প্লাবিত এই তীরের মাঝে একা জয়দেব
১৯৯২ সালে জয়দেব ডায়রিতে লেখেন, "বিজেপি ক্ষমতায় আসছে। নিশ্চিতভাবে আজ আমি লিখে রাখছি-ক্ষমতায় আসছে অবিলম্বেই।" ১৯৯২ সালে কবি জয়দেব বসুর এই রাজনৈতিক অনুমান। বত্রিশ বছর আগে। কিন্তু একটা অনুমান একজন কবির কৌশল পাল্টে দিতে পারে, কিন্তু তাঁর আদর্শগত অবস্থান নয়।
আজ কবি জয়দেব বসুর জন্মদিন। আমরা কি জয়দেব বসুর জন্মদিনকে 'জন্মদিবস' বলে চিনতে পারি? না বোধহয়। আমাদের জন্মদিন হয়। আমাদের জন্মদিন কখনও জন্মদিবস হয়ে ওঠে না। আমরা মানে এই পৃথিবীতে টিকে থাকা, হারতে থাকা, ঠকতে থাকা অজস্র মানুষ। পোকা হয়ে যাওয়া মানুষ, বোকা হয়ে থাকা মানুষ। আমাদের মাঝেই একজন জয়দেব বসু ছিলেন। কবিতাকে যিনি রাজনীতির অবস্থানেই মাপতে চেয়েছিলেন।
জয়দেব বসুর জন্ম ১৯৬২ সালে। যুদ্ধের ৬২। টালমাটালের ৬২। ৬২ সালের জয়দেব যখন আঠারো পেরোচ্ছেন তখন ১৯৮০। আশির দশকেই জয়দেব বসু লিখছেন,
আজি হতে শতবর্ষ পরে কে তুমি পাঁজর খুলে শান দাও পাথরে-পাথরে?
সহসা আকাশ আজ কনের চেলির মতো ছেড়ে এল অতীত জীবনে।
বাজে শাখ, বাজে উলুরব। এসো মেয়ে, অলক্ত চরণ রেখা এঁকে দাও শিয়রে, কপালে...
ডিসেম্বর: ১৯৮৫ নামের এই লেখা তিনি লিখছেন সাতাশে ডিসেম্বর। এ কি তেমন নতুন কোনো উচ্চারণ? বাংলা কবিতার মানচিত্রে এই কবিতা কি নদী পাহাড়ের পাশে এক নতুন সংকেত?
এই তর্ক শুরুতেই বাতিল করা যায়। আশির দশকে বাংলা কবিতা উদযাপনে ব্যস্ত হয়ে উঠছে। কবিতায় কবিতায় বুঝে নেওয়া হচ্ছে শ্রেণি অবস্থান এবং শ্রেণি সংগ্রামের যাবতীয় হিসেব। রাজ্য পরিচালনায় তখন বামপন্থীরা। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং জ্যোতি বসু। লালে লাল এই বাংলা। বিরানব্বই আসতে তখনও ঢের দেরি। বাংলার কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের প্রায় সকলেই শ্রেণি সংগ্রামের পক্ষে লিখছেন। কার্ল মার্ক্স তাঁদের দিয়ে লেখাচ্ছেন। বিচ্যুতি দেখলে মার্ক্সই শাস্তি দিচ্ছেন। দেওয়ালে দেওয়ালে তখন মাৰ্ক্সের ছবি। ব্যক্তি নয়, কালেকটিভই আসল, এটাই তখন সময়ের ন্যারেটিভ। ব্যক্তির কথা ভাবা, পছন্দের পক্ষে সাওয়াল করা তখন পার্টিদ্রোহ। সেই পার্টিদ্রোহ আর এখনের দেশদ্রোহ আকারে না হলেও, আয়তনে প্রায় সমান।
তবু চিন্তকের একমাত্র সহায় তো দ্বন্দ্বই। সেই বিশাল সমষ্টির মাঝে নিজের অবস্থান কী, কোথায় তার মূল্য এই প্রশ্নে এক তরুণ কবির উদ্বেল হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রায় প্রায় ওই সময়েই, ১৯৮৬ সালে জয়দেব ডায়রিতে লিখছেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হলো ‘অতি-আবেগ’। ছবি অতিরিক্ত আবেগ থাকলে তার ভিতরের অন্যান্য ফ্লেভারগুলি ঢাকা পড়ে যায়—ঠিক যেমন রান্নায় খুব বেশি ঝাল হলে খাবারের অন্য সব স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। রঘু রাইয়ের ছবিতে আবেগের ভারসাম্যটা খুব চমৎকার।
কিছুদিন আগেই যে মজদুর কিষাণ সংগ্রাম সমিতিকে নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে কবিতা লিখেছি, গতকাল তারাই আমাদের বিহার রাজ্য কমিটির সদস্য কমরেড আনন্দ সিংকে খুন করল। আমার প্রতিবাদে যেমন ওদের উপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়নি, তেমনই আজ আমার ধিক্কারেও তাদের কিছুই যাবে আসবে না। হায়, সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়াসমূহের কাছে ব্যক্তিমানুষের প্রতিক্রিয়া কতই না অকিঞ্চিৎকর।
এই দ্বন্দ্ব থেকেই মূলত জয়দেবের যাত্রা শুরু। আর যতবারই এই প্রশ্ন নিয়ে জয়দেব সামনে এসেছেন, নিজের সঙ্গে নিজেরই একটা মীমাংসা করতে চেয়েছেন ততবারই তত্ত্ব আর পার্টিলাইনের জটিল মারপ্যাঁচে জয়দেবকে প্রায় একা করে দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৬ সালেই ডায়েরিতে জয়দেব লিখছেন,
দঃ চব্বিশ পরগনার ঘটনাটা প্রসঙ্গে মনে পড়ল, একেবারে উচ্চতম কমিটি থেকে নিম্নতম ব্রাঞ্চ পর্যন্ত দেখেছি নিজের স্বার্থটাকে সবাই একটা খাড়া করা তত্ত্ব দিয়ে ঢাকে। বুড়ো থেকে কচি পর্যন্ত সবকটারই একই ঢং। আশ্চর্য, কখন সময় পায় সে? সে কি গর্ভের মধ্যেও কাজ করে?
দারুণ প্রাসঙ্গিকতায় জয়দেব বসু তাঁর ডায়েরিতে 'অচলয়াতন'-এর উল্লেখ করেছেন। এবং আশির দশকের শেষ দিক থেকে এই অচলায়তন যত তার পেট ফুলিয়ে হাতির মতো সাজতে চেয়েছে ততই জয়দেব তাঁর কবিতার পরিসর খুঁজে পেয়েছেন। সময়টা ১৯৯৪ সাল; তখন জয়দেব বসু সম্ভবত তাঁর জীবনের চরমতম বিতর্কের সামনে এসে দাঁড়ান। 'আমার লোকাল কমিটি' কবিতায় একেবারে স্পষ্টই লেখেন
এল-সি বলেছে, আমাদের আগে বলো
একা একা কোনও প্রতিবাদ করা মানা
জানিয়ে দেখেছি, ফল যা হয়েছে তার
শুধু আমি কেন, অন্যেরও সেটা জানা।
এবার হঠাৎ করে জয়দেব এমন লিখতেই বা গেলেন কেন? আসলে এই লেখার পটভূমি তৈরি হচ্ছিল আরও আগে থেকে। ১৯৯২ সালে জয়দেব বসু ডায়েরি লিখছেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেশভাগ মান্টোর সাহিত্যে নারীর উপর নেমে আসা চরমতম লাঞ্ছনার নাম। কিন্তু মান্টো কেবল ধর্ষণের বর্ণনা দেননি, তিনি লিখেছেন সেই নারী মনের ভাঙনের কথা। 'খোল দো' গল্পে সাকিনার চরিত্রটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ। দাঙ্গার পর যখন তার বাবা তাকে খুঁজে পায়, সাকিনা তখন প্রায় মৃত। ডাক্তার যখন বলেন "জানালা খুলে দাও" (খোল দো), সাকিনা যান্ত্রিকভাবে নিজের সালোয়ারের গিঁট খুলে দেয়।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পার্টি থেকে ছয় মাসের জন্য আমায় সাসপেন্ড করা হয়েছে। কারণ? ঘোষিত কারণ হল, নিষেধ অমান্য করে 'দেশ' পত্রিকায় লেখা। আর, আসল কারণটা নোংরা।
সময়টা ১৯৯২। এই ৯২ সাল স্রেফ বাংলার না, গোটা দেশের রাজনীতির ল্যান্ডমার্ক বছর। একদিকে বিশ্বায়নের পদ্ধতি সম্পূর্ণ। খোলা বাজারের অসীম হাতছানি, ক্রেতা তৈরির চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা আর ঠিক অন্য দিকে এই ৯২ সালেই অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙা হচ্ছে। ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙা হচ্ছে আর ঠিক তার চারদিন পরে একটা বেআইনি শনি মন্দির বানানো রুখতে গিয়ে জয়দেব বসুকে মার খেতে হয়। সেই নিগৃহীত হওয়াটা সম্ভবত ততটা অস্বাভাবিক ছিল না, যতটা ছিল তৎকালীন লোকাল কমিটির ভূমিকা। যারা মেরেছিল, পার্টি তাদেরই আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। এই হলো রাজনৈতিক সমীকরণের উল্টোবাজি। সেই দিনই জয়দেব ডায়রিতে লেখেন,
বিজেপি ক্ষমতায় আসছে। নিশ্চিতভাবে আজ আমি লিখে রাখছি-ক্ষমতায় আসছে অবিলম্বেই।
১৯৯২ সালে কবি জয়দেব বসুর এই রাজনৈতিক অনুমান। বত্রিশ বছর আগে। কিন্তু একটা অনুমান একজন কবির কৌশল পাল্টে দিতে পারে, কিন্তু তাঁর আদর্শগত অবস্থান নয়।
কবিতায় তিনি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠেন। থিওরি আর অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে কবি জয়দেব বসু প্রাণপণে কবিতাকে এবং নিজেকে মুক্ত করতে চান। নিজেকেই নিজে শোনাতে থাকেন কাক আর হাঁসের গল্প। তবে এই উপলব্ধির শুরু আরও আগে থেকে। যখন থেকে তিনি বুঝতে শুরু করছেন যে, অহেতুক তত্ত্বের আড়াল আসলে এক অন্ধকারের জন্ম দিচ্ছে। যে অন্ধকারের সঙ্গে মেহনতি মানুষের প্রকৃত কোনো যোগাযোগ নেই।
১৯৮৭ সালে জয়দেব বসু লিখছেন:
এক কাক একবার পাল্লা দিতে গিয়েছিল মানসযাত্রী হাঁসদের সঙ্গে। কাক থাকতো নিজের বাসায়। অল্প জায়গার মধ্যে ওড়ার নানা কায়দা রপ্ত করেছিল সে। এভাবে কাক নিজেকে ভাবতে শুরু করলে উড্ডয়নবিদ। তারপর এক শীতে মানসযাত্রী হাঁসের ঝাঁক দেখে সে ভাবলে, এদের একটু চমকে দেওয়া যাক। তাই, আকাশে উঠে হাঁসদের ডেকে বললে: কোথায় যাচ্ছ হে? হাঁসরা বলল: মানস সরোবর। কাক বলল: চলো আমিও যাবো তোমাদের সাথে। তা কতরকম ভাবে উড়তে পারো তোমরা? হাঁসের দল তো অবাক। কতরকম আবার কী? আমরা তো একই রকম উড়ি। কাক তো মুখ বেঁকিয়ে বলল: ছ্যা ছ্যা, শুধু সরল ভাবেই ওড়ো। আর কিছুই জানো না? এই বলে কাক ওদের সাথেই উড়তে উড়তে নানারকম ওড়ার কায়দা দেখাতে থাকল। কিন্তু ফলে যা হবার সেটাই হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাক খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তখন হাঁসের দল মুচকি হেসে সেই কাককে ধরে ধরে মাটিতে নামিয়ে আবার সরল ভাবেই উড়ে চলল মানসযাত্রায়।
কবি জয়দেব বসু আসলে এক মানসযাত্রীই ছিলেন। নিজের নির্মিত খাঁচা থেকে নিজেকেই মুক্তি দিতে পারেন—এমন রাজা ছিলেন তিনি। কবিতার আড়াল, কবির অজীব দৃষ্টি অতিক্রম করে জয়দেব বসু সহজ উচ্চারণে মানুষের কাছাকাছিই থাকতে চেয়েছেন। অজস্র ইশতেহারের পাশে কবি জয়দেব বসু তাঁর ‘জনগণতান্ত্রিক ইশতেহারে’ লিখে রেখেছেন:
শোনো সেই হরিণের কথা, মাংসই ছিল যার শত্রু
শোনো সেই খরগোশের কথা, অহংকার যাকে ছুঁতে দেয়নি
দৌড়বাজির শেষ ফিতে
শোনো সেই কুমীরের কথা, বিশ্বস্ত শিক্ষক যার
সন্তানদের খেয়ে ফেলেছিল।
শোনো সেই ছাগলের কথা, বাঘ যাকে ভয় পেত।
আর সেই রাখাল -
সত্য থেকে দু'কদম পিছিয়ে থাকত যার বাণী।
শোনো, আকাশ কীভাবে শেষ বিকেলের বৃষ্টির পর
শোলার মুকুট পরে সেজে ওঠে, কীভাবে দগ্ধ দিন
জুড়িয়ে দেয় মেঘ, কীভাবে ঝড় ওঠে, শোনো
কীভাবে ঝড় ওঠে
এসবই কি লিখে গেছেন বুড়ো মার্কস?
এই চরম অনিশ্চিত সময়ে, এই তছনছ ঝড়ের মুখে, এই প্লাবিত তীরের পাশে এখনও আজ এই জয়দেব বসুর জন্মদিন উজ্জ্বল হয়ে জেগে আছে। অন্ধকারে আমাদের চোখ সয়ে গিয়েছে বলেই হয়তো আমাদের তাকাতে অনীহা।








