২০২৫: ভারতের হেট স্পিচ রিপোর্ট, ৯৮ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে

Hate Speech in India 2025: প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ১,৩১৮টি ঘৃণাভাষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে।

inscript
৪ মিনিট
২০২৫: ভারতের হেট স্পিচ রিপোর্ট, ৯৮ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে

২০২৫ সাল, ভারতের গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য একটি অস্বস্তির বছর হয়ে উঠেছে। ভাষা, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের ভূমিকা মিলেমিশে দেশজুড়ে যে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে, তার স্পষ্ট ও তথ্যভিত্তিক ছবি তুলে ধরেছে ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের সাম্প্রতিক রিপোর্ট। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ১,৩১৮টি ঘৃণাভাষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হয়, রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গড়ে প্রতিদিন প্রায় চারটি করে হেট স্পিচের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ঘৃণার ভাষা এখন আর বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা নয়, বরং তা নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক সভা, ধর্মীয় সমাবেশ, মিছিল, সামাজিক অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে উঠেছে। ভাষার এই হিংস্র রূপ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে তোলার যে প্রক্রিয়া চলছে, সেটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।

সবচেয়ে গুরুতর দিকটি হলো, এই ১,৩১৮টি ঘটনার মধ্যে ১,২৮৯টিই মুসলিমদের বিরুদ্ধে। কোথাও মুসলিমদের 'দেশদ্রোহী' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কোথাও তাদের দেশের জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী করা হয়েছে, আবার কোথাও সরাসরি সামাজিক ভাবে বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছে। শুধু মুসলিম নয়, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও এই বিদ্বেষের বাইরে থাকেনি। রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে ঘৃণাভাষণের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ সংখ্যালঘু বিরোধী রাজনীতির পরিধি ক্রমশ আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মোদি জামানায় তুঙ্গে ধর্মের বিদ্বেষ! যেভাবে বেড়েছে হাড়হিম করা অপরাধ

Crimes in Modi Govt: বিজেপি শাসিত রাজ্যে দাঙ্গা তো হয়ই, খোদ প্রশাসনই ধর্মীয় সংঘাতগুলিকে উস্কেও দেয়। চোখের সামনে রয়েছে, মণিপুর এবং হরিয়ানার নুহ'র ঘটনা।

এই ঘৃণাভাষণ দেশের যেসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, তাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড ও দিল্লি— এই রাজ্যগুলিতে হেট স্পিচের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। রিপোর্ট বলছে, মোট নথিভুক্ত ঘটনার প্রায় ৮৮ শতাংশই এমন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতায় রয়েছে বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বিজেপি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলি। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, ঘৃণাভাষণকে রাজনৈতিকভাবে মদত দেওয়া হচ্ছে।

রিপোর্টে যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শাসকদলের একাধিক নেতা ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের মুখপাত্ররা। উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তাঁর বক্তব্য একাধিকবার সংখ্যালঘু বিদ্বেষ উসকে দিয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও অন্যান্য দক্ষিণপন্থী সংগঠনের নেতাদের বক্তব্যও ঘৃণাভাষণের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

এই ঘৃণাভাষণের ভাষাগত ধরনও অত্যন্ত পরিকল্পিত। মুসলিমদের বিরুদ্ধে একের পর এক তথাকথিত ‘জিহাদ’ তত্ত্ব হাজির করা হয়েছে— লাভ জিহাদ, ভূমি জিহাদ, শিক্ষা জিহাদ, ভোট জিহাদ।এখানে বলা জরুরি, এগুলোর কোনোটিরই বাস্তব বা আইনি ভিত্তি নেই, কিন্তু বারবার এই ধরনের শব্ধবন্ধের ব্যবহার করে জনমানসে এগুলিকে ‘সাধারণ সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভয়ের রাজনীতি তৈরি করার কৌশল নতুন নয়, তবে ২০২৫ সালে তার প্রয়োগ আরও নগ্ন এবং আগ্রাসী হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন আখলাক হত্যার মামলা প্রত্যাহার চায় যোগী সরকার?

Akhlaq lynching case: যোগী প্রশাসন বলছে, গ্রামে সামাজিক শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য মামলাটি প্রত্যাহার জরুরি। সমালোচকদের মতে, এই যুক্তি বিপজ্জনক কারণ এটি ভবিষ্যতের হামলাকারীদের কাছে ভুল বার্তা ছড়াবে।

রিপোর্টের আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো সরাসরি হিংসার আহ্বান। প্রায় এক-চতুর্থাংশ ঘটনায় প্রকাশ্যে হিংসা, অস্ত্রধারণ কিংবা ধর্মীয় স্থান ধ্বংসের ডাক দেওয়া হয়েছে। কোথাও মসজিদ ভাঙার কথা বলা হয়েছে, কোথাও সংখ্যালঘু পাড়ায় আগুন লাগানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের বক্তব্য কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা লঙ্ঘন করে না, বরং সরাসরি সামাজিক সহিংসতার মঞ্চ তৈরি করে।

এত কিছুর পরেও রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া প্রশ্নের মুখে। কেন্দ্র সরকার বরাবরের মতোই হেট স্পিচের দায় রাজ্য সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে ‘পাবলিক অর্ডার’ যুক্তি তুলে ধরেছে। সংসদে এই বিষয়ে প্রশ্ন উঠলেও নির্দিষ্ট তথ্য বা কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট। বিচারব্যবস্থাও কিছু পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য ছাড়া বড় কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।

এই পরিস্থিতিতে কর্নাটকের উদ্যোগ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ঘৃণাভাষণ ও বিদ্বেষমূলক অপরাধ বন্ধ করতে রাজ্যটি আলাদা একটি আইন করেছে, সেখানে হেট স্পিচ কী তা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এবং তার জন্য শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে।

২০২৫ সালের হেট স্পিচ রিপোর্ট আসলে একটি আয়নার মতো। এই আয়নায় শুধু বিদ্বেষ ছড়ানো বক্তাদের মুখই নয়, রাষ্ট্রের নীরবতা, প্রশাসনের পক্ষপাত এবং সমাজের উদাসীনতাও প্রতিফলিত হয়। ঘৃণার ভাষা যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন তা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। এই রিপোর্ট ভবিষ্যৎ ভারতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।

হুথিরা যেভাবে স্থানীয় বিদ্রোহী থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিতে পরিণত হলো

Houthi Expansion in Yemen: ইয়েমেনে ফের কেন যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? হুথিরা কীভাবে স্থানীয় জায়দি আন্দোলন থেকে শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হল? ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর? মোখা ও হানিশ দ্বীপপুঞ্জ দখলের পর কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দাব? এই সংঘাতের প্রভাব কি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পড়বে?