কেন রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চাইছে নতুন প্রজন্ম? নতুন সমীক্ষা যে প্রশ্ন তুলে দিল
Indian Politics: যুবসমাজ আগ্রহ হারাচ্ছে রাজনীতিতে, সমীক্ষায় উঠে আসছে বিস্ফোরক তথ্য।

রাজনীতি গঠনমূলক হলে তা সমাজ ও মানুষের পক্ষে মঙ্গলের। তবে সে আশায় গুড়ে বালি। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৭৫ বছর পেরিয়ে ভারতীয় রাজনীতি মানেই নেতা-নেত্রীর পারস্পরিক লড়াই। দিনেদিনে আদর্শ গৌণ হচ্ছে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে রাজনীতির পরিসরে লাগাতার দুর্নীতি অথবা রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপরাধমূলক কাণ্ডের খতিয়ান, যা সংবাদমাধ্যমে রসালো আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় রাজনীতির এই বেহাল দশা আদৌ কাটবে কি না তাও বলা মুশকিল। অন্তত তেমন কোনও লক্ষণ চোখে পড়ছে না। কথায় বলে, 'যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ'। এদেশে রাজনীতিকদের সম্পর্কে মানুষের ধারণাও এমনই।
ভারতে প্রায় ১৪০ কোটির কাছাকাছি মানুষ বসবাস করেন। এদের মধ্যে বড় অংশ তরুণ সম্প্রদায়ের। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, ৪১ শতাংশ ভারতীয় নাগরিকেরই বয়স ২০ বছরের নিচে।
ভারতীয় নাগরিক যুব সম্প্রদায়ের ইদানীংকালের রাজনীতি নিয়ে কী মনোভাব, ওঁদের সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না, এই নিয়ে হাতে গোনা কয়েকটি সমীক্ষা হয়েছে। সেইসব সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, যুব সম্প্রদায় রাজনীতির প্রতি ঘোরতর বীতশ্রদ্ধ। তাই ওঁরা প্রত্যক্ষ রাজনীতি করে 'সুস্থ শরীরকে ব্যস্ত' করতে নারাজ।
'কুভিরা' নামে একটি সংস্থার তরফে রাজনীতিতে এই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভূমিকা সম্পর্কে সমীক্ষা চালানো হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতা দখল করতে যেভাবে আকচাআকচি করছেন যুব সম্প্রদায় একে অবক্ষয়ের বিপজ্জনক চিহ্ন হিসেবে মনে করছেন। অনলাইনে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে দেশের ২৪টি রাজ্যে।
ওই সমীক্ষায় ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সি নাবালক-নাবালিকারা জানিয়েছে, রাজনীতির খবরাখবর রাখলেও ভবিষ্যতেও রাজনীতির ময়দানে পা রাখার কোনও পরিকল্পনাই ওদের নেই। বর্তমানে দেশের নানা রাজনৈতিক দলের নেতারা যেভাবে পরস্পরের প্রতি যুযুধানরত তাতে বীতশ্রদ্ধ নাবালক-নাবালিকারা পর্যন্ত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Indian Politics: সমীক্ষায় এও জানা গিয়েছে, ছেলেদের তুলনায় বেশি সংখ্যক মেয়ে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে ইচ্ছাপ্রকাশ করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২২ বছরের এক তরুণীর কথায়, রাজনীতিকরা নীতি প্রণয়ন করছেন জনগণের মতামতের কোনও তোয়াক্কা না করেই। মানুষ যেন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। এদিকে রাজনীতিকরা কুরুচিকরভাবে পরস্পরের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছেন।
ভারতের রাজনীতিকদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে মোটে ২৯ শতাংশ নাবালক-নাবালিকার। এদের বয়স ১১ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
'কুভিরা'-র সমীক্ষায় উঠে এসেছে আরও কিছু আকর্ষণীয় তথ্য। যেমন, কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের দোরগোড়ায় পা রাখা ছেলেদের চেয়ে রাজনীতিতে যোগ দিতে বেশি মাত্রায় আগ্রহী মেয়েরা। আর প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের মধ্যে ৩২ শতাংশ পুরুষ এবং মোটে ২০ শতাংশ মহিলা ভবিষ্যতে প্রত্যক্ষ রাজনীতি করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন।
সমীক্ষকরা জানাচ্ছেন, যারা রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন এদের মধ্যে প্রায় সকলেই স্কুল-কলেজে পড়াকালীন ছাত্র রাজনীতি করেছেন। এমনকী, ছাত্র সংসদের নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। অন্যদিকে, রাজনীতিতে অনাগ্রহীরা স্কুল-কলেজে পড়াকালীন সন্তর্পণে এড়িয়ে গিয়েছেন রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পাট।
কেমন রাজনীতিক হলে ভালো হতো, সে-ব্যাপারে তরুণ প্রজন্মের মত হলো, রাজনীতি যাঁরা করছেন, মানুষের দুর্দশায় তাঁদের মানুষের পাশে থাকা অবশ্য কর্তব্য। রাজনীতিকদের সর্বতোভাবে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকেও দেশ পরিচালনার নেতৃত্ব উঠে আসা উচিত। এতে মানুষের কঠোর বাস্তব সমস্যাগুলির খানিক সুরাহা হতে পারে বলে সমীক্ষকদের কাছে অভিমত জানিয়েছেন অনেকেই।
রাজনীতিকদের মাধ্যমে নাগরিকদের জীবনের সাধারণ সমস্যাগুলো বছরের পর বছর ধরে না মিটলে জনগণ কী ধরনের পদক্ষেপ করতে পারে, সে-সম্পর্কে লিখেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অ্যালবার্ট ও হির্শম্যান। এ-বিষয়ে লেখা ওই বইটির নাম 'এক্সিট, ভয়েস অ্যান্ড লয়ালটি'।
হির্শম্যান দেখিয়েছেন, ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হন অধিকাংশ ক্ষেত্রে। এতে জনগণও ওঁদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনীতিকরা ভোটের আগে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোট মিটলে সেসবের ধারকাছ মাড়ান না।
ভারতে আগামী দিনের রাজনীতিকদের কোন কোন কাজে গুরুত্ব দিতে হবে? সমীক্ষায় ধরা পড়েছে এসম্পর্কিত তথ্যও। যেমন, ৭৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের কাজ হল দারিদ্র্য এবং বৈষম্য দূরীকরণ। স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ যাতে নাগরিকদের কাছে সহজলভ্য হয়, এও গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। তাছাড়া পরিবেশকে নির্বিচারে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেই মনে করেন যথাক্রমে ৭০ শতাংশ এবং ৬৯ শতাংশ ভারতীয় নাগরিক। বলাই বাহুল্য, গণতন্ত্রের বিকাশে জনগণের কাছে সুযোগ-সুবিধাগুলো পৌঁছে দিতে জরুরি কাজ পরিকাঠামোগত উন্নয়নও।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ১৪ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরী থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত নাগরিকদের চিন্তাভাবনা নিয়ে ভারতেও নানা গবেষণা হয়েছে। ভারতে বিপুল সংখ্যক নাগরিকই যুব সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অধিকাংশ রাজনীতিকের স্বার্থপরতা এবং অসামাজিক আচরণ দেশের ভবিষ্যতের নাগরিকদের চলতি রাজনীতি সম্পর্কে কেবল বীতশ্রদ্ধই করছে না, একইসঙ্গে চোখে আঙুল দিয়ে যেন দেখাচ্ছে, আত্মত্যাগ করে কি হবে? এর চেয়ে যথোপযুক্ত কাজ স্রেফ নিজের চাহিদাগুলি যে কোনও প্রকারে চরিতার্থ করা।
এই আবহে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে যাঁরা মেধাবী এবং উচ্চশিক্ষিত তাঁরা স্বদেশ ত্যাগ করে বিদেশমুখী হচ্ছেন। ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরে এতই বিষিয়ে গিয়েছে যে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যদি কেউ স্বতন্ত্রভাবে দেশসেবা করতেও যান স্রোতের বিরুদ্ধেই সাঁতার কাটতে হবে সেই মানুষটিকে।
একারণে শিক্ষিত ও মেধাবী যুব সম্প্রদায় ভারত ছেড়ে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলিতে পাড়ি দিচ্ছেন। আর লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন। কারণ বর্তমানে গোটা ভারতে যে ধরনের রাজনীতি চলছে তাতে সমাজ পরিবর্তনের উদ্দেশ্য গৌণ হয়ে উঠেছে।এদিকে ভারতে মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৬৫ শতাংশ নাগরিকেরই বয়স ৩৫ বছরের চেয়ে কম। অথচ ভারতের রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীদের মধ্যে মোটে ৬ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের চেয়ে কম।
পরাধীন ভারতকে অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকদের হাত থেকে মুক্ত করতে এদেশের যুব সম্প্রদায় যে ভূমিকা পালন করেছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সেই কাহিনি স্বর্ণাক্ষরে্ লেখা রয়েছে। তবু স্বাধীনতার ৭৫ বছরে ভারতীয় রাজনীতি থেকে অন্তর্হিত হয়েছে আদর্শ। এই নিয়ে ভাবার সময় এসেছে জাতীয় স্বার্থেই।






