ক্ষমতার অঙ্কে হারিয়ে যাচ্ছে আদর্শ! গণতন্ত্রের সঙ্কট বাড়াচ্ছে দলবদলের রাজনীতি
প্রতীক উর রহমানের দলবদল রাজনীতি সচেতন তরুণ প্রজন্মকেও 'রাজনৈতিক ব্যবস্থা'র প্রতি অবিশ্বাসী করে তুলতে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করবে।
শুভেন্দু অধিকারী থেকে অর্জুন সিং, শঙ্কর ঘোষ থেকে প্রতীক উর রহমান, রুদ্রনীল ঘোষ থেকে কৌস্তুভ বাগচী— বাংলার রাজনীতিতে দলবদল এখন নিয়মিত ঘটে চলা এক স্বাভাবিক ঘটনায় পরিনত হয়েছে। এই দলবদলের রাজনীতি এবং ক্ষমতা সর্বস্ব, নীতি-হীন অস্পষ্ট জোট রাজনীতি বর্তমানে রাজনৈতিক ব্যধিতে পরিণত হয়েছে। মতাদর্শ, নীতি নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা বারবার ভূলুন্ঠিত হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থের কাছে। যা গোটা গনতান্ত্রিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অ-বিশ্বস্ত করে তুলছে। প্রতীক উর রহমানের দলবদল রাজনীতি সচেতন তরুণ প্রজন্মকেও 'রাজনৈতিক ব্যবস্থা'র প্রতি অবিশ্বাসী করে তুলতে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করবে।
রাজনীতিতে দলবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়। দলবদলে লাগাম টানতে, দৃশ্যত প্রচেষ্টা স্বরূপ 'দলবদল বিরোধী আইন' (১৯৮৫) সংবিধান সংশোধনের মধ্যে দিয়ে কার্যকর হয়। এই আইনের উপস্থিতি স্পষ্ট করে, দলবদল বহুকাল ধরেই চলে আসা একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তবে সামাজিক মাধ্যমের যুগে, দল পরিবর্তন একটি রাজনৈতিক ব্যধিতে পরিনত হয়েছে। সম্প্রতি নীতি নৈতিকতার বুলি আওড়ানো তথাকথিত বামপন্থী প্রতীক উর রহমান তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে ওই তথ্যচিত্রের রি-টেলিকাস্ট করলেন।
রাজনীতিকে বলা হয় সম্ভাবনার শিল্প। রণনীতিতে সবকিছুই সম্ভব। 'এভরিথিং ইস ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার' কথাটির সঙ্গেও আমরা কমবেশি পরিচিত। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে হারানোর জন্য বা জয়ী হওয়ার জন্য এবং ভালোবাসায় সব কিছু ‘ন্যায্য’। রাজনীতির ক্ষেত্রে তা হলো— মতাদর্শ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নীতি নৈতিকতা। তবে বর্তমানে সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে রাজনীতিকে তুলে ধরা হচ্ছে দলীয় স্বার্থ ও ব্যক্তি স্বার্থের জন্য, যেখানে আদর্শ ধর্ষিত হয় তার অনুগত বাহকদের হাতেই, ব্যক্তিস্বার্থের বিনিময়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রতীক উর বা সৃজন ভট্টাচার্যরা কি সহজ, গানিতিক হিসেব কষা কম ঝুঁকি এবং স্বল্প সময়ে বেশি লাভের বিনিয়োগের বাইরে বেড়িয়ে রাজনীতি করতে পারেন না?
কয়েকটি উদাহরণ বললে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। শুভেন্দু অধিকারী এক সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের দাপুটে নেতা ছিলেন। বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহকে বারবার আক্রমণ করেছেন। বিজেপি কেন খারাপ দল, কেন 'বহিরাগত' নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের মানুষ বর্জন করবেন— তার কারণ তুলে ধরে ভাষণ দিতেন। সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, ভোট মেশিনারি পরিচালনা ইত্যাদিতেও সক্রিয় ভুমিকা নিতেন। একাধিক দফতরের মন্ত্রীও ছিলেন। অর্থাৎ জনগনের মধ্যে অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক অবস্থান ও সরকারে অংশীদারিত্ব— সব ক্ষেত্রেই বিজেপি বিরোধিতায় তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পর তিনি ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দিলেন, নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহকে নেতা হিসেবে মানলেন, তৃণমূল কংগ্রেসকে শত্রুপক্ষ বানালেন এবং যে সরকারে তিনি মন্ত্রী ছিলেন সেই সরকারে তাঁর অংশটুকু বাদে বাকি সকল অংশের সমালোচনা শুরু করলেন। ২১-এর আগের শুভেন্দু অধিকারীকে ২১-এর পরের শুভেন্দু অধিকারী, নিজেই নিজের বিরোধীতা করলেন। এবং এই গোটা প্রক্রিয়া ব্যক্তিস্বার্থের বাইরে— তা হয়তো শুভেন্দু অধিকারী নিজেও একান্তে স্বীকার করবেন না। একইভাবে, শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে পর্যন্ত বিজেপিও তাঁর তীব্র বিরোধিতা করছিল। কিন্তু তিনি পদ্ম শিবিরে যোগ দিতেই সেই বিরোধিতা থেমে যায়, এবং তিনি হঠাৎই দলের কাছে ‘সৎ’ ও ‘সঠিক’ নেতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pratik Ur Rahman resignation: প্রতীক উর রহমান প্রকাশ্যে এখনও তৃণমূলে যোগদানের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। মহম্মদ সেলিমও প্রতীক উরের তৃণমূলে যোগদানের গুঞ্জনে স্পষ্ট ভাবে কিছু বলেননি, তবে ইঙ্গিতপূর্ন মন্তব্য করতে শোনা যায় তাঁকে।
একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে অর্জুন সিং, মুকুল রায়, বাবুল সুপ্রিয়, শঙ্কর ঘোষ, রুদ্রনীল ঘোষ ও সজল ঘোষের ক্ষেত্রেও। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতীক উর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনও সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি উদাহরণ। কিছুদিন আগেও তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করতেন এবং দলটিকে ধর্ষণ, দুষ্কর্ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করতেন। কিন্তু তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর তাঁর বক্তব্যে সম্পূর্ণ পরিবর্তন এসেছে; এখন তিনি সেই দলকেই প্রশংসা করছেন। অন্যদিকে, যে তৃণমূল কংগ্রেস আগে প্রতীক উরদের তীব্র আক্রমণের নিশানায় রাখত, তাদের দলে যোগ দেওয়ার পর তিনিই হয়ে উঠলেন দলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও আদরণীয় ব্যক্তি। এবং এক্ষেত্রেও ব্যক্তিস্বার্থের বাইরে কোনো বিষয় রয়েছে, তা হয়তো প্রতীক উর নিজেও একান্তে স্বীকার করবেন না। কিছু মজাদার উদাহরণও আছে— যেমন ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বরাহনগরে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন পার্ণো মিত্র, এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন তাপস রায়। ২০২৬-এর বিধানসভার নির্বাচন এগিয়ে এসেছে। ওই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর রাজনৈতিক পরিচয়ও পাল্টে গেছে। তাপস রায় এখন বিজেপিতে, পার্ণো মিত্র তৃণমূলে।
জোট রাজনীতির ক্ষেত্রেও দলীয় স্বার্থ আরও বেশি করে স্পষ্ট হয়। জাতীয় রাজনীতিতে বামফ্রন্ট, তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এক সঙ্গে 'ইন্ডিয়া' জোটে আছে। অথচ তারা বাংলায় একে অপরের বিরোধী পক্ষ। বড় শত্রুকে হারাতে ছোট শত্রুকে সাহায্য করা রণনীতির অংশ অবশ্যই। কিন্তু এই জোট রাজনীতিতে সেই অবস্থানও অস্পষ্ট। সিপিআইএমের কাছে বাংলায় বড় শত্রু বিজেপিকে আটকাতে ছোট শত্রু তৃণমূলকে বামফ্রন্ট সঙ্গে নিচ্ছে না বা শর্তহীন সাহায্যও করছে না। উল্টে 'বিজেমূল' ত্বত্ত্ব বা তৃণমূল-বিজেপি সেটিং-এর কথা বলছে, অথচ তারাই জাতীয় রাজনীতিতে এক সঙ্গে আছে। দলীয় শক্তিবৃদ্ধি, দলীয় স্বার্থ, ক্ষমতা সর্বস্ব রাজনীতি এখানে আবারও স্পষ্ট হয়। একই উদাহরণ তৃণমূল কংগ্রেস, জাতীয় কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, বিজেপি, নিতীশ কুমার ও চন্দ্রবাবু নাইডুর দলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
রাজনৈতিক দলগুলি, নেতারা ভুলে যান; সাধারণ মানুষ সব কিছু ভুলে যায় না। যারা ভুক্তভোগী, রাজনীতির নোংরা খেলায় যারা ভিকটিম, যাদের পিঠে অন্য দলের ঝান্ডার দাগ আছে— তারা এসব ভুলে যায় না। তারা সব মনে রাখে। যখন তারা সুযোগ পায়, যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন তারা এর শোধ চায়, শোধ নেয়। আর যখন এই ঘটনাগুলো বারবার ঘটে, যখন সবাই মতাদর্শের বাইরে গিয়ে, নীতি নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে, সামাজিক দায়বদ্ধতা বিসর্জন দিয়ে এই কাজ করতে থাকে, সাধারণ মানুষ যখন আর কোনো আশা খুঁজে পায় না, যখন শেষ প্রদীপও নিভে যায়, তখন ওই ব্যবস্থা নিয়েই মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠে। গণতন্ত্র, রাজনৈতিক কাঠামো আদৌ কতটা মানুষের জন্য, সমাজের জন্য? সেই প্রশ্ন ওঠে এবং এই প্রশ্ন শুধু কোনো একক ব্যক্তি তোলে না। সামগ্রিক ভাবে সমাজ এই প্রশ্ন করে। রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস তখন কোনো ব্যক্তির থাকে না, গোটা সমাজের এই অবিশ্বাস জন্মায়। প্রতীক উর রহমান ওই প্রশ্নগুলো করার সংখ্যাটা বাড়িয়ে দিলেন। যারা মনে করেছিল নতুন প্রজন্মের নেতারা, অন্তত যারা নিজেরা নীতি নৈতিকতার কথা বলেন, যারা এই দলবদলের সমালোচনা করেন, তারা অন্তত নীতি-হীন হবেন না। তারা অন্তত যার বিরুদ্ধে ভোটে লড়াই করেছেন তার হাত থেকে অন্য দলের পতাকা তুলে নেবেন না।
কিন্তু যখন প্রতীক উর রহমান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে তৃণমূলের পতাকা গ্রহণ করেন, তখন স্বচ্ছ ও নীতিনিষ্ঠ রাজনীতিতে বিশ্বাসী মানুষ— বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম নিশ্চয়ই এই অবিশ্বস্ত রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রশ্ন করার এবং তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে উদ্যত হবে বলেই আশা করা যায়। দলবদলের রাজনীতির যতই স্বাভাবিকীকরণ হোক না কেন, আসলে মানুষ ভুলে যায় না। ইতিহাসও ভুলে যায় না। রাজনীতির প্রতিটি অবস্থান, প্রতিটি দলবদল, প্রতিটি আপস ভবিষ্যতের আস্থাকে প্রভাবিত করে। তাই ক্ষমতার অঙ্কের বাইরে গিয়ে বিশ্বাসের অঙ্কটাও কষা জরুরি।






