১৫ লক্ষ শহিদের স্মৃতি ও বর্তমানের অধিকার: আলজেরিয়ার নতুন আইনে কোণঠাসা ফ্রান্স
Algeria: ফ্রান্স এই পদক্ষেপকে একটি "শত্রুতামূলক কাজ" হিসেবে বর্ণনা করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, এই ধরনের আইন দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষত নিরাময়ের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
গত ২৪ ডিসেম্বর আলজেরিয়ার জাতীয় পরিষদ, পাশ হওয়া ঐতিহাসিক একটি আইনের মাধ্যমে ফ্রান্সের ১৩২ বছরের শাসনকালকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি 'রাষ্ট্রীয় অপরাধ' হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটি কেবল একটি আইনি দলিল নয়, বরং এটি ফ্রান্সের সঙ্গে আলজেরিয়ার প্রায় দেড় শতাব্দীর তিক্ত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন এবং অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ। এই আইনের মূল নির্যাস হলো ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়া, যার মধ্যে রয়েছে ফরাসি শাসনের সময় লুণ্ঠিত সম্পত্তি ও আর্কাইভ ফেরত আনা, ১৯৬০-এর দশকে সাহারা মরুভূমিতে চালানো পারমাণবিক পরীক্ষার মানচিত্র হস্তান্তর এবং ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ যোদ্ধাদের দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনা। এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল যখন আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলোও তাদের ঔপনিবেশিক অতীতের জন্য ক্ষতিপূরণ ও স্বীকৃতির দাবি তুলছে। আলজেরিয়া তার এই নতুন আইনের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ঔপনিবেশিক অপরাধের কোনো তামাদি বা নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
ফ্রান্স এই পদক্ষেপকে একটি "শত্রুতামূলক কাজ" হিসেবে বর্ণনা করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, এই ধরনের আইন দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষত নিরাময়ের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে। যদিও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ অতীতে আলজেরিয়ায় ফ্রান্সের কর্মকাণ্ডকে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে স্বীকার করেছিলেন, কিন্তু তিনি কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাননি। বর্তমান ফরাসি সরকার মনে করে, এই আইনটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে তিক্ততা তৈরি করবে, বিশেষ করে যেখানে নিরাপত্তা এবং অভিবাসনের মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে দুই দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও মেরুকরণ সৃষ্টি করবে। ফ্রান্সের কট্টর দক্ষিণপন্থীরা এই আইনের বিরোধিতা করে কঠোর অবস্থানের দাবি জানাবে, যা ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারকে চাপের মুখে ফেলবে। অন্যদিকে, ফ্রান্সে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক আলজেরীয় বংশোদ্ভূত মানুষ এই আইনকে সমর্থন করছে। এটি ফ্রান্সের সামাজিক সংহতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং নাগরিক অধিকার ও ইতিহাসের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে, আলজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই আইনটি এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্যের জন্ম দিয়েছে। পার্লামেন্টে বিলটি পাশের সময় যে আবেগপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা প্রমাণ করে যে আলজেরীয়দের জনমানসে ফরাসি নির্যাতনের স্মৃতি এখনও কতটা সজীব।
ঐতিহাসিকভাবে, আলজেরিয়ায় ফরাসি শাসন ছিল অত্যন্ত নৃশংস। ১৮৩০ সালে শুরু হওয়া এই শাসনকালে ফরাসিরা আলজেরিয়ার সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। আলজেরীয়দের নিজের দেশেই তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছিল এবং প্রায় ১০ লাখ ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীকে সমস্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত চলা স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রায় ১৫ লক্ষ আলজেরীয় শহিদ হন। ফরাসি বাহিনী সেই সময় বন্দিদের উপর ভয়াবহ নির্যাতন এবং নির্বিচারে গ্রাম ধ্বংসের মতো যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। বর্তমান এই আইনটি সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসেরই একটি আইনি প্রতিচ্ছবি। এটি এমন এক সময়ে পাশ হয়েছে যখন আলজেরিয়া অর্থনৈতিক ভাবে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট দেখা দেওয়ায় আলজেরিয়ার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে, যা তাদের ফ্রান্সের বিরুদ্ধে এই ধরনের সাহসী কূটনৈতিক অবস্থান নিতে সহায়তা করেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
NPA Bangladesh: উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এনপিএ তাঁদের ১০১ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে তিনজনকে মুখপাত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছে— ফেরদৌস আরা রুমি, মইনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) এবং নাজিফা জান্নাত।
আলজেরিয়ার এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ ফ্রান্সের ওপর গভীর এবং বহুমুখী প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপের বর্তমান জ্বালানি সংকটে আলজেরিয়া ফ্রান্সের জন্য একটি অপরিহার্য উৎস। আলজেরিয়া থেকে ফ্রান্সে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি করা হয়। যদি কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তবে আলজেরিয়া গ্যাসের দাম বাড়ানো বা সরবরাহে সীমাবদ্ধতা আরোপের মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। যদিও তারা বাণিজ্যিকভাবে নির্ভরযোগ্য থাকতে চায়, তবে ঐতিহাসিক ইস্যুতে টানাপোড়েন হলে ফ্রান্সকে জ্বালানির জন্য বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে, যা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে। এছাড়া, আলজেরিয়ায় অনেক ফরাসি কোম্পানির বড় বিনিয়োগ রয়েছে, যা এই নতুন আইনের ফলে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আলজেরিয়া বর্তমানে খনিজ সম্পদে আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা কেবল তেল ও গ্যাসের উপর নির্ভরশীল না থেকে খনি খাতে ব্যাপক বৈচিত্র্য আনছে। দেশটির প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত প্রায় ৪.৫ ট্রিলিয়ন কিউবিক মিটার এবং তেলের মজুত ১২.১ বিলিয়ন ব্যারেল, যা তাদের বিশ্ববাজারে অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি রফতানিকারক হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে তারা এই খাতে ৬০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আলজেরিয়া তার বিশাল লৌহ আকরিক ও ফসফেট খনির দিকে বেশি নজর দিচ্ছে; যার মধ্যে ৩.৫ বিলিয়ন টন মজুত সমৃদ্ধ 'গারা জেবিলেট' লৌহ খনি এবং ৭ বিলিয়ন ডলারের নতুন ফসফেট প্রকল্প অন্যতম। গত ৩ আগস্ট পাশ হওয়া নতুন খনি আইনের মাধ্যমে দেশটি বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মালিকানা নীতি শিথিল করেছে, যা লিথিয়াম, জিংক এবং স্বর্ণ উত্তোলনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। হিলিয়াম উৎপাদনেও দেশটির অবস্থান বিশ্বে প্রথম সারিতে। ২০৩০ সালের মধ্যে হাইড্রোকার্বন বহির্ভূত খাত থেকে ২৯ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নিয়ে আলজেরিয়া এখন নিজেকে আফ্রিকার একটি বড় শিল্প ও খনিজ কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। শুধু জ্বালানি অর্থনীতিই নয়, ফ্রান্সের জন্য এটি একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা। আফ্রিকা মহাদেশে ফ্রান্সের প্রভাব গত কয়েক বছরে অনেক কমেছে, বিশেষ করে মালি, নাইজার এবং বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলোতে ফরাসি বিরোধী মনোভাব বৃদ্ধির কারণে। এখন আলজেরিয়া যদি আইনগতভাবে ফ্রান্সকে 'অপরাধী' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, তবে তা আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলোকেও উদ্বুদ্ধ করবে। এটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফ্রান্সের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং রাশিয়া বা চিনের মতো দেশগুলোকে উত্তর আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের আরও সুযোগ করে দেবে। এই মুহূর্তে ফ্রান্স এবং আলজেরিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিষয়ক গভীর সহযোগিতা রয়েছে। আলজেরিয়া যদি ফরাসি সরকারের সঙ্গে এই বিষয়ে অসহযোগিতা শুরু করে, তবে অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করা ফ্রান্সের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মানব পাচার ও উগ্রপন্থা দমনে আলজেরিয়ার গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্কের এই অবনতি ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nobel Peace Prize controversy Maria Corina Machado: মাচাদোর রাজনৈতিক অতীত খতিয়ে দেখলে নোবেল শান্তি পুরস্কারের সঙ্গে একাধিক মৌলিক অসঙ্গতি চোখে পড়ে। ২০১৮ সালে তিনি সরাসরি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে চিঠি লিখে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণের জন্য বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছিলেন।
সব মিলিয়ে, আলজেরিয়ার এই সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠিয়েছে। এটি কেবল আলজেরিয়ার একার দাবি নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে প্রাক্তন উপনিবেশগুলোর জেগে ওঠার একটি প্রতীক। ফ্রান্স যদিও এই আইন উপেক্ষা করার ইঙ্গিত দিয়েছে, তবে আলজেরিয়া তার দাবিতে অনড়। আলজেরীয়দের জন্য এটি ছিল তাদের জাতীয় সম্মান ও বীর শহিদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষার একটি পবিত্র দায়িত্ব। বর্তমান এই টানাপোড়েন ভবিষ্যতে ইউরোপ এবং আফ্রিকার সম্পর্কের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, যেখানে ইতিহাসের অমীমাংসিত অধ্যায়গুলো আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসবে।
আলজেরিয়ার এই নতুন আইনটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আলজেরিয়ার এই আইনে বলা হয়েছে যে, ঔপনিবেশিক আমলের অপরাধের কোনো 'তামাদি' বা নির্দিষ্ট সময়সীমা (Statute of Limitation) নেই। এর অর্থ হলো, ঘটনাগুলো কয়েক দশক আগে ঘটলেও আলজেরিয়া এগুলোকে বর্তমান সময়ের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করবে। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) বা জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রতীকী বা আইনি চাপ তৈরির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে। যদিও আইসিসি সাধারণত অতীতের ঘটনার বিচার করে না, তবে আলজেরিয়ার এই অবস্থান আন্তর্জাতিক স্তরে 'ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার' নিশ্চিত করার দাবিতে নতুন গতি যোগ করবে। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যে আলজেরিয়ার সাহারা মরুভূমিতে ফ্রান্স যে ১৭টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছিল, তার প্রভাব আজও ওই অঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের উপর বিদ্যমান। আলজেরিয়ার নতুন আইনে এই পরীক্ষার মানচিত্র দাবি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ যদি অন্য কোনো দেশে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটায়, তবে তার দায়বদ্ধতা সেই দেশ এড়াতে পারে না। এই আইনের মাধ্যমে আলজেরিয়া ফ্রান্সকে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিষ্কার করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করার জন্য আন্তর্জাতিক পরিবেশ আদালতে আবেদন করার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, ইউনেসকোর ১৯৭০ সালের কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো দেশ থেকে অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ ফেরত চাওয়া যায়। আলজেরিয়ার এই আইনটি সেই দাবিকে আরও আইনি ভিত্তি প্রদান করে। ফ্রান্স যদি আর্কাইভ এবং ঐতিহাসিক সম্পদ ফেরত দিতে অস্বীকার করে, তবে আলজেরিয়া ইউনেসকোর মধ্যস্থতায় বা আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে আইনি লড়াই চালাতে পারবে।
আলজেরিয়ার এই পদক্ষেপটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ আইন নয়, বরং এটি 'ডিকলোনাইজেশন' বা ঔপনিবেশিকতা বিলোপ-এর দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি একটি আইনি নজির তৈরি করল যা ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রাক্তন উপনিবেশগুলোকেও (যেমন ভারত, ভিয়েতনাম বা কঙ্গো) তাদের লুণ্ঠিত সম্পদ ও অধিকার আদায়ে উৎসাহিত করতে পারে। এই ঐতিহাসিক আইনটি পাশ করার পর, আলজেরিয়া এখন তার দাবিগুলো বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আলজেরীয় সরকার এবং বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির পরবর্তী পদক্ষেপগুলো মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত হতে পারে। আলজেরিয়া এখন ফ্রান্সের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করবে যাতে তারা ১৮৩০-১৯৬২ সালের শাসনকালকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'অপরাধ' হিসেবে স্বীকার করে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চায়। এটি কোনো ব্যক্তিগত দুঃখ প্রকাশ নয়, বরং একটি আইনি স্বীকৃতির দাবি। আলজেরিয়া সম্প্রতি আফ্রিকান দেশগুলোর সঙ্গে একটি সম্মিলিত অবস্থান নিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের সম্মেলনে তারা একটি বিশেষ প্রস্তাব (Algiers Declaration) পেশ করার পরিকল্পনা করছে, যাতে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের ঔপনিবেশিক অপরাধের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়। আলজেরিয়ার পরবর্তী বড় পদক্ষেপ হবে ১৯৬০-এর দশকে সাহারায় চালানো ফরাসি পারমাণবিক পরীক্ষার বিস্তারিত মানচিত্র আদায় করা। এর মাধ্যমে তারা ওই অঞ্চলের তেজস্ক্রিয়তা পরিষ্কার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। আলজেরীয় নথিপত্র (আর্কাইভ) এবং লুণ্ঠিত ঐতিহাসিক সম্পদ (যেমন: ১৬শ শতাব্দীর ব্রোঞ্জ কামান 'বাবা মারজুক (Marzuq) ফেরত আনতে তারা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেসকো এবং অন্যান্য সালিশি আদালতের সাহায্য নিতে পারে। নতুন আইন অনুযায়ী, আলজেরিয়ার ভেতরে ফরাসি উপনিবেশবাদকে কোনোভাবে প্রশংসা বা মহিমান্বিত করা এখন দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকার শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রচারমাধ্যমে এই ইতিহাসের সঠিক চিত্র তুলে ধরার জন্য বিশেষ কমিশন গঠন করবে। ফরাসি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলজেরিয়া এই 'ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতাকে' একটি শর্ত হিসেবে যুক্ত করতে পারে। ফ্রান্স যদি দাবিগুলো উপেক্ষা করে, তবে আলজেরিয়া নিরাপত্তা সহযোগিতা বা অভিবাসন সংক্রান্ত ইস্যুতে তাদের অবস্থান কঠোর করতে পারে।
আলজেরিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ কেবল ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ব্যবহার করে একটি 'পূর্ণাঙ্গ ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ' নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্মৃতিকে স্থায়ী আইনি সুরক্ষা প্রদান করা। আইনটি পাশের মাধ্যমে আলজেরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রান্সের কর্মকাণ্ডকে 'গণহত্যা' বা 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এটি আন্তর্জাতিক মহলে ফ্রান্সের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশ বা সংস্থা এই আইনকে সমর্থন করে, তবে ফ্রান্সের উপর নৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করতে পারে। শুধু তাই নয়, শত শত বছর ধরে বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা ঔপনিবেশিক লুন্ঠন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এক নতুন লড়াইয়ে অংশ নিতে নিপীড়িত দেশ, জাতি, জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করবে আলজেরিয়ার এই আইন।






