অরুণাচলে ফের মুখোমুখি ভারত-চিন সেনা, বিরোধের নেপথ্যে কী?

India-China Border: সীমান্ত বিরোধ মেটাতে একের পর এক বৈঠক, সামরিক স্তরে আলোচনা এবং শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অরুণাচলে ভারত-চিন উত্তেজনা কেন কমছে না? প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে বিরোধের ইতিহাস কী? চিনের সামরিক আধুনিকীকরণের মোকাবিলায় ভারতের প্রস্তুতি কতটা, আর কূটনীতি কি আদৌ স্থায়ী শান্তির পথ দেখাতে পারবে?

Tanvia Barua
৭ মিনিট
অরুণাচলে ফের মুখোমুখি ভারত-চিন সেনা, বিরোধের নেপথ্যে কী?

অরুণাচল প্রদেশে ভারত ও চিনের সেনাবাহিনীর মধ্যে ফের মুখোমুখি অবস্থানের খবর দুই দেশের সীমান্ত পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। কয়েক মাস ধরে সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে একাধিক বৈঠক হয়েছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বও সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। তা সত্ত্বেও অরুণাচলের একাধিক এলাকায় সেনাদের মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছেন ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা আইটিবিপির মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুর। ফলে প্রশ্ন উঠছে, আলোচনার পরেও কেন সীমান্তে উত্তেজনা কমছে না? প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে দুই দেশের বিরোধের চরিত্র কী? আর চিনের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির তুলনায় ভারত নিজের সীমান্ত সুরক্ষার প্রস্তুতি কতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে?

রাজস্থানের আলওয়ারে একটি অনুষ্ঠানে আইটিবিপির মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুর জানান, অরুণাচল প্রদেশের একাধিক জায়গায় ভারত ও চিনের সেনাদের মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি তখনও অব্যাহত ছিল। সীমান্তে কর্মরত আইটিবিপির শৌর্য কমান্ডো দলগুলি ওই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলেও তিনি জানান।

তবে কাপুরের প্রকাশ্য বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায়নি। কোন এলাকায় ঠিক কী ঘটেছিল, দুই দেশের সেনারা কতক্ষণ মুখোমুখি ছিলেন, কিংবা কোন জায়গায় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন হয়েছিল কি না, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য থেকে সীমান্তে উত্তেজনা থাকার বিষয়টি জানা গেলেও, প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য পাওয়া যায় না।

ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চিনা সেনারা প্রচলিত টহল দেওয়ার পদ্ধতি থেকে সরে এলে সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। দুই দেশই আলোচনার মাধ্যমে এই ধরনের সমস্যার সমাধান করতে চায়। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো এবং শান্তি বজায় রাখাও দুই দেশের ঘোষিত লক্ষ্য।

সীমান্তের কোনো এলাকায় দুই দেশের দাবির মধ্যে পার্থক্য থাকলে টহলদারি দল পরস্পরের মুখোমুখি হতে পারে। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে সঠিক বলে দাবি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সেনাদের মধ্যে সংঘাত না হলেও উত্তেজনা তৈরি হয়। কিন্তু কোনো এলাকায় নতুন করে সেনা মোতায়েন, তাঁবু খাটানো কিংবা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তনের মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে আলাদা করে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

চলতি বছর জুনের শেষ দিকে অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার তাখত সিং এলাকায় চিনা সেনাদের গতিবিধি নিয়ে অভিযোগ সামনে এসেছিল। স্থানীয় সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি দাবি করেছিল, সীমান্তের কাছাকাছি কয়েকটি জায়গায় চিনা সেনাদের উপস্থিতি বেড়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য ছিল, আগে স্থানীয় মানুষ যেসব এলাকায় শিকার করতে, পশু চরাতে বা ধর্মীয় কাজে যেতেন, সেখানে পৌঁছনো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে। কয়েকটি জায়গায় চিনা সেনারা শিবির বা অন্য পরিকাঠামো তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছিল।

তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী এই অভিযোগ অস্বীকার করে। অরুণাচল প্রদেশের ভিতরে চিনা অনুপ্রবেশ এবং শিবির তৈরির খবরকে ভিত্তিহীন বলে জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ, স্থানীয় সংগঠনের অভিযোগ এবং সেনাবাহিনীর বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

এর পর জুলাই মাসে মাজা এলাকার কাছে দুই দেশের টহলদারি দলের মুখোমুখি হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক মুখোমুখি অবস্থানের পর দুই পক্ষই সেখান থেকে ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিন পরে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএর আরও সেনা সেখানে ফিরে এসে তাঁবু খাটায় বলে অভিযোগ ওঠে। ভারতের বিবেচনায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার যে অংশ ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে পড়ে, তাঁবুগুলি তার প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার ভিতরে ছিল বলেও কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আর কত গুলিগোলা! AI দিয়ে সীমান্তে জঙ্গি কার্যকলাপ আটকানো সম্ভব ভারতে?

AI Border Security: ইজরায়েলের মতো দেশের সীমান্ত কম্পিউটারাইজড থার্মাল ইমেজিং সিস্টেম সম্বলিত নিরাপত্তা বলয়ে মোড়া। কোনও প্রাণী, মানুষ বা যানবাহন সীমান্ত টপকালেই সে খবর তাদের কাছে পৌঁছয়।

তবে এই অভিযোগের সব দিক সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। বিদেশ মন্ত্রক সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও তাঁবু খাটানোর অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ দেয়নি।

ভারত ও চিনের সীমান্ত বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি)। এই রেখা কোনো পারস্পরিকভাবে স্বীকৃত চূড়ান্ত আন্তর্জাতিক সীমান্ত নয়। দুই দেশ যে অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে মনে করে, তার মধ্যবর্তী সীমারেখা বোঝাতেই এলএসি শব্দটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই রেখার অবস্থান নিয়ে দুই দেশের ধারণা এক নয়। ফলে কোনো কোনো এলাকায় ভারত ও চিনের টহলদারি এলাকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

ভারতের হিসেব অনুযায়ী, ভারত-চিন সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩,৪৮৮ কিলোমিটার। চিন এই হিসাব মানে না। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধকে সাধারণত পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিম—এই তিনটি অংশে ভাগ করা হয়। পূর্বাঞ্চলে অরুণাচল প্রদেশ ও সিকিম, মধ্যাঞ্চলে হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড এবং পশ্চিমাঞ্চলে লাদাখের সীমান্ত রয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চলে আকসাই চিন নিয়ে দুই দেশের বিরোধ দীর্ঘদিনের। প্রায় ৩৮ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চল বর্তমানে চিনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভারত আকসাই চিনকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। অন্যদিকে, পূর্বাঞ্চলে অরুণাচল প্রদেশের প্রায় ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাকে চিন নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। ভারত এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে।

অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে বিরোধের ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে ১৯১৪ সালের সিমলা সম্মেলনে। ওই সম্মেলনে ব্রিটিশ ভারতের বিদেশসচিব হেনরি ম্যাকমোহন ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের মধ্যে একটি সীমারেখা নির্ধারণ করেন। সেটিই ম্যাকমোহন লাইন নামে পরিচিত। ভারত এই রেখাকে পূর্বাঞ্চলে সীমান্তের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু চিন এই সীমারেখাকে স্বীকৃতি দেয় না।

চিনের যুক্তি, ১৯১৪ সালের চুক্তিতে চিনের সম্মতি ছিল না। তিব্বতকে চিন নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে। তাই তিব্বতের প্রতিনিধিরা এককভাবে এমন কোনো সীমান্ত চুক্তি করতে পারেন না, যা চিনের ভূখণ্ডগত অধিকারকে প্রভাবিত করে। এই যুক্তির ভিত্তিতে চিন অরুণাচল প্রদেশকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বলে দাবি করে।

অন্যদিকে, ভারতের অবস্থান, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে নির্বাচিত সরকার, প্রশাসন এবং ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। চিনের দাবি বা জায়গার নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে এই বাস্তবতা বদলে যায় না বলে ভারত বারবার জানিয়েছে।

এই বিরোধের ফলে সীমান্তের কিছু এলাকায় দুই দেশের দাবির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কোনো এলাকায় এক পক্ষের কাছে টহল দেওয়া স্বাভাবিক কাজ হলেও অন্য পক্ষ সেটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় প্রবেশ হিসেবে দেখতে পারে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পুলিশের নজর এড়িয়েই বৈসরনে পর্যটকরা! নিরাপত্তার যে যে গাফিলতি স্বীকার কেন্দ্রের

Amit Shah on Kashmir: কেন পুলিশের অনুমতি ছাড়াই এমন বিপজ্জনক জায়গায় পর্যটকদের প্রবেশ সম্ভব হচ্ছে? এর দায় কার?

১৯৬২ সালে ভারত ও চিনের মধ্যে যুদ্ধ হয়। পূর্ব ও পশ্চিম—দুই সীমান্তেই চিনা সেনাবাহিনী অগ্রসর হয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পর চিন অরুণাচল প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নিলেও আকসাই চিনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। এই যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্কের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

পরবর্তী কয়েক দশকে সীমান্ত বিরোধ সমাধানের জন্য একাধিক আলোচনা ও চুক্তি হয়। ১৯৯৩ সালে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চুক্তি এবং ১৯৯৬ সালে সামরিক ক্ষেত্রে আস্থা বৃদ্ধির চুক্তি তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল, চূড়ান্ত সীমান্ত নির্ধারিত না হলেও যেন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর সংঘাতের আশঙ্কা কমানো যায়।

কিন্তু ২০২০ সালের ১৫ জুন পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে হিংসাত্মক সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে বদলে দেয়। ওই ঘটনায় ভারতের ২০ জন সেনা নিহত হন। চিনও পরে তাদের চারজন সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করে। ১৯৭৫ সালের পর এই প্রথম ভারত-চিন সীমান্তে সংঘর্ষে সেনাদের প্রাণহানি ঘটে।

গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস বেড়ে যায়। লাদাখের একাধিক এলাকায় বিপুল সংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়। সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চললেও দেপসাং ও দেমচক-সহ কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা বজায় ছিল।

২০২৪ সালের অক্টোবরে পূর্ব লাদাখের দেপসাং ও দেমচক এলাকায় টহল দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে দুই দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছয়। এরপর ওই দুই এলাকা থেকে সেনা সরানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই সমঝোতা সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত-চিন সীমান্তের সমস্ত বিরোধ মিটে গিয়েছে।

একের পর এক বৈঠকের পরেও কেন উত্তেজনা? চলতি বছর অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরে ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়। ৬ অগাস্ট সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা ও সমন্বয়ের জন্য গঠিত ওয়ার্কিং মেকানিজমের ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২৬ অগাস্ট বেজিংয়ে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে ২৫তম দফার আলোচনা হয়। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই ওই আলোচনায় নেতৃত্ব দেন।

এর পর ৬ সেপ্টেম্বর অরুণাচল প্রদেশে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে কোর কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক হয়। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর অরুণাচল প্রদেশে এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের সামরিক আলোচনার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। কারণ, এর আগে কোর কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনা মূলত পূর্ব লাদাখের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে হয়েছে।

তবে এই বৈঠকগুলির নির্দিষ্ট ফলাফল বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কোন বিষয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছেছে, কোথায় মতপার্থক্য রয়ে গিয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া কঠিন।

আইটিবিপির মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুরের বক্তব্যে চিনের সামরিক আধুনিকীকরণ এবং বিপুল বিনিয়োগের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। চিন দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিকাঠামো উন্নয়ন, নজরদারি এবং দ্রুত সেনা মোতায়েনের ব্যবস্থাও এই সামরিক প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কাপুর ড্রোনের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন সংঘাতে ড্রোন নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্ত করা এবং সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও ড্রোনের ব্যবহার যুদ্ধের ধরনকে প্রভাবিত করেছে। সীমান্তে ড্রোন ব্যবহার করলে দুর্গম এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং সেনাদের গতিবিধি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে।

এখানে আইটিবিপির সরঞ্জাম নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কাপুরের বক্তব্য অনুযায়ী, বাহিনীর বহু সরঞ্জাম পুরনো হয়ে গিয়েছে এবং সেগুলি বদলে আধুনিক সরঞ্জাম আনা জরুরি। সীমান্তে কর্মরত বাহিনীর কাছে রাতের অন্ধকারে নজরদারির উপযোগী যন্ত্র, তাপচিত্র গ্রহণের প্রযুক্তি, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং আধুনিক নিশানাযন্ত্র থাকলে দায়িত্ব পালন সহজ হতে পারে।

আইটিবিপি ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাজের ধরন এক নয়। কিন্তু প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার মতো সংবেদনশীল এলাকায় দুই বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হলে তথ্য আদানপ্রদান, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

সামরিক প্রস্তুতির সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতারও সম্পর্ক রয়েছে। বড় অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরক্ষা গবেষণা, প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম এবং সীমান্তবর্তী পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে পারে। চিনের অর্থনীতি ভারতের তুলনায় অনেক বড়। ফলে সামরিক আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে চিনের বিনিয়োগের ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য।

ভারত ও চিনের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কও গভীর। বৈদ্যুতিন যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক পদার্থ এবং ওষুধ তৈরির কাঁচামাল-সহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য ভারত চিনের উপর নির্ভর করে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা সহজ নয়।

তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকলেই সীমান্তে সংঘাতের আশঙ্কা দূর হয়ে যায় না। বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে, কিন্তু সীমান্তের বিরোধ মেটানোর জন্য আলাদা রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগ প্রয়োজন। একইভাবে, চিনের সঙ্গে বাণিজ্য চললেও ভারতের সীমান্ত সুরক্ষার প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।

সরকারের পক্ষ থেকেও সীমান্তের ঘটনা সম্পর্কে যথাসম্ভব স্পষ্ট তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। কোথায় সেনাদের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তা কীভাবে সামাল দেওয়া হয়েছে এবং কোনো এলাকায় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন হয়েছে কি না—এই প্রশ্নগুলির উত্তর জানা গুরুত্বপূর্ণ। সব সামরিক তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়, কিন্তু সীমান্তের পরিস্থিতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা বিভ্রান্তি তৈরি না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মণিপুরে কেন কুকি শিবিরের নিয়ন্ত্রণ নিল যৌথ বাহিনী?

Manipur SoO camp raid: মণিপুরে SoO চুক্তির আওতায় থাকা কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর শিবিরে ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও ১৭ জনের গ্রেফতারি কি শান্তিচুক্তির নজরদারি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনছে?

১৩ দিন ধরে অনশনে পড়ুয়ারা, কী হচ্ছে জামিয়ায়?

Jamia Millia Islamia protest: ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে পড়ুয়াদের অনশন ও উত্তেজনার জেরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় ক্লাস অনলাইনে সরিয়ে নেওয়ায় ক্যাম্পাসের অচলাবস্থা কি আদৌ কাটবে, নাকি প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করবে?

জঁ দ্রেজ, কে আপনি?

Jean Dreze Economic Philosophy: দ্রেজের কাছে দারিদ্র্য দূরীকরণ মানে শুধু দরিদ্র পরিবারকে কিছু আর্থিক সাহায্য দেওয়া নয়। প্রয়োজন কাজের সুযোগ, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যা মানুষকে নিজের জীবন গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ দেয়। দুই প্রশ্নের সময়ক্ষেত্র আলাদা হলেও দুটির দর্শনগত দিক একই—যেখানে শিক্ষা আনে চেতনা, আর চেতনা আনে বিপ্লব।

অরুণাচলে বাঁধবিরোধী আন্দোলনে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাসে আহত একাধিক মহিলা

Arunachal Pradesh: সিয়াং নদীর উপর প্রস্তাবিত বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতায় ২৩ অক্টোবর, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।

পুজোর আচার না মানলে... তিন খ্রিস্টান পরবিবারের উপর চড়াও বজরং দল

১৯ অক্টোবর লক্ষ্মী মণ্ডল, তাঁর স্বামী, বনশ্রী মণ্ডল ও তাঁর স্বামী গোপাল মণ্ডল-সহ কয়েকজনকে জোর করে ডিঙ্গল গ্রামের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মীয় আচার পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

SBI Data Leak: কীভাবে ফাঁস হলো ৩,৮৯৭ গ্রাহকের তথ্য? কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট?

SBI Data Leak: SBI-এর ৩,৮৯৭ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়ার ঘটনায় কতটা ঝুঁকিতে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট? সাইবার প্রতারণা থেকে নিজের টাকা সুরক্ষিত রাখতে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করবেন?

নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের অভিযোগে পদক্ষেপ করেনি কেন্দ্র, আরটিআইতে সামনে এল চিঠি চালাচালির তথ্য

ECI RTI revelation: নির্বাচন কমিশনের অন্দরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই কমিশনারের অসন্তোষ ও মন্ত্রিসচিবকে চিঠি দেওয়ার ঘটনাটি আরটিআই নথিতে কীভাবে প্রকাশ্যে এল, এবং সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের স্বার্থে সচিবালয় কেন সরাসরি পদক্ষেপে বিরত থাকল?