিধে দিয়েও তারা আয় করে। পেটিএম বা ফোনপে সরাসরি ব্যাংক না হলেও, তারা বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে টাই-আপ করে গ্রাহকদের লোন বা 'বাই নাও পে লেটার' (BNPL) সুবিধে দেয়। এর বদলে ব্যাংক থেকে তারা বড় কমিশন পায়।
৬. ডেটা ও বিজ্ঞাপনের শক্তি: কোটি কোটি মানুষের খরচের প্যাটার্ন বা অভ্যাস এই কোম্পানিগুলোর কাছে এক অমূল্য সম্পদ। আপনি কোথায় কত টাকা খরচ করছেন, সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন কোম্পানিকে তাদের বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়। যদিও সরাসরি ডেটা বিক্রি করা আইনত নিষিদ্ধ, কিন্তু টার্গেটেড অ্যাডভার্টাইজিংয়ের মাধ্যমে আয়ের পথ প্রশস্ত থাকে।
২০৩০ সালের রোডম্যাপ বার্নস্টেইন রিপোর্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের এই ডিজিটাল পেমেন্ট রেভিনিউ পুল ৩৮,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছবে। এখন হয়তো প্রতি গ্রাহক পিছু কোম্পানিগুলোর লাভ ১৫০ টাকার কম, কিন্তু লোন এবং ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়লে এই লাভ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। পরের বার যখন কিউআর কোড স্ক্যান করবেন, মনে রাখবেন—আপনার জন্য পরিষেবাটি ফ্রি হলেও, আপনার ছোট একটি ক্লিক ভারতের ডিজিটাল ইকোনমিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসার ইন্ধন যোগাচ্ছে।






