আওয়ামী লীগের ভোটব্যাঙ্ক টানতে চাইছে বিএনপি?
Bangladesh Politics: নির্বাচনী মঞ্চে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে বারবার ফিরে আসছে ১৯৭১, ফিরে আসছে কারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিল আর কারা ছিল বিপক্ষে। সভা-সমাবেশে তারা জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলছেন, সমালোচনা করছেন, ইতিহাসের পাতা উল্টে বর্তমান রাজনীতির যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল আদর্শের জন্যেই করা, নাকি ভোটের অঙ্ক মেলানোর এক হিসেবি প্রয়াস?
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে আসতেই এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ছে— মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ। নির্বাচনী মঞ্চে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে বারবার ফিরে আসছে ১৯৭১, ফিরে আসছে কারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিল আর কারা ছিল বিপক্ষে। সভা-সমাবেশে তারা জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলছেন, সমালোচনা করছেন, ইতিহাসের পাতা উল্টে বর্তমান রাজনীতির যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল আদর্শের জন্যেই করা, নাকি ভোটের অঙ্ক মেলানোর এক হিসেবি প্রয়াস?
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের মোট আসন সংখ্যা ৩০০টি, এ তথ্য নির্বাচন কমিশনের নথিতেই উল্লেখ আছে। ২০২৪ সালের ভোটে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় নয়টি আসনের অন্তর্গত ২১টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছিল। একই সময়ে কমিশন আওয়ামী লীগের এক প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল করে। শেষ পর্যন্ত ২৯৯টি আসনের ফল প্রকাশ হয়। এর মধ্যে ২২৩টিতে জিতে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তবে এই নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট বির্তক আছে।
এবারের বাংলাদেশের নির্বাচনী সমীকরণকে অন্যরকম করে তুলেছে একটি বড় অনুপস্থিতি, আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে নেই। ফলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানচিত্র বদলে গিয়েছে। এই শূন্যতায় সবচেয়ে দৃশ্যমান দুই শক্তি হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। পাশাপাশি আলোচনায় আছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। কিন্তু বাস্তব লড়াই মূলত বিএনপি ও জামায়াতকে ঘিরেই। আর সেই লড়াইয়ে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধকে এমনভাবে সামনে আনছে, যা আবারও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিষয়। অন্যদিকে বিএনপি নিজেদের বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসেছে। কিন্তু এই দুই দল বহু সময় একসঙ্গে পথও চলেছে। আন্দোলনে, নির্বাচনে, এমনকি সরকার পরিচালনায়ও তাদের জোট ছিল। ইতিহাসে দুই দলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এখন জামায়াতকে লক্ষ্য করে বিএনপি যে কথা বলছে, তা শুধু অতীতের কথা মনে করানো নয়— এর মধ্যে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ না থাকায় তাদের সমর্থক ভোটারদের একটি বড় অংশ এখন দোদুল্যমান অবস্থায়। এই ভোটারদের আবেগের জায়গা মুক্তিযুদ্ধ। বিএনপি সেই জায়গাটিকেই স্পর্শ করতে চাইছে। কারণ, যারা আওয়ামী লীগ বিরোধী, তাদের মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও চেতনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। আবার সাম্প্রতিক আন্দোলনে যুক্ত অনেক তরুণও মুক্তিযুদ্ধকে মূল্যবোধের জায়গা থেকে দেখে। তাই এই বিষয়টি সামনে আনা মানে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Khaleda Zia’s Funeral: এই জানাজায় যারা যোগ দিয়েছিলেন তারা সকলেই বিএনপি কর্মী ছিলেন না। কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্তিম বিদায়ে এমন ছবি এই উপমহাদেশে খুব কমই তৈরি হয়েছে।
অনেকের মতে, নতুন কিছু নয় যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নির্বাচন এলেই মুক্তিযুদ্ধ সামনে আসে, আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আড়ালেও চলে যায়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বিএনপিকে এমন একটি অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে তাকে সরাসরি জামায়াতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে। ফলে ইতিহাসের প্রশ্নটিও সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠেছে।
৫ অগাস্টের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে জামায়াতে ইসলামী নতুন করে দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে বলে অনেকেই মনে করেন। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতঘনিষ্ঠ ছাত্র সংগঠনগুলির সাফল্য তাদের সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। এতে করে সংসদ নির্বাচনেও তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে দৃঢ় হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি জামায়াতকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে। ফলে তাদের বক্তব্যে একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। অতীতে যাদের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সহাবস্থান ছিল, আজ তাদের বিরুদ্ধেই ইতিহাস তুলে ধরে অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াতের বর্তমান অবস্থানের পেছনে অতীতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের সময় থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জন্য যে সুযোগ তৈরি হয়, তা জামায়াতকে পুনর্গঠনের পথ দেয়। স্বাধীনতার পর সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই নিষেধাজ্ঞা ক্রমশ দুর্বল হয়। এরপর ধীরে ধীরে জামায়াত আবার প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসে। তবে তারা সরাসরি নিজেদের নামে রাজনীতিতে ফেরেনি। ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা নির্বাচনে অংশ নেয় এবং সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে। সেখান থেকে সংগঠিত হয়ে আবার নিজেদের পরিচয়ে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৯১ সালে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করে। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের মাধ্যমে আবারও তারা একসঙ্গে ক্ষমতায় আসে। সেই সময়ের সরকারে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা মন্ত্রিত্ব পান। পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এখন বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে জামায়াতবিরোধী অবস্থান অনেকের কাছে কৌশলগত বলে মনে হচ্ছে। কারণ, আওয়ামী লীগ না থাকায় তাদের ভোটারদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতেই বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ সামনে আনছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bangladesh 13th National Election: বিএনপির একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করা। কীভাবে দেশ চালাবে, সে কথা বলাই জরুরি। একইভাবে জামায়াতেরও দরকার, শুধু আদর্শের কথা নয়— দেশ চালানোর সক্ষমতা আছে, সেটাও দেখানো।
মুক্তিযুদ্ধ এখনও বাংলাদেশের মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। যারা আওয়ামী লীগ বিরোধী, তাদের বড় অংশও মুক্তিযুদ্ধকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখে। ফলে এই আবেগকে সামনে আনা মানে একটি সাধারণ নৈতিক অবস্থান তৈরি করা, যেখানে জামায়াতকে সহজেই প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়।
বিএনপি বলছে, আদর্শগতভাবে জামায়াতের সঙ্গে তাদের পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, এই বক্তব্যের পেছনে নির্বাচনী কৌশল বড় ভূমিকা রাখছে। কারণ, প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে ইতিহাসের মতো কার্যকর হাতিয়ার খুব কমই আছে। রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই, এই কথাটি বাংলাদেশেও বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান বদলায়, যুক্তি বদলায়, রাজনীতির ধরন বদলায়। একসময় যারা সহযোগী ছিল, আজ তারা প্রতিদ্বন্দ্বী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা কি সত্যিই বিএনপির দিকে ঝুঁকবে? নাকি তারা অন্য কোনো বিকল্প খুঁজবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাঙ্ক এখন বিভিন্ন দলের নজরে। তাঁর কথায়, স্থানীয় প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর করে এই ভোট বিভক্ত হবে। তিনি মনে করেন,
আওয়ামী লীগের সব সমর্থক ভোট দিতে আসবেন না; এমনকি মোট সমর্থকদের একটি বড় অংশও ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত নাও থাকতে পারেন। ফলে বিভিন্ন এলাকায় এই ভোট ছড়িয়ে পড়বে।
আলতাফ পারভেজ আরও বলেন,
বিএনপির ভেতর ঐতিহাসিকভাবে দু'টি ধারা ছিলই— ডান ও বাম মনস্ক। বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের বাম মনস্ক নেতারা নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরার একটি সুযোগ পাচ্ছেন।
বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান আবার বলেন,
শুধুমাত্র নির্বাচনী মঞ্চ নয়, যে কোনো প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিতেই বিএনপি'র বক্তব্যে সব সময় ৭১ ও মুক্তিযুদ্ধ আসে। কারণ বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক এবং শ্রেষ্ঠতম মুক্তিযোদ্ধা। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের যে কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে (আওয়ামী লীগ-সহ) বিএনপিতেই সবচেয়ে বেশি বীরত্বের পদক পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিল এবং আছে। বিএনপি কখনোই মুক্তিযুদ্ধের আবেগ নিয়ে নোংরা রাজনীতি করতে যায়নি। সুতরাং, আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আনছে বা মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করছে, এই ধারণাটা সঠিক নয়। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা যদি মনে করেন যে আসন্ন নির্বাচনে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি দলকে বেছে নিবেন, কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী একটি দলকে বর্জন করবেন— তাহলে সেটা তাদের নিজস্ব বিবেচনা। এবং আমরা তাদের এই বিবেচনাকে স্বাগত জানাবো।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্ন এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী। বিএনপি সেই বাস্তবতাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। জামায়াতের সঙ্গে অতীতের জোটের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এখন তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান জোরালো করছে।






