নেহা বোরার সভার পরেই যাদবপুরে কমিটি ভাঙল! রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ঘিরে কেন তুঙ্গে বিতর্ক?
Neha Bora Jadavpur University: আয়োজক ছাত্র সংগঠন আইসার যাদবপুর ইউনিট দাবি করেছে যে তারা যথাযথ নিয়ম মেনে ২০ সেপ্টেম্বরই আবেদনপত্র জমা দিয়েছিল এবং ২৫ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট কমিটি থেকে অনুষ্ঠানটির অনুমোদনও পেয়েছিল। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দেবজিৎ দত্ত দাবি করেন, এই ধরনের কোনো ফাইল বা অনুমতির চিঠি তাঁর দপ্তরে পৌঁছয়নি।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফের দানা বেঁধেছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক। ৫ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির উদ্যোগে একটি কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের জাতীয় রাজধানীর পরিচিত যুব নেত্রী তথা আইসার (AISA) জাতীয় সভাপতি নেহা বোরা। আর এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই তৈরি হওয়া তীব্র রাজনৈতিক তরজার জেরে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান অনুমোদন ও নজরদারির দায়িত্বে থাকা বিশেষ কমিটিটিকে ভেঙে দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য।
৫ অক্টোবর ২০২৬, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলির যৌথ উদ্যোগে “জেন জি মুভমেন্ট: ইউনিটি অফ জেনারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্যান্স” শীর্ষক একটি কনভেনশন আয়োজিত হয়। প্রাথমিকভাবে কেপি বসু মেমোরিয়াল হলে এই অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা থাকলেও, বিপুল ছাত্রসমাগম হওয়ায় পরবর্তীতে তা স্থানান্তরিত করা হয় গান্ধী ভবনের সামনের খোলা জায়গায়। এই সম্মেলনে মূলত জাতীয় শিক্ষানীতি ও ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বাতিল, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন, ভারতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট বিল ২০২৬ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে লাগাতার আক্রমণের প্রতিবাদে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে নেহা বোরা ছাড়াও এসএফআই (SFI) নেতা সৃজন ভট্টাচার্য, এসআরএফটিআই (SRFTI)-এর ছাত্র সংসদের সভাপতি ব্লসম হাজারিকা সহ বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Neha Bora Jadavpur University: নেহার কথায়, “আমার গলার অবস্থা, আমার শরীরের অবস্থা যা—ঠিক একই পরিস্থিতি আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (SRFTI)। আর এই যন্ত্রণা যদি কেউ বুঝতে পারে, তবে দিল্লির রাজপথে যাদের রক্ত ঝরেছে, যাদবপুরে যাদের উপর হামলা হয়েছে, এসআরএফটিআই-তে যাদের উপর আক্রমণ হয়েছে—আমরাই একে অপরের ব্যথা সবচেয়ে ভালো বুঝি।”
এই কনভেনশনের পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কোন্দল শুরু হয়। আয়োজক ছাত্র সংগঠন আইসার যাদবপুর ইউনিট দাবি করেছে যে তারা যথাযথ নিয়ম মেনে ২১ সেপ্টেম্বরই আবেদনপত্র জমা দিয়েছিল এবং ২৫ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট কমিটি থেকে অনুষ্ঠানটির অনুমোদনও পেয়েছিল। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দেবজিৎ দত্ত দাবি করেন, এই ধরনের কোনো ফাইল বা অনুমতির চিঠি তাঁর দপ্তরে পৌঁছয়নি। নিয়ম অনুযায়ী কমিটি কেবল সুপারিশ করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের দায়িত্ব রেজিস্ট্রারের। এই ক্ষেত্রে সেই প্রোটোকল মানা হয়নি বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়। এই পদ্ধতিগত ত্রুটি এবং এবিভিপি ও অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের (ABRSM) তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে ৬ অক্টোবর একটি নির্দেশিকায় উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানান, ২৪ মার্চ গঠিত অনুমোদন এবং কর্মসূচি নজরদারি কমিটিকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ওই কমিটির চেয়ারম্যান এবং ছাত্রাবাসের ডিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এখন থেকে এই ধরনের সব বিষয় ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নিজে দেখাশোনা করবেন বলে জানানো হয়েছে।
দিল্লিতে নির্বাচন কমিশন ও এসআইআর (SIR)-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশি হেনস্থার শিকার হওয়া যুব নেত্রী নেহা বোরা যাদবপুরের মঞ্চ থেকে তীব্র ভাষায় কেন্দ্র ও শাসক শিবিরকে আক্রমণ করেন। তিনি বলেন যে বামপন্থীরা ভয় পায় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ চালিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা দমন করার চেষ্টার প্রতিবাদ করে তিনি জানান যে বাংলায় ক্ষমতার লোভ ও আস্ফালন তৈরি করতে এসআইআরের মতো ফাঁদ তৈরি করা হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া মানে গণতন্ত্রের প্রাণ কেড়ে নেওয়া। পাশাপাশি তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন যে তারা ভাবে বই পড়া আর সুন্দর ভাষায় বক্তৃতা দেওয়া বামপন্থীরা কিছুই করতে পারবে না, কিন্তু যখন প্রতিরোধের প্রশ্ন আসবে তখন তারা হাত ভেঙে দেবে এবং অন্যায়ের দাপট মাটিতে নামিয়ে দেবে। দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে যাদবপুর ও এসআরএফটিআই-র লড়াইকে এক সুতোয় বেঁধে তিনি ছাত্র সমাজকে প্রগতিশীল ঐতিহ্য রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SIR Form 7 Controversy: হায়দরাবাদে এসআইআর-এ ফর্ম ৭ নিয়ে বিতর্ক। ৩০ জন মুসলিম ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন করার অভিযোগে বিজেপির এক বুথ এজেন্টের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছে। নির্বাচন আধিকারিকদের যাচাইয়ে ওই ভোটারদের ঠিকানায় থাকার প্রমাণ মেলে। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনায় ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে রাজনৈতিক পারদ চড়েছে চরমে। এবিভিপি এবং শিক্ষক সংগঠন অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, শ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করে বাইরের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ক্যাম্পাসে এনে রাজনৈতিক সভা করা হয়েছে; এ বিষয়ে রেজিস্ট্রারের অনুমোদন এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে বড় ধরনের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে তারা। অন্যদিকে, বাম ছাত্ররা এই পদক্ষেপকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে আক্রমণ করে প্রশ্ন তুলেছে যে গত সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকেই যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি জাতীয়তাবাদী কনভেনশনে বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা এবং যাদবপুরের বর্তমান বিজেপি বিধায়ক সর্বরী মুখোপাধ্যায় অতিথি হয়ে এসেছিলেন, তখন তো প্রশাসনের তরফ থেকে কোনো আপত্তি তোলা হয়নি। উপরন্তু গত অগাস্ট মাসে এবিভিপি সমর্থকদের একাংশ জোর করে ক্যাম্পাসে ঢুকে ভাঙচুর চালিয়েছিল এবং শিক্ষার্থীদের আহত করেছিল, অথচ সেই সময় উপাচার্য বা প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ কোথায় ছিল সেই প্রশ্নও তুলেছে বাম সংগঠনগুলি।
উপাচার্যের নির্দেশে অনুষ্ঠান তদারকি কমিটি ভেঙে দেওয়া হলেও নতুন কমিটি গঠন কিংবা শোকজের কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব এখনও সামনে আসেনি। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দেবজিৎ দত্ত জানিয়েছেন যে বিশ্ববিদ্যালয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, তবে নিয়মের তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক অনুষ্ঠান করার ক্ষেত্রে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সবমিলিয়ে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রাজনৈতিক উত্তাপ এখন তুঙ্গে।






