স্বদেশি সিগারেটের প্যাকেটে অভয় দিতেন দেবী, যুগে যুগে কালীকে যেভাবে দেখেছে বাঙালি
স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে মা কালীকে জুড়ে দেওয়া যদি অপরাধ না হয়ে থাকে, তাহলে পরিচালক লীনা কীভাবে অপরাধ করে বসলেন? শিল্প তো সমাজের দর্পণ।

'কালী’ ছবির পোস্টারে মা কালীর মুখে সিগারেট গুঁজে দিয়েছেন পরিচালক লীনা মনিমেকলেই। ২ জুলাই ট্যুইটারে এই ছবি পোস্ট করেন। এরপর এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হতে সময় লাগেনি। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তবে হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন তাঁর নামে এফআইআর করেছে। তাঁর ছবি নিষিদ্ধ করার দাবিও উঠেছে। তবে এসব তো সাম্প্রতিক ঘটনাবলি। স্বদেশি আন্দোলনে দেশ যখন উত্তাল, তখন দেখা যায়, সিগারেটের প্যাকেটে মা কালীর ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন। এটা ১৯ শতকের স্বদেশি আর্টের কথা। অর্থাৎ, কালের সঙ্গে সঙ্গে মা কালীকে নিজেদের মতো করে দেখেছেন শিল্পীরা। আর সিগারেটের সঙ্গে মা কালীকে জুড়ে দেওয়ার ইতিহাস যে আরও প্রাচীন, তা বলাই বাহুল্য। তাই মা কালীকে ধূমপান করিয়ে পরিচালক লীনা কোনও অপরাধ করেছেন কি না, তা সময়ই বলবে।
১৯ শতকের স্বদেশি আর্ট শো। ২০১৭ সালে দিল্লির আকারপ্রকার গ্যালারি এই স্বদেশি আর্ট শোয়ের আয়োজন করে। অর্থাৎ, স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শিল্পের প্রদর্শন। সেখানে দেখা যায় সিগারেটের প্যাকেটে মা কালীর বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপন যে কোনও শিল্পীকে ভাবাতে পারে যে, ধর্ম, পরিচয়, রাজনীতি এবং ব্যবসা কীভাবে শিল্পের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে।
এই শিল্পী এই সিগারেটের বিজ্ঞাপন বাংলায় অনুবাদ করেন। সিগারেটের ব্র্যান্ড কালী। স্বদেশি দ্রব্য হিসেবে একে উল্লেখ করা হয়। তখন দেশ স্বদেশি আন্দোলনে উত্তাল। ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি যে সমাজকে ছেড়ে যায়নি, তা বলাই বাহুল্য। এই অবস্থায় সিগারেটের প্যাকেটে মা কালী। এই নিয়ে সেই সময় আদৌ বিতর্ক হয়েছে কে জানে! না কি স্বদেশি দ্রব্য বলে ছাড়া পেয়ে গিয়েছিল। এই বিজ্ঞাপনের আরও চমক- এই সিগারেট ক্রেতাদের আশ্বস্ত করছে, এতে মা কালীর আশীর্বাদ আছে, তাই এই সিগারেটে সুখটান দিলে তা নিয়ে আশঙ্কা বা ভয়ের কোনও কারণ নেই। সিগারেটের বিজ্ঞাপনে সবসময় লেখা থাকে It Causes Cancer, এক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। বরং উল্টোটাই হয়েছে, এতে উল্লেখিত- “It is not injurious to health.”
তাহলে প্রশ্ন হলো, এই বিজ্ঞাপন কি প্রমাণ করে না যে মা কালী সিগারেট বিক্রি করেছেন, তাই তা নিয়ে আশঙ্কার কিছু নেই। সেটা ছিল ১৯ শতক, তখন সিগারেটের বিজ্ঞাপনে মা কালীর ছবি। আর এখন সময় পাল্টেছে। সমাজ আধুনিক হয়েছে। কিন্তু হিন্দুবাদীদের দাপট যে কমেনি, তা দেখাল তথ্যচিত্রর পোস্টারে মা কালীর ধূমপানের ঘটনা। শিল্পীমহলে এই ছবি বহু-আলোচিত এবং আলোড়িত। এই ছবি সম্পর্কে বলা হয়, ২১ শতকে এই নিয়ে আলোড়ন পড়তে পারত, তখন, অর্থাৎ ১৯ শতকে এই নিয়ে কোনও আলোড়ন হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারও বিরুদ্ধে এফআইআর হয়নি সম্ভবত। কারণ তখন ভাববার মতো অনেক বিষয় ছিল, কারণ দেশ পরাধীন। চলছে স্বদেশি আন্দোলন। কাজেই একটা ঠুনকো সিগারেটের বিজ্ঞাপন হয়তো ঝড় তুলে সময় নষ্ট করেনি। তবে এই সিগারেটের সেলস এজেন্ট ছিলেন এ এইচ জহর। তিনি চেয়েছিলেন স্বদেশি আন্দোলনকে সমর্থন করে যাতে বাংলার দরিদ্র শ্রমিকরা এই সিগারেট কেনেন। সেই কারণে মা কালীকে এর মডেল করে তোলা হয়। তবে কোথাও কোথাও নাকি ক্ষীণ প্রতিবাদ ওঠে। এই সিগারেট তৈরি করে ইস্ট ইন্ডিয়া সিগারেট ম্যানুফেকচারিং কোম্পানি। তবে তা স্বদেশি দ্রব্য হিসেবে বাজারে ছড়ায়। তখন দেশের ভেতরে বিদেশি দ্রব্য বয়কটের রমরমা। তাই কি ব্রিটিশ সংস্থার তৈরি সিগারেট স্বাদেশিকতার মোড়কে জুড়ে বিজ্ঞাপনের কৌশল নেওয়া হয়? এর উত্তর ইতিহাসেই রয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পরিচালক লীনা মা কালীকে ধূমপান করিয়ে যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, তার রেশ চলতে পারে আরও কিছু দূর। তবে তন্ত্রমতে একটা কথা সিদ্ধ যে, মদ, মাংস ছাড়া মা কালীর নৈবেদ্য অসম্পূর্ণ।
এখানেই শেষ নয়। আকারপ্রকার গ্যালারিতে ১৯ শতকের আরও অনেক অয়েলপেন্টিং, লিথোগ্রাফ এবং ওলিওগ্রাফ যেভাবে প্রদর্শিত হয়েছে, তাতে অতীত সমাজের ঝাঁকিদর্শন হয়। সেই সময় পৌরানিক দেবদেবী ও ঘটনা-পরম্পরাকে কীভাবে দেখা হয়েছে, তাও বোঝা যায়। যেমন, মা সরস্বতীর একটা ছবি। তাতে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যার দেবী শুভ্রবসনা, তাঁর একহাতে বীণা, অন্যহাতে বই। সাধারণভাবে বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে এভাবেই দেখতে অভ্যস্ত বঙ্গবাসী। কিন্তু একসময় তাঁকে বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবে তুলে ধরা হয়। ১৯ শতকে মা সরস্বতীকে অন্যভাবে সাজিয়ে তুলেছেন শিল্পী। যেমনভাবে তিনি তাঁর আরাধ্য দেবদেবীকে দেখতে চেয়েছেন, সেইভাবেই তাঁকে রূপ দিয়েছেন। ১৯ শতকের এক বিজ্ঞাপনে মা সরস্বতীকে আয়ুর্বেদ প্রোডাক্টের মডেল হিসেবে দেখানো হয়। মা সরস্বতী বিক্রি করছেন কেশতেল এবং ম্যালেরিয়ার মেডিসিন। তখন চারিদিকে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ, তাই তা সামলাতে মা সরস্বতীকে মডেল করে আয়ুর্বেদিক ওষুধ বিক্রি করা হয়।
ধর্ম এবং পুরাণের বিভিন্ন চরিত্র সেই সময় সমাজকে বার্তা দেওয়ার জন্য শিল্পীদের বড় হাতিয়ার ছিল। এই শো-এর তত্ত্ববধায়ক অসিত পাল নিজে একজন শিল্পী। তাঁর মতে, যদি সেই সময় সিগারেটের প্যাকেটে মা কালীর ছবি দেওয়ার জন্য প্রতিবাদ হয়ে থাকে, তা নিয়ে ব্রিটিশদের মাথা ব্যথার সময় ছিল না। ১৯ শতকে শিল্পীদের শিল্পকর্মে বারেবারে ঠাঁই পেয়েছে পুরাণ, ধর্ম, সমাজ।
পাল বলেন, ১৮৫৭ সালের পরে বাংলার স্থানীয় শিল্পীরা তাঁদের বিষয়ভাবনায় নিয়ে আসেন রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণ। অনেকেই ক্যালকাটা স্কুল অফ আর্ট থেকে প্রশিক্ষণ নেন। তাঁরা এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিয়ে মহাভারত, রামায়ণের বিভিন্ন ঘটনা নিজেদের কল্পনায় জারিত করে বাস্তবে রূপ দেন।
বাংলার ১৯ শতক মানে কী? ধর্ম, শিক্ষা, শিল্প, সমাজ যখন অন্ধকূপে নিমজ্জিত, তখন সমাজকে একটা সজোরে ধাক্কা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। বাংলা নবজাগৃতি দেখল, বাংলা পেল রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ প্রমুখকে। এই অধ্যায় সাক্ষী থাকে ব্রাহ্মসমাজ গঠনের, সমাজ সাক্ষী থাকে সতীদাহ রদ, বাল্যবিবাহ রদ, মহিলাদের শিক্ষা এবং বিধবাবিবাহের মতো ঘটনার। সমাজের পরিবর্তনে সজোরে ধাক্কা দিলেন এই মহাপুরুষরা। তাই শিল্পীদের কলমের আঁচড়ে চিত্রায়িত হয়েছে এই সময় এবং মহাপুরুষরা। এইসব ঘটনা ফুটে উঠেছে সেসময়ের শিল্পকলায়।
কালীঘাটের পটচিত্র সেই সময় বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। ব্রাশস্ট্রোক, ভাইব্র্যান্ট কালার ব্যবহার করে পটুয়ারা সেই সময়ের শহরজীবন তুলে ধরতেন। আবার তাঁরা তুলে ধরতেন পুরাণের চরিত্র, সামাজিক অবক্ষয়ের মতো ঘটনা। কোনও এক পটুয়ার পটে ফুটে ওঠে মা কালীর মাথায় মুকুট। অর্থাৎ, স্থানীয় শিল্পকলায় মা কালী শিল্পীর চোখে এভাবেই রূপ পেয়েছেন। আসল কথা হল শিল্পমাধ্যম বদলেছে, তাই শিল্পীরা তাঁদের নিজেদের মতো করে তাঁদের শিল্পীসত্তার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন মা কালীকে।
স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে মা কালীকে জুড়ে দেওয়া যদি অপরাধ না হয়ে থাকে, তাহলে পরিচালক লীনা কীভাবে অপরাধ করে বসলেন? শিল্প তো সমাজের দর্পণ। শিল্পী যেভাবে তাকে দেখে, তাই রূপ দেন। তা লীনা হোন, কিংবা ১৯ শতকের কোনও শিল্পী, শুধু দেখার চোখ আলাদা।








