এলোপাথাড়ি গুলি থেকে কাটা মুণ্ডুর আতঙ্ক! স্বর্ণযুগের সিনেমার শুটিং ছিল ক্ল্যাইম্যাক্সে ঠাসা
শুটিং করতে গিয়ে কীভাবে ডাকাতের পাল্লায় পড়তেন ফিল্মের লোকজন?

শুটিং, শুটিং আর শুটিং। ছবির জগতের লোকদের শ্বাস ফেলার সময় পাওয়া ভার হতো এককালে। তারকাদের মতো বিলাসবহুল যাপন কোনওদিনই ছিল না আঞ্চলিক ছবির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের। অবশ্য আজকাল প্রচারের দৌলতে পরিচালকেরা অনেকটাই লাইমলাইটে থাকেন। বিলাসের ছোঁয়া ঢুকে পড়েছে তাঁদের জীবনেও। কিন্তু একটা সময় ছিল, নায়ক এবং গায়ক— এঁদের ছাড়া ফিল্মের বাদবাকি যে বিশাল একটা অংশ, তাঁদের কেউই তেমন চিনতেন না। দূরদর্শন তখনও আসেনি। আসেনি হাজারো চ্যানেলে সাক্ষাৎকারের উৎপাত। এই অচেনা মুখের কিছু সুবিধে ছিল। স্বাভাবিক জীবনযাপন। আর পাঁচজনের মধ্যে দিব্যি মিশে যাওয়া। যেটা উত্তম করতে পারতেন না বলে আফসোস করে গিয়েছেন সারাটা জীবন। আবার আঞ্চলিক ফিল্মের ছোট ছোট প্রোজেক্ট। দলবল নিয়ে গিয়ে নানান বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হত। নিরাপত্তার তেমন ব্যবস্থা ছিল না। ফলে অনেক সময় চোরছ্যাঁচড় মায় ডাকাতের পাল্লাতেও পড়তে হতো তাঁদের। আজ তেমনই কয়েকটি গল্প শোনাব, শুটিং করতে গিয়ে কীভাবে ডাকাতের পাল্লায় পড়তেন ফিল্মের লোকজন।
কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে খানিক সময় পেলেই তরুণ মজুমদার দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন ঘুরতে। একটা মোটর ভ্যান ভাড়া করে গন্তব্যহীন ঘুরে বেড়ানো। হাতে একটিমাত্র অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের ম্যাপ। নানা জায়গা, নানা ধরনের মানুষ, নাচিয়ে-গাইয়ের দলের সঙ্গে আলাপ, ট্রাক ড্রাইভারদের সঙ্গে খাটিয়া পেতে শোওয়া- সেসব ভ্রমণ একঝুড়ি অভিজ্ঞতা রেখে যেত দোরে। যে যেভাবে নেয়। কেউ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, চরিত্র সম্বন্ধে বোঝাপড়া গভীর হয়, কারও আবার গোটাটাই ট্রান্স। চলতি পথের যাবতীয় কিছু সে উপভোগ করে, কিন্তু গ্রহণের তেমন প্রয়োজন বোধ করে না। যাই হোক, সেবার জিটি রোড ধরে আসানসোল পেরিয়ে বিহারের দিকে চলেছেন। তোপচাঁচি, বাঢ়হি, রাঁচি, হাজারিবাগ, সাসারাম হয়ে সোজা বেনারস যাবেন। পথে রাজগিরে এক নৌটঙ্কির দলের সঙ্গে থেকে গেলেন কয়েকদিন। হঠাৎ করেই সাক্ষাৎ। পরিচালকের মাথায় ঝিলিক খেলে গেল। কয়েকদিন আগেই হেমন্ত প্রস্তাব দিয়ে গিয়েছেন, 'পলাতক'-এর একটা হিন্দি ভার্সন দরকার। ছবিটার একটা মস্ত অংশজুড়ে রয়েছে ঝুমুর নাচ আর গান। সমস্যা সেটা নিয়েই। সেই অংশটাকে হিন্দিতে পরিবেশন করেন কীভাবে! নৌটঙ্কির দল পেয়ে পরিচালক বুঝলেন, উপায় হয়ে গিয়েছে। তাদের সঙ্গে দিনকতক কাটিয়ে ভালোরকম জেনে নেওয়া গেল সমস্তটা।
সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতা পেরিয়ে পাটনা এল গোটা দল। পাটনা তখন বেশ জমজমাট শহর। কিন্তু শহরের আরামে মন টেকে না। পরদিনই ফের বেরিয়ে পড়লেন সবাই। বাঢ়হির এক বৃদ্ধ চটিওয়ালা বলে দিয়েছিলেন, পাটনা থেকে সাসারাম যেতে হলে কোইলোয়ার ব্রিজ পেরতে হবে। পেরোনো গেল নির্বিঘ্নে। বংশী চন্দ্রগুপ্তর ডানহাত সুরেশচন্দ্র পথ বাতলাচ্ছিলেন। হাতে ম্যাপ। ব্রিজ পেরিয়ে একটা জায়গায় এসে তিনি গম্ভীরভাবে হাঁকড়ালেন, "এবার ডানদিক—ডানদিকের রাস্তা।" বিপত্তির সূত্রপাত ঠিক এই দক্ষিণপন্থী মোড় থেকেই। কিছুদূর এসেই যাত্রীরা বুঝলেন, যাত্রা বড় একটা আরামের হবে না। যত এগোনো হচ্ছে, রাস্তা সরু হচ্ছে। তার ওপর লাফাতে লাফাতে এগোচ্ছে ভ্যান। প্রথমদিকে প্রশস্ত কপালের ওপর দু'-এক গাছি চুলের মতো পিচ মুখরক্ষা করছিল, পরের দিকে দেখা গেল সেটুকুও কুলোচ্ছে না। শুধু ঝামা ইটের খোয়া আর পাথর। তার ওপর চন্দ্রযানের মতো মোটর ভ্যান চলেছে। এদিকে সকালে গাড়ি ছেড়েছে, খিদের চোটে নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাওয়ার জোগাড়। এরপর আরও অনবদ্য দৃশ্য। দেখা গেল, রাস্তার ওপর বেশ ভালোরকম ঘাস গজিয়েছে। রাশি রাশি ছাগল সেই ঘাস খেতে ব্যস্ত। হর্ন-টর্নের তারা খুব একটা পরোয়া করে না। সেই পেল্লায় অবিবেচক ছাগলের দল পেরিয়ে গাড়ি যখন একটা গ্রামের সীমান্তে এসে দাঁড়াল, তখন ঘণ্টাদেড়েক পেরিয়ে গেছে। জায়গাটার নাম পিরো। নামটা যে পাকাপাকি স্মৃতিতে জায়গা করে নেবে, তা তখনও ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি গোটা ইউনিট।
ঢুকেই একটা হাট। গাঁয়ের মানুষের সাধারণ বিকিকিনির হাট। সবজি, কাটা কাপড় থেকে তাবিজ মাদুলি পর্যন্ত পাওয়া যায় সেখানে। সব খোলা দোকান। চালা-টালা নেই। অনেক খুঁজে পেতে একটা পাইস হোটেল পাওয়া গেল। খাপরার চাল, পিছনে রান্নার জায়গা, সামনে তক্তার দরজা। মনটা সবে একটু জুড়িয়ে এসেছিল, মালিক জানালেন আপাতত হোটেলের ভাঁড়ার ফাঁকা। হাটুরেরা সব সাফ করে দিয়ে গিয়েছে। তবে খানিক সময় পেলে ভাত আর বাগেরি পাখির মাংসের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তাই সই! গোটা দলের তখন আর নড়ার ক্ষমতা নেই। বসে বসে উদাস মনে সামনের হাটের বেচাকেনা দেখছেন। হঠাৎ শোরগোল। কী ব্যাপার? হাটুরেরা মালের বোঁচকা মাথায় নিয়ে এদিক-ওদিক দৌড়চ্ছে। মুখে-চোখে প্রচণ্ড ভয়। হোটেলের মালিক রান্না ফেলে দৌড়ে এলেন। ফটাফট তক্তার দরজা বন্ধ। সবাই অবাক। হলো কী! "ডাকু!" অ্যাঁ! কী বলে! "ডাকু পড়েছে। একদম চুপচাপ থাকুন।" বেশ একটা হিন্দি সিনেমা হিন্দি সিনেমা ব্যাপার।
তক্তার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখা গেল ডাকুদের হিন্দি সিনেমা নিয়ে একেবারেই মাথাব্যথা নেই। ঘোড়ার পিঠে চেপে বন্দুক-টন্দুক নিয়ে এসেছে বটে, কিন্তু ধর্মেন্দ্র বা বিনোদ খান্নার মতো পাগড়ি বা পোশাক— কিসসু নেই। বরং একেবারে বেলমাথা, তাতে পুরুষ্টু একখান টিকি, মালকোঁচা মারা খাটো ধুতি, আর কোমরে বাঁধা গামছা। ডাকাতের 'ক্লাস' নেই দেখে পরিচালক বোধহয় একটু মুষড়েই পড়েছিলেন, এমন সময় দুমদুম করে কয়েকবার বন্দুকের আওয়াজ। হোটেল মালিক পরিচালকের হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে রান্নাশালে ঢুকিয়ে সেটারও দরজা দিলেন বন্ধ করে। ফিসফিস করে বললেন, "এখান থেকে নড়বেন না একদম। ওদের বন্দুকে নিশানা ঠিক নেই। কাকে মারতে কাকে মেরে বসবে।" কিছুক্ষণের মধ্যেই শোরগোল থেমে গেল। হোটেল মালিক তক্তা খুলতে খুলতে জানালেন মাংস-ভাত তৈয়ার। বেরিয়ে দেখা গেল, সামনের চত্বরটার অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। কুমড়ো, লাউ, অন্যান্য শাক-সবজি ছড়িয়ে ছত্রাখান। কিছু ফেটে গেছে ঘোড়ার পায়ের চাপে, কিছু নষ্ট হয়ে গিয়েছে এদিক-ওদিক। বাকি জিনিসগুলো হাটুরেরা বস্তাবন্দি করছে তাড়াতাড়ি। পিরোর নাম সেই ক্লাসহীন ডাকুদের দৌলতেই দলের প্রত্যেকের স্মৃতিতে ছাপা হয়ে গিয়েছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রেশনের ব্যাগে করে দু'টি চিল নিয়ে স্টুডিওতেও হাজির হলেন এক ভদ্রলোক। মিনমিন করে বললেন, 'একজোড়া চিল এনেছিলাম। নেবেন কি?'
আরেকবার এমনই গণ্ডগোল বেঁধেছিল। তখন 'পলাতক'-এর হিন্দি ছবি 'রাহগির'-এর শুটিং শুরু হয়ে গিয়েছে। একেবারে প্রথম দৃশ্যে নায়ক একটা বিচালিবোঝাই গরুর গাড়িতে গ্রামের পথ ধরে দূর নজরের আড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। 'পলাতক'-এ ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে যাওয়া একটি পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল। হিন্দি ছবির জন্য গমের ক্ষেতই বেশি মানাবে। এই ভেবে দানাপুরের আশপাশে লোকেশন দেখতে গিয়ে একটা সরষে ক্ষেত দেখে পরিচালক এতটাই মুগ্ধ হয়ে গেলেন যে, গমের ক্ষেত বাতিল, এইখানেই শুটিং হবে ঠিক হলো। হাতিয়ার রাজবাড়িতে ক্যাম্প হলো। পাটনা থেকে একটা ট্রাকে চাপিয়ে গরুসুদ্ধ গাড়িখান আনানো হয়েছিল। অচেনা জায়গা। পাওয়া না গেলে বিপদ হবে। সব ঠিকঠাক। চারিদিকে ক্ষেত। মাঝে সরু রাস্তা। দীর্ঘ ট্র্যাকলাইনটা পেতে ক্যামেরা চাপাতে যাবেন, হঠাৎ কয়েকটি অচেনা লোক যেন মাটি ফুঁড়ে উঠল। প্রথমটায় গা করেননি পরিচালক, কিন্তু দেখতে দেখতে সংখ্যাটা বাড়তে লাগল। সবার হাতেই পাকানো লাঠি। আলের ওপর দাঁড়িয়ে হাসিঠাট্টা করছে, নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি করছে, পায়ের চাপে কয়েকটা সরষে গাছ শুয়ে পড়ল। পরিচালক বারণ করতে যাবেন, হঠাৎ দেখা গেল খেলাটা উল্টো। লোকগুলার দাবি সিনেমার লোকজন ফসল নষ্ট করেছে, ফলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এবং ক্ষতিপূরণ অর্থে একটা অসম্ভব পরিমাণ টাকা। নইলে যন্ত্রপাতি কেড়ে নেবে এমন হুমকিও রয়েছে। এদিকে ওই অঙ্কের টাকা কারও কাছেই নেই। এই অবস্থায় পরিচালকের মাথায় একটা বুদ্ধি এল। তিনি সহকারী গিরিশকে নিয়ে ওদের সঙ্গে তর্ক করতে করতে একদিকে এগিয়ে গেলেন। কথাবার্তা তখন অশ্রাব্য গালিগালাজের রূপ নিয়েছে। প্রায় গায়ে হাত ওঠে ওঠে, এমন সময় গাড়ির হর্ন। বাকিদের বলা ছিল এই ফাঁকে সব গুটিয়ে নিয়ে গাড়িতে উঠতে। সে কাজ সারা। গাড়ি বেশ খানিকটা নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে পৌঁছেছে। এইবার দুইজনে দৌড়ে একটা ঢিবির মাথায় উঠে লোকগুলোকে এদিকে ডাকলেন। বললেন, "ওই যে দেখছেন, আমাদের লোকজন সবাই গাড়িতে চেপে বসেছে। আর আমাদের পকেট তল্লাশি করে দেখুন টাকা-পয়সা নেই। তা সত্ত্বেও যদি আমাদের ক্ষতি করতে চান, তাহলে যা খুশি করুন। মেরে ফেলতে চাইলেও বাধা দেওয়ার কেউ থাকবে না। আমাদের দলবল কিন্তু সোজা গিয়ে পুলিশে রিপোর্ট করবে। তারপর আপনাদের ভাগ্যে কী নাচছে নিশ্চয়ই তা বুঝতে পারছেন।" শুনে লোকগুলো প্রথমটায় একটু হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল, পরমুহূর্তেই তাদের সে কী আক্রোশ! ভয়ংকর ঠান্ডা গলায় তারা জানাল, এখনই এই জায়গা ছেড়ে চলে যান। নইলে 'নতিজা খতরনাক'। পালিয়ে বাঁচলেন সবাই।
শুটিং সেবার ওখানেই হয়েছিল। তবে পুলিশ কিচ্ছুটি সাহায্য করেনি। শেষ অবধি গাঁয়ের প্রধানকে গিয়ে ধরতেই তিনি একা নির্বিঘ্নে সমস্ত শুটিং করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
এ তো গেল বাংলার বাইরের ডাকুদের গল্প। আরেকবার খোদ বাংলায়। 'গণদেবতা'-র শুটিং চলছে। সরকারি প্রোজেক্ট। তা ঢ্যাঙা পুরুতমশাইয়ের জন্য দরকার একদম হাড় জিরজিরে ল্যাংড়া এবং বেঁটে একখান ঘোড়া। এতটাই বেঁটে যে ঢ্যাঙা পুরুত যখন তাতে চেপে গাঁয়ে ঢোকে, তার পা মাটিতে ঘষটায়। আর তাই দেখে ছেলেছোকরার দল ছড়া কাটে। সিনেমার ভাষায় একে বলা হয় 'স্পেশাল প্রপার্টি'। পরিচালক-সহ পাঁচ-ছ'জনের একটা দল সেসময় ইলামবাজারের বাংলোয়। রোজই নানা ধরনের ঘোড়া আসছে। সব বাতিল। অবশেষে বাংলোর কেয়ারটেকার দেবীদাস ঘটক খবর দিলেন, এক্কেরে অমন একখান ঘোড়া নাকি আছে, তবে ধল্লার জঙ্গল ছাড়িয়ে আরো মাইলতিনেক যেতে হবে। ইলামবাজার থেকে বোলপুর যাওয়ার পথেই এই ধল্লার জঙ্গল। জঙ্গলের পরে একটা খাল। সেটা পেরোলেই বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। সরু রাস্তা ধরে অনেকখানি এগোলে ঘোড়ার মালিকের গ্রাম। কিন্তু তিনি হাটুরে মানুষ। দিনে সময় দিতে পারবেন না। গেলে রাতে দেখা করতে যেতে হবে। ঘোড়া পেতে পরিচালক তখন মরিয়া। রাত তো রাতই সই। বেরিয়ে পড়া গেল। কৃষ্ণপক্ষের রাত। চারিদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। জঙ্গল পেরিয়ে খালটার কাছাকাছি আসতেই দেবীদাসবাবু চাপা গলায় জানালেন, এটা 'ওদের' টার্গেট প্র্যাক্টিসিং সেন্টার। ওদের? ওদের-টা আবার কে? জানা গেল, কয়েকদিন আগে বোলপুরের সদর রাস্তার ওপরে কাটা মুণ্ডু ঝুলিয়ে রেখেছিল 'ওরা'।
এতক্ষণে ব্যাপারটা পরিষ্কার। সময়টা নকশাল আমল। আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত বাংলায়। বিশেষত আয়েসি মধ্যবিত্তদের ভয় তখন বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। সেই ভয়েরই ছাপ দেবীদাসবাবুর কথায়। জঙ্গল পিছনে রেখে কালভার্ট পেরিয়ে ডানদিকে ঘুরতেই বোঝা গেল, এ মোটরগাড়ির রাস্তা নয়। মাঝখান উঁচু। দু'দিকে গরুর গাড়ির চাকায় খাল হয়ে গিয়েছে কাঁচা রাস্তার গায়। খানিক গিয়েই চেম্বার অথবা সাইলেন্সার ফেঁসে গিয়ে একটা ধাতব শব্দ করে গাড়ি থেমে গেল। মস্ত একটা পাথরের চাঁই চেম্বারের সঙ্গে এঁটে গিয়েছে। এগোলে বা পিছোলে চেম্বার ফুটো হয়ে যেতে পারে। এক শাবল হলে পাথরের তলার মাটি খুঁড়ে পাথরটা বসিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু গাঁ-এলাকা। এই রাতে শাবলের খোঁজ পাওয়া অসম্ভব। সারা রাত ওখানেই থাকতে হবে, যা বোঝা গেল। সবাই নিরাশ। গাড়ার হেডলাইট জ্বেলে বসে আছেন। আধঘণ্টা পেরিয়েছে কি পেরোয়নি, পিছনের দিক থেকে তিনটি সিল্যুয়েট এগিয়ে আসে। ক্রমে জানলার পাশে। পরনে ট্রাউজার্স আর শার্ট, একজনের মাথায় কাউন্টি ক্যাপ, আরেকজনের মাথায় মাথাল। তৃতীয় জন সম্ভবত স্থানীয়, কিন্তু হাতে আগ্নেয়াস্ত্র।
—এ রাস্তায় কী করতে?
সবাই চুপ। দেবীদাসবাবু তরুণ মজুমদারের হাতে চাপ দেন।
—কারা আপনারা?
এবারে প্রায় ধমকের সুর। এবার সমস্তটা খুলে বলেন অর্ণববাবু। এরই মধ্যে আরও সাত-আটজন জড়ো হয়েছে। "তরুণবাবু এ গাড়িতেই আছেন। তরুণ মজুমদার।" শুনে হুকুম আসে, "আপনাদের মধ্যে কে তরুণবাবু? নেমে এসে হেডলাইটের সামনে দাঁড়ান।" বুক ঢিপঢিপ। ভয়ও রয়েছে। রোমাঞ্চও। দাঁড়ালেন তরুণ মজুমদার। সেই কাউন্টি ক্যাপ এগিয়ে আসে। বলে, "ভুল রাস্তায় এসেছেন। ও গাঁয়ের রাস্তা তিন জায়গায় কাটা। আমরা পাথর সরানোর ব্যবস্থা করছি। ফিরে যান।" কয়েক মুহূর্তে বেশ ক'টা শাবল আসে। আধঘণ্টায় নির্বিঘ্নে ইলামবাজার ফেরেন পরিচালকের দল।
এইরকম নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শুটিং সারতে হতো তখন। বাজেটের ব্যাপার ছিল, অসুবিধে ছিল প্রযুক্তির। আন্তর্জাল ছিল না। মাটির থেকে বিচ্ছিন্নতা ছিল না। বরং প্রান্তিক মানুষদের আদর-আপ্যায়ন সহযোগিতায় গড়ে উঠত একের পর এক অসাধারণ ছবি। তাতে মাটির গন্ধ থাকত। পরিচালকরা কখনও কখনও গোটা গ্রামের মানুষকে ধন্যবাদ জানাতেন কাস্টিংয়ে, কখনও রূপোলি পর্দার আড়ালেই রয়ে যেত সেই পরিশ্রম, আন্তরিকতার উপাখ্যান। এখন যে সিনেমার জগৎ আমজগতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন, তা বড় বেশি চোখে পড়ে। সাধারণের সাহায্য তো দূর, মাটির ছোঁয়াটুকুও হারিয়ে ফেলেছে এপার বাংলার সিনেমা। থাকার মধ্যে এক পর্যটক-বিশেষ দৃষ্টি কেবল। ডাকাতের খপ্পরে পড়া মানুষগুলো বা তাদের উদ্ধারকর্তারা একে একে হারিয়ে গিয়েছে মায়োপিয়ার মহামারীতে। তবু গল্প থাকে, থাকে ইতিহাস। সেইসব গল্পের মধ্য দিয়েই এক মহাযাত্রার নিরন্তর বেঁচে থাকা।








