বাড়ছে ছোট দলের গুরুত্ব! মহারাষ্ট্রের পুরসভা ভোটের ছায়া পড়বে বাংলার নির্বাচনে?

AIMIM performance maharashtra: মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চলের একাধিক শহর— ঔরঙ্গাবাদ, নাগপুর, অমরাবতী, আকোলা এইসব এলাকায় সাম্প্রতিক পুরসভা নির্বাচনে দেখা গিয়েছে এক নতুন ধরনের ভোটিং প্রবণতা। সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার বিভক্ত না হয়ে কৌশলগতভাবে নির্দিষ্ট প্রার্থী ও দলকে সমর্থন করেছেন।

Sangita Ghorai
৪ মিনিট
বাড়ছে ছোট দলের গুরুত্ব! মহারাষ্ট্রের পুরসভা ভোটের ছায়া পড়বে বাংলার নির্বাচনে?

ভারতীয় রাজনীতিতে গত এক দশকে একটি বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, কেন্দ্রীয় বড় দলগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তির গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। একসময় যাদের ‘ভোট কাটার দল’ বলে অবজ্ঞা করা হতো, আজ তারাই অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। সাম্প্রতিক মহারাষ্ট্রের পুরসভা ও স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল সেই বাস্তবতাকেই আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চলের একাধিক শহর— ঔরঙ্গাবাদ, নাগপুর, অমরাবতী, আকোলা এইসব এলাকায় সাম্প্রতিক পুরসভা নির্বাচনে দেখা গিয়েছে এক নতুন ধরনের ভোটিং প্রবণতা। সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার বিভক্ত না হয়ে কৌশলগতভাবে নির্দিষ্ট প্রার্থী ও দলকে সমর্থন করেছেন। এই সমন্বিত ভোটিংয়ের ফলে বিজেপি ও কংগ্রেসের মতো বড় রাজনৈতিক দলগুলো একাধিক কেন্দ্রে অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খেয়েছে। উল্টে লাভবান হয়েছে তুলনামূলকভাবে ছোট ও আঞ্চলিক দলগুলি, বিশেষ করে AIMIM-এর মতো দল।

গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, মহারাষ্ট্রের প্রায় ২৯টি পৌরসভা এলাকায় ভোটগ্রহণ হয়। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গিয়েছে, ক্ষমতাসীন মহাযুতি জোট (বিজেপি, শিন্দে-নেতৃত্বাধীন শিবসেনা ও এনসিপি) বেশ কয়েকটি এলাকায় তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২৮৬৯টি আসনের মধ্যে তারা জিতেছে ১,৪২৫টি আসন। তবে একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে ছোট ও উদীয়মান রাজনৈতিক দলগুলির উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে AIMIM এই নির্বাচনে প্রায় ১২৫টি আসন জিতে নজর কেড়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৫ লক্ষ শহিদের স্মৃতি ও বর্তমানের অধিকার: আলজেরিয়ার নতুন আইনে কোণঠাসা ফ্রান্স

Algeria: ফ্রান্স এই পদক্ষেপকে একটি "শত্রুতামূলক কাজ" হিসেবে বর্ণনা করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, এই ধরনের আইন দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষত নিরাময়ের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।

বিদর্ভ অঞ্চলের নাগপুর, অমরাবতী, আকোলা ও চন্দ্রপুরের মতো এলাকায় AIMIM সংগঠিত ভোটব্যাংক ও স্থানীয় নেতৃত্বের জোরে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পেরেছে। নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভোটারদের কৌশলগতভাবে একত্রিত করার মাধ্যমে দলটি স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোতে একটি দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করেছে। এই ফলাফল মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে ছোট ও আঞ্চলিক দলগুলোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনে মূল পরিবর্তনটি ভোটের অঙ্কে নয়, এসেছে ভোটের ব্যবহারে। বহু এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটাররা ‘জয়ের সম্ভাবনা আছে’, এমন প্রার্থীদের ঘিরে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। ফলে যেখানে আগে ভোট ভাগ হয়ে যেত, সেখানে এবার একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশ দেখা গিয়েছে। এই প্রবণতা শুধু স্থানীয় পুরসভা নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব আগামী বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

এই ঘটনা ভারতের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে। আজকের ভারতে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু আর শুধুমাত্র দিল্লি নয়। রাজ্য, জেলা, এমনকি ব্লক স্তরেও রাজনীতি নিজের মতো করে সংগঠিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃত হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে জাতীয় দল মাত্র হাতে গোনা (৬টি) কয়েকটি, কিন্তু রাজ্য ও আঞ্চলিক দলের সংখ্যা পঞ্চাশেরও বেশি (৫৮টি)। অস্বীকৃত দল ২,৭৬৩টি। এই দলগুলির অনেকেরই সংসদে বড় উপস্থিতি নেই, কিন্তু রাজ্য রাজনীতিতে তারা নির্ণায়ক শক্তি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০২৫: ভারতের হেট স্পিচ রিপোর্ট, ৯৮ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে

Hate Speech in India 2025: প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ১,৩১৮টি ঘৃণাভাষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে।

আঞ্চলিক দলগুলোর শক্তি মূলত তিনটি জায়গা থেকে আসে— স্থানীয় ইস্যু, সামাজিক পরিচয় এবং সংগঠিত ভোটব্যাংক। বড় দলগুলি যেখানে সর্বভারতীয় এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নামে, সেখানে আঞ্চলিক দলগুলি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকে। রুটি-রুজি-রোজগার-ভাষা এই সব প্রশ্নে তারা অনেক বেশি সরব ও নির্দিষ্ট অবস্থান নেয়। ফলে ভোটারদের একাংশ নিজেদের কথা বলার জায়গা এই দলগুলির মধ্যেই খুঁজে পান।

এই প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটাও একইরকম। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন দোরগোড়ায়, তার আগেই রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন চমক তৈরি করেছে হুমায়ূন কবীরের নতুন রাজনৈতিক দল ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর এই দল গঠন মূলত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে নতুন রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করার চেষ্টার দিকেই ইঙ্গিত করছে। মুর্শিদাবাদে তৃণমূলকে শূন্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুমায়ূন কবীর। যদিও এই দল কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা এখনই বলা কঠিন, তবে রাজনীতির ময়দানে এর উপস্থিতি যে নতুন হিসাব তৈরি করবে, তা অস্বীকার করা যায় না।

বাংলার রাজনীতিতে নতুন দল গঠনের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির নেতৃত্বে গঠিত ISF-ও একইরকমভাবে সংখ্যালঘু রাজনীতির একটি নতুন ভাষা তৈরি করতে চেয়েছিল। যদিও নির্বাচনী ফলাফলে ISF বড় সাফল্য পায়নি, তবু কিছু এলাকায় তাদের উপস্থিতি ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন, মহারাষ্ট্রে যেমন কৌশলগত ভোটিং ছোট দলগুলিকে শক্তিশালী করেছে, বাংলাতেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— আঞ্চলিক বা নতুন রাজনৈতিক দলের সাফল্য শুধুমাত্র আবেগ বা পরিচয়ের উপর নির্ভর করে না। সংগঠন, নেতৃত্ব, মাঠের কাজ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছাড়া কোনো দলই টিকে থাকতে পারে না। মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নির্বাচন দেখিয়ে দিয়েছে, সংগঠিত ভোট যদি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ব্যবহার করা যায়, তাহলে বড় দলগুলোকেও অস্বস্তিতে ফেলা সম্ভব। সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক দলের গুরুত্ব এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। মহারাষ্ট্রের পুরসভা নির্বাচনের ফল শুধু একটি রাজ্যের গল্প নয়, এটি দেশের রাজনীতির বদলে যাওয়া চরিত্রের প্রতিফলন। সেই বদলের ছায়া কি পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের নির্বাচনে পড়বে? উত্তর দেবে সময়, তবে ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই স্পষ্ট।

লিখেছেন
Sangita Ghorai
Sangita Ghorai
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।