কেলেঘাই শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মেদিনীপুরের লোকভাষা

Keleghai River drying up: মৃণ্ময়ের এখন বয়স আটত্রিশ। তিনি পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা। দুই মেদিনীপুরের সীমান্তের কিছুটা অংশ বরাবর বয়ে গিয়েছে কেলেঘাই নদী। কিন্তু সেই নদী আজ শুকিয়ে একপ্রকার বিলুপ্তির পথে। স্মৃতির পথে হেঁটে একটু পিছিয়ে গিয়ে তিনি বললেন, ‘হলা’, ‘মং’, ‘চুয়া’, ‘বাসা’, ‘চাগড়ি’ এবং ‘যাত’-এর মতো বহু লোকায়ত বাংলা শব্দ এখন আর দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় তিনি কাউকে ব্যবহার করতে শোনেননি।

Madhurima Pattanayak
৭ মিনিট
কেলেঘাই শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মেদিনীপুরের লোকভাষা

যৌবনে পা রাখার কিছু পরেই মৃণ্ময় মণ্ডলের মনে হচ্ছিল, আশৈশব যা জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে গেঁথে ছিল, সেই রকম কিছু একটা উপাদান যেন জীবন থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি ভেবে দেখলেন, ছোটবেলা থেকে যে সমস্ত বাংলা শব্দ তিনি দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে এসেছেন এবং নিজের আশপাশের মানুষদের ব্যবহার করতে দেখেছেন, যে শব্দগুচ্ছ জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ছিল—সেই শব্দগুলি যেন জীবন থেকে হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছে।

মৃণ্ময়ের এখন বয়স আটত্রিশ। তিনি পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা। দুই মেদিনীপুরের সীমান্তের কিছুটা অংশ বরাবর বয়ে গিয়েছে কেলেঘাই নদী। কিন্তু সেই নদী আজ শুকিয়ে একপ্রকার বিলুপ্তির পথে।

স্মৃতির পথে হেঁটে একটু পিছিয়ে গিয়ে তিনি বললেন, ‘হলা’, ‘মং’, ‘চুয়া’, ‘বাসা’, ‘চাগড়ি’ এবং ‘যাত’-এর মতো বহু লোকায়ত বাংলা শব্দ এখন আর দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় তিনি কাউকে ব্যবহার করতে শোনেননি। অন্তত তাঁর যৌবনে পা রাখার পর থেকে তো নয়ই। কোনো না কোনোভাবে এই শব্দগুলি সেই কেলেঘাই নদী এবং তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সমাজ, জীবিকা ও সংস্কৃতিকে নির্ভর করেই ব্যবহার করা হতো।

ছোট ডিঙি—যাকে মৃণ্ময় মণ্ডলের অঞ্চলে বলা হয় ‘হলা’। ‘মং’-এর অর্থ নৌকার সামনের অংশ। ‘চুয়া’ মানে ছোট পুকুর। ‘হদা’ বলতে আঞ্চলিকভাবে কচুরিপানাকে বোঝায়, আর কচুরিপানার ঝাঁককে বলা হয় ‘চাগড়ি’। নদীতে যেখানে মাছ খেলা করে, সেই অংশটিকে বলা হয় ‘বাসা’। আর ‘যাত’ শব্দের অর্থ যাত্রাপালা।

এই হারিয়ে যাওয়া শব্দগুলি রাঢ়ী উপভাষারই অঙ্গ। তবে বাংলার অন্যান্য অংশে প্রচলিত রাঢ়ী উপভাষার সঙ্গে দুই মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম অঞ্চলে ব্যবহৃত রাঢ়ী উপভাষার স্পষ্ট ফারাক রয়েছে।

অথচ যে শব্দগুচ্ছ মৃণ্ময় এবং তাঁর আগের প্রজন্ম শুনে ও দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে বড় হয়ে উঠেছেন, পরবর্তী প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের সেই শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয়ই ঘটেনি।

কবি ভাস্কর চক্রবর্তী লিখেছিলেন,

"পাশেই যে নদীটা বয়ে যেত, তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঝিমিয়ে এসেছিল।"

কেলেঘাই চোখের সামনে মরে যাওয়ায় তার হাত ধরে কেবল ভাষা ও সংস্কৃতি মরে যায়নি; নদীকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক মানুষের যে পরিচয় গড়ে উঠেছিল, গড়ে উঠেছিল যে জীবনদর্শন ও আত্মিক পরিচয়—নদীর হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলিও কখন যেন ক্ষীণ হয়ে এসেছে।

বা ধরা যাক ‘মাদাগাড়ি’ বা ‘চাউড়া’-র মতো শব্দ। ‘মাদাগাড়ি’ বলতে কোদাল দিয়ে খোঁড়া ছোট খাদকে বোঝায়, যেখানে চাষের জমিতে সেচের সময় জল ধরে রাখা হতো। আর ‘চাউড়া’ বলতে বোঝানো হতো সেই সময় ব্যবহৃত মাছ ধরার সরঞ্জাম, যা তৈরি হতো বাঁশের পাতলা কাঠি দিয়ে। মৃণ্ময়ের মতে, অন্তত এই দুটি শব্দের অবলুপ্তির নেপথ্যে কেবল নদীর হারিয়ে যাওয়াকেই দায়ী করা যায় না; নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারও এর অন্যতম কারণ।

কেলেঘাইয়ের শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে তাকে ঘিরে সমস্ত শব্দও

দেখা যাচ্ছে, হারিয়ে যাওয়া এই শব্দগুলির স্থান দখল করেছে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলে ব্যবহৃত মান্য রাঢ়ী উপভাষার শব্দগুলি। কিন্তু যে শব্দগুলি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বহুল ভাবে ব্যবহৃত হয়। এগুলির উপর আঞ্চলিকতার ছাপ প্রায় নেই। যেমন ‘হদা’ শব্দটি। সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে একে ‘কচুরিপানা’ বলেই ডাকা হয়। এমনকী রাজ্যের যেসব অঞ্চলে রাঢ়ী উপভাষার প্রয়োগ রয়েছে, সেখানেও এটি কচুরিপানা হিসেবেই পরিচিত।

কেলেঘাই নদীর উৎপত্তি ঝাড়গ্রাম জেলার বাদিনা গ্রামে। সেখান থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে পূর্ব মেদিনীপুরে হলদি নদীতে মিলিত হয়েছে।

লেখক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষাকে প্রধানত চারটি উপভাষায় ভাগ করেছিলেন—রাঢ়ী, পুণ্ড্র বা বরেন্দ্র, বঙ্গ এবং কামরূপ। ঝাড়গ্রাম, দুই মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান, হুগলি, কলকাতা, হাওড়া ও নদীয়ায় রাঢ়ী ভাষার প্রয়োগ দেখা যায়। কিন্তু অঞ্চলভেদে রাঢ়ী উপভাষার ভিতরেও নানা বৈচিত্র্য রয়েছে, ঠিক যেমনটা ঝাড়গ্রাম ও দুই মেদিনীপুরে শুনতে পাওয়া যায়।

মৃণ্ময় জানাচ্ছেন,

"কেলেঘাই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর যত হয়েছে, এই নদীর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং সর্বোপরি এতগুলি মানুষের যে সমষ্টিগত স্মৃতি সব কিছুই কখন যেন হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা যদি নদীকে বাঁচিয়ে রাখতাম, তাহলে কেলেঘাই-কেন্দ্রিক ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং সমষ্টিগত স্মৃতিকে হারিয়ে ফেলতাম না। এই সমস্ত উপাদানই আবার প্রকারান্তরে নদীকে বাঁচিয়ে রাখত।"

ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সুশীলকুমার বর্মণের লেখা একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, যখন শ্রীচৈতন্যদেব কেলেঘাই নদীর পথ ধরে ওড়িশা গিয়েছিলেন, সেই সময় কেলেঘাইয়ের বুকে ‘তেঁতুলাগড়’, ‘বত্রিশাগড়’ এবং ‘বুড়াবুড়িদহ’ নামে বিপজ্জনক চোরাস্রোত দেখা যেত। কিন্তু এই নদীর গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় চোরাস্রোত যেমন হারিয়েছে, সঙ্গে হারিয়েছে তাদের নাম।

যে ভাবে হারাল কেলেঘাই

কেলেঘাই নদীর জলে পুষ্ট নদী। কিন্তু বৃষ্টির খামখেয়ালিপনা এই নদীর শুকিয়ে যাওয়ার পিছনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। এখন বর্ষা আসে দেরিতে; এদিকে বর্ষাকালেও শুষ্ক দিনের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে। সারা বছরের বিভিন্ন ঋতু জুড়ে বেড়েছে দৈনন্দিন গড় তাপমাত্রা। বিশ্বউষ্ণায়নের কারণে নদীর জল বাষ্পীভূত হওয়ার হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রখর গ্রীষ্মে নদী তল শুকিয়ে ফুটিফাটা হয়ে যায়। আবার যেখানে জল দেখা যায়, হয়তো দেখা গেল সেই অংশ বেআইনিভাবে দখল হয়ে রয়েছে।

কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিদ তথা সহকারী অধ্যাপক ড. সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন,

"কেলেঘাইয়ের মতো বর্ষার জলে পুষ্ট নদীকে বর্ষাকাল ছাড়া অন্যান্য সময় জিইয়ে রাখে ভূগর্ভস্থ জল। কিন্তু ভূগর্ভস্থ জলের মাত্রাতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে ক্রমেই মাটির নিচে জলের স্তর কমছে।"

তাঁর মতে, কেলেঘাইয়ের মতো ছোট নদীর ক্ষেত্রে নদীর পাড় বেআইনিভাবে দখল হয়ে যাওয়াও এক বড় ভূমিকা পালন করছে।

মৃণ্ময় জানাচ্ছেন, তিনি কেলেঘাই সংলগ্ন যে অংশে বাস করেন, অন্তত সেই অঞ্চলে কেলেঘাইয়ের তীর বরাবর যে জলাশয়গুলি ছিল, সেগুলি এতদিন ধরে বর্ষাকাল ছাড়াও বছরের অন্যান্য ঋতুতে কেলেঘাইকে পুষ্ট করে এসেছে। কিন্তু সেগুলিকে নদী থেকে বিচ্ছিন্ন করে মাছ চাষের ভেড়ি বানিয়ে ফেলায় জল কমেছে কেলেঘাইতে।

২০২০ সালে ‘মিনিস্ট্রি অব আর্থ সাইন্সেস’-এর ‘অবজার্ভড রেইনফল ভ্যারিয়েবিলিটি অ্যান্ড চেঞ্জেস ওভার ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট’ শীর্ষক রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, দুই মেদিনীপুরেই বর্ষাকালে শুষ্ক দিনের সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির দিনগুলির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বর্ষাকালে গড় বৃষ্টির পরিমাণে বিশেষ তফাত দেখা না গেলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে অতিবর্ষণের ঘটনা বেড়েছে।

‘সুইচঅন ফাউন্ডেশন’-এর ২০২১ সালের মার্চ মাসের একটি রিপোর্ট জানাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে ২০১৩ সাল থেকে বর্ষাকালের পরবর্তী সময়ে ভূগর্ভস্থ জলস্তর হু হু করে নেমেছে। ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাঁকুড়া জেলায় জলস্তর নেমেছে ১১ মিটার পর্যন্ত। অন্যদিকে পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমেছে ৪.৬৯ মিটার এবং পূর্ব মেদিনীপুরে ১.২৭ মিটার। এর ফলে ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সামগ্রিক ভূগর্ভস্থ জলস্তর স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫ থেকে ২১ মিটার নিচে নেমে যায়।

‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র হাইড্রোলজিস্ট অধ্যাপক বিমল মিশ্র একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, মাটির নিচের জল স্বাভাবিকভাবে পুষ্ট হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বৃষ্টির খামখেয়ালিপনা। বিশেষ করে বর্ষাকালে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অতিবর্ষণের ঘটনা, আবার এরই মাঝে শুষ্ক দিনের সংখ্যা বৃদ্ধির মতো ব্যাপার।

‘মিনিস্ট্রি অব আর্থ সাইন্সেস’-এর “দ্য অ্যাসেসমেন্ট অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ওভার ইন্ডিয়ান রিজিয়ন” শীর্ষক রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের আরও পাঁচটি রাজ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুজনিত বৃষ্টিপাতের গড় পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। মিনিস্ট্রির তরফে ২০২৪ সালে প্রকাশিত বার্ষিক জলবায়ু রিপোর্ট বলছে, ২০২৩ সালের গড় তাপমাত্রা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড় তাপমাত্রার তুলনায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে।

নদী, প্রকৃতি ও ভাষা

বিজ্ঞানী ও ভাষাবিদ—উভয়েই বহুদিন আগেই বুঝেছিলেন প্রকৃতির বৈচিত্র্যের সঙ্গে ভাষার বৈচিত্র্যের এক নিবিড় যোগ রয়েছে। সেই কারণে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের কোনো এক উপাদান যদি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভাষা, উপভাষা এবং শব্দও হারিয়ে যায়।

পেনসিলভ্যানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রবীণ ভাষাবিদ এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক জন লিপস্কি একটি ইমেইলে জানিয়েছেন,

“যখন ভাষার অবক্ষয় ঘটে, তখন সংস্কৃতি এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে ফেলে।”

আর যখন উপভাষার একটি বৈচিত্র্য হারিয়ে যায়, তখন হারিয়ে যায় নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পারম্পরিক জ্ঞান—যেমন জোয়ার-ভাটার ধরন, বন্যার ধরন, নদীতে মাছ ধরা কিংবা নৌকা বানানোর জ্ঞান।

আসলে মানুষ বেড়ে উঠেছে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে। কয়েক বছর, দশক বা শতক নয়—লক্ষ লক্ষ বছর ধরে।

প্রকৃতি এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ফলে ইতিমধ্যেই অবলুপ্ত হয়েছে হাজার হাজার ভাষা। চলতি শতকের শেষে সারা বিশ্বজুড়ে অবলুপ্ত হতে পারে ২৪০০ থেকে ৩০০০ ভাষা। কেবল ভারতবর্ষে বিগত ৫০ বছরে ২২০টি ভাষা হারিয়েছে, আর বিগত এক দশকে বিশ্বজুড়ে হারিয়েছে ৪০০টি ভাষা।

সুইডেনসহ উত্তর মেরু অঞ্চলে এখনও কোনোভাবে নয় ধরনের সামি ভাষা টিকে রয়েছে, যে ভাষায় কেবল সেই অঞ্চলের হিমবাহ ও বরফের রকমফের বোঝাতে ৩০০টি আলাদা শব্দ আছে। কিন্তু বিশ্বউষ্ণায়নের কারণে যেহেতু বরফপাত কমেছে এবং হিমবাহের গলন বৃদ্ধি পেয়েছে, এই সংক্রান্ত শব্দগুলিও ক্রমশ অবলুপ্ত হচ্ছে।

যেভাবে বয়ে চলেছে কেলেঘাই

রাজস্থানে মেঘের বৈচিত্র্য বোঝাতে ব্যবহার হয় ৪০টি আলাদা আলাদা শব্দ। কিন্তু প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার কারণে প্রচলিতভাবে দেখে আসা মেঘের ধরন বদলাচ্ছে; ফলে ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হচ্ছে মেঘেদের সেই হারিয়ে যাওয়া নামগুলি।

যদিও কেলেঘাই নদীর ক্ষেত্রে একটা আস্ত ভাষা হারিয়ে যায়নি, হারিয়েছে একটি উপভাষার অন্তর্গত বেশ কিছু ভাষা—ঠিক যেন বড় একটা নদীর ছোট একটা প্রশাখা হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু লিপস্কির মতে, তাও এক বিশাল ক্ষতি। কারণ আঞ্চলিক স্তরে ব্যবহৃত শব্দগুলি সেখানকার মানুষের পরিচয় ও সংস্কৃতির এক ওতপ্রোত অংশ।

নদী ও ভাষার পুনরুদ্ধার

মৃণ্ময়ের মতে, এই নদী যদি বেঁচে থাকত, তবে হয়তো মানুষ নদীকেন্দ্রিক ভাষার প্রতি আরও যত্নবান হতো। তিনি এখন শ্রেণিকক্ষের ভিতরে ও বাইরে ছাত্র-ছাত্রীদের শেখান হারিয়ে যাওয়া সেই ভাষা। জনসচেতনতা বাড়াতে সমাজমাধ্যমে গল্প বলেন কেলেঘাইয়ের।

তাঁর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের নদীকর্মীরা নদী বাঁচাও আন্দোলনের মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক চোখরাঙানি এড়িয়ে নিরন্তর চেষ্টা করে যান নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে।

(লেখাটি প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত হয় ১০১ রিপোর্টার্স-এ। অনুবাদ করেছেন মধুরিমা পট্টনায়ক)

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কয়লার দেশ হয়েও কেন বিদ্যুৎ সংকটে ভারত?

India's energy crisis 2026: হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ায়, ভারতের ৮০ শতাংশের বেশি জ্বালানি আমদানি ধাক্কা খেয়েছে। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর এক সময় জ্বালানিক্ষেত্রে ‘ঘাটতি নেই’ বললেও সেপ্টেম্বরে স্বীকার করলেন, জ্বালানির পরিস্থিতি বর্তমানে ‘টানটান’। ৭৬টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সংকটজনক ভাবে মজুত করা কয়লায় চলছে। চলছে এলপিজির কালোবাজারি। ডিসকমগুলির বকেয়া জমে রয়েছে প্রায়, ৩,৩৩০ কোটি টাকা।

প্রকৃতির কোলে পিকনিক, শেষে প্লাস্টিকের পাহাড়: মানুষ কি সত্যিই প্রকৃতিকে ভালোবাসে?

Environmental Pollution: প্রশাসনের তরফে অতিরিক্ত দূষণ ছড়ানো কলকারখানা সিল করে দেওয়ার মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপ হয়তো নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এতেই কি সমস্যার সমাধান মিলবে? কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যক্তিগত যানবাহনের দাপট এবং বৈদ্যুতিন বর্জ্য। শ্রমবিমুখ হয়ে সবকিছু প্রস্তুত পাওয়ার মানসিকতা এবং দেশে সংস্কারের লড়াই না করে সহজে অন্য দেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতাও স্পষ্ট। এই দায় এড়িয়ে কি সার্বিক সমাধান সম্ভব?

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।