ড. জানকী আম্মাল: বিজ্ঞানের জন্য আজীবন নিবেদিত এক নারী

Dr Janaki Ammal: ভারত পুরোপুরিভাবে আখ আমদানিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপর নির্ভরশীল ছিল। কারণ ভারতীয় জলবায়ুতে যে ধরনের আখ উৎপন্ন হতো তা ছিল ভঙ্গুর প্রকৃতির এবং তাতে মিষ্টতা ছিল কম। অর্থাৎ সুইট সেক্টরে ভারত তখনও পরনির্ভরশীল। এই সমস্যারই সমাধান করেছিলেন বিজ্ঞানী ড. জানকী আম্মাল।

inscript
৫ মিনিট
ড. জানকী আম্মাল: বিজ্ঞানের জন্য আজীবন নিবেদিত এক নারী

সংসারবিহীন নারী জীবন পূর্ণতা পায়!

সালটা ১৯৩২, যে সময় নারীদের বিয়ে-সংসার ছেড়ে উচ্চশিক্ষা কিংবা কর্মে যোগদান প্রায় সোনার পাথর বাটি, তেমন একটা সমাজে দাঁড়িয়ে স্রোতের বিপরীতে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জানকী আম্মাল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতের প্রথম উদ্ভিদ বিজ্ঞানী। তাঁর জানকী থেকে ড. জানকী আম্মাল হয়ে ওঠার পথটা ছিল কর্কশ-মধুর।

জানকী আম্মালের জন্ম ১৮৯৭ সালের ৪ নভেম্বর কেরালার থলাসেরিতে (তেলিচেরি)। তাঁর বেড়ে ওঠার সময় ভারতে নারী শিক্ষা ছিল বিরল। প্রায়শই মেয়েরা যেখানে বিয়ে এবং সংসারের সুখী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল সেখানে, জানকী আম্মাল বেছে নিয়েছিলেন ‘শিক্ষা’। সমাজের চল, বৈষম্যতার চোখ রাঙানি ভুলে , অদম্য জেদ, মেধা ও শ্রমবলে তিনি হয়ে উঠলেন ভারতের প্রথম বোটানি ডক্টরেট, প্রথম মহিলা উদ্ভিদবিজ্ঞানী।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হুইল চেয়ার থেকে বিশ্বমঞ্চ: হার না মানা এক অসামান্যা নারীর কথা

Women’s Day 2026: দীর্ঘ দেড় বছরের ব্যর্থ চেষ্টা আর অমানুষিক যন্ত্রণার পর একদিন নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল অনুক্তা। ভেবেছিল লড়াই বোধহয় শেষ, কিন্তু সমাজ তাকে নতুন যন্ত্রণার মুখোমুখি দাঁড় করাল।

প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বোটানিতে অনার্স পরে ১৯২৪ সাল নাগাদ মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বোটানিতে এমএস ও পিএইচডি– তবে শুধু উচ্চশিক্ষিত হিসেবেই নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত নয়, দেশের অগ্রগমনেও একই রকম দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন এই মহিলা বিজ্ঞানী। তাঁর দৌলতেই আজ ভারত পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ‘আখ’ উৎপাদনকারী দেশ।

একটা সময় ছিল যখন ভারত পুরোপুরিভাবে আখ আমদানিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপর নির্ভরশীল ছিল। কারণ ভারতীয় জলবায়ুতে যে ধরনের আখ উৎপন্ন হতো তা ছিল ভঙ্গুর প্রকৃতির এবং তাতে মিষ্টতা ছিল কম। অর্থাৎ সুইট সেক্টরে ভারত তখনও পরনির্ভরশীল। এই সমস্যারই সমাধান করেছিলেন বিজ্ঞানী ড. জানকী আম্মাল। আমেরিকা থেকে ভারতে ফিরে, জিনতত্ত্ববিদ হিসেবে তিনি যোগ দিলেন কোয়েম্বাটুরের আখ প্রজনন ইনস্টিটিউটে। তাঁর গবেষণার মূল বিষয়ই ছিল সাইটোজেনেটিক্স (ক্রোমোজোম গবেষণা) এবং উদ্ভিদ সংকরণ (plant cytogenetics and hybridization)। এর উপর ভিত্তি করেই দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় হাইব্রিড ‘ক্রস-ব্রিডিং’ দ্বারা তিনি এমন এক আখের প্রজাতি তৈরি করেছিলেন যা ভারতীয় মাটি ও জলবায়ুতে পরিপূর্ণভাবে বেড়ে উঠতে সক্ষম। তারই গবেষণা মোড় ঘুরিয়েছিল ভারতের সুইট সেক্টরের। আজ ভারত আখ উৎপাদন এবং চিনি তৈরিতে আত্মনির্ভরশীল, যাঁর পুরো কৃতিত্বই তাঁর। তবে এই পর্যায়ে পৌঁছেও বৈষম্যতা কিন্তু তাঁর পিছু ছাড়েনি। কর্মক্ষেত্রে পুরুষকর্মীদের তাঁকে কোণঠাসা করার প্রবণতা, তাঁকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করে। তিনি লন্ডনে চলে যান। তবে সেখানে গিয়েও তাঁর গবেষণা থেমে থাকেনি। লন্ডনের একটি গবেষণাগারে, তিনি একটি নতুন ম্যাগনোলিয়া প্রজাতি তৈরি করেন, যা পরিচিতি পায় ম্যাগনোলিয়া কোবাস ‘জানকী আম্মাল’ নামে।

১৯৫১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর অনুরোধে , তিনি পুনরায় ভারতে ফেরেন। উদ্দেশ্য ছিল ভারতে কৃষি বিজ্ঞানী বিকাশ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও উন্নত করা। বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (BSI)-র পুনর্গঠনও তাঁর হাত ধরে। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা, জ্ঞান, শ্রম এবং বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর এই অবদানকে সম্মান জানিয়ে, ১৯৭৭ সালে তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে সম্মানিত করে। পরিবেশ রক্ষায় সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলনেও তাঁর ভূমিকা অগ্রগন্য।

বাঁধা ছক ভেঙে এগিয়ে চলার অনন্য উদাহরণ জানকী আম্মাল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, বিজ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ বা জাতির একচেটিয়া অধিকার নয়। একজন নারী হিসেবে তিনি তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে অবিবাহিত থেকে নিজের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞানের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। বদলাতে চেয়েছিলেন, নারী মনের চিরাচরিত ইতিহাসকে। বার্তা দিয়েছিলেন— ধৈর্য, নিষ্ঠা এবং বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা থাকলে যে কোনো সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকেই জয় করা সম্ভব।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।