ভারতীয় সিঙ্গল মল্টের উত্থান: যেভাবে বিশ্ববাজারে বাড়ছে দেশি হুইস্কির কদর
Indian single malt whisky: CIABC এবং বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি রিপোর্টের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে ২০২৫ সালে ভারতীয় ‘Made in India’ সিঙ্গেল মল্টের ডোমেস্টিক বিক্রি প্রায় ৫ লাখ কেস ছুঁয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।
ভারতকে সাধারণত বলা হয় বিশ্বের হুইস্কির বৃহত্তম রাজধানী। স্কচ থেকে শুরু করে আইরিশ, বোর্দো ওয়াইন কিংবা মেক্সিকোর টেকিলা—বিশ্বের তাবৎ দামী মদ আমদানি করার ক্ষেত্রে ভারতের জুড়ি মেলা ভার। দোকানে গেলে বিদেশি লেবেলে তাক ভর্তি। কিন্তু এই চিরচেনা ছবির সমান্তরালে জন্ম নিয়েছে এক নতুন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্যারাডক্স—যে দেশে অ্যালকোহলের সিংহভাগ আমদানি হয়, সেই দেশই আজ নিজের হাতে তৈরি সিঙ্গেল মল্ট হুইস্কি পাঠাচ্ছে বিদেশে। বিশ্বমানের সব প্রতিযোগিতায় সোনা জিতে কাঁপিয়ে দিচ্ছে গ্লোবাল স্পিরিটস মার্কেট।
এতদিন ধরে ভারতীয় মদ বলতেই এককালে বোঝানো হতো সস্তা মল্যাস-বেসড হুইস্কি। কিন্তু আজ ভারতীয় ডিস্টিলারিগুলি তৈরি করছে খাঁটি বার্লি থেকে তৈরি প্রিমিয়াম সিঙ্গেল মল্ট, যা পাল্লা দিচ্ছে স্কটল্যান্ডের সেরা বোতলগুলির সঙ্গে। CIABC এবং বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি রিপোর্টের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে ২০২৫ সালে ভারতীয় ‘Made in India’ সিঙ্গেল মল্টের ডোমেস্টিক বিক্রি প্রায় ৫ লাখ কেস ছুঁয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। ট্র্যাজেক্টরি খেয়াল করলে দেখা যায়, যেখানে ২০২৩ সালে বিক্রি ছিল সাড়ে তিন লাখ কেস, ২০২৪ সালে তা পৌঁছয় চার লাখে, আর ২০২৫ সালে সোজা পাঁচ লাখে গিয়ে ঠেকেছে এবং গত দুই বছরে সামগ্রিক বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। সবচেয়ে বড় কথা, এই বাজারের ৯২ শতাংশই ভারতীয় মালিকানাধীন দেশি কোম্পানিগুলির দখলে রয়েছে। অমৃত, রামপুর, ইন্দ্রী এবং পল জন—এই চার মহারথী বাজার শাসন করছে এবং সঙ্গে যোগ হয়েছে সোনা গোল্ড, জ্ঞানচাঁদ, দোয়াআব, ক্রেজি ককের মতো নতুন নাম। অন্যদিকে মাল্টিন্যাশনাল জায়ান্টদের ভারতীয় ভেঞ্চারগুলি ধরে রেখেছে প্রায় সাত শতাংশ শেয়ার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mahua liquor: পৃথিবীতে ফুল থেকে তৈরি হওয়া হাতেগোনা কয়েকটি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের মধ্যে মহুয়া অন্যতম। এটি শুধু একটি পানীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের গভীর জঙ্গল, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। কিন্তু জংলি ফুল দিয়ে তৈরি মহুয়া এখন আর স্রেফ ‘কান্ট্রি লিকার’ নয়, বরং হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক লাক্সারি ব্র্যান্ড।
আসল চমকটি লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। ভারতে আমদানিকৃত সিঙ্গেল মল্ট এবং দেশি সিঙ্গেল মল্ট মিলিয়ে মোট বাজার প্রায় সাড়ে আট লাখ কেসের। এর মধ্যে আমদানিকৃত সিঙ্গেল মল্টের পরিমাণ সাড়ে তিন লাখ কেসের মতো। অর্থাৎ, আজ লোকাল সিঙ্গেল মল্ট মোট বাজারের প্রায় উনষাট শতাংশ দখল করে আছে। হিসাব বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই বিক্রি ছয় গুণেরও বেশি বেড়েছে। চাহিদা এতটাই তুঙ্গে যে অনেক ডিস্টিলারি এখন স্টক রেশনের মুখে পড়েছে, কারণ সিঙ্গেল মল্ট পরিপক্ক হতে কয়েক বছর সময় লাগে আর সেই অনুপাতে উৎপাদন বাড়ানো রাতারাতি সম্ভব হচ্ছে না।
স্কটল্যান্ডের ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় হুইস্কি পেকে উঠতে দীর্ঘ সময় নেয়। কিন্তু ভারতের আবহাওয়া সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের দেশের উষ্ণ ও আর্দ্র ট্রপিক্যাল জলবায়ুতে ব্যারেলের কাঠ ও তরলের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া হয় অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। এটিকে বলা হয় ট্রপিক্যাল ম্যাজিক বা ট্রপিক্যাল ম্যাচুরেশন। এর ফলে ব্যারেলের ভিতরের কাঠের ফ্লেভার খুব দ্রুত হুইস্কির মধ্যে মিশে যায় এবং কম বয়সেই ভারতীয় সিঙ্গেল মল্ট পেয়ে যায় এক গভীর, পরিণত, ফ্রুটি এবং স্পাইসি নোট। স্কটিশ বা জাপানিজ হুইস্কির চেনা বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এই স্বতন্ত্র স্বাদই আন্তর্জাতিক কনসোইজার বা হুইস্কি বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Somras The Alcohol: অশ্বিনীকুমারেরা শূদ্র জাতীয় দেবতা বলে ইন্দ্রাদি উচ্চবর্ণীয় দেবতারা মোটেও চাইতেন না যে তাঁরা সেই উচ্চমানের সোমরস ভোগ করুন।
আজ ভারতীয় সিঙ্গেল মল্ট আর শুধু দেশের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া—বিশ্বের নামী-দামী মিশেলিন-স্টার রেস্তোরাঁ ও বারে এখন শোভা পাচ্ছে অমৃত, ইন্দ্রী বা রামপুরের বোতল। ইন্দ্রীর মতো ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক মঞ্চে সেরা ওয়ার্ল্ড হুইস্কি খেতাব ছিনিয়ে নিয়েছে। রামপুর জুগলবন্দি জিতেছে সেরা ওয়ার্ল্ড সিঙ্গেল মল্টের ট্রফি। জ্ঞানচাঁদ পেয়েছে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ডাবল গোল্ড। ইন্দ্রীর ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে তাদের মোট বিক্রির প্রায় সাতাশ শতাংশই আসে এক্সপোর্ট মার্কেট থেকে। সামগ্রিকভাবে, ভারত সরকারের লক্ষ্য আগামী দশকের মধ্যে দেশের মোট অ্যালকোহলিক বেভারেজ এক্সপোর্টকে এক বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া এবং এই বিশাল লক্ষ্যের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে চলেছে এই প্রিমিয়াম সিঙ্গেল মল্ট ক্যাটাগরি।
অবশ্য মেনে নেওয়া দরকার ভারতের মোট অ্যালকোহল এক্সপোর্টের বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে সাধারণ স্পিরিট এবং সিঙ্গেল মল্ট রপ্তানির পরিমাণ এখনও কয়েক লাখ কেসের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কারণ দেশের মধ্যেই চাহিদার যে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা মেটাতেই হিমসিম খাচ্ছে কোম্পানিগুলি। অমৃত বা রামপুরের মতো ব্র্যান্ডগুলি আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রেখেই তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে স্টক ভাগ করছে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই প্যারাডক্সটি আরও স্পষ্ট হয়। ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় হুইস্কি ভলিউম কনজিউমার। ২০২৫ সালে কেবল ভারতেই মোট হুইস্কি খরচ হয়েছে প্রায় ছাব্বিশ কোটি কেসের বেশি। এর মধ্যে স্কচ হুইস্কির দিক থেকে ভারত এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় এক্সপোর্ট মার্কেট। এক বছরে ভারতে বিপুল পরিমাণে স্কচ আমদানি হয়েছে যার আর্থিক মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকার বেশি। এর উপর শুল্ক কমার কারণে আমদানি আরও বাড়বে। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে যে যেখানে বিদেশ থেকে এত মদ আসছে, সেখানে আমাদের সিঙ্গেল মল্ট রপ্তানির খবরকে এত বড় করে দেখা হচ্ছে কেন? কারণ, এতদিন আমরা ছিলাম সস্তা মদের ক্রেতা এবং আজ প্রিমিয়াম সেগমেন্টে দাঁড়িয়ে আমরা এমন এক পণ্য তৈরি করছি যা ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ পয়সা খরচ করে কিনে খাচ্ছে। এটা কেবল ব্যবসা নয়, এটা একটা কালচারাল শিফট বা সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের রূপান্তর।
এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে শৃঙ্খলায় বাঁধতে এবং বিশ্ববাজারে ভারতীয় সিঙ্গেল মল্টের খাঁটি মান বজায় রাখতে সম্প্রতি গঠিত হয়েছে ইন্ডিয়ান মল্ট হুইস্কি অ্যাসোসিয়েশন। তারা একটি সুনির্দিষ্ট সার্টিফিকেশন মার্ক চালু করেছে যেখানে বলা হয়েছে ভারতীয় সিঙ্গেল মল্ট হতে গেলে তাকে শতভাগ মল্টেড বার্লি, কপার পট স্টিল এবং ওক ব্যারেলে অন্তত ন্যূনতম তিন বছর ধরে পাকা হতে হবে এবং সম্পূর্ণ ভারতেই উৎপাদিত হতে হবে। পাশাপাশি স্কচ হুইস্কি অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গেও ভারতীয় সংস্থাগুলির সহযোগিতার হাত মেলানো প্রমাণ করে যে গ্লোবাল হুইস্কি মানচিত্রে ভারত এখন আর কোনো ব্র্যাকেটবন্দি নিশ মার্কেট নয়, বরং আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।






