লেনদেন ফ্রি! কী ভাবে রোজগার করে ফোনপে, পেটিএম?

UPI business model: আমরা সাধারণ গ্রাহকরা যখন একে অপরকে টাকা পাঠাই, সেখানে কোম্পানিগুলোর আয় নামমাত্র। কিন্তু আসল খেলা শুরু হয় যখন আপনি কোনো দোকানদার বা মার্চেন্টকে পেমেন্ট করেন।

inscript
৫ মিনিট
লেনদেন ফ্রি! কী ভাবে রোজগার করে ফোনপে, পেটিএম?

ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে পকেটে নগদ টাকা থাকুক বা না থাকুক, স্মার্টফোনে একটি ইউপিআই অ্যাপ থাকলেই কেল্লাফতে। পাড়ার চায়ের দোকান থেকে বড় শপিং মল— সর্বত্রই কিউআর (QR) কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করা এখন জলভাত। ভারত সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫৭% লেনদেন এখন ইউপিআই-এর মাধ্যমে হয়। কিন্তু আমরা যখন পেমেন্ট করি, তখন আমাদের যা বিল হয়, সেই পরিমাণ টাকাই পেমেন্ট করি, অ্যাকাউন্ট থেকে বেশি টাকা তো কাটে না। তাহলে এই কোম্পানিগুলোর ঘর চলে কীভাবে? বার্নস্টেইন (Bernstein) রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে এক চমকপ্রদ ব্যবসার মডেল।

​১. মার্চেন্ট পেমেন্ট (আয়ের ৭৫%): আমরা সাধারণ গ্রাহকরা যখন একে অপরকে টাকা পাঠাই, সেখানে কোম্পানিগুলোর আয় নামমাত্র। কিন্তু আসল খেলা শুরু হয় যখন আপনি কোনো দোকানদার বা মার্চেন্টকে পেমেন্ট করেন। বার্নস্টেইন রিপোর্ট বলছে, পেমেন্ট অ্যাপগুলোর নিট রেভিনিউ বা আয়ের ৭৫% আসে মার্চেন্ট সাইড থেকে। যদিও সাধারণ ইউপিআই-তে জিরো MDR (Merchant Discount Rate), কিন্তু মার্চেন্টদের বিভিন্ন ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস দিয়ে এই টাকা উসুল করা হয়।

​২. সাউন্ডবক্স এবং POS ডিভাইসের ভাড়া (Subscription Model): ​রাস্তায় বেরোলেই দোকানে শোনা যায়— "পেটিএম পর বিশ রুপয়ে প্রাপ্ত হুয়ে"। এই যে সাউন্ডবক্স বা কার্ড সোয়াইপ করার POS মেশিন, এগুলো দোকানদারদের নিতে হলে গাঁটের টাকা খরচ করতে হয়। এই ডিভাইসগুলোর জন্য মার্চেন্টদের থেকে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট রেন্টাল বা ভাড়া নেওয়া হয়। ২০২৫ অর্থবর্ষে শুধুমাত্র এই ডিভাইসের ভাড়া থেকেই প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা আয় হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এটি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি 'সাবস্ক্রিপশন' মডেলের মতো কাজ করে।

​৩. বিল পেমেন্ট ও রিচার্জ থেকে কমিশন: ​ফোনপে বা পেটিএম অ্যাপ ব্যবহার করে যখন আপনি ইলেকট্রিক বিল, জলের বিল, ডিটিএইচ (DTH) রিচার্জ বা মোবাইল রিচার্জ করেন, তখন প্রতিটি ট্রানজ্যাকশনের জন্য কোম্পানিগুলো একটি নির্দিষ্ট কমিশন পায়। ভারত বিল পেমেন্ট সিস্টেম (BBPS)-এর মাধ্যমে হওয়া এই লেনদেনে প্রতি ১০,০০০ টাকায় প্রায় ৮-১০ টাকা পর্যন্ত আয় হয় এই প্ল্যাটফর্মগুলোর। ২০২৫-এ এই সেক্টরে ১০ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মারণাস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? পেন্টাগন-অ্যানথ্রোপিক লড়াইয়ের নেপথ্য কথা

বর্তমানে এআই যুদ্ধক্ষেত্রে এমনভাবে সংহত হয়েছে যে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (LLM) এখন রণকৌশল নির্ধারণের প্রধান হাতিয়ার।

​৪. ক্রেডিট কার্ড ও রুপে (RuPay) কার্ডের মেলবন্ধন

​সাধারণ সেভিংস অ্যাকাউন্ট থেকে ইউপিআই করলে চার্জ না থাকলেও, ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে গল্পটা আলাদা। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে পেমেন্ট করলে মার্চেন্টদের থেকে একটি ফি নেওয়া হয়। বর্তমানে রুপে ক্রেডিট কার্ডকে ইউপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত করার ফলে পেমেন্ট অ্যাপগুলোর প্রফিট মার্জিন দ্রুত বাড়ছে। কারণ ক্রেডিট কার্ডের ট্রানজ্যাকশন ভ্যালু সাধারণত বেশি হয় এবং এখানে কমিশন রেটও বেশি।

​৫. আর্থিক পণ্যের ডিস্ট্রিবিউশন (Cross-selling):

​পেমেন্ট অ্যাপগুলো এখন শুধু টাকা পাঠানোর মাধ্যম নয়, এগুলো এখন এক একটি 'ফাইন্যান্সিয়াল সুপারমার্কেট'।

বাইক, গাড়ি বা স্বাস্থ্য বিমা বিক্রি করে মোটা অঙ্কের কমিশন পায় এই অ্যাপগুলো। ডিজিটাল গোল্ড বা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সুবিধে দিয়েও তারা আয় করে। পেটিএম বা ফোনপে সরাসরি ব্যাংক না হলেও, তারা বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে টাই-আপ করে গ্রাহকদের লোন বা 'বাই নাও পে লেটার' (BNPL) সুবিধে দেয়। এর বদলে ব্যাংক থেকে তারা বড় কমিশন পায়।

​৬. ডেটা ও বিজ্ঞাপনের শক্তি: কোটি কোটি মানুষের খরচের প্যাটার্ন বা অভ্যাস এই কোম্পানিগুলোর কাছে এক অমূল্য সম্পদ। আপনি কোথায় কত টাকা খরচ করছেন, সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন কোম্পানিকে তাদের বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়। যদিও সরাসরি ডেটা বিক্রি করা আইনত নিষিদ্ধ, কিন্তু টার্গেটেড অ্যাডভার্টাইজিংয়ের মাধ্যমে আয়ের পথ প্রশস্ত থাকে।

২০৩০ সালের রোডম্যাপ ​বার্নস্টেইন রিপোর্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের এই ডিজিটাল পেমেন্ট রেভিনিউ পুল ৩৮,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছবে। এখন হয়তো প্রতি গ্রাহক পিছু কোম্পানিগুলোর লাভ ১৫০ টাকার কম, কিন্তু লোন এবং ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়লে এই লাভ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। পরের বার যখন কিউআর কোড স্ক্যান করবেন, মনে রাখবেন—আপনার জন্য পরিষেবাটি ফ্রি হলেও, আপনার ছোট একটি ক্লিক ভারতের ডিজিটাল ইকোনমিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসার ইন্ধন যোগাচ্ছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে যে ভুলগুলি এড়ানো জরুরি

Stock Market Psychology: শেয়ারবাজারে একজন বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় সে নিজেই। আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক বাজারে এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ এখন সমস্যা তথ্যের অভাব নয়, বরং তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ।

মহাবিশ্বকে বুঝতে গিয়ে সমাজকে ভুলে যাননি অশোক সেন

পিএইচডির প্রথম প্রায় তিন বছর তাঁর গবেষণায় কোনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিই হয়নি। চারদিকে শুধু স্থবিরতা। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যেখানে এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন বা হতাশ হয়ে পড়েন, অশোক সেন তা করেননি।

মেষ নয়, হায়াডিস? ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ নিয়ে কী বলছে নতুন গবেষণা?

The Starry Night mystery: এর আগে দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে ভ্যান গগের আঁকা ছবিটির উপরের অংশটি মেষ রাশির কোনো তারামণ্ডল। তবে, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত 'দ্য অ্যাকচুয়াল স্কাই অফ ভ্যান গগস স্টারি নাইট: এ মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিঅকনস্ট্রাকশন' নামক গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ভ্যান গগের ছবির কেন্দ্রীয় পাঁচ তারার বিন্যাস মেষ রাশির সঙ্গে নয়, বরং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মেলে।

ডার্কওয়েবে SBI-র তথ্য ফাঁস, কতটা সুরক্ষিত আপনার সঞ্চয়? যা জানাচ্ছেন সাইবার বিশেষজ্ঞ

সন্দীপ সেনগুপ্তের পরামর্শ, যাঁদের তথ্য ফাঁস হয়েছে বলে আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তিনি এমনকি ব্যাঙ্কে রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বর পরিবর্তন এবং নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার কথাও বলেছেন।

আইনস্টাইনের কাল্পনিক পরীক্ষা এবার বাস্তবে, কোয়ান্টাম জগতের কণা-তরঙ্গ রহস্যের কী হলো?

Einstein Bohr quantum debate: সম্প্রতি ১০০ বছর আগের আইনস্টাইনের সেই কাল্পনিক পরীক্ষাটি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব চায়না (USTC)-এর বিখ্যাত কোয়ান্টামবিজ্ঞানী জিয়ান-উই প্যান (Jian-Wei Pan) এবং তাঁর সহকর্মীরা ল্যাবরেটরিতে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?